গোবিন্দপুর অস্থল ও বাংলার প্রাচীনতম হনুমান মন্দির

Share your experience
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

রাম মন্দিরে বহু মূর্তির সমাহার
রাম-মন্দিরে বহু প্রাচীন মূর্তির সমাহার

শুভম্ মুখোপাধ্যায়

 মোটামুটি অষ্টম-নবম শতাব্দী থেকেই ভারতের বুকে বিষ্ণু-রাম-কৃষ্ণ কেন্দ্রিক একাধিক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। এগুলির মধ্যে শ্রী-সম্প্রদায়, নিম্বার্ক সম্প্রদায়, রামায়েৎ সম্প্রদায় ও পরবর্তীকালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় ভারতীয় ধর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করে। এই সম্প্রদায়গুলি আপন আপন ইষ্ট ও ধর্মভাবনা প্রচার করতে বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্র বা দেবস্থল তৈরী করে, এগুলিই পরবর্তী কালে ‘অস্থল’ নামে পরিচিত হয়।

শ্রী-সম্প্রদায়ের অনুবর্তী মহর্ষি রামানন্দ রাম-উপাসনার উপর জোর দিয়েছিলেন বলে আনেকেই তাঁকে রামায়েৎ সম্প্রদায়ের জনক বলে থাকেন। মল্লাধিপতি বীরহম্বীরের আমল থেকেই বাঁকুড়ার বিভিন্ন স্থানে রামানন্দ-পন্থী রামায়েৎ সম্প্রদায়ের অস্থল প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। বড়জোড়া ব্লকের দধিমুখা গ্রামপঞ্চায়েতের অন্তর্গত গোবিন্দপুর গ্রামেও সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত হয় এমনি এক অস্থল।

হনুমান মন্দিরের প্রাচীন হনুমান মুর্তি
হনুমান মন্দিরে প্রাচীন হনুমান মূর্তি

১৬৭১খ্রিস্টাব্দে এই অস্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় রামচন্দ্রের মন্দির। বোধ হয়, এটিই এই অস্থলে স্থাপিত সবচেয়ে প্রাচীন মন্দির। অবশ্য গত শতকের প্রথম দিকেই মন্দিরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। তাই মন্দিরটি কোন রীতির ছিল তাও জানা যায় না। তবে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাফলকটি বর্তমান রাম মন্দিরে রাখা আছে। তার তা থেকেই মন্দির প্রতিষ্ঠাতা বা প্রতিষ্ঠাকাল সম্বন্ধে জানা যায়। প্রাচীন বাংলা হরফে সংস্কৃত ভাষায় অনুষ্টুপ ছন্দে লিখিত প্রতিষ্ঠাবাক্যটি এরকম—

“শাকে গুণাঙ্কবাণেন্দো কুম্ভরাশি গতে রবো।

বিদ্যাসাগর পুত্রঃ শ্রীপদো রামায় মন্দিরং।।১৫৯৩

 

কারুকার্য খচিত মকরমুখ
কারুকার্য খচিত মকরমুখ

লিপি অনুযায়ী, ১৫৯৩শকাব্দে বা ১৬৭১খ্রিষ্টাব্দের ফাল্গুন মাসে এই মন্দিরটি বিদ্যাসাগর পুত্র শ্রীপদ এই মন্দির স্থাপন করেছিলেন। যদিও এই ‘বিদ্যাসাগর’ বা ‘শ্রীপদ’ সম্বন্ধে কোন তথ্য পাওয়া যায় না, তবু অনুমিত হয় তাঁরা এই অস্থলের ‘মহান্ত’ ছিলেন। বর্তমান রাম মন্দিরটি গত শতাব্দীর প্রথমার্ধ নাগাদ নির্মিত হয়। মন্দিরে রয়েছে রাম-সীতার প্রস্তর বিগ্রহ। এছাড়াও সীতারাম ও রাধাকৃষ্ণের ধাতব মূর্তি ও একাধিক শালগ্রাম শিলা।

অস্থলটির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি হল উত্তরমুখী একরত্ন বিশিষ্ট হনুমান মন্দিরটি। মন্দিরটি ল্যাটেরাইট পাথরে নির্মিত ও উচ্চ ভিত্তিবেদীর উপর প্রতিষ্ঠিত। সমগ্র মন্দিরটি উন্নতমানের পঙ্খের প্রলেপে আবৃত। প্রবেশপথ ত্রিখিলান দ্বার বিশিষ্ট, সামনের দেওয়ালে রয়েছে একাধিক প্রস্ফুটিত পদ্মের অলঙ্করণ। এই দেওয়ালে গদাধারী ও গন্ধমাদন পর্বতধারী হনুমানের দুটি মূর্তিও খোদিত আছে। মন্দিরের চূড়াটি পঞ্চরথ শিখর। প্রবেশপথের সামনে দুটি ও মন্দিরের পশ্চাৎভাগে একটি কারুকার্যমণ্ডিত মকরমুখ আছে। গর্ভগৃহে রয়েছে প্রস্তরখোদিত প্রাচীন হনুমান মূর্তি ও অসংখ্য শালগ্রামশিলা।

রাম মন্দিরের প্রাচীন লিপি
রামমন্দিরে প্রাচীন লিপি

হনুমান মন্দিরটি ১৭৪৬খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এই অস্থলের ‘মহান্ত’ ধর্মদাস। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাফলকটিও অভিনব। ফলকটির দুদিকে বাংলায় ও দেবনাগরী হরফে প্রতিষ্ঠা বাক্য লিখিত হয়েছে, যা বিরল। ধর্মদাস কনৌজ প্রদেশাগত ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাই হয়ত বাংলার সাথে সাথে দেবনাগরী হরফও ফলকে স্থান করে নিয়েছে। প্রতিষ্ঠা ফলকটিতে লেখা আছে—

‘শ্রীশ্রীরাম… সকাব্দে/

১৬৬৮ নাগর্তু… গণিতে/

সকাব্দে শ্রীজানকীনাথ/

পদারবিন্দে শ্রীধর্মদাসেন/

বিচিত্র সৌধং সমর্পিতং কার্তি-/

ক পৌর্ণমাস্যাং।।’

-অর্থাৎ ১৬৬৮ শকাব্দে বা ১৭৪৬খ্রিষ্টাব্দের কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ধর্মদাস এই বিচিত্র সৌধ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 

হনুমান মন্দির
হনুমান মন্দির

বাংলায় রামায়ণের জনপ্রিয়তা আকাশ ছোঁয়া। অবশ্য শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত গৌড়িয় বৈষ্ণবধর্মের জোয়ারে বাংলায় কৃষ্ণের মত রাম দেবতা হিসাবে খুব একটা জনপ্রিয়তা পান নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাম পূজিত হয়েছেন শালগ্রাম শিলায়, রঘুনাথ রঘুবীর ইত্যাদি নামে। অবশ্য কিছুকিছু জমিদার বা রাজপরিবারে সপার্ষদ রামমূর্তি পূজিত হলেও তা হাতেগোনা। শালগ্রাম শিলাতেই তাঁর অর্চনা হওয়ায় সীতা, লক্ষ্মণ বা হনুমানের স্থান সেখানে খুব একটা নেই। বাংলা রামায়ণে হনুমান দাস্যভক্তির অসামান্য প্রতীক হলেও তাঁর আচরণে রঙ্গরসের প্লাবন ঘটানো হয়েছে বেশি। ফলে দেবতা হিসাবে হনুমানও বাংলায় জনপ্রিয় হন নি সেভাবে। গোবিন্দপুরের এই একরত্ন হনুমান মন্দিরটি সেই প্রেক্ষাপটে এক অতুলনীয় সংযোজন। এটিই সম্ভবত বাংলার প্রাচীনতম হনুমান মন্দির।

এই অস্থলের মহান্তরা সকলেই উত্তরভারতীয় ও ব্রহ্মচর্য ব্রতাবলম্বী হতেন। উত্তর ভারতীয় ও বাংলার উভয় সংস্কৃতির এক অসামান্য মিশেল দেখা যায় এই অস্থলে। তার প্রভাব পড়েছে মন্দিরে, লিপিতে এমন কি উপাসিত দেবদেবী মূর্তিতেও। যদিও এই মন্দিরের শেষ মহান্ত প্রায় কুড়ি বছর আগেই এ স্থান ছেড়ে চলে যান, আর ফেরেন নি। ফলে অস্থলটি অভিভাবকহীন ও হতশ্রী হয়ে পড়ে।

হনুমান মন্দিরের প্রাচীন লিপি
হনুমান মন্দিরের প্রাচীন লিপি

অস্থলের ত্রয়োদশ চূড়া বিশিষ্ট রাসমন্দিরটিও প্রাচীন। এখানে রাসপূর্ণিমার পাঁচদিন পর পঞ্চমরাসে শ্রীশ্রীরামচন্দ্রের রাস অনুষ্ঠিত হয়।  রাম-রাস উপলক্ষ্যে দিনের বেলায় যাত্রা হত। মহান্তের নিবাসস্থল, ভোগঘর ও মহান্তদের সমাধিমন্দির প্রাচীন দালানরীতির অলংকৃত নির্মান। যদিও এসব ধ্বংসের মুখে। আগে এই অস্থলের মহান্তের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল জমিদারের মতই। বিভিন্ন রাজা এই অস্থলে প্রচুর ভু-সম্পত্তি দান করেছিলেন। গদীয়ান মহান্ত তাঁর সবচেয়ে অনুগত শিষ্যকে পরবর্তী মহান্ত রূপে আভিষিক্ত করতেন। সেই অভিষেক পর্বটি ছিল আকর্ষণীয়। সে সব আজ অতীত। জঙ্গলঘেরা এক ছোট্টগ্রামে শুধু নির্জনতাকে সঙ্গী করে আজও টিকে আছে কোনমতে। যদিও বাঁকুড়ার রাম-সংস্কৃতি বিকাশে এই অস্থলের গুরুত্ত্ব অসীম।

আরও পড়ুনঃ উৎপল চক্রবর্তীর অভিব্যক্তি

ছবিঃলেখক
কৌলালে প্রকাশিত সমস্ত বক্তব্য লেখকের নিজস্ব। এ বিষয়ে কৌলাল কোনও ভাবে দায়বদ্ধ নয়।  সম্পাদকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত কৌলাল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখা  কিম্বা  কৌলালের নিজস্ব ছবি ব্যবহার করা সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ।


Share your experience
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

Facebook Comments

Post Author: শুভম মুখোপাধ্যায়

Shuvom Mukhopadhyay
শুভম মুখোপাধ্যায় বাঁকুড়ার তরুণ ক্ষেত্রসমীক্ষক ও বাংলা ভাষা সাহিত্যের গবেষক।টিম কৌলালের অন্যতম সদস্য।

0 thoughts on “গোবিন্দপুর অস্থল ও বাংলার প্রাচীনতম হনুমান মন্দির