আন্নামালাইয়ার তেজলিঙ্গম বিচিত্র পৌরাণিক আলেখ্য ও মন্দির ভাস্কর্য

Share your experience
  • 131
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    131
    Shares

আন্নামালাই অরুণাচলেশ্বর মন্দির
অরুণাচলেশ্বর মন্দির আন্নামালাইয়ার

আন্নামালাইয়ার  তেজলিঙ্গম বিচিত্র পৌরাণিক আলেখ্য ও মন্দির ভাস্কর্য।পঞ্চভূতের তৃতীয় “ভূত” হল তেজ বা আগুন। এই তেজ বা আগুনের অধীশ্বর হলেন আন্নামালাইয়ার বা অরুণাচলেশ্বর। তামিলনাড়ুর থিরুভন্নামালাই শহরে অবস্থিত অরুণাচল পর্বত, যাকে স্বয়ং শিব বলে মান্যতা দেওয়া হয়, সেই পর্বতের পাদদেশে বিশাল মন্দিরে আছেন তেজলিঙ্গ আন্নামালাইয়ার বা অরুণাচলেশ্বর। আজ আমরা এই তেজলিঙ্গের সন্ধানে যাবো। লিখছেন–আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

আন্নামালাইয়ার : অবস্থান

তামিলনাড়ুর থিরুভন্নামালাই জেলার সদর শহর হল থিরুভন্নামালাই। এর দূরত্ব চেন্নাই থেকে ১৮৫ কিলোমিটার এবং ব্যাঙ্গালোর থেকে ২১০ কিলোমিটার। এই শহরে অবস্থিত অরুণাচল পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত আন্নামালাইয়ার শিবের মন্দির। এর ভৌগোলিক অবস্থান হল ১২.১৩ ডিগ্রী নর্থ, ৭৯.৪১ ডিগ্রী ইস্ট (আবার সেই ৭৯ ডিগ্রী ইস্ট!)।

আন্নামালাইয়ার : অরুণাচল গিরি

থিরুভন্নামালাই শহরের মধ্যে অবস্থিত একটি পঞ্চচূড়া বিশিষ্ট ছোট পাহাড়ের নাম অরুণাচল গিরি। এর অন্য নামগুলি হল অরুণাগিরি, আন্নামালাই হিলস, অরুণাচলম, অরুণাই, সোনাগিরি এবং সোনাচলম। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো। এই পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ার উচ্চতা ২,৬৬৯ ফিট, সেইজন্য অরুণাচল গিরি টেকনিকালি ‘পর্বত’ (mountain), ‘পাহাড়’ (hill) নয়, যদিও এই লেখায় অনেক সময়েই অরুণাচল গিরিকে পাহাড় বলা হয়েছে । এই পর্বত থেকে পবিত্র সোনা নদীর উৎপত্তি হয়েছে।

অরুণাচল গিরির ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম। এই পাহাড়টিকে স্বয়ং শিব মনে করা হয়। খেয়াল করে দেখুন, এমনকি কৈলাস পর্বতও শিব নয়, শিবের বাসস্থান মাত্র, কিন্তু অরণাচলম স্বয়ং শিব। এই পাহাড়ের সবক’টি পাথরই শিবলিঙ্গ, সব গাছই কল্পবৃক্ষ, সব জলই গঙ্গাজল। এই পাহাড়েই অগ্নিস্তম্ভের রূপে শিব আবির্ভূত হয়েছিলেন। তামিল ধর্মশাস্ত্র অনুসারে এই পাহাড়ের পূর্বদিকে সূর্যদেবতার আবাস, পশ্চিমদিকে বরুণ দেবতার, দক্ষিণদিকে বিশ্বামিত্র মুনির এবং উত্তরদিকে আছেন শিবের ত্রিশূল এবং সিদ্ধপুরুষ-রূপী শিব।

বলা হয় যে অরুণাচল গিরি সত্যযুগে আগুনের ছিল, ত্রেতাযুগে পান্নার, দ্বাপরে সোনার এবং কলিযুগে হয়েছে পাথরের।

এই পাহাড়কে ঘিরে কম্পাসের আট কার্ডিনাল পয়েন্টে (E,SE,S,SW,W,NW,N,NE) আটটি শিবলিঙ্গের অবস্থান — ইন্দ্র লিঙ্গম, অগ্নি লিঙ্গম, যম লিঙ্গম, নিরুথি/নিরুধী লিঙ্গম,বরুণ লিঙ্গম, বায়ু লিঙ্গম, কুবের লিঙ্গম ও ঈশান/ঈশানীয়া লিঙ্গম। এই আটটি শিবলিঙ্গকে একসাথে বলা হয় “অষ্টলিঙ্গম” এবং এঁরা হলেন রাশিচক্রের ১২টি রাশির অধীশ্বর। অষ্টলিঙ্গম নিয়ে যথাসময়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবেঅরুণাচল গিরিকে সর্বদা ডানদিকে রেখে পাহাড়টিকে পায়ে হেঁটে প্রদক্ষিণ করা একটি প্রাচীন ধর্মীয় প্রথা। প্রায় ১৪ কিলোমিটারের এই পরিক্রমাকে বলা হয় ‘গিরিবালম’ বা ‘গিরি প্রদক্ষিণা’। এই প্রদক্ষিণা নিয়েও যথাস্থানে আলোচনা করা হবে।

অরুণাচল গিরির সর্বোচ্চ শিখর
অরুণাচল গিরির সর্বোচ্চ শিখর

আন্নামালাইয়ার : পৌরাণিক কাহিনী

এই স্থান  এবং মন্দির নিয়েও একাধিক পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে।প্রথম কাহিনী অনুসারে একবার কৈলাসে খেলাচ্ছলে পার্বতী শিবের দু’চোখ এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করে দেন। শিবের চোখ বন্ধ হতেই সমগ্র জগৎ অন্ধকার হয়ে যায়। এক মুহূর্ত হলেও সেটা দেবতাদের এক মুহূর্ত, পৃথিবীর মানুষের বহু যুগ (আইনস্টাইনীয় টাইম ডাইলেশন?)। জগৎ অন্ধকার হয়ে চারদিকে হাহাকার পড়ে গেল। পার্বতী নিজের ভুল বুঝতে পেরে মর্ত্যে এসে এই অরুণাচল পর্বতে শিবের তপস্যা শুরু করলেন। অবশষে শিব সন্তুষ্ট হয়ে একটি আদিঅন্তহীন আগুনের স্তম্ভের রূপে অরুণাচল গিরির উপর আবির্ভূত হলেন। জগতের অন্ধকার দূর হয়ে সৃষ্টি রক্ষা পেল।

অরুণাচলেশ্বর রাজা গোপ্রুম
অরুণাচলেশ্বর রাজা গোপুরম

আন্নামালাইয়ার : দ্বিতীয় পৌরাণিক কাহিনী

এই কাহিনীটি সবাই জানেন। একবার ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের মধ্যে তর্ক হয় কে বড় তা নিয়ে। শিব একটি আগুনের স্তম্ভের রূপে আবির্ভূত হয়ে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে বললেন অগ্নিস্তম্ভটির আদি ও অন্ত খোঁজার জন্য। ব্রহ্মা তাঁর বাহন হাঁসে চড়ে আকাশের দিকে আর বিষ্ণু বরাহ রূপ ধারণ করে পাতালের দিকে গেলেন, কিন্তু অনেক খুঁজেও অগ্নিস্তম্ভটির আদি অন্ত দেখতে না পেয়ে ফিরে এলেন। বিষ্ণু নিজের ব্যর্থতার কথা জানালেন এবং শিবের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করলেন , কিন্তু ব্রহ্মা মিথ্যা করে বললেন তিনি এর শেষ দেখতে পেয়েছেন। এতে শিব রেগে গিয়ে অভিশাপ দিলেন যে পৃথিবীতে কোথাও ব্রহ্মার পূজা হবে না। তার পরে অবশ্য ব্রহ্মা শিবের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিলে পুষ্করে তাঁর পূজার ব্যবস্থা হয়।

এই গল্পটি অতি পরিচিত একটি গল্প, কিন্তু এর সঙ্গে আন্নামালাইয়ের সম্পর্ক কী? সম্পর্কটা হল বলা হয় যে শিব অগ্নিস্তম্ভ রূপে অরুণাচল পর্বতের উপরেই আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং এখানেই তিনি তেজ/অগ্নি লিঙ্গ রূপে থেকে যান।

আন্নামালাইয়ার : মন্দিরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

এই মন্দিরটির কথা খৃষ্টীয় ৭ম শতাব্দিতে তামিল ‘নয়নার’ সাধু সম্বন্দার ও আপ্পারের লেখা ‘তেভরম’ কাব্যগ্রন্থে আছে। তবে ‘তেভরম’ গ্রন্থে যে আন্নামালাইয়ার বা অরুণাচলশ্বর মন্দিরের কথা বলা হয়েছে, তার অবস্থান ছিল বরুণলিঙ্গম মন্দির থেকে এক কিলোমিটার দূরের আদি আন্নামালাইয়ার গ্রামে। বর্তমান মন্দিরটি খৃষ্টীয় ৯ম-১০ম শতাব্দিতে চোল রাজারা নির্মান করলেও পরবর্তী কালে হয়সালা বংশের রাজারা (খৃষ্টীয় ১৪শ শতাব্দিতে) এবং বিজয়নগরের রাজারা খৃষ্টীয় ১৬শ শতাব্দিতে এই মন্দিরের সৌন্দর্যায়ন এবং নবরূপায়নে প্রচুর অর্থসাহায্য করেন।

 মন্দির ভাস্কর্য ১
মন্দির ভাস্কর্য ১

আন্নামালাইয়ার : মন্দিরের স্থাপত্য

দ্রাবিড় রীতিতে তৈরী এই বিশাল মন্দিরটি অরুণাচল পর্বতের পাদদেশে প্রায় ২৪ একর জায়গা নিয়ে অবস্থিত। এর মোট গোপুরম ৯টি হলেও মন্দিরের প্রাকারের গায়ে প্রবেশদ্বারের উপর অবস্থিত চারটি গোপুরমই প্রধান। পূর্বদিকের গোপুরমটি (‘রাজা গোপুরম’) সবচেয়ে উঁচু (১১ তলা, ২১৭ ফুট)। এছাড়া অন্য তিনটি গোপুরমের নাম হল ‘পে’ গোপুরম (পশ্চিম দিকের), ‘আম্মানাইআম্মাল’ গোপুরম (উত্তর দিকের) এবং ‘থিরুমনাঞ্জনা’ গোপুরম (দক্ষিণ দিকের)। প্রতিটি গোপুরমই দ্রাবিড় মন্দির স্থাপত্যরীতি অনুসারে অজস্র রঙিন মূর্তি দিয়ে অলঙ্কৃত। মন্দিরের গায়েও অসংখ্য পাথরের কাজের ভাস্কর্য আছে।

মন্দির কমপ্লেক্সে বহু মণ্ডপ ও মন্দির আছে। মন্দিরের মধ্যে মূল আন্নামালাইয়ারের মন্দির এবং উন্নামূলাই আম্মানের (পার্বতী এখানে যে নামে পরিচিত) মন্দিরই প্রধান হলেও পাতাল লিঙ্গমের মন্দিরটি মিস করা উচিত নয়, কারন ঐ মন্দিরে তপস্যা করেই আধুনিক কালের ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি রামন মহর্ষি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। মূল শিবমন্দিরটি পূর্বমুখী, এবং এই মন্দিরটিকে ঘিরে অনেকগুলি মন্দির আছে — সোমস্কন্দ, গজলক্ষ্মী, নটরাজ, লিঙ্গোদ্ভব (শিব লিঙ্গের মধ্য থেকে আবির্ভূত হচ্ছেন এই মূর্তি আছে) ইত্যাদি।

মন্দির ভাস্কর্য ২
মন্দির ভাস্কর্য ২

মণ্ডপগুলির মধ্যে খৃষ্টীয় ১৬শ শতাব্দিতে বিজয়নগর সাম্রাজ্যর সম্রাট কৃষ্ণদেবরায় প্রতিষ্ঠিত ‘হাজার পিলার মণ্ডপ’-টি অবশ্য-দ্রষ্টব্য। এই মণ্ডপের পিলারগুলিতে ‘গজ-ভিয়ালা’ (‘গজ-ইয়ালি’)-র ভাস্কর্য দেখার মত। প্রসঙ্গতঃ, এই ‘গজ ভিয়ালা/ইয়ালি’ হল একটি কাল্পনিক প্রাণী যার দেহটি সিংহের ও মাথাটি হাতির। দু’টি প্রাণীর শ্রেষ্ঠ গুণগুলির সমন্বয় বোঝাতে এই রকম কাল্পনিক প্রাণীর ধারণা। দাক্ষিণাত্যের বহু মন্দিরেই বিভিন্ন ধরণের ইয়ালি/ভিয়ালার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।মন্দির প্রাঙ্গনে কয়েকটি জলাশয় বা কুণ্ড আছে, তার মধ্যে ‘হাজার পিলার মণ্ডপ’-য়ের কাছের পুষ্করিণীটি সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ।

আন্নামালাইয়ার : তেজ বা অগ্নিলিঙ্গ

আন্নামালাইয়ার বা অরুণাচলেশ্বর হলেন পঞ্চভূতলিঙ্গের তেজলিঙ্গ বা অগ্নিলিঙ্গ। এই শিবলিঙ্গটিকে নিয়ে নানারকম কথা চলে। অনেকে বলেন এই লিঙ্গটি গরম, এবং সেইজন্য এই মন্দিরের গর্ভগৃহের তাপমাত্রা বাইরের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি। কেউ কেউ আবার এই লিঙ্গটিকে Tesla Coil-য়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন (নেটসার্চ করলে ভিডিও পাওয়া যাবে)। তবে এ সবই বিতর্কিত বিষয়। তবে শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষালশাস্ত্রীর বিখ্যাত বই “তপোভূমি নর্মদা”-র চতুর্থ খণ্ডের ১৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় “আগ্নেয়লিঙ্গ”-য়ের লক্ষণ সম্বন্ধে বলা হয়েছে  “আগ্নেয়লিঙ্গ অরুণ বর্ণের মত লাল হয়, করতলে উষ্ণস্পর্শ লাগে এবং লিঙ্গের মধ্যে অর্ধনারীশ্বর বা শক্তির চিহ্ন স্পষ্টতঃ অঙ্কিত থাকবে।”

এখন আন্নামালাইয়ার কি আগ্নেয়লিঙ্গ? এর উত্তর আমার জানা নেই। যদি আন্নামালাইয়ার একটি বৃহদাকার আগ্নেয়লিঙ্গ হন, তবে তাঁর উষ্ণ হওয়ার একটি শাস্ত্রীয় যুক্তি মেলে। আর যদি আন্নামালাইয়ার সাধারন আগ্নেয়লিঙ্গ না হন, এবং সত্যিই গরম হন, তবে তা নিঃসন্দেহে রহস্যময়।

আন্নামালাইয়ার : কার্তিগাই দীপম

শিব যে অগ্নিস্তম্ভ রপে অরুণাচল পর্বতের চূড়ায় আবির্ভূত হয়েছিলেন, সেই ঘটনাকে উপলক্ষ করে প্রতিবছর তামিল কার্তিক মাসে এখানে ১০ দিন ধরে ‘কার্তিগাই দীপম’ নামে একটি বিশেষ উৎসব হয়। প্রথম দিন সকালে মন্দিরের ধ্বজা উত্তোলন করে আন্নামালাইয়ারের ‘উৎসব মূর্তি’-সহ ‘পঞ্চমূর্তি’ (গণপতি, মুরুগান, ষণ্ডেশ্বর, অরুণাচলেশ্বর ও পার্বতী) নিয়ে শোভাযাত্রা করে এই উৎসবের সূচনা হয়। দ্বিতীয় দিন থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন দেবতার মূ্র্তি নিয়ে শোভাযাত্রা সহ বিভিন্ন ধরণের ধর্মীয় কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত হয়।  কার্তিক পূর্ণিমায় এই উৎসবের ১০ম বা শেষদিন পালিত হয়। সেই দিনে অরুণাচল গিরির সর্বোচ্চ চূড়ায় একটি বিশাল ‘প্রদীপ’ (‘মহাদীপম’) স্থাপন করে তা প্রায় ৩০০০ কিলোগ্রাম ঘী ঢেলে ভর্তি করা হয়। ঠিক সন্ধ্যা ছ’টায় যখন পশ্চিম দিকে সূর্যাস্ত এবং পূর্বদিকে চন্দ্রোদয় হয়, তখন সেই বিশাল ‘প্রদীপ’টি জ্বালানো হয়। বহুদূর থেকে এই ‘প্রদীপ’-টির আলো দেখা যায়। এই ‘কার্তিগাই দীপম’ উৎসব উপলক্ষে এখানে লক্ষ লক্ষ দর্শকের সমাগম হয় এবং ভক্তরা ‘গিরিবালম’ বা অরুণাচল গিরির প্রদক্ষিণায় অংশগ্রহণ করেন।

অরুণাচলেশ্বর মন্দির
অরুণাচলেশ্বর মন্দির

 গিরিবালম

গিরিবালম বা অরুণাচল গিরির প্রদক্ষিণার কথা না বললে আন্নামালাইয়ারের কথা সম্পূর্ণ হয় না, যদিও বিষয়টি অনেক বড় এবং গিরিবালম নিয়ে আলাদা ভাবে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে। এখানে একটু ছুঁয়ে যাচ্ছি।

অরুণাচল পর্বতকেই স্বয়ং শিব বলে মানা হয়। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখুন, স্বয়ং কৈলাসও কিন্তু শিব নয়, শিবের বাসস্থান মাত্র। কিন্তু অরুণাচল গিরি স্বয়ং শিব। এই পাহাড়টির চারদিকে পায়ে হেঁটে ঘোরাকে (১৪ কিলোমিটারের কছাকাছি) বলা হয় ‘গিরি প্রদক্ষিণা’ বা ‘গিরিবালম’। এই গিরিবালম শাস্ত্রানুসারে করত গেলে বিশেষ তিথিতে (পূর্ণিমা) খালি পায়ে সর্বদা অরুণাচল গিরিকে ডানদিকে রেখে শিবস্তোত্র জপ করতে করতে হাঁটতে হয়। প্রদক্ষিণা পথে অনেক মন্দির, কুণ্ড ও তীর্থ পড়ে, তার মধ্যে  আটটি শিবমন্দিরে অধিষ্ঠিত শিবলিঙ্গকে ‘অষ্ট লিঙ্গম’ বলা হয়। এঁরা হলেন যথাক্রমে ইন্দ্রলিঙ্গম, অগ্নিলিঙ্গম, যম লিঙ্গম, নিরুধি লিঙ্গম, বায়ু লিঙ্গম, বরুণ লিঙ্গম, কুবের লিঙ্গম এবং ঈশান বা ঈশানীয়া লিঙ্গম। গিরিবালমের সময় এই আটটি শিবলিঙ্গের প্রতিটি মন্দিরে পূজা দিতে হয়। এই গিরিবালম ব্যাপারটি অত্যন্ত ভালো ভাবে অর্গানাইজড, এমনকি ভক্তদের সুবিধার জন্য গিরিবালমের সব তথ্য দেওয়া একটি অ্যাপ অর্থাৎ অ্যাপ্লিকেশন আছে যা সেল ফোনে ডাউনলোড করে নেওয়া যায়।

রামন মহর্ষি

রামন মহর্ষি (১৮৭৯ — ১৯৫০ খৃষ্টাব্দ) একজন অত্যন্ত উচ্চস্তরের ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি ছিলেন। রামন মহর্ষি ছিলেন জীবনমুক্ত ব্রহ্মজ্ঞানী সন্ন্যাসী। তিনি ১৮৯৬-৯৭ সালে অরুণাচলেশ্বর মন্দিরে বাস করেন এবং ঐ মন্দির প্রাঙ্গনে অবস্থিত পাতাললিঙ্গের কাছে প্রায় ছ’ সপ্তাহ গভীর সমাধিমগ্ন থেকে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন। এরপর ১৮৯৯ সালে তিনি অরুণাচল গিরিতে বীরুপাক্ষ গুহায় প্রায় ১৭ বছর বাস করেন।  সারা পৃথিবীতেই তাঁর শিষ্যরা ছড়িয়ে আছেন। মন্দির থেকে কিছু দূরে রামন মহর্ষির খুব বড় আশ্রম আছে।

 আরও পড়ুন– জম্বুকেশ্বর — জলাধিপতি দ্বিতীয় পঞ্চভূতলিঙ্গমের কথা ও কাহিনী

উপসংহার

 আন্নামালাইয়ারের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে এই লেখাটি শেষ করছি। তা হল এই যে আন্নামালাইয়ার শুধু যে পঞ্চভূতলিঙ্গের একটি তাই নয়, ‘আথারা (আধার) লিঙ্গম’-য়েরও একটি। আন্নামালাইয়ার মণিপুর চক্রের অধীশ্বর। প্রসঙ্গতঃ, ‘আথারা/আধার লিঙ্গম’ হল তন্ত্রমতে মানব শরীরে যে ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ ‘চক্র’ আছে (মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধাক্ষ ও আজ্ঞা), তার অধীশ্বর শিবলিঙ্গ। ‘আথারা/আধার লিঙ্গম’ সম্বন্ধে যথাসময়ে আলোচনা করা হবে।থিরুভন্নামালাই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এর আকর্ষণ বহুবিধ। অন্ততঃ একবার এই জায়গাটিতে যাওয়া উচিত।

ঋণ স্বীকার ১) উইকিপিডিয়া সহ বিভিন্ন ইন্টারনেট সাইট।

২) শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষালশাস্ত্রীর বিখ্যাত বই “তপোভূমি নর্মদা”।

ফটো : লেখক

দেখুন কৌলালের ভিডিও


Share your experience
  • 131
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    131
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।

1 thought on “আন্নামালাইয়ার তেজলিঙ্গম বিচিত্র পৌরাণিক আলেখ্য ও মন্দির ভাস্কর্য

Comments are closed.