আত্মবলিদান দিবস- ভারতের অগ্নিযুগের দুই মহান বিপ্লবী

Share your experience
  • 148
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    148
    Shares

 

আত্মবলিদান দিবস বলতে প্রথমেই যার নামটি উঠে আসে তিনি হলেন শহীদ ক্ষুদিরাম বসু।১৯০৮ সাল ১১ আগষ্ট ভোর ছয়টায় ব্রিটিশ সরকার ১৮ বছরের এক তরতাজা যুবকে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করালো। কারা ফটকের বাইরে জনগণের কন্ঠে স্নোগান শোনা গেল ‘ বন্দেমাতরম ‘।লিখছেন–অভিষেক নস্কর।

 

আত্মবলিদান দিবস--শহীদ ক্ষুদিরাম বসু
আত্মবলিদান দিবস–শহীদ ক্ষুদিরাম বসু

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী ও স্বাধীনতা আন্দোলনোর অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা ও অগ্নিযুগের শহীদ বিপ্লবী ছিলেন ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী। এই দুইজন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসুর বিপ্লবী  কার্যকলাপ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত ।

প্রফুল্ল চাকীর জীবনী

প্রফুল্ল চাকীর জন্ম ১৮৮৮ সালে ১০ ই ডিসেম্বর। পূর্ববঙ্গের বগুড়া জেলায় বিহার গ্রামে। ছোটবেলায় নামুজা জ্ঞানদা প্রসাদ মধ্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে তিনি বগুড়ায় মাইনর স্কুলে ভর্তি হন। তারপরে ১৯০৩ সালে রংপুরে জেলা স্কুলে ভর্তি হন। এখানে তিনি নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় পূর্ববঙ্গ সরকারের কার্লাইলসার্কুলার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন অংশগ্রহণ করারর দায়ে তাঁকে এই স্কুল থেকে বহিস্কার করা হয়। এরপর রংপুরে কৈলাস রঞ্জন স্কুলে ভর্তি হন। এখানে পড়ার সময় বিভিন্ন বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগের সূত্রপাত ঘটে এবং তিনি বিপ্লবী ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

আত্মবলিদান দিবস -ক্ষুদিরাম বসুর

মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর জন্মদিন ৩ রা ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে। পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু ও মাতা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। খুব ছোট্টবেলায় ক্ষুদিরাম মা বাবা কে হারান। এরপরে তিনি দিদি অপরূপা দেবীর কাছে মানুষ হন। ক্ষুদিরামের নামটি নিয়ে মজা আছে, কথিত আছে দিদি অপরূপা দেবী তাঁর ভাই ক্ষুদিরামকে তিন মুঠো ক্ষুদ দিয়ে কিনেছিলেন বলে ভাইটির নাম হয় ‘ ক্ষুদিরাম’। ছোটো থেকে সেবামূলক ও দুঃসাহসিক কাজের প্রতি আগ্রহ ছিল। মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের মাষ্টারমশাই জ্ঞানেন্দ্রনাথ  তবসু ক্ষুদিরামকে দেশাত্মবোধ উদীপ্ত করেন ।

১৯০৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে মেদিনীপুরে পুরাতন জেল প্রাঙ্গনে এক শিল্প প্রদর্শনী হয়। সেখানে সেই যুগের বিখ্যাত রাজদ্রোহমূলক পত্রিকা ‘সোনারবাংলা’ মতান্তরে ‘ বন্দেমাতরম’ বিলি করার দায়ে পুলিশ ক্ষুদিরামকে ধরতে গেলে তিনি পুলিশকে প্রহার করে পালিয়ে যান। কিন্তু পড়ে ধরা পড়েন। তাঁর বয়স অল্প হওয়ায় পুলিশ মামলা প্রত্যাহার করেন। আর ক্ষুদিরামই অবিভক্ত বাঙলার প্রথম বিপ্লবী ছিলেন, যার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার প্রথম রাজদ্রোহ মামলাটি করেন।

ব্রিটিশদের অত্যাচার

১৯০৭ সালের শেষের দিকে সারা দেশে শুরু হয় ব্রিটিশ শাসক ও সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংঘর্ষ, ধড়াপাকড় আর অত্যাচার, নির্যাতন। স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লববাদী দলগুলোকে দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার মরিয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক বিপ্লবীদের ধরে নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা শুরু করে দেয়। এছাড়া তাদের উপর অথ্য অত্যাচার শারীরিক নির্যাতন চালানো শুরু করে। তাঁদেরকে আলিপুর ও আন্দামান জেলে যাবজ্জীন কারাদন্ড দিয়ে পাঠানো হত।

বালক সুশীল সেনের উপর অত্যাচার

এমন সময়ে একটি ঘটনা ঘটে যায়।, সুশীল সেন নামে ১৩ বছরের বালক ঘুসি মেরে পুলিশ সাজের্ন্টকে নাক ফাটিয়ে দেয়। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতা মামলা শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। মামলায় বিচারক ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বিচারের সুশীল সেনকে ১৫ ঘা বেত্রাঘাত মারার হুকুম দেন। বেত্রাঘাতে ফলে বালক সুশীল সেন রক্তাক্ত হলেন। কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েন। এই ঘটনা  সমকালে দারুন প্রভাব ফেলে বিপ্লবীদের মনে।

বিপ্লবীদের কিংসফোর্ডকে হত্যা ছক

ঠিক এইসময় সকল তরুণ বিপ্লবী দল এইঘটনা ক্ষিপ্ত হয়ে ইংরেজকে বিতাড়িত করার সংকল্প করেন। বিপ্লববাদী দলের অরবিন্দ ঘোষ, চারুদত্ত, হেমচন্দ্র কানুগো, বারীন ঘোষ, একটি পরিকল্পনা করলেন যে, অত্যাচারী কিংফোর্ড কে হত্যা করার। কিন্তু প্রশ্ন উঠল যে এই কাজের দায়িত্ব কাকে দেওয়া যেতে পারে।ঠিক এইসময় এইকথা শুনে প্রফুল্ল চাকী বললেন :- ” আমি প্রস্তুত ” ” বলুন কি করিতে হইবে”। সবাই ভাবলেন এই কাজ করার জন্য আরো একজনের দরকার। ভেবেচিন্তে বালক ক্ষুদিরাম বসুকে নির্বাচিত করলেন। ১৯০৮ সালে ২৫ এপিল ক্ষুদিরাম বসু কলকাতায় পৌঁছালেন। কলকাতায় গোপিমোহন দত্তের ১৫ নম্বর বাড়িটি ছিল বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা। এখানে বসেই বিপ্লবী হেমচন্দ্র ও উল্লাস কর “বুক বোমা ” তৈরী করলেন। এই বোমা বইএর পাতায় রাখা যেত।এই বোমাকে একটি বইএর মধ্যে রেখে কিংফোর্ডকে পাঠানো হল। কিন্তু কিংসফোর্ড বই না খোলায় এই যাত্রায় প্রাণ বেঁচে গেল।

আত্মবলিদান

শুরু হল নতুন প্রস্তুতি। প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম কলকাতা রেলস্টেশনে পৌঁছানোর পর বারীন ঘোষ তাঁদের কাছে কিংসফোর্ডকে মারার জন্য বোমা পৌঁছে দিলেন। প্রফুল্ল চাকী ক্ষুদিরাম প্রথমবারে মতো একজায়গা হলেন রেলস্টেশনে। কিংফোর্ডকে হত্যা করার জন্য যুক্তি করলেন। এরপর তারা মজঃফরপুরে চলে যান।কারণ প্রতিদিন এখানে তিনি বাস করেন কিংফোর্ড। প্রতিদিন ক্লাব হাউজ থেকে সন্ধ্যার পর সাদা ফিটন গাড়ি করে নিয়মিত বাড়ি ফিরে যান কিংসফোর্ড। কিছু দিনন চলে গেল, কিন্তু তারা সুযোগের পেল না। কিংফোর্ডকে হত্যা করার জন্য শেষমেষ সুযোগ এল। ১৯০৮ সালে ৩০ এপিল ক্লাব হাউজ থেকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত যে পথ সেই পথের মাঝখানে প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম ঝোপের ঢাকা একটি জায়গায় লুকিয়ে ছিল। সন্ধ্যার পর সাদা ফিটন গাড়ি তাঁদের কাছে পৌঁছানো মাত্রই গাড়িটি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করে।কিন্তু সেই দিন ওই গাড়ি তে কিংসফোর্ড ছিলেন না। ছিলেন দুই বিদেশ যাত্রী। অতিদ্রুত সেখান থেকে পলায়ন করলেন তাঁরা।

আত্মবলিদান
আত্মবলিদান

বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে ধরার চেষ্টা

এরপরেই সকল স্টেশনে খবর চলে গেল। পুলিশ ঘোষণা করলেন, এই আততায়ীকে ধরে দিতে পারলে পাঁচ হাকার টাকা নগদ পুরস্কার দেওয়া হবে।এই দিকে ক্ষুদিরাম বসু মজঃফরপুর থেকে প্রায় ২৪ মাইল পায়ে হেঁটে ওয়ালী  স্টেশনে পৌঁছে যান।প্রচন্ড তৃষ্ণায় একটি দোকানে যান তিনি। এদিকে পুলিশ আততায়ী কে ধরার জন্য ওত পেতে ছিল। পুলিশ ক্ষুদিরামকে সন্দেহ করেন।ক্ষুদিরাম জল পান করার সময় পাঁচ থেকে ছয় জন পুলিশ ঘিরে ফেলে।এরফলে গ্রেপ্তার হলেন বাালক ক্ষুদিরাম বসু।ক্ষুদিরাম বসু বোমা হামলার সব দায় তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।তিনি একবারসও তার সহযোগীর কথা বা নাম মুখে উচ্চারণ করেননি।

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে ক্ষুদিরাম বসু প্রফুল্ল চাকীর শুধুমাত্র একসাথে সহকর্মী ছিলেন না। তাদের একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা ও দেশপ্রেম কত গভীর ছিল।

বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর আত্মবলিদান দিবস

অন্য দিকে প্রফুল্ল চাকী অনেকটা পথ অতিক্রান্ত করার পর গ্রেপতার এড়ানোর জন্য রওনা হন ট্রেনে। বাঙালী পুলিশ নন্দলাল ব্যানার্জী নামে পুলিশের এক দারোগা সমস্তিপুরে ( মোকামা ঘাট) স্টেশনের কাছে প্রফুল্ল চাকীকে দেখে সন্দেহ করেন।দারোগা সন্দেহ করার জন্য প্রফুল্ল চাকী পালাবার চেষ্টা করেন।ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে অনেক দূর চলে যান। পুলিশ তার পিছু ধাওয়া করল। স্টেশনে পাহাড়ারত পুলিশও পিছু নিল। প্রফুল্ল চাকী দারোগাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লেন। কিন্তু লক্ষভ্রষ্ট হল। এই সময় সিধান্ত অনুযায়ী ঠিক করলেন নিজের গুলিতে তিনি প্রাণ বিসর্জন দেবেন।

তিনি দৌড়াতে দৌড়াতে হটাৎ দাঁড়িয়ে পড়েন। পুলিশ খুব কাছে চলে এল।সেই মুহুর্তে মধ্যে পকেটে থাকা রিভালবার বার করে দুটি গুলি নিজ মাথায়  করেন।  নিজেকে আত্মহতি দিলেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। Khudiram Bose

Khudiram Bose

ক্ষুদিরামের আত্মবলিদান দিবস

অবশেষে ব্রিটিশ দের হাতে ধরা পড়লেন ক্ষুদিরাম বসু। বিচার হল, পরিশেষে হত্যা মামলা চলাকালীন দুইজন অফিসার একমত হয়ে জজ ই. এইচ. বার্থহোর্ড ক্ষুদিরামকে দোষী সাবস্ত করে ফাঁসীর নির্দেশ দেন। ১৯০৮ সাল ১১ আগষ্ট ভোর ছয়টায় ব্রিটিশ সরকার ১৮ বছরের এক তরতাজা যুবকে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করালো। কারাফটকের বাইরে জনগণের কন্ঠে স্নোগান শোনা গেল ‘ বন্দেমাতরম ‘।

আরও পড়ুন- –বাংলার দুই বিখ্যাত ময়রার কথা

কারা কৃর্তপক্ষ জানতে চাইলেন মৃত্যুর আগে শেষ ইচ্ছাটা কি? তিনি অপেক্ষা না করে বললেন ‘ আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিতে চাই।

দেখুন কৌলালের তথ্যচিত্র

 

 

 


Share your experience
  • 148
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    148
    Shares

Facebook Comments

Post Author: অভিষেক নস্কর

Avisek Naskar
অভিষেক নস্কর।তরুণ ক্ষেত্রসমীক্ষক।টিম কৌলালের অন্যতম সদস্য।

1 thought on “আত্মবলিদান দিবস- ভারতের অগ্নিযুগের দুই মহান বিপ্লবী

Comments are closed.