অগ্নিযুগের বিপ্লবী শহীদ ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী

Share your experience
  • 43
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    43
    Shares

ক্ষুদিরাম-বসু

অভিষেক নস্কর

 

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী ও স্বাধীনতা আন্দোলনোর অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা ও অগ্নিযুগের শহীদ দুই বিপ্লবী ছিলেন প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসু।  বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর জন্ম ১৮৮৮ সালে ১০ ই ডিসেম্বর,  পূর্ববঙ্গের বগুড়া জেলায় বিহার গ্রামে। বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম ৩ রা ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে।  । প্রফুল্ল চাকী   ছোটবেলায় নামুজা জ্ঞানদা প্রসাদ মধ্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে তিনি বগুড়ায় মাইনর স্কুলে ভর্তি হন। তারপরে ১৯০৩ সালে রংপুরে জেলা স্কুলে ভর্তি হন।  এখানে তিনি নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় পূর্ববঙ্গ সরকারের কার্লাইল সার্কুলার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন অংশগ্রহণ করার দায়ে তাঁকে এই স্কুল থেকে বহিস্কার করা হয়।  এরপর রংপুরে কৈলাস রঞ্জন স্কুলে ভর্তি হন। এখানে পড়ার সময় বিভিন্ন বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগের সূত্রপাত ঘটে। এবং তিনি বিপ্লবী ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

ক্ষুদিরাম বসু, পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু,  মাতা লক্ষীপ্রিয়া দেবী। খুব ছোট্টবেলায় ক্ষুদিরাম পিতা মাতাকে হারান। তখন মা, বাবা হারা ক্ষুদিরাম বেড়ে ওঠে দিদি অপরূপা  দেবীর সংসারে। ক্ষুদিরামের নামের তাৎপর্য আছে, কথিত আছে দিদি অপরূপা দেবী তাঁর ভাই ক্ষুদিরামকে তিনমুঠো ক্ষুদ দিয়ে কিনেছিলেন বলে সেই থেকে ভাইটির নাম হয় ক্ষুদিরাম। ছোটবেলায় থেকে  সেবামূলক ও দুঃসাহসিক কাজে সীমাহীন আগ্রহ ছিল।  তবে ক্ষুদিরামকে দেশাত্মবোধ উদীপ্ত করেন মেদনীপুরে কলেজিয়েট স্কুলের   ‘ শিক্ষক ‘  জ্ঞানেন্দ্র নাথ বসু ।  1906 সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মেদিনীপুরে পুরাতন জেল প্রাঙ্গণে এক শিল্প প্রদর্শনী হয়। সেখানে সেই যুগের বিখ্যাত রাজদ্রোহ মুলক পত্রিকা  ‘সোনারবাংলা’ মতান্তরে  বন্দেমাতরম্  বিলি করার দায়ে  পুলিশ ক্ষুদিরামকে ধরতে গেলে তিনি পুলিশকে প্রহার করে পালিয়ে যান। কিন্তু পরে ধরা পড়েন। অল্প বয়সের জন্য পুলিশ মামলা প্রত্যাহার করে নেন। এটা মনে রাখতে হবে যে, ক্ষুদিরামই অবিভক্ত বাংলার প্রথম বিপ্লবী যাঁর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার রাজদ্রোহের প্রথম মামলাটি করেন।

গ্রেপ্তার ক্ষুদিরাম বসু

১৯০৭ সালে শেষের দিকে সারা দেশে শুরু হয় ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংঘর্ষ, ধড়াপাকড় আর অত্যাচার,  নির্যাতন। এইসব স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লববাদীদলগুলোকে দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার মরিয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক বিপ্লবীদের ধরে নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা শুরু করে দেয়। এছাড়া তাদের উপর অকথ্য অত্যাচার  শারীরিক নির্যাতন চালানো শুরু করে।  তাঁদেরকে আলিপুর ও আন্দামান জেলে যাবজ্জীন কারাদন্ড দিয়ে পাঠানো হত।

এমন সময়ে একটি ঘটনা ঘটে যায়,  সুশীল সেন নামে ১৩ বছরে বালক ঘুসি মেরে পুলিশ  সার্জেন্টের  নাক ফাটিয়ে দেয়। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতা মামলা শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। মামলায় বিচারক ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বিচারের সুশীল সেনকে ১৫ ঘা বেত্রাঘাত মারার হুকুম দেন। বেত্রাঘাত করার ফলে বালক সুশীল সেন রক্তাক্ত হলেন।  কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান  শূন্য হয়ে পড়েন।  এর প্রভাব  ছড়িয়ে পড়তে থাকে।   তরুণ বিপ্লবী দল এইঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ইংরেজকে বিতাড়িত করার সংকল্প করেন। বিপ্লববাদী দলের অরবিন্দ ঘোষ, চারুদত্ত, হেমচন্দ্র কানুগো, বারীন ঘোষ, একটি পরিকল্পনা করলেন যে, অত্যাচারী কিংসফোর্ড কে হত্যা করার।  কিন্তু প্রশ্ন উঠল যে এই কাজের দায়িত্ব কাকে দেওয়া যেতে পারে। এইকথা শুনে প্রফুল্ল চাকী বললেন :- ” আমি প্রস্তুত ” ” বলুন কি করিতে হইবে”। সবাই ভাবলেন এই কাজ করার জন্য আরো একজনের দরকার। ভেবেচিন্তে বালক ক্ষুদিরাম বসুকে নির্বাচিত করলেন। ১৯০৮ সালে ২৫ এপিল ক্ষুদিরাম বসু কলকাতায় পৌঁছালেন। কলকাতায় গোপীমোহন দত্তের ১৫ নম্বর বাড়িটি ছিল বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা। এখানে বসেই বিপ্লবী হেমচন্দ্র ও উল্লাস কর “বুক বোমা ” তৈরী করলেন। এই বোমা বইএর পাতায় রাখা যেত।এই বোমাকে একটি বইএর মধ্যে রেখে কিংফোর্ডকে পাঠানো হল। কিন্তু কিংফোর্ড বই না খোলায় এই যাত্রায় প্রাণ বেঁচে গেল।

শুরু হল নতুন প্রস্তুতি। প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম কলকাতা রেলস্টেশনে পৌঁছানোর পর রারীন ঘোষ তাঁদের কাছে কিংফোর্ডকে মারার জন্য বোমা পৌঁছে দিলেন।প্রফুল্ল চাকী ক্ষুদিরাম প্রথমবারে মতো একজায়গা হলেন রেলস্টেশনে।কিংফোর্ডকে হত্যা করার জন্য যুক্তি করলেন। এরপর তারা মজঃফরপুরে চলে যান। কারণ এখানে বাস করতেন কিংসফোর্ড।  প্রতিদিন ক্লাব হাউজ থেকে সন্ধ্যার পর সাদা ফিটন গাড়ি করে নিয়মিত বাড়ি ফিরে যান কিংসফোর্ড। কিছু দিন চলে গেল,  তারা সুযোগের পেল না। কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য শেষমেষ সুযোগ এল। ১৯০৮ সালে ৩০ এপ্রিল ক্লাব হাউজ থেকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত যে পথ সেই পথের মাঝখানে প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম ঝোপে ঢাকা একটি জায়গায় লুকিয়ে ছিল। সন্ধ্যার পর সাদা ফিটন গাড়ি তাঁদের কাছে পৌঁছানো মাত্রই গাড়িটি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করে।কিন্তু সেই দিন ওই গাড়িতে কিংসফোর্ড  ছিলেন না। ছিলেন দুই বিদেশি যাত্রী।অতিদ্রুত সেখান থেকে পলায়ন করলেন তাঁরা। এরপরেই সকল স্টেশনে খবর চলে গেল। পুলিশ ঘোষণা করলেন,  এই আততায়ীকে ধরে দিতে পারলে পাঁচ হাকার টাকা নগদ পুরস্কার দেওয়া হবে।

এই দিকে ক্ষুদিরাম বসু মজঃফরপুর থেকে  প্রায় ২৪ মাইল পায়ে হেঁটে ওয়ালী স্টেশনে পৌঁছে যান।প্রচন্ড জলের তৃষ্ণায় একটি দোকানে যান । এইদিকে পুলিশ আততায়ীকে ধরার জন্য ওত পেতে ছিল। পুলিশ ক্ষুদিরাম কে সন্দেহ করেন।ক্ষুদিরাম জল পান করার সময় পাঁচ থেকে ছয় জন পুলিশ ঘিরে ফেলে।এরফলে গ্রেপ্তার হলেন বাালক ক্ষুদিরাম বসু।ক্ষুদিরাম বসু বোমা হামলার সব দায় নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।তিনি একবার ও তার সহযোগীর কথা বা নাম মুখে উচ্চারণ করেননি। অবশেষে ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে ভারতীয় দন্ডবিধি ৩০৪ নং ধারায় মামলা চালানো হয়। পরিশেষে দুজন অফিসার সাথে একমত হয়ে জর্জ এইচ বার্থহোড ক্ষুদিরামকে ফাঁসির আদেশ দেন।

সুশীল সেন

১৯০৮ সালের ১১ আগষ্ট এই দিনটির কথা বারে বারে মানে,  তখন ভোট ৬ টা ।ব্রিটিশ সরকার ১৮ বছরের  এক তরতাজা যুবকে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করালো।  কারাফটকের বাইরে তখন হাজারো জনতার কন্ঠে ‘বন্দোমাতরম্’ স্লোগান। ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে কারা কর্তৃপক্ষ  ক্ষুদিরামের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো যে, মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছাটা কি?  তিনি এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করে  নিঃশঙ্কোচে বলে  উঠলেন ‘ আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিতে চাই। কারা কর্তৃপক্ষ এই কথা শুনে যুকবটির মানসিক দৃঢ়তা আর ব্রিটিশ সামাজ্যবাদের তীব্র ঘৃণাবোধ উপলব্ধি করে।

প্রফুল্ল চাকী

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে ক্ষুদিরাম বসু প্রফুল্ল চাকীর শুধুমাত্র একসাথে সহকর্মী ছিলেন না। তাদের মধ্যে একান্তই  বিশ্বাস,  ভালোবাসা ও দেশপ্রেমিক এক ভ্রাতৃত্ব হৃদয়ের বন্ধনের সৃষ্টি করেছে।আবার অন্য দিকে প্রফিল্ল চাকী অনেকটা পথ অতিক্রান্ত করার পর গ্রেপতার এড়ানোর জন্য রওনা হন। ট্রেনে বাঙালী পুলিশ নন্দলাল ব্যানার্জী নামে পুলিশের এক দারোগা সমস্তিপুরে ( মোকামা ঘাট) স্টেশনের কাছে প্রফুল্ল চাকীকে দেখে সন্দেহ করেন।দারোগা সন্দেহ করার জন্য প্রফুল্ল চাকীকে পালাবার চেষ্টা করেন।ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে অনেক দূর চলে যান। পুলিশ তার পিছু ধাওয়া করল। স্টেশনে পাহারত পুলিশও পিছু নিল। প্রফুল্ল চাকী দারোগাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লেন।  কিন্তু লক্ষভ্রষ্ট হল। এই সময় তিনি ভাবলেন যদি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তাহলে দলের সিধান্ত অনুযায়ী ঠিক করলেন নিজের গুলিতে তিনি প্রাণ বিসর্জন দেবেন।  কারন হল যদি তিনি ধরা পড়েন তাহলে মারে মুখে বিপ্লবীদের অনেক তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে। তিনি দৌড়াতে দৌড়াতে হটাৎ দাঁড়িয়ে পড়েন। পুলিশ খুব কাছে চলে এল।সেই মুহুর্তে মধ্যে পকেটে থাকা রিভালবার বার করে দুটি গুলি নিজ মাথায় বর্ষণ করেন। এরফলে তিনি নিজেকে আত্মহতি দিলেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। কিন্তু তার সাহসিকতা,  আত্মত্যাগী, এমনকি নিজের প্রাণ বিসর্জন করে তিনি ভারতমাতার কোলে শায়িত হলেন। কিন্তু প্রশ্ন একটা থেকে যায় যে, প্রফুল্ল চাকী কি নিজের গুলিতে প্রাণ হারায়, না পুলিশ তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন? ব্রিটিশ পুলিশের বয়ানে লেখা আছে যে, প্রফুল্ল চাকী নিজের গুলিতে প্রাণ হারায়। কিন্তু  আদৌ সত্য কি?

আজ ক্ষুদিরাম নেই,  প্রফুল্ল চাকী নেই।  কিন্তু সারা ভারতবর্ষের মানুষের হৃদয়ে ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী যে স্বাধীনতার অগ্নিমশাল প্রজ্বলিত করেছিলেন, শত চেষ্টা করেও ব্রিটিশ সরকার  তা নেভাতে পারেনি। তাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এনাদের আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ক্ষুদিরাম বসু যেখানে বন্দী ছিলেন।

 

তথ্যসুত্র – ক্ষুদিরাম বসু ,  সম্পাদক শৈলেশ দে, মানিক মুখোপাধ্যায়, সৌমেন বসু। ।

ফাঁসির মঞ্চে থেকে গেয়ে গেল যারা,  চিন্ময় চৌধুরী।

মূল নথি থেকে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী,  চিন্ময় চৌধুরী।

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 43
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    43
    Shares

Facebook Comments

Post Author: অভিষেক নস্কর

Avisek Naskar
অভিষেক নস্কর।তরুণ ক্ষেত্রসমীক্ষক।টিম কৌলালের অন্যতম সদস্য।