অম্বিকা কালনার মন্দির স্থাপত্য

Share your experience
  • 57
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    57
    Shares

সৌম্য সেনগুপ্ত

বাঙলার টেরাকোটা মন্দির মানচিত্রে বিষ্ণুপুরের পর দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য মন্দিরক্ষেত্র হল অম্বিকা-কালনা শহর। সেন আমলে ভাগীরথী নদীতীরস্থ এই জনপদটি প্রসিদ্ধি লাভ করে। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, এককালে ‘অম্বিকা (অম্বুয়া)’ ও ‘কালনা’ দুটি পৃথক অঞ্চল ছিল। চৈতন্য অন্দোলনের সূত্রে, স্থান দুটি সাংস্কৃতিকভাবে একীভূত হয়। পরে, নবদ্বীপ সংলগ্ন ‘শ্রীপাট অম্বিকাকালনা’  অঞ্চলটি হয়ে ওঠে বৈষ্ণব সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান।

পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী  শ্রীচৈতন্যোত্তর বাংলায় প্রথম নবজাগরণের যুগরূপে পরিচিত। সেই সময় নবাগত ইসলামিক সংস্কৃতির প্রতিরোধে দিশেহারা হিন্দু সমাজের গোঁড়ামির থেকে মুক্তিলাভের পথের সন্ধান দিয়েছিল বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলন। সাহিত্যের মতো, চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলনের জোয়ারে বাংলার মন্দির স্থাপত্য সংস্কৃতি প্রভাবিত হয়।  বাংলার পোড়ামাটি স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাস যদিও প্রাচীন। তবে এই যুগে, পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে সুদক্ষ শিল্পীরা  মন্দিরগুলিকে উৎকর্ষতার চূড়ান্ত পরিণিতির দিকে নিয়ে যান। মন্দিরগাত্রে সংযোজিত হয় বৈষ্ণব পদাবলী ও পৌরাণিক কাহিনী আশ্রিত টেরাকোটা ফলক। গঠনশৈলী স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল এই মন্দিরচর্চার জের ।

১৭৪১ সালে মারাঠা বর্গি ভাস্কর পন্ডিতের আক্রমণে কাটোয়া প্রাসাদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বর্ধমান রাজবংশ অবসর বিনোদনের জন্য এই বিকল্প স্থানটি নির্বাচন করেন। রাজন্য জমিদারবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক গড়ে উঠে টেরাকোটা মন্দির। বিশেষ করে বর্ধমান  রাজমহিষীরাই অগ্রণী ভুমিকা নেন মন্দির নির্মাণে। মধ্যযুগের শেষের দিকে কালনায় বৈষ্ণবধারার ভক্তিস্রোতের পাশাপাশি শাক্ত ধর্মমত অনুসৃত হয়। কর্ণাটকের পাট্টাডক্কল মন্দির চত্বরে যেমন ভারতের বিভিন্ন মন্দিরস্থাপত্যধারার সমাবেশ পরিলক্ষিত হয়, তেমনি কালনার রাজবাড়ি প্রাঙ্গন। এই মন্দিরক্ষেত্র বাংলার চালা, দেউল, রত্ন ও দালান মন্দিরশৈলীর একত্র সমাহার। ইন্দো-ইসলামিক ও কলোনিয়াল শৈলীর অভিনব সংমিশ্রণ দেখা যায় মন্দিরগুলির স্থাপত্য পরিভাষায়।

অম্বিকা-কালনার সাথে বিখ্যাত মন্দিরগুলির সাথে ধীরে ধীরে পরিচয় করা যাক।

বর্ধমান রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন মন্দিরগুলির মধ্যে প্রাচীনতম হল লালজি মন্দির। সারা বাংলা জুড়ে যতগুলি পঁচিশ রত্ন মন্দির দেখা যায়, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হল এই মন্দির। স্থাপত্যশৈলী ও পোড়ামাটির প্রতিমূর্তিগুলির উৎকর্ষতার নিরিখে লালজি মন্দির বাংলার মন্দির স্থাপত্য ইতিহাসে একটি অনুপম সংযোজন। ‘রত্ন’ হল শুধুমাত্র অলংকরণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত ক্ষুদ্রাকৃতি চূড়া-মন্দির।  এই মন্দিরের প্রধান কেন্দ্রীয় চূড়াটিকে ঘিরে উপরের দিকের প্রতিটি তলের চারকোণায় রত্ন-চূড়াগুলি সজ্জিত আছে। প্রথমতলের ছাদের চারকোণের প্রত্যেকটিতে তিনটি  করে, দ্বিতীয়তলে মোট আটটি ও তৃতীয় তলে  কেন্দ্রীয় চূড়া সমেত চারকোনে চারটি; মোট পঁচিশটি রত্ন-চূড়ার এই হল সজ্জাবিন্যাস। মন্দিরের সম্মুখে রয়েছে টেরাকোটা অলংকৃত একটি পৃথক চারচালা মন্ডপ। সেই মন্ডপ প্রাঙ্গণে বসে আজও কথকঠাকুর রামকথা, কৃষ্ণলীলা শোনান। লালজি মন্দিরের মূল বিগ্রহ রাধাকৃষ্ণ। কথিত আছে, বর্ধমান মহারাজা কীর্তিচাঁদের মাতা ব্রজকিশোরী দেবী কোন এক বৈষ্ণব সাধকের থেকে লালজি অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহটি উপহার পান। শ্রীবিগ্রহের সাথে রাধিকা মূর্তিটি পরবর্তী সংযোজন। ১৭৩৯ খ্রীস্টাব্দে জননীর অনুরোধে মহারাজা কীর্তিচাঁদ এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। বর্ধমান রাজ ইতিহাসে এই  কীর্তিচাঁদ রাই একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি চন্দ্রকোণার রাজাকে পরাস্ত করে তাঁর জমিদারীর সীমানা মেদিনীপুর অবধি বিস্তৃত করেন। তবে, তাঁর সবচেয়ে দুঃসাহসিক পদক্ষেপ হল বিষ্ণুপুর আক্রমণ ও দুর্ধর্ষ মল্লরাজাদের পরাজিত করা। ফলস্বরূপ, ১৭৩৬ সালে দিল্লির মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহের থেকে তাঁর চন্দ্রকোণার জমিদারীর স্বীকৃতি লাভ। এই পরাক্রমী রাজার বীরত্বের আভাস-চিত্র প্রতিফলিত হয় লালজি মন্দিরের বহির্ভাগের টেরাকোটা ফলকগুলিতে। একতলা মন্দিরগাত্রের কৌণিক অভিক্ষেপগুলিতে উল্লম্বভাবে স্থাপিত রণজয়ী ঘোড়সাওয়ারের ‘মৃত্যুলতা’ মোটিফগুলি (কলিঙ্গশৈলীর  অনুবর্তী হলেও) মহারাজার রণসফলতার সাক্ষ্য গরিমা ব্যক্ত করে। মন্দির বহির্গাত্রের সর্বনিম্ন প্যানেলগুলির টেরাকোটা ফলকগুলি সামরিক কুচকাওয়াজ, যুদ্ধদৃশ্য অলংকরণে সমৃদ্ধ। তার ঠিক উপরের প্যানেলটিতে কৃষ্ণজন্ম, তাঁর জীবন ও প্রণয়লীলা সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি সুচারুভাবে চিত্রায়িত। রাম ও লক্ষণের যুদ্ধ প্রস্তুতির দৃশ্যাবলীও খুব আকর্ষক। চিরায়ত ধর্মীয় কাহিনীর চিত্রবদ্ধ রূপ যে শুধু বর্ণিত হয়েছে, তা নয়। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার প্রতিফলনে (যেমন গার্হস্থ দৃশ্য, মিথুনদৃশ্য) ও তদানীন্তন যোগাযোগের বিভিন্ন পন্থার  অলঙ্করণে শিল্পীর নৈপুন্যতা ও সুকৌশলী পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হয়। দ্বিতল ও ত্রিতলে চুনবালির আস্তরণের উপর বৈচিত্র্যময় কাজ মন্দির স্থাপত্যকলায় অনন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।

রাজবাড়ীর চৌহদ্দীর অভ্যন্তরে দ্বিতীয় পঞ্চবিংশতি রত্নমন্দিরটি হল , কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির। মহারাজা কীর্তিচাঁদের পুত্র চিত্রসেন নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তাঁর ভাইপো ত্রিলোকচাঁদ উত্তরাধিকারসূত্রে জমিদারী পান। ১৭৫৫ সালে এই দাপুটে রাজা একবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, পরে অবশ্য নবাব আলীবর্দি খানের মধ্যস্থতায় ব্যাপারটি মিটমাট হয়। তাঁর আমলে কালনায় অনেকগুলি মন্দির স্থাপিত হয়। ১৭৫১-৫২ সালে বাংলা তখন সবেমাত্র মারাঠা বর্গী আক্রমন থেকে মুক্ত , সেই সময় রাজমাতা লক্ষ্মীকুমারী দেবীর নির্দেশে তৈরী হয় কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরটি। ভূমি নকশা ও পরিকল্পনা লালজি মন্দিরের অনুরূপ, কেবলমাত্র সম্মুখ মণ্ডপটি ছাড়া। এখানে মন্ডপটি মূলমন্দির সংলগ্ন তিনটি প্রবেশদ্বার বিশিষ্ট ‘সংবৃত’ মন্ডপ। স্থাপত্যশৈলীতে না হলেও,  টেরাকোটা অলঙ্করণের নান্দনিকতায় কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির সর্বৈবভাবে বলিষ্ঠ লালজি মন্দিরের তুলনায় । বৈষ্ণব ভাবধারা আশ্রিত এই মন্দিরগাত্রে একটি চিত্রাকর্ষক কৃষ্ণজন্ম কাহিনির ফলক দ্রষ্টব্য, যেখানে বসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে যমুনার জল থেকে তুলছেন এবং একটি শৃগাল তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । এছাড়া কৃষ্ণকে আক্রমণোদ্যত কেশীন ,বকাসুর বধ, কৃষ্ণ-বলরামের দ্বারকাযাত্রা, নৌকাবিলাস, কৃষ্ণের দাবানল ভক্ষণ, অশ্বমেধ যজ্ঞ , বন্দুকধারী ফিরিঙ্গী সৈন্যদল ইত্যাদি পোড়ামাটির প্রতিমূর্তিতে দৃশ্যায়িত।

কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরের চত্বরের পশ্চিমদিকে রয়েছে বদ্রীনারায়ণের মন্দির। দালান বা সমতলছাদযুক্ত স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন এই মন্দির। কালো শীলাখন্ডের উপর ‘বাস-রিলিফ’ পদ্ধতিতে খোদিত চতুর্ভূজ নারায়ণ, দেবালয়ের মূলবিগ্রহ। বদ্রীনারায়ণের মন্দিরের বিপরীতে অভিন্ন দালানরীতিতে নির্মিত অপর মন্দিরটি রাধাবল্লভজীর। সপারিষদ রঘুনাথ ও রাধাকৃষ্ণ এই মন্দিরে নিত্যপূজিত।

কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরের ঠিক পিছনে অবস্থিত সাবেকী আটচালা ধরনের বিজয় বৈদ্যনাথ মন্দিরটির  কেবলমাত্র সম্মুখভাগ টেরাকোটা সৌন্দর্যসমৃদ্ধ। রাজা চিত্রসেন ও তাঁর সহধর্মিণী লক্ষ্মীকুমারী দেবীর প্রীতার্থে ত্রিলোকচাঁদ এই মন্দিরটি নির্মান করেন।

১৭৫১ সালে নির্মিত সমতলছাদযুক্ত ‘দালান’ বা  ‘চাঁদনি’ স্থাপত্যশৈলীর দেবায়তনের প্রাচীনতম উদাহরণ হল রূপেশ্বর শিব মন্দির। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় ভাবধারার প্রত্যক্ষ প্রভাবে নির্মিত এই মন্দিরশৈলী বাংলা স্থাপত্য ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। মন্দিরের সম্মুখে ধনুকাকৃতি-খিলানযুক্ত প্রবেশপথ তিনটি। স্তম্ভ ও সম্মুখস্থ দেওয়ালগাত্র সুক্ষ্ম টেরাকোটা অলংকরণে শোভিত।

রূপেশ্বর মন্দিরের ঠিক পাশে উত্তর-দক্ষিণ দিক বরাবর একসারিতে রয়েছে পাঁচটি সাদামাটা আটচালা শিব মন্দির। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রাণী কমলকুমারী দেবীর পরিচারিকা পঞ্চশিব মন্দিরগুলি প্রতিষ্ঠা করেন।

লালজি মন্দিরের প্রবেশমুখের ঠিক সামনেই ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য শিল্পকলার নিদর্শন রাসমঞ্চ। বৈষ্ণবীয় ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই রাসমঞ্চ বা দোলমঞ্চগুলি শ্রীকৃষ্ণের রাসযাত্রা বা দোল উৎসব পালন উপলক্ষে প্রধান মন্দিরের অনুসঙ্গে পবিত্র দেবস্থান হিসাবে নির্মিত হত। অষ্টভুজ ভূমি নকশার উপর নির্মিত কেন্দ্রীয় রাসমঞ্চটির প্রবেশদ্বার আটটি। সমতল ছাদে গোলাকৃতি চূড়া গম্বুজটি স্থাপিত। রাসমঞ্চটিকে আবর্তন করে রয়েছে ২৪টি খিলানদ্বারযুক্ত অষ্টকোণাকৃতি বারান্দা। পরিকাঠামোটি সম্পূর্ণ অলঙ্করণবর্জিত। খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার, নিরাভরণ বহিরঙ্গ ও গম্বুজের স্থাপত্যশৈলীতে অষ্টাদশ শতকের ইসলামিক প্রভাব স্পষ্ট।

রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ পরিধিতে নবীনতম সংযোজন, প্রতাপেশ্বর শিব মন্দির। ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত পোড়ামাটির স্থাপত্য নিদর্শনগুলির মধ্যে নির্মাণশৈলীর নান্দনিকতায় ও সুক্ষ্ম কারুকার্যের নিপুণতায় এই মন্দির সর্বশ্রেষ্ঠ। ডেভিড ম্যাককাচনের মতে, অন্ত-মধ্যযুগে বীরভূম-বাঁকুড়ার বৈশিষ্ট্যযুক্ত মন্দিরগুলি স্থানীয় প্রভাব অনুসারে নতুনতর রূপলাভ করে প্রকৃত বাংলা দেউল হয়ে ওঠে। ইসলামিক ও ইউরোপীয় শিল্পধারার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত দেবালয়ের গঠনরীতি।  উড়িষ্যার ঐতিহ্যবাহী ‘রেখ দেউল’ মন্দিরশৈলীর অনুসারী এই উচ্চমানের শিল্পকর্মটি কালনা তথা সারা ভারতের গর্বের কারণ। মহারাজা প্রতাপচাঁদের ( জাল প্রতাপচাঁদ নামে খ্যাত ) ধর্মপত্নী প্যারীকুমারী দেবী ১৮৪৯ খ্রীষ্টাব্দে সর্বাঙ্গসুন্দর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্বমুখী রেখ দেউলটিতে উদীয়মান সূর্যালোকে দেববিগ্রহ আলোকিত হওয়ার ভারতীয় পরম্পরা অ্রনুসৃত। এই মন্দিরের ‘পঞ্চরথ’যুক্ত( উল্লম্বভাবে পাঁচ অংশে বিভক্ত) শিখর চূড়ার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল,    অনুভূমিকভাবে বিভাজিত ঘনসন্নিবিষ্ট শিরাল বিন্যাস। আঠারশো শতকের শেষভাগে মন্দিরের মূল উপাখ্যানগাথাগুলি দেওয়ালগাত্রের প্যানেল থেকে স্থান পরিবর্তন করে খিলানের উপরের পরিসরে উঠে আসে, ঊনিশ শতকে সেই ধারা আরও জনপ্রিয় হয়। এই দেবস্থানের প্রধান প্রবেশদ্বারের লিনটেলের উপর ও অন্য তিনদিকের কৃত্রিম দ্বারগুলির উপরের অংশে শিব-বিবাহ, মহিষাসুরমর্দিনী, রাম-সীতা, গৌর-নিতাই পৌরানিক আখ্যানগুলি প্রসংশনীয় মাধুর্য নিয়ে উপস্থিত। উত্তরমুখী কৃত্রিম দরজার উপর মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা প্যানেলের বাম পাশে রাম ও ডানপাশে দশানন রাবণ চিত্রায়িত। উভয়ের পোষাকে তদানিন্তন ‘বাবু’ বাঙালীয়ানার ছাপ সুস্পষ্ট। মন্দিরের চারপাশের দেওয়ালগাত্র শৈব্য ও শাক্ত পৌরাণিক কাহিনীতে সমৃদ্ধ হলেও , চৈতন্যোত্তর বৈষ্ণব প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং, শৈব্য-শাক্ত-বৈষ্ণব ভক্তিরসধারার অনায়াস সম্মিলনের মূর্তরূপ প্রতাপেশ্বর দেউল। মন্দিরের সম্মুখপথের দেওয়ালগাত্রের নিম্ন প্যানেলে উৎকীর্ণ  দন্ডায়মান ষড়ভুজ একটি টেরাকোটা প্রতিমূর্তি খুব কৌতূহলোদ্দীপক। ধনুর্বানধারী রামচন্দ্র , দন্ড-কমন্ডলুহস্তে শ্রীগৌরাঙ্গ এবং বংশীবাদনরত কৃষ্ণের সমন্বয়ী এই ত্রিভঙ্গ দিব্যরূপ; ‘ষড়ভুজ গৌরাঙ্গ’ নামে শ্রীচৈতন্যভাগবতে উল্লিখিত। এছাড়া উল্লেখযোগ্য মোটিফগুলি হল, যুদ্ধরত বানরসেনা, বাতায়নবর্তিনী, মৎস্যাবতার, গোপীদের বস্ত্রহরণ ইত্যাদি।

ঠিক কোন সময় বর্ধমান রাজপরিবার বৈষ্ণব ধর্মীয় ভাবধারার পাশাপাশি ‘শিব-শাক্ত’ সংস্কৃতির অনুসারী হল, তা বলা খুব মুশকিল। তবে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে রাজা তেজচাঁদ রায়ের আমলে রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে অনেকগুলি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় শ্যামাসংগীত রচয়িতা ও তন্ত্রসাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের কাছে রাজা তেজচাঁদ দীক্ষা নেন। সম্ভবত তখন থেকেই তান্ত্রিক শিব-শক্তি সাধনার অনুপ্রবেশ বর্ধমান রাজপরিবারে।

১৮০৫ সালে মল্লরাজা চৈতন্য সিংহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বকেয়া খাজনা না দিতে পারায়,  বিষ্ণুপুরের জমিদারি তাঁর হস্তচ্যুত হয়। পরে নাম মাত্র মূল্যে বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ নীলামে এই জমিদারি অধিগ্রহণ করেন।  এই কূটনৈতিক বিজয় উপলক্ষ্যে, ১৮০৯ সালে একেবারে স্বতন্ত্র্য স্থাপত্য পরিকল্পনায় নির্মিত হয় ১০৮ শিব মন্দির বা নব কৈলাস শিব মন্দির। রাজমাতা বিষেণকুমারী দেবীর তত্ত্বাবধানে তৈরী এই স্থাপত্যশৈলী ভারতবর্ষের মন্দিরশিল্প ইতিহাসে এক এবং অদ্বিতীয়।

রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ পরিসরের বাইরে  ছোট ও বড় দুটি বৃত্তবিন্যাসে ১০৮ টি সাবেকী আটচালা মন্দির সজ্জিত। তান্ত্রিক মতে নির্মিত এই ছাদবিহীন বৃত্তাকার গঠনকাঠামো প্রাচীন চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরগুলিতে প্রতিভাত। ১০৮ সংখ্যাটি তন্ত্রসাধনায় উচ্চারিত অক্ষরসংখ্যার দ্যোতক। প্রত্যেকটি অক্ষরে শিব ও শক্তির অধিষ্ঠান। সেই মতে, বহির্বৃত্তের ৭৪টি মন্দিরে সাদা ও কালো পাথরের শিবলিঙ্গ পর্যায়ক্রমে বিন্যাস্ত। অন্তর্বৃত্তের ৩৪টি মন্দিরের শিবলিঙ্গগুলি সব শ্বেতপাথরের। প্রতিটি লিঙ্গের গৌরীপট সতত উত্তরমুখী। বৃত্তমন্ডলের কেন্দ্রে একটি পবিত্র ইঁদারা বর্তমান। যা তন্ত্রচক্রের বিন্দুকে সূচিত করে। আটচালা মন্দিরগাত্রে চুন-বালির উপর কিছু বিমূর্ত ফুল ও লতার অলঙ্করণ পরিলক্ষিত হলেও, কোন টেরাকোটা মূর্তিকল্প বিস্ময়করভাবে অনুপস্থিত।

কালনা সিদ্ধেশ্বরী মোড়ের অনতিদূরে পঁচিশরত্ন বিশিষ্ট তৃতীয় মন্দিরটিতে গোপালজীয়ের অধিষ্ঠান। ১৭৬৭ খ্রীষ্টাব্দে রাজা ত্রিলোকচাঁদের অনুগত রাজকর্মচারী কৃষ্ণচন্দ্র বর্মন  গোপালজীউ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরের আদলে তৈরী এই মন্দিরটির টেরাকোটা অলঙ্করণে সমৃদ্ধ। ফলকে উৎকীর্ণ গল্পগাথাগুলির মধ্যে কৃষ্ণলীলার প্রাধান্য বেশী। তবে অনেক শিল্পকর্ম ধ্বংসপ্রায়, যার আধুনিক সংস্কারকার্য বেদনাদায়ক।

গোপালজীউ মন্দিরের খুব কাছেই সিদ্ধেশ্বরীকালী বাড়ি। আরাধ্যা দেবী হলেন অম্বিকা মাতা , যার নামে স্থানমাহাত্ম্য। বিনয় ঘোষ প্রমুখ গবেষকগণ এই দেবীকে জৈন দেবী বলে চিহ্নিত করেছেন, যিনি পরবর্তীকালে হিন্দু শক্তিমাতৃকার সাথে একভূত হয়ে জনমানসে পূজিতা। মতান্তরে, কুব্জিকাতন্ত্রে সিদ্ধপীঠ নির্ণয় প্রসঙ্গে উল্লিখিত

‘বদরী চ মহাপীঠ অম্বিকা বর্ধমানকম্ ।‘

অর্থাৎ ‘অম্বিকা’ নামক শক্তিপীঠটির অধিষ্ঠান কালনায়। রাজা চিত্রসেন ১৭৪০ খ্রীষ্টাব্দে এই ‘জোড়বাংলা’ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তবে চিত্রসেনের একশ বছর পূর্বে , অম্বিকা-কালনায় দেবী যে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তার প্রমান রূপরাম চক্রবর্তীর ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্য। মন্দিরে টেরাকোটা অলঙ্করণ দেখা না গেলেও ত্রি-খিলানের উপরিভাগে কিছু ফুল-লতার কাজ আছে। সিদ্ধেশ্বরী  ও তৎসংলগ্ন শিব মন্দিরগুলি অধুনা সংস্কারের পর বিভিন্ন রঙে রঞ্জিত হওয়ায়, একবিংশ শতাব্দীর মানুষের রসবোধের(?) সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়।

সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি থেকে পূর্বদিকে একটু এগোলে ডানদিকে পড়বে ‘ অনন্তবাসুদেব মন্দির’। ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দে  বৃহৎ আটচালা মন্দিরটি পিতামহী ব্রজকিশোরী দেবীর অনুরোধে রাজা ত্রিলোকচাঁদ নির্মাণ করেন। এককালে টেরাকোটা অলংকরণে সমৃদ্ধ এ স্থাপত্য গৌরব, আধুনিকতার স্পর্শে অনেকটা ম্লান। তবে, কষ্ঠি পাথরে খোদিত নারায়ণ-বাসুদেব মূর্তিটি নয়নমুগ্ধকর।

সীমিত পরিসরে কেবলমাত্র বর্ধমান রাজপরিবার নির্মিত কয়েকটি মন্দিরের কথা বলা সম্ভব হল। অনেক মন্দির কথা অব্যক্ত রইল। কালনাবাসীর ইতিহাসবোধ ও সাংস্কৃতিক সচেতনতার ফলেই যে আজ এই সুপ্রাচীন মন্দিরগুলি যথাযথভাবে সম্মানিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বঙ্গ সংস্কৃতিতে উপেক্ষিত মন্দির স্থাপত্যশৈলীর পুনর্মূল্যায়ন ও বাঙালী জাতির ঐতিহ্য অনুসন্ধানে অম্বিকা-কালনার মন্দিরগুলির অধ্যয়ন অপরিহার্য। হয়তো সঠিক গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হতে পারে অন্ত-মধ্য যুগের বাঙালির ইতিহাসের কোন অজানা অধ্যায় ।

ছবি লেখক

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 57
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    57
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সৌম্য সেনগুপ্ত

সৌম্য সেনগুপ্ত
সৌম্য সেনগুপ্ত।চিত্রগ্রাহক ও শিল্প গবেষক। বাড়ি মালদায়, কর্মসূত্রে কলকাতা নিবাসী।সম্প্রতি রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার, গোলপার্ক (কলকাতা) থেকে 'Appreciation of Indian art ' ও ' Indology (ভারততত্ত্ব) এই দুটি কোর্স সম্পূর্ণ করেছি। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মন্দির স্থাপত্য ও মূর্তিতত্ত্ব (iconography) বিষয়ক অনুসন্ধান আমার গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য। তাছাড়া বাংলার লোক সংস্কৃতি চর্চার সাথে গত পাঁচ বছর যাবৎ নিরবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত