অর্ধ কালীদুর্গা রূপের বিচিত্র পুজো হয় সুভাষগ্রামের ঘোষবাড়িতে

Share your experience
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

অর্ধ কালীদুর্গা রূপের বিচিত্র পুজো হয় সুভাষগ্রামের ঘোষবাড়িতে। বনেদি বাড়ির এই দুর্গাপুজোয় একই মূর্তিতে অর্ধেক কালী ,অপরাংশ দুর্গা।এমন বিচিত্র রূপের দুর্গা আর পুজোর কথা লিখছেন–শুভদীপ রায় চৌধুরী

অর্ধ কালীদুর্গা
অর্ধ কালীদুর্গা

দেবী দুর্গা ও কালী

মহামায়া দশভূজা তিনিই পরমাপ্রকৃতি আবার একাধারে তিনিই জ্যোতির্ময়ী শক্তি। কখনও তিনি অভয়দান করেন সকল ভক্তদের আবার তিনি কখনও অসুরকে ধ্বংস করেন তাঁর ত্রিশূল ও খড়গের দ্বারা। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি দেবীদুর্গা এবং দেবীকালী হলেন আমাদের সেই শক্তিরূপা মহেশ্বরী যিনি আমাদের সমস্ত বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করেন অসুরকে দমন করে।

অর্ধ কালীদুর্গা –সুভাষগ্রামে

বঙ্গে এমনই এক প্রাচীন পরিবার রয়েছে যাদের বাড়িতে দুর্গাপুজো হয় ঠিকই কিন্তু তারা একসাথে দুই শক্তিকেই আরাধনা করেন তাও একই বিগ্রহে, কি অদ্ভুত লাগছে তো! এই বাড়ির ইতিহাসও যেমন অনন্য ঠিক তেমনই এই বাড়ির প্রতিমাও, লোককথায় এই বাড়িতে অর্ধকালীদুর্গা পুজো হয়। জাঁকজমক আজকে না থাকলেও প্রাচীন প্রথা মেনে আজও এই বাড়ির ঠাকুরদালানে ঢাক বাজে দুর্গাপুজোর সময়।

অর্ধ কালীদুর্গা ও স্বপ্নাদেশ

এই পরিবারের পূর্বপুরুষেরা থাকতেন পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে, ১৮৬৪সালে মেদিনীমণ্ডলের জাঁদরেল দারোগা হরিকিশোর ঘোষ স্বপ্নাদেশ পেলেন স্বয়ং দেবীর এবং তারপর থেকেই শুরু হয়ে গেলো ধুমধাম করে দুর্গাপুজো। শুভতিথিতে মৃন্ময়ী প্রতিমাও নির্মাণ শুরু হল কিন্তু এই সময়েই হল বিপত্তি! অর্থাৎ যিনি প্রতিমা তৈরি করছিলেন তিনি রঙের কাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে তখন হলুদ রঙ করতেই মূর্তির ডানদিকের অংশের রঙ বদলে যায় কালো রঙে।

সেই সময় হরিকিশোরের মনে পড়ল সেই স্বপ্নাদেশের কথা, কারণ দেবী যে রূপ তাঁকে বর্ণনা করেছিলেন সেই রূপ সাধারণ দুর্গার রূপ নয়। এই সঙ্কটের সময় পরিবারের কুলপুরোহিত আদেশ দিলেন অর্ধকালী অর্ধদুর্গারূপে পুজো করতে। সেই থেকে আজও ঘোষ বাড়ির দেবী অর্ধকালীদুর্গা রূপেই পুজো পেয়ে আসছেন বর্তমানে সুভাষগ্রামের বাড়িতে।

অর্ধ কালীদুর্গা মূর্তি বৈচিত্র্য

দেশভাগের পর ঘোষ পরিবারের সদস্যরা এপার বাংলায় চলে আসেন এবং সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন কিছু তৈজসপত্র ও বলিদানের খড়গ। প্রতিকূলতা থাকলেও পুজোর নিয়ম আচরে কোনদিন কমতি দেখা যায় নি এই বাড়ির পুজোতে। দেবীবিগ্রহে দেবীর শরীরের ঠিক মাঝ বরাবর চুলচেরা ভাগ- ডানদিকে অমানিশারূপী দেবী কালিকা এবং বামদিকে তপ্তকাঞ্চনবর্ণা দেবী দশভূজা।

মহিষাসুর দেবী কালিকার হস্তধৃত শূলে বিদ্ধ। লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর অবস্থান এক থাকলেও কার্তিক এবং গনেশ বিপরীত দিকে অবস্থান করেন। অর্থাৎ দেবী লক্ষ্মীর সাথে কার্তিক থাকেন এবং দেবী সরস্বতীর সাথে থাকেন গনেশ। ডাকের সাজে সজ্জিত থাকেন তাঁরা এবং নানান অলংকারে সাজানো থাকে তাঁদের।

অর্ধ কালীদুর্গার প্রতিমা
অর্ধ কালীদুর্গার প্রতিমা

পুজোর বিচিত্র পদ্ধতি ও শত্রুবলি

সুভাষগ্রামের ঘোষ বাড়ির দুর্গাপুজোর রীতিনীতিতেও বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বাড়ির পুজো হয় বৃহৎনান্দীকেশ্বর পুরাণ মতে এবং ললিতাসপ্তমীর দিন হয় কাঠামোপুজো। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন দেবীর চক্ষুদান ও প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর হয় মহাস্নানপর্ব, মায়ের প্রতীকরূপে দর্পনকেই স্নান করানো হয় এই বাড়িতে। পুজোর তিনদিনই একটি করে আঁখ, চালকুমড়া বলিদান হয় এবং মহানবমীর দিন হয় শত্রুবলি। অর্থাৎ চালের পিটুলি দিয়ে মানুষের আকৃতি তৈরি করে কচু পাতায় মুড়ে বলি দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন কলকাতার প্রাচীনতম দুর্গাপুজো-বড়িশার সাবর্ণদের দুর্গোৎসব

এই বাড়িতে অন্নভোগের প্রচলন নেই তবে তার পরিবর্তে সাড়ে বারো কেজি চালের নৈবেদ্য হয়। দশমীর দিন ভোগে থাকে বোরোধানের চাল, কচুরলতি, শালুক শাপলা শাক, আমড়া ইত্যাদি। দশমীর সকালে দর্পন বিসর্জন হয় এবং সন্ধ্যাবেলাতে দেবীবরণের পর বিসর্জনের মাধ্যমে এবছরের মতন পুজো শেষ হয় ঘোষ বাড়িতে। রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের সাথে আজও সাড়ম্বরে দেবীর পুজো করে আসছেন তারা, সুভাষগ্রামের ঠাকুরদালানে।

বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো নিয়ে দি কৌলালের একগুচ্ছ তথ্যচিত্র দেখুন


Share your experience
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ রায় চৌধুরী

শুভদীপ রায় চৌধুরী
শুভদীপ রায় চৌধুরী, ১২বছর দক্ষিণ কলকাতার স্বনামখ্যাত বিদ্যালয় "বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়" থেকে পড়ার পর উত্তর কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে স্নাতক এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর, বিশেষ বিষয় ছিল-ভারতের আধুনিক ইতিহাস। তাছাড়া ২০১৬সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে স্বতন্ত্র গবেষণায় যুক্ত। বর্তমানে বহু পত্রিকায় যুক্ত স্বতন্ত্র লেখায়, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে নয় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখার কাজেও যুক্ত। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের ৩৬তম বংশধর

1 thought on “অর্ধ কালীদুর্গা রূপের বিচিত্র পুজো হয় সুভাষগ্রামের ঘোষবাড়িতে

Comments are closed.