অযোধ্যা পাহাড়ের সীতাকুণ্ড

Share your experience
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

অযোধ্যাপাহাড়

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

ভূমিকা

সীতাকুণ্ড নামটার মধ্যেই আমরা দুটি বিষয়ের উল্লেখ পাই — এক, সীতা, আর দুই, কুণ্ড। এর মধ্যে সীতা অর্থাৎ রামায়ণের সীতাদেবী, আর কুণ্ড মানেই একটা জলাশয়। অর্থাৎ সীতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি জলাশয়কেই সীতাকুণ্ড বলে।

এখন এই সম্পর্কটি সবসময়েই রামায়ণের কোন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, এ বলার দরকার পড়ে না।

এই সীতাকুণ্ড ভারতবর্ষের অনেক জায়গাতেই আছে, এমনকি বর্তমান ভারতের সীমার বাইরেও সীতাকুণ্ডের খোঁজ পাওয়া যায়।

এখানে আমরা সেইরকম কয়েকটি জায়গার সীতাকুণ্ডের উল্লেখ করে এই লেখাটির মূল বিষয় পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের সীতাকুণ্ডের গল্প শুনবো।

অযোধ্যাপাহাড়

বিভিন্ন জায়গার সীতাকুন্ড :

১) মুঙ্গের : বিহারের মুঙ্গের শহরের খুব কাছেই একটি উষ্ণ প্রস্রবনকে সীতাকুণ্ড বলা হয়। এখানকার প্রচলিত কাহিনীটি হল সীতার দ্বিতীয় অগ্নিপরীক্ষার পর সীতাদেবী এই কুণ্ডে স্নান করে শরীর শীতল করেন, এবং সীতাদেবীর গায়ের উত্তাপে এই প্রস্রবনের জল চিরকালের জন্য গরম হয়ে যায়।

২) সীতামারী : উত্তর বিহারের সীতামারী শহরের কাছে পুনাউরা ধামে আর একটি সীতাকুণ্ড আছে। বলা হয় যে এখানেই সীতাদেবীর জন্ম হয়েছিল। এটি একটি বড় তীর্থস্থান।

৩) ময়ূরভঞ্জ, ওড়িশা : ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের কাছে সিমলিপাল জাতীয় উদ্যানের মধ্যে একটি জায়গার একটি জলপ্রপাতকে ঘিরে একটি সীতাকুণ্ড আছে।

৪) বিন্ধ্যাচল : উত্তরপ্রদেশের বিন্ধ্যাচলের কাছে একটি সীতাকুণ্ড আছে। এখানে প্রচলিত কাহিনী অনুসারে বনবাসের সময় লক্ষ্মন তীর মেরে মাটি ভেদ করে সীতার জন্য এই জলের ব্যবস্থা করেছিলেন।

৫) সুলতানপুর : সুলতানপুরের কাছেও একটি সীতাকুণ্ড ঘাটের খবর পাওয়া যায়।

৬) সীতাকুণ্ড, বাংলাদেশ : বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কাছে একটি সীতাকুণ্ড আছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে একটি পাহাড়ের নীচে এই সীতাকুণ্ড অবস্থিত। এই পাহাড়ের উপর চন্দ্রনাথ শিবের মন্দির এবং বুদ্ধদেবের পদচিহ্ন সমন্বিত একটি বুদ্ধমন্দির আছে।

৭) পুরুলিয়ার অযোধ্যার সীতাকুণ্ড : এটিই আমাদের মূল আলোচ্য।

সীতাকুণ্ড যাওয়ার পথ

অযোধ্যা পাহাড়ের সীতাকুণ্ড

অযোধ্যা পাহাড়ের হিলটপ অঞ্চলের খুব কাছেই আছে এই সীতাকুণ্ডটি। এটি একটি শীতল জলের প্রস্রবন।

হিলটপের বনবিভাগের বাংলোটি থেকে এক কিলোমিটার মত এগিয়ে গেলেই একটি গ্রাম। সেই গ্রামের মধ্য দিয়ে সিমেন্টের রাস্তা দিয়ে গ্রামটি পেরিয়ে গিয়ে এবার মাঠের মধ্য দিয়ে পায়ে চলা মাটির পথ। একদিকে দিগন্ত বিস্তৃত চাষের মাঠ, থরে থরে এমনভাবে সাজানো যে দেখলে হিমালয় অঞ্চলের স্টেপ কাল্টিভেশনের কথাই মনে পড়ে। অন্যদিকে হালকা জঙ্গল। মাটির পায়ে চলা পথটিও গেছে গাছগাছরার মধ্য দিয়ে। দুপাশে প্রচুর ল্যান্টানা বা পুটুশফুলের গাছের ভিড়। নানা রঙের পুটুশফুল ফুটে আছে। পথের দুপাশে ঝোপের মধ্যে বুনো ওল জাতীয় একটা গাছ খুব চোখে পড়ছে। আরও নানা ধরণের গাছের ভিড়, বেশিরভাগই অচেনা।

কিছুটা এগোতেই কানে এল ঝরঝর করে জল পড়ার শব্দ, যেন কোনও জলপ্রপাত  কাছে আছে। একটু এগোতেই চোখে পড়ল সেই ছোট্ট জলপ্রপাতটিকে। একটি ছোট্ট ঝোরার গতিপথ আটকে তৈরী করা হয়েছে একটি ছোট্ট ড্যামের মত জলাশয়, আর জল ওভার ফ্লো করে ঝরণার মত নীচে পড়ে বয়ে যাচ্ছে।

এটাই সীতাকুণ্ড? আমাদের গাইড অচিন্ত্য জানালো তা নয়। এটা একটি অনামী ঝর্ণা। সীতাকুণ্ড আর একটু এগিয়ে।

সত্যিই আর একটু এগিয়ে সামান্য উৎরাইয়ের নীচেই চোখে পড়লো সীতাকুণ্ড। একটা বড় কূয়োর মত গোল করে পাথর দিয়ে পাড় বাধানো একটি কুণ্ড। এটাই সীতাকুণ্ড।

কাছে গিয়ে তাকিয়ে দেখি ঐ কূয়োর মত জায়গাটি কিন্তু মোটেই কূয়োর মত গভীর নয়। হাত দিয়ে জল ছোঁয়া যায়। পরিস্কার টলটলে জলের মধ্য দিয়ে নীচের সাদা বালি দেখা যাচ্ছে। আর বালির মধ্যে দু’তিনটি জায়গা থেকে বুড়বুড়ি কেটে বেরিয়ে আসছে জলের ধারা। আর সেই জল একটি পাইপ দিয়ে বাইরে পড়ছে। খেয়াল করে দেখি কুণ্ডের জলে খেলা করে বেড়াচ্ছে কয়েকটি ল্যাটা জাতীয় মাছ। অচিন্ত্য বললো ছোট্ট ছোট্ট কাকড়াও আছে, যদিও দেখতে পেলাম না।

অচিন্ত্য এখানকার প্রচলিত কাহিনীটি শোনালো। বনবাসের সময় রামসীতা এখানে কিছুদিন ছিলেন। তখন একদিন সীতার তৃষ্ণা মেটাতে শ্রীরাম মাটিতে তীর মেরে এই জলের ধারাটি সৃষ্টি করেছিলেন। সেই পাতালের জলের ধারা এখনও উঠে আসছে তৃষ্ণার্ত মানুষের তৃষ্ণা মেটাবার জন্য।

সীতাকুণ্ড

সেই একই গল্প, কোথাও রাম, কোথাও বা লক্ষ্মণ। তির মেরে পাতালের জল তুলে আনছেন সীতার তৃষ্ণা মেটাবার জন্য। এই কাহিনীটি কি আদিম কৃষিজীবী সমাজের চাষের জন্য ভূগর্ভস্থ জল তোলার রূপক? কে জানে, পণ্ডিতরা বলতে পারবেন। কিন্তু একটা কথা পরিস্কার — সেই একই রাম ভারতবর্ষের সব প্রান্তে। রামময় ভারত বর্ষ।

সীতাকুণ্ডের জল একটা পাইপ দিয়ে বাইরে এসে একটা ছোট্ট জলের ধারা হয়ে বয়ে গিয়ে আমাদের আগের দেখা সেই ঝোরাটির সঙ্গে মিশে নীচের দিকে বয়ে গেছে।

সীতাকুণ্ডের একপাশে একটি পাথরের শিবলিঙ্গ। কোনও আড়ম্বর নেই। মুক্ত আকাশের নীচে শিব বসে আছেন সীতাকুণ্ডের পাহারাদার হয়ে। শিব আর রাম অর্থাৎ বিষ্ণু পাশাপাশি। আমার মনে পড়লো সেই শ্লোকটি :

ওম নম: শিবায় বিষ্ণু রূপায় শিবরূপায় বিষ্ণবে।

শিবশ্চ হৃদয়ং বিষ্ণু বিষ্ণোশ্চ হৃদয়ং শিব:।।

যিনি শিব, তিনিই বিষ্ণু।

সীতাকুণ্ডের জল ছুঁয়ে একগণ্ডুষ জল খেলাম। মিষ্টি জল। সীতা কি এই জল খেতেন? কে জানে!

তবে সীতা খান বা নাই খান, স্থানীয় মানুষেরা কিন্তু এই জল খান। বৈশাখী পূর্ণিমার দিন স্থানীয় আদিবাসীরা এই জল খেয়ে শিকার উৎসবে মেতে ওঠেন। সারাদিন শিকারের মজা ও উত্তেজনা, আর রাতে নাচগান। সীতাকুন্ডকে ঘিরে উৎসবে মেতে ওঠেন তারা।

এখন কাছেই একটি মুক্তমঞ্চ ও রামমন্দির তৈরী হয়েছে, তবে মন্দিরটি বন্ধ থাকায় শ্রীরাম-দর্শন হল না। কিন্তু শ্রীরাম কি আর একটি মূর্তি মাত্র? আকাশ বাতাস জল বায়ু জঙ্গম স্থাবর যা কিছু আছে, সবই তো সেই রাম। শ্রীরামকে না বুঝে তার মূর্তি আর মন্দির নিয়ে আমরা মেতে থাকি।

 খয়রাবাড়ির লেক

এবার ফেরার পালা।

দূরে দূরে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের ঢেউয়ের দিকে তাকালাম। মনে হল ওরাও মৌনভাবে আমার চিন্তার সমর্থন জানিয়ে বললো, আবার এসো।

নিশ্চয়ই আসবো। আবার আসবো তোমাদের কাছে।

অযোধ্যার পাহাড়, তোমরা ভালো থেকো।

ছবি–লেখক

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।