অম্বুবাচী জলোৎসব হলেও যোগ রয়েছে কৃষি ও নারী ভাবনার আদিম প্রেক্ষিত

Share your experience
  • 259
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    259
    Shares

অম্বুবাচী কামাক্ষ্যাদেবী মন্দিরে
অম্বুবাচী কামাক্ষ্যাদেবী মন্দিরে

স্বপনকুমার ঠাকুর– অম্বুবাচী মানেই জলোৎসব।গ্রীষ্মের রুক্ষ দাবদায়ে ধরণী উত্তপ্ত।মাঠ ঘাট ফুটিফাটা।চারিদিকে ধূ ধূ রিক্ততা। নিস্ব মাঠ ঘাট।আষাঢ়ের নবীন সজল বারিধারায় রুক্ষ মাঠ ঘাট যেন প্রাণ ফিরে পায়।নদিতে ঢল আসে।গাছপালা হয়ে ওঠে সবুজ।”নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে’।রিমিঝিমি বৃষ্টি ধারায় ধরিত্রী যেন সত্যিই ঋতুমতী হয়ে ওঠে।এরই নাম অম্বুবাচী ।এমনিতে জলের উৎসব।তো কৃষি,বিধবা নারী আর ধর্ম বিশেষকরে কামাখ্যাদেবীর সঙ্গে জড়িয়ে গেল কেন? এসব নিয়েই দু চার কথা নিবেদন আপনাদের কাছে।

অম্বুবাচী–নারী ও কৃষি

নারী আর কৃষি -সমার্থক।এ ভাবনা আদ্দিকাল থেকেই জনমানসে সক্রিয়।নারী ঋতুমতী হলে যেমন সৃষ্টিসম্ভবা হয়ে ওঠে তেমনি আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে ধরিত্রী হয়ে ওঠে রজঃস্বলা রমনীর মতো।এই সময় ভূমিকর্ষণ নিষিদ্ধ।নারী ঋতুমতী হলে যেমন আমাদের শাস্ত্রে সহবাস নিষিদ্ধ তেমনি এই চারদিন ধরিত্রীর গর্ভে লাঙ্গল চালনা বা কোনরকম কৃষিকার্য বন্ধ থাকে।মনে রাখা প্রয়োজন লাঙ্গল আর লিঙ্গ শব্দটি একই ধাতু থেকে আগত।লোকবিশ্বাস অনুসারে আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে ধরিত্রী ঋতুমতী হয়।

লাঙ্গল ও লিঙ্গ একই ধাতু

নারী পুরুষের মিলনে সন্তান লাভ হয়।একই ভাবে জমি কর্ষণ করলে ফসল উৎপাদন হয়।বাউল গানে রয়েছে –“নাগর কোথায় রইলা রে জল লেগেছে তোমার বাকুড়িতে।“ ফলে আদিম মানুষ বুঝতে পেরেছিল ঊর্বরাশক্তির দিক থেকে নারীর সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছিল মেয়েদের মধ্যে একটি অদ্ভুত শক্তি রয়েছে যার ফলে সে সন্তানবতী হয়ে ওঠে।বলাবাহুল্য,নারীই প্রথম কৃষিকাজের আবিষ্কারক।আদিম মানুষ যখন পশু শিকার করতে যেত দূরে দূরান্তরে তখন খিদের জ্বালায় প্রথম কৃষিক্ষেত বানাতে শুরু করে মহিলারা।পুরুষের লিঙ্গ কর্ষণে সে যেমন সন্তানবতী হয়েছে   সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে ভূমিতে লাঠির কর্ষণে সে কৃষিকাজ আবিষ্কার করে।

অম্বুবাচীতে লাঙল চষা বন্ধ থাকে
অম্বুবাচীতে লাঙল চষা বন্ধ থাকে

অম্বুবাচী আসলে কৃষি ব্রত

নারী ঋতুমতী হলে সে সন্তান সম্ভবার উপযোগী হয়ে ওঠে।তেমনি ধরিত্রী বা ক্ষেত ঋতুমতী হয়ে ওঠে বৃষ্টিধারায়।বিধবা মহিলাদের ঋতু যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন পরজন্মে আবার ঋতুমতী হবার প্রবল বাসনায় অম্বুবাচী ব্রত পালন করেন নিষ্ঠার  সঙ্গে। তিন দিন ধরে তাঁরা শীতল নিরামিষ খাদ্য গ্রহণ করেন।মাটিতে নামেন না।কাঁচা ফলমূল খান।পবিত্র জীবন যাপন করেন- যা-ব্রতের অন্যতম  অঙ্গ।রাঢ়াঞ্চলে একটি অনুষ্ঠান রয়েছে জমিকে সাধ খাওয়ানো। ভাদ্র মাসে ধানের বিয়েন ছাড়ার সময় জমির এককোনায় চাষি জমিকে বিশেষ রূপে পুজো করেন।একে বলা হয় গাভর ষষ্ঠী।এই গাভর শব্দটি এসেছে গর্ভ থেকে। এই প্রসঙ্গে সুধীর চক্রবর্তী “নির্বাচিত প্রবন্ধে” লিখেছেন—‘কৃষিভিত্তিক সমাজে জমিতে শস্য উৎপাদন আর নারী গর্ভে সন্তান আগমন একই যাদু বিশ্বাসে গৃহীত হয়।দুটিতেই খেত আর বীজের সমভূমিকা।মাতৃবস্তু আর পিতৃবস্তুর সমন্বয়”।

কৃষি ও নারীসঙ্গম

কৃষির সঙ্গে এমনিতে সম্পৃক্ত হয়ে আছে বেশ কিছু যৌন অনুষ্ঠান।এগুলিও মূলত যাদুবিশ্বাস থেকে আগত।কৃষিক্ষেত্র ক্রমশ নারীর সমার্থক হয়ে উঠেছিল। নারী পুরুষের মিলনে যেমন সন্তান হয় তেমনি প্রাচীন মানুষের ধারনা হয়েছিল জমির ঊর্বরতা বৃদ্ধি বা কৃষির ভালো ফলন পেতে হলে ক্ষেতে নারীসঙ্গম করা করা উচিৎ।মধ্য আমেরিকার আদিবাসীরা বীজ বপনের রাতে এবং বীজ বপনের ঠিক আগের মুহূর্তে জমির উপর মৈথুন করার জন্য কয়েকজনকে বিশেষভাবে নিযুক্ত করে।রেড ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে প্রথা হলো বীজ বপন উপলক্ষে একজন যুবককে নির্বাচিত করে তাকে উপযুক্ত সঙ্গীনী দেওয়া হয়।জাভাদ্বীপেও কৃষাণীরা ক্ষেতের মধ্যে মিলিত হয়।

অম্বুবাচী–বৃষ্টি মূলক যাদুবিশ্বাস

বৃষ্টি সম্পর্কিত যাদু অনুষ্ঠানেও এই যৌনতা দেখা যায়। উত্তরবঙ্গে হুদুমদেয়া অনুষ্ঠানে মেঘের দেবতাকে প্রসন্ন করার জন্য রাতে কুমারী মেয়েরা নগ্ন হয়ে বেড়ায়। মেঘের দেবতাকে শরীর দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করে।অশ্লীল ছড়া কাটে। নাচে গান করে। এ সবের মধ্য দিয়ে বৃষ্টির জন্য আকুল প্রার্থনা করা হয়। কোথাও কোথাও আবার দুটি মেয়ে লাঙলজোড়া পশুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একজন আবার কৃষক সাজে। অম্বুবাচী হয়তো আদিতে এমন এক যাদুবিশ্বাস মূলক অনুষ্ঠান ছিল।

কৃষিতে যৌনতা ও নগ্নতা

ভাঁজো উৎসবে শস পাতার সময় সকাল সন্ধ্যে কুমার মেয়েরা নগ্ন হয়ে অঙ্কুরে জল দেয়।গ্রামাঞ্চলে লক্ষ্মীর হাঁড়া থেকে চাল বের করার সময় উলঙ্গ হয়ে হাঁড়া স্পর্শ করে।মনিপুরের নাগাদের মধ্যে প্রচলিত আছে বীজবপন ও ফসল পাকার সময় নারী পুরুষ অশ্লীল আচার আচরণ ।উড়িষ্যার ভূঁইয়ারা আবার ক্ষেতে বসে মদ্যপান করে। কৃষি সম্পর্কিত এই ধরনের যৌন আচরণগুলি পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই বেশি কম দেখা যায়। রাঢ় অঞ্চলে একটি প্রথা আছে ভাদ্র কিম্বা আশ্বিন মাসে ফুলোনো ধানের জমিতে জলের অভাবে যখন ধানের জলটান ধরে তখন গভীর রাতে মেয়েরা উলঙ্গ হয়ে দুনি ধরে সাতবার জলসেচ করে।লোকবিশ্বাস হলো এর ফলে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে।

আরও পড়ুন–সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের আদি নিবাস কাটোয়ার আমাথি বা আমূলগ্রাম

 

অম্বুবাচী দুনিতে জলসেচ
অম্বুবাচী দুনিতে জলসেচ

ক্ষেত্র থেকে ক্ষেত্রজ সন্তান

নারীর গর্ভাধানকে একসময় ক্ষেত বলা হত।মনুসংহিতার দায়ভাগ ও বিচার পর্বে ১৬৬ থেকে ১৭৭ শ্লোকে দ্বাদশ প্রকার পুত্রের কথা বলা হয়েছে যেমন ঔরস ক্ষেত্রজ দত্তক কৃত্রিম গূঢ়োৎপন্ন অপবিদ্ধ কানীন সহোঢ় ক্রীত পৌনর্ভব স্বয়ংদত্ত শৌদ্র ।এই বারোটি পুত্রের মধ্যে ক্ষেত্রজ পুত্র বিষয়ে বলা হয়েছে—অপুত্রক মৃত ব্যক্তির নপুংসকের কিম্বা ব্যধিগ্রস্থ ব্যক্তির পত্নীতে ধর্ম সন্মতভাবে নিযুক্ত হয়ে দেবর প্রভৃতি সপিণ্ড বন্ধুজন যে সন্তান উৎপাদন করে সে সন্তানকে ক্ষেত্রজ সন্তান বলা বলে।মহাভারতে কর্ণসহ পঞ্চপাণ্ডবই ছিলেন কুন্তীর ক্ষেত্রজ সন্তান। ধর্মের সঙ্গে মিলনের ফলে পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ পুত্র ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয় ।পবনের ঔরসে তার গর্ভ থেকে ভীমের জন্ম হয়। বীর দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে সঙ্গম করেন কুন্তী। এই মিলনের ফলে ইন্দ্রের ঔরসে কুন্তী অন্তঃসত্বা হন এবং ইন্দ্রের ন্যায় বীর অর্জুনের জন্মদান করেন।

অম্বুবাচী কামরূপ কামাখ্যা

কৃষিকাজ থেকেই আদি মাতৃকাতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে।এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঊর্বরতা ও প্রজনন।এই আদি মাতৃকা থেকেই শাক্তধর্মের দেবীর উদ্ভব।দেবীর নাম ভগবতী।ভগ শব্দের একটি অর্থ হলো যোনি।সুতরাং অম্বুবাচীতে তে ভগ যুক্ত হবে তাতে সন্দেহ নেই।এই কারনেই অম্বুবাচী বললেই আসামের কামরূপ কামাখ্যাদেবীর কথা মনে আসে। ৫১ সতীপীঠের অন্যতম এই দেবী।কথিত আছে এখানে দেবীর যোনি পতিত হয়েছিল।এই চারদিন দেবীর মন্দির বন্ধ থাকে। কোনররম মাঙ্গলিক কর্ম হয় না।ধরিত্রীর মতো দেবীও এই সময়ে ঋতুমতী হয়ে ওঠেন।রাঢ় অঞ্চলে বিশেষ করে কাটোয়া থানার মুলটি কিম্বা পূর্বস্থলী থানার পাটুলি নারায়ণপুরের জনপ্রিয় লোকোৎসব এই অম্বুবাচী।এই দিন কামাখ্যারূপী কালিকাদেবীর পুজো হয়।কোন মূর্তি নেই।বৃক্ষকে কামাক্ষ্যা বা কালিকা জ্ঞানে পুজো করা হয়।মেলা বসে।প্রচুর পাঁঠাবলি হয়।লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে।

গ্রন্থঋণ–বাংলার কৃষিকাজ ও কৃষিদেবতা স্বপনকুমার ঠাকুর–খড়ি প্রকাশনী

দেখুন

 


Share your experience
  • 259
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    259
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR. SWAPAN KUMAR THAKUR
ড. স্বপনকুমার ঠাকুর। গবেষক লেখক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক। কৌলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।