নৈহাটি তাম্রশাসনে উল্লিখিত বাল্লহিট্টা বা বালুটিয়া গ্রাম

Share your experience
  • 607
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    607
    Shares

কৌশিক রায় চৌধুরী

 

এমন অনেক গ্রাম আছে যেগুলি অতীত ইতিহাসকে বুকে করে আগলে আছে নীরবে। সাধারণ ভাবে বোঝা যায় না। কিন্তু  যখনই কোন প্রত্নতাত্ত্বিক বা গবেষক সেই অন্ধকারের কুহেলিকা ছিন্ন করে সেই লুকিয়ে থাকা ইতিহাসকে উদ্ঘাটিত করেন, তখন মনে হয় তাই তো “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া।” পূর্ব বর্দ্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত এমনই এক গ্রাম বালুটিয়া কত অজানা অতীতকে আঁকড়ে পড়ে আছে সেই সেন যুগ থেকে।

কাটোয়া আজিমগঞ্জ রেল লাইনের গঙ্গাটিকুরী স্টেশনে নেমে উত্তর-পশ্চিম কোণে চোখ রাখলেই দেখতে পাবেন এই সুন্দর গ্রামখানি। দেখে কবি জসিমুদ্দিনের মতো আপনারও বলতে ইচ্ছে করবে, “ওই যে দূরে মাঠের পারে সবুজ ঘেরা গাঁ”।
১৯১১ সালে বল্লাল সেনের যে নৈহাটি (নবহট্ট) তাম্রশাসন আবিষ্কার হয়েছিল তাতে গ্রামটি ‘বাল্লহিট্টা’ নামে অভিহিত আছে। এই ‘বাল্লহিট্টা’র অপভ্রংশ বর্তমান বালুটিয়া। গ্রামের উত্তর-পূর্ব কোণে বৈষ্ণব গ্রাম বিরাহিমপুর, ঝামটপুর। পশ্চিমে আর এক বৈষ্ণব গ্রাম জলসূতী। আরও পশ্চিমে সোনারুন্দি। পূর্বে ৬-৭ কিমি জুড়ে বিস্তৃত ফাঁকা মাঠ এবং তার পারে নৈহাটি-সীতাহাটি গ্রাম। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রস সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মভূমি গ্রাম গঙ্গাটিকুরী এবং দক্ষিণে খাঁড়ুলিয়া ও অম্বলগ্রাম। আর কুলুকুলু বয়ে চলেছে প্রাচীন ‘সিঙ্গোটিয়া’ নদী। বর্তমান নাম ঈশানী। স্থানীয়দের কাছে কাঁদর।


ইতিহাসে চোখ রাখলে দেখব দ্বাদশ শতাব্দীতে চলছে সেন বংশের রাজত্ব। শূর বংশীয় কন্যা বল্লাল সেনের মা বিলাস দেবী ছিলেন ধর্মপরায়ণা মহিলা। বিজয় সেনের ‘ব্যারাকপুর’ তাম্রশাসনে ক্ষোদিত আছে বিজয় সেনের পাটরাণী বিলাসদেবী অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত বিক্রমপুর থেকে চন্দ্র গ্রহণের এক মাহেন্দ্রক্ষণে কনকতুলাপুরুষ যজ্ঞ করেছিলেন। তেমনি নৈহাটি তাম্রশাসনে বর্ণিত আছে যে তিনি গঙ্গা তীরে হেমাশ্ব যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু গঙ্গা তীরের ঠিক কোথায় সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন উল্লেখ নাই। তবুও ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন তত্ত্ব তথ্য ঘেঁটে অনুমান করছেন যে ওটা কেতুগ্রাম থানার  নৈহাটির গঙ্গা তীরেই হবে। মৎস্য পুরাণে যে ষোলোটি মহাদানের বা মহাযজ্ঞের কথা বলা আছে তার মধ্যে হেমাশ্ব যজ্ঞ অন্যতম শ্রেষ্ঠ। এই যজ্ঞকর্মের পৌরোহিত্য করেছিলেন লক্ষ্মী দেবশর্মনের পুত্র ওবাসুদেব শর্মণ। ইনি ছিলেন ভরদ্বাজ গোত্রীয় সামবেদীয় ব্রাহ্মণ। বিলাসিনী দেবী দক্ষিণা স্বরূপ ওবাসুদেবকে শ্রীবর্দ্ধমানের ভুক্তির মধ্যবর্তী উত্তর রাঢ়া মন্ডলের স্বল্প দক্ষিণ বীথির অন্তর্গত ‘বাল্লহিট্টা’ নামক গ্রামটি দান করেছিলেন। বৃষভশঙ্কর নলের পরিমাপ অনুযায়ী প্রাচীন বালুটিয়া (বাল্লহিট্টা) গ্রামের আয়তন ৭ ভূপাটক, ৯ দ্রোন,১ আঢ়ক,৩৪ উন্মান এবং ৩ কাক।


তাম্রপটে গ্রামের চতুঃসীমা বর্ণনায় যে যে গ্রামের নাম আছে সেগুলি হল- খান্ডয়িল্লা (খাড়ুলিয়া), অম্বয়িল্লা (অম্বলগ্রাম), জলসোথী (জলসূতী), মোলাদন্ডী(মুরুন্দি)। এছাড়াও অন্যান্য যে যে গ্রামের নামগুলো পাওয়া গেছে সেগুলি বালুটিয়া গ্রামের সাত-আট কিলোমিটারের মধ্যেই অবস্থিত। যেমন- আউহাগগড্ডিয়া (আগড়ডাঙা), নডডিনা (রাউন্দি), সোমালি (শিমুলিয়া), কিয়োত্তরালি (তরাল সেনপাড়া), সুরকোণগড্ডিয়া (সোনারুন্দি) ইত্যাদি।
বাল্লহিট্টা বা বালুটিয়া নামটির অর্থ বালির ভিটা বা বালুর চড়ে গড়ে ওঠা গ্রাম। আবার নিকটবর্তী গ্রাম ‘গঙ্গাটিকুরী’র নামের অর্থ খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় ‘গঙ্গা’ ও ‘টিকর’ শব্দ দুটি। ‘টিকর’ মানেও নদীর চরা বা ডাঙা। অর্থাৎ গঙ্গা নদীর চরে বা ডাঙায় গড়ে ওঠা গ্রাম।এ থেকে একটা স্পষ্ট আভাস পাওয়া যায় যে বহু বছর আগে এখান দিয়েই ভাগীরথী প্রবাহিত হত। ক্রমে তা ভাঙতে ভাঙতে পূর্ব দিকে অনেকখানি সরে গেছে। সে তো আরও আগেকার কথা।
গ্রাম ঢুকতেই সাক্ষাৎ হবে শতাব্দী প্রাচীন আচকা বা আশকে পুকুরের সঙ্গে। পশ্চিম পাড়ে পুরোনো বাঁধানো ঘাটের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। বাঁদিকে লেইকী পুকুর। এই পুকুরের পাড়ে আগে অপেরা যাত্রা বসতো। তারও আগে বসতো অস্থায়ী সিনেমা হল। পুকুরটির ঈশান কোণে একটি আম গাছ ছিল। লোকে বলতো সাধুবাবার আমগাছ। ১৯৩০ সালের আশেপাশে মুর্শিদাবাদ জেলার দক্ষিণখন্ড ধীরাজতলা আশ্রমের ১০৮ দ্বারিকানাথ সাধুবাবা উদ্ধারণপুর যাওয়ার পথে ঐ গাছের আম পেড়ে ওখানকার স্থানীয় কোন ঠাকুরের উদ্দেশ্যে পুজো দিয়েছিলেন। আমগুলো স্বাদে ছিল রামটক। কিন্তু পুজোর পর প্রসাদী ফল হয়ে উঠল চিনির মতো মিষ্টি। সাধনার বলে গাছটির অম্লত্ব নষ্ট করে মিষ্টি আম গাছে রূপান্তরিত করে দিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। ১৯৮০ সাল নাগাদ গাছটা গঙ্গাটিকুরীর জমিদাররা কেটে দেয়।


গ্রামটিতে অনেকগুলি পুকুরের সমাবেশ রয়েছে। নিমেপুকুর, বামাপুকুর, সর্বেষে, নেড়াতলা, বেনে ও মোড়লা পুকুর। এই মোড়লাকে অনেকে মোল্লা পুকুর বলে থাকেন। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে এখানে আগে কি মুসলিমদের বসবাস ছিল?
পুরাসম্পদ বলতে একটি ভগ্ন মূর্তি (শুধু মাথাটুকু) রয়েছে, যেটা বিষ্ণু মূর্তি বলেই প্রতীয়মান হয়। বহু বছর আগে পুকুর খুঁড়তে গিয়ে এটিকে পাওয়া গিয়েছিল।বর্তমানে এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে সুহৃদ চট্টরাজের আদি বাড়িতে সংরক্ষিত আছে। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, সদগোপ ছাড়াও বাগদি, মুচি, সুড়ি, হাড়ি, ছুতোরদের বসবাস রয়েছে। বেশিরভাগ কৃষিজীবী। এছাড়াও চাকরিজীবী আছে। গঙ্গাটিকুরী স্টেশনে ব্যবসা করে বেশ কিছু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। এখানকার মজুমদারেরা ছিলেন একসময়ের জমিদার। এই মজুমদার বংশের বনয়ারি চন্দ্র মজুমদারের জ্যেষ্ঠা কন্যার সাথে গঙ্গাটিকুরীর জমিদার তথা বিখ্যাত রস সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিয়ে হয়েছিল ১২৬৬ বঙ্গাব্দের ১৩ই ফাল্গুন।
গ্রাম্য দেবতা ধর্মরাজ ঠাকুর। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমাতে ব্যাপক ধুমধাম হয়। গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে রয়েছে জটাধারীর থান। ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমায় ঘটা করে পুজো হয় ও মচ্ছব হয়। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে ছিদাম পুকুর পাড়ে ডাকাত কালী আছে। মাঘ মাসের অমাবস্যায় পুজো হয়। গ্রামের প্রধান আকর্ষণ বৈষ্ণবদের আখড়া বর্গী বাদাড়। কেতুগ্রাম থানার দধিয়া-বৈরাগ্যতলার গোপাল দাস বাবাজির আখড়ার কথা জানি। মাঘ মাসের মাকরীসপ্তমী তিথিতে সেখানে অন্নকূটের বিরাট মেলা বসে। অন্যান্য গ্রামের মতো এ গ্রাম থেকেও সেখানে  আখড়া নিয়ে যাওয়া হয়। এই গোপাল দাসের ভাই গোলোকদাস বৈরাগ্য পূর্ব বাংলার রাজশাহী থেকে কেনারাম দাস নামক এক জনৈক ভক্তকে নিয়ে এসে বালুটিয়াতে আখড়া পাতেন। বৃদ্ধ হলে তিনি তাঁর স্থাবর সম্পত্তি শিষ্য কেনারাম দাসকে দিয়ে যান। কেনারাম দাসের বংশধররা আজও এই গ্রামে বসবাস করছেন। এখানেও দধিয়ার মতোই মাঘ মাসের মাকরীসপ্তমী তিথি থেকে পরপর তিনদিন যথাক্রমে চিড়ে মহোৎসব, অন্ন মহোৎসব ও ধুলোট অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল-ডাল, টাকা, সব্জি তুলে গ্রামবাসীরা অন্ন মহোৎসবের দিন প্রায় আঠারো-কুড়ি মণ খিচুড়ি ভোগের প্রসাদ করেন। বালুটিয়ার বৈরাগীতলার মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নাই। ভিতরে দুটি সমাধি চোখে পড়ে। একটি গোলোক দাসের অপরটি শিষ্য শ্যামদাস বৈরাগীর।

গোলোকদাসের মাথাটি সবসময় নেড়া থাকত বলে ‘ন্যাড়াবাবা’ নামেও পরিচিত। গোলোকদাসের সমাধিতে নিত্য সেবা হয়। সারাদিনে একবার অন্নভোগ এবং বৈশাখ মাসে দুবার ঝাড়া দেওয়া হয়। ১৪১৫ বঙ্গাব্দে মাটির মন্দিরটি শ্রীদুর্গা পাঠাগার ক্লাবের সহায়তায় ও গ্রামবাসীর আর্থিক আনুকূল্য পাকা করা হয় ও সামনে একটি আটচালা নির্মাণ করা হয়। বালুটেবাসীরা গোলোকদাস বৈরাগীকে ভগবানের মতো শ্রদ্ধা করেন। তাঁকে নিয়ে অনেক অলৌকিক ঘটনার কথা এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তিনি প্রতিদিন গঙ্গাটিকুরী গ্রামের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উদ্ধারণপুর ঘাটে স্নান করতে যেতেন। গঙ্গাটিকুরীর এক সদগোপের বাড়িতে হুঁকো খাওয়ার অভ্যাস ছিল। একবার বাড়ির গিন্নি বিরক্ত হয়ে হুঁকোর টিকেতে আগুনের বদলে ছাই দিয়েছিল। গোলকদাস হুঁকোতে টান দেওয়ামাত্র গোটা বাড়িতে আগুন লেগে যায়। পরে সেই গৃহস্থ  ভদ্রলোক বাড়ি ফিরে সব শুনে গোলোকদাসের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে সবকিছু আগের মতোই হয়ে যায়। পরবর্তী কালে সেই ব্যক্তি গোলোকদাসের সেবার জন্য গঙ্গাটিকুরীর মাঠে বারো বিঘা জমি দান করেছিলেন। একবার বর্ষাকালে একজন মাঠে (গোমাই ও বালুটিয়ার মাঝে) আড়া পেতেছিল। আড়াতে ভালোই মাছ পড়েছিল। গোলোকদাস ঐ পথে যাওয়ার সময় সেই লোকটাকে জিজ্ঞেস করেন, “কিরে মাছ কেমন  পড়ল রে?” লোকটা ভাবল বাবা যদি মাছ চাই তাই মিথ্যা করে বলল,”না না বাবা, ঐ দু একটা গুগুলি টুগুলি পড়েছে”। বলাও যা হওয়াও তাই। আড়ার দিকে তাকিয়ে দেখে সব মাছ গেঁড়ি গুগুলি হয়ে গেছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইলে আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যায়।


গ্রামের অন্যতম লোকোৎসব শিবের গাজন। রয়েছে দাঁড় বোলান ও পোরো বোলানের দল। জলসন্ন্যাসের দিন গ্রামের শিব ময়ূরপঙ্খী দোলায় চড়ে গঙ্গা স্নানে বের হয়। লোকের ভিড় চোখে পড়ার মতো। গ্রামটি যে পুরোপুরি একটি বৈষ্ণব গ্রাম তার প্রমাণ আজকের বিশেষ দিনটিতে ঢাকের বোলেও পাওয়া যায়। শিব বের হয় আর ঢাকীরা বোল তোলে “বল ভাই নিতাই নিতাই/ আজ বল ভাই নিতাই নিতাই”, যেটা এই গ্রামের গাজনের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
এছাড়াও রয়েছে দুগ্ধকমল শিব। স্থানীয় নাম দুধ-কমলি। বালুটে গ্রামে অবস্থিত হলেও মুরুন্দির সিংহ পরিবারের ঠাকুর। আর আছে রক্ষাকালী। এটিও গ্রাম্য দেবতা। তবে পুজো করার কোন নির্দিষ্ট তিথি নাই। গ্রামে কোন বিপদ ঘটলে, মড়ক লাগলে হঠাৎ করে পুজোর আয়োজন করা হয়।
অনেকে মনে করেন যে গ্রামের  উত্তর অংশটি  আগে নাকি রাধাবিনোদপুর নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু এর কোন পুঁথিগত বা তথ্যগত প্রমাণ না থাকায় ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যায় না। অন্তত এমনটাই মনে করেন গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধ তথা গঙ্গাটিকুরী অতীন্দ্রনাথ বিদ্যামন্দিরের বাংলা সাহিত্যের প্রাক্তন শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চট্টরাজ মহাশয়।

 

ঋণস্বীকার:- ১) কেতুগ্রাম কথা কও- মুহম্মদ আয়ুব হোসেন।
২) বৃহত্তর কাটোয়া মহকুমার স্থাননাম ও জনপদ পরিচিতি- স্বপনকুমার ঠাকুর।
৩) রবীন্দ্রনাথ চট্টরাজ, নকুল লাহা- বালুটিয়া।

                    ছবি,জয়মঙ্গল ঘোষ, সুহৃদ চট্টরাজ ও লেখক।


Share your experience
  • 607
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    607
    Shares

Facebook Comments

Post Author: koushik roychoudhury

koushik roychoudhury
কৌশিক রায় চৌধুরী পেশায় শিক্ষক,নেশায় ক্ষেত্রগবেষণা।