অষ্টবিনায়ক

Share your experience
  • 230
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    230
    Shares

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

মহারাষ্ট্রে গণেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় দেবতা। সারা মহারাষ্ট্রে অসংখ্য অখ্যাত, বিখ্যাত এবং অতিবিখ্যাত গণেশ মন্দির আছে। এর মধ্যে আটটিকে মানা হয় স্বয়ম্ভূ গণেশ হিসেবে। এদের একত্রে বলা হয় অষ্টবিনায়ক। মহারাষ্ট্রের তিনটি জেলা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই অষ্টবিনায়কের আটটি মন্দির, এর মধ্যে পাঁচটি মন্দির পুণে জেলায়, দুটোরায়গড় জেলায় এবং একটি আহমেদনগর জেলায়। এদের নাম হলো যথাক্রমে মোরেশ্বর বা ময়ূরেশ্বর (মোরগাঁও, পুণে জেলা), মহাগণপতি (রঞ্জনগাঁও, পুণে), বিঘ্ণেশ্বর (ওজার, পুণে), গিরিজাত্মজ (লেনাদ্রি, পুণে), চিন্তামণি (থেউর, পুণে), বরদবিনায়ক (মাহাড, রায়গড় জেলা), বল্লালেশ্বর (পালি, রায়গড়) এবং সিদ্ধিবিনায়ক (সিদ্ধটেক, আহমেদনগর জেলা)।

অষ্টবিনায়ক দর্শন

শাস্ত্রসম্মতভাবে অষ্টবিনায়ক দর্শন করতে গেলে যেখান সেখান করলে হবে না, একটা নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। তা হল মোরেশ্বর – সিদ্ধটেকের সিদ্ধিবিনায়ক – বল্লালেশ্বর – বরদবিনায়ক – চিন্তামণি গণেশ – গিরিজাত্মজ গণেশ – বিঘ্নেশ্বর – মহাগণপতি – মোরেশ্বর (অর্থাৎ মোরেশ্বর দিয়ে শুরু করে আমার মোরেশ্বরেই শেষ করতে হবে।

মোরেশ্বর

অষ্টবিনায়কের আটজন গণেশের মধ্যে মোরেশ্বর বা ময়ূরেশ্বরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।গণেশ পুরাণ অনুসারে গণেশের তিনটি বাসস্থান – স্বর্গে কৈলাশ, মর্তে মোরগাঁও এবং পাতালে শেষনাগের প্রাসাদ।মন্বান্তরে যখন প্রলয় হয়, তখন গণেশ এখানে যোগনিদ্রায় সমাধিস্থ অবস্থায় থাকেন।স্বয়ং ব্রহ্মা দু’বারএই গণেশের মূর্তি  পূজো করেছিলেন, গণেশ এখানে সিন্ধুরাসুরকে বধ করেন এবং পাণ্ডবরা এখানে এসে মোরেশ্বরের পূজো করেন।শাস্ত্র অনুসারে মোরেশ্বরের ছয় হাত, গাত্রবর্ণ শ্বেত। এঁর বাহন ময়ূর এবং সঙ্গে রিদ্ধি ও সিদ্ধি থাকেন। এঁর শুঁড় বাঁ দিকে ফেরানো।

সিদ্ধটেকের সিদ্ধিবিনায়ক

সিদ্ধিবিনায়ক – এই নামটার সঙ্গে প্রায় সবাই পরিচিত। কিন্তু সিদ্ধিবিনায়ক কোন গণেশকে বলা হয় ? উত্তরটা হলো – ডানদিকে শুঁড় ফেরানো গণেশ। সব গণেশই সিদ্ধিদাতা, তবে সিদ্ধিবিনায়ক রূপে তাঁর সিদ্ধিদানের ক্ষমতা বেশি।মুম্বাইয়ের সিদ্ধিবিনায়কের মন্দিরের গণেশ কিন্তু অষ্টবিনায়কদের একজন নন।স্বয়ম্ভূ সিদ্ধিবিনায়ক, যিনি অষ্টবিনায়কের একজন, তিনি কিন্তু আছেন মুম্বাই থেকে অনেক দূরে আহমেদনগর জেলার কারজাত তালুকের ছোট্ট জনপদ সিদ্ধটেকে।গর্ভগৃহে তিন ফিট উঁচু আর আড়াই ফিট চওড়া সিদ্ধিবিনায়কের স্বয়ম্ভূ পাথরের মূর্তি। ইনি সিদ্ধিবিনায়ক, তাই এঁর শুঁড় ডানদিকে ফেরানো।একদিকের জানুতে রিদ্ধি আর সিদ্ধির মূর্তি।

বল্লালেশ্বর

বল্লালেশ্বর গণেশের মূর্তির দুই চোখে ও নাভিতে তিনটি হীরে বসানো আছে। মূর্তিটির শেপ অনেকটাই মন্দিরের পিছনের পাহাড়টির মতো। এই মন্দিরটি এমনভাবে তৈরী যে বছরের বিশেষ বিশেষ সময়ে সূর্যোদয়ের সময় সূর্যের আলো গণেশমূর্তির মুখে পড়ে।

বরদবিনায়ক

‘বরদ বিনায়ক’, অর্থাৎ যে গণেশ ভক্তদের সম্পদ ও সমৃদ্ধি লাভের বর প্রদান করেন।বরদবিনায়কের মূর্তিটি লাল রঙের (অষ্টবিনায়কের সবাই লাল রঙের)। মূর্তিটি পূর্বমুখী এবং এঁর শুঁড় বাঁ দিকে।

চিন্তামণি গণেশ

প্রচলিত গল্প অনুসারে এই গণেশ চিন্তা দূর করেন, তাই ইনি চিন্তামণি। এখানে এসে তাই সবাই গণেশকে নিজের নিজের চিন্তা আহুতি দেন, যাতে তাঁরা চিন্তামুক্ত হন।

চিন্তামণিও বাঁ-শুঁড়ো গণেশ। পূর্বমুখি মূর্তিটি যথারীতি মেটে সিঁদুরের রঙের, আর এঁরও দু’চোখে হীরে বসানো।

গিরিজাত্মজ গণেশ

পুণে জেলার জুনারের লেনাদ্রি পর্বতেরগায়ে সারিবদ্ধভাবে বহু রক-কাট গুহা। এ এস আই-য়ের বোর্ডের বয়ান অনুসারে দু’শোরও বেশী রক-কাট গুহা আছে এখানে। বলা হয় যে এক জায়গায় এত রক-কাট গুহা ভারতবর্ষে আর দ্বিতীয়টি নেই। প্রায় সবকটাই বৌদ্ধ গুহা, শুধু একটি হলো অষ্টবিনায়কের অন্যতম গিরিজাত্মজ গণপতির গুহামন্দির।গুহায় ঢুকতেই বিশাল একটি হলঘর, এখন বলা হয় সভামণ্ডপ। হলঘরটি লম্বায় ৫৭ ফিট ও চওড়ায় ৫১ ফিট হলেও ছাদটি খুব নীচু, ৯ ফিটের বেশী হবে বলে হল না। দু’পাশে সারি দিয়ে ৭টি করে ছোট ছোট কুঠরি, ভিক্ষুদের শয়নকক্ষ। পিছনের দেওয়ালেও ৬টি কুঠরি ছিলো, কিন্তু মাঝের দুটি ভেঙে একটি বড়ো ঘর মতো করে সেখানে গনেশমূর্তি স্থাপন করে সেটিকে গর্ভগৃহ বানানো হয়েছে।

গুহাটি দক্ষিণমুখী, কিন্তু গণেশ বিগ্রহটি উত্তরমুখী বলে দর্শকদের দিকে পিছনফেরা। পেশোয়ারা বিগ্রহটি ঘোরাবার অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হন নি। বিগ্রহটি এখন কিছুটা পূর্বমুখী এবং এর একটি চোখ দেখা যায়। এঁর শুঁড়টি বাঁ দিকে ফেরানো।

বিঘ্নেশ্বর

বিঘ্নহর গণেশের মন্দির পূণে জেলার জুনার তালুকের ওঝার বা ওজার গ্রামে উকরি নদীর ইয়েদাগাঁও ড্যামের পাশে অবস্থিত।গর্ভগৃহে বাঁ দিকে শুঁড় ফেরানো বিঘ্নেশ্বর গণেশের স্বয়ম্ভূ পাথরের মূর্তি। কপালে একখণ্ড হীরে। দুচোখে আর নাভীতে রুবি বসানো। দুপাশে রিদ্ধি আর সিদ্ধি।

মহাগণপতি

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে স্বয়ং মহাদেব এইখানে নিজপুত্র গণেশকে প্রণাম অজেয় ত্রিপুরাসুরকে বধ করেন।
নাটমন্দিরে রূপোর তৈরী দুটো হাতি, দু’জনে দু’জনের দিকে মুখ করা। মাঝখানে একটু সামনে গণেশের বাহন ইঁদুর। এটিও রূপোর। হাতি এবং ইঁদুর সবারই কারুকার্য অসাধারণ।

গর্ভগৃহে মহাগণপতির মূর্তি – যথারীতি লাল রঙের এবং দু’চোখে ও নাভীতে হীরে বসানো। এঁর শুঁড় বাঁদিকে।

 


Share your experience
  • 230
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    230
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।