বাংলার কৃষি উৎসব ইতুপুজো

Share your experience
  • 739
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    739
    Shares

শুভজিত সাহাঃহিঞ্চে কলমি লকলক করে।

রাজার বেটায় পাখী মারে।।

মারলাম পাখি শুক আর বীর।

সোনার কৌটোয় রুপোর খিল

রাই এলো মা ঝলমলিয়ে।

সোনার টোপর মাথায় দিয়ে।।

সোনার আঁটন সোনার পাচন সোনার সিংহাসন।

তাইতো মা পুজো করতে লাগলো এতহ্মণ।।

আধুনিকতার দাপটে মেয়েদের বারোমাসের ব্রতগুলির বেশির ভাগেরই প্রাণ ওষ্ঠাগত। অজস্র ব্রত বাংলার বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছে কালের নিয়মে। কিছু ব্রত টিকে রয়েছে কোনোমতে। এদের মধ্যে অন্যতম অঘ্রানের ইতুপুজোর ব্রত।

কার্তিক সংক্রান্তির দিন একটি বড় পরিস্কার নুতন মাটির সরায় গঙ্গামাটি দিয়ে তাতে ধান, মান, কচু ,হলুদ , শুশনিশাক কলমীশাক , সর্ষে ইত্যাদি গাছ শিকড় শুদ্ধ বসিয়ে চারদিকে পাঁচটি বটের ডাল পুঁতে মাঝে দুটি জল পূর্ণ ঘট বসিয়ে তাতে সিঁদুর দিয়ে পুতুল এঁকে ঘটের মাথায় দূর্বা দিয়ে পূর্ণ করে দিতে হয় ও দুটিঘটের সামনে মাটিতে একটি করে দুটি হরিতকী অথবা সুপারি পুঁতে দিতে হয়। তারপর পুরো সরায় মাটির ওপর ছোলা মটর সহ পাঁচ কলাই ছড়িয়ে হাতে তিল নিয়ে সঙ্কল্প করতে হয় ।কিছুদিন পর ছোলা মটর পাঁচ কলাই বীজ থেকে গাছ বের হয়। সকলের বিশ্বাস গাছ যত বড় হয় তত সংসারের শ্রীবৃদ্ধি হয়।

কেউ কেউ ঠাকুর ঘরে ইতু প্রতিষ্ঠা করেন আবার কেউকেউ বাড়ির মনসা তলা, তুলসি তলায় ইতু পাতেন।কার্তিকের সংক্রান্তির দিন ইতু প্রতিষ্ঠা করে অঘ্রানের সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতি রবিবার পুজো করার পর অঘ্রানের সংক্রান্তির দিন নিকটবর্তী নদী বা পুকুরে শঙ্খ ও উলুধ্বনি সহ কারে বিসর্জন করতে হয়।আবার অনেকে অঘ্রানের সংক্রান্তির দিন ঘট সরা পেতে পুজোর পর ওইদিনই বিসর্জন করেন একে কাঁচাঘট পুজো বলে।

ইতুপুজো মূলত সূর্যের পুজো। সূর্যের অপর নাম মিত্র থেকে মিতু হয়ে ইতু। সূর্য দেবতার পুজো কিভাবে কালের নিয়মে মেয়েদের ব্রততে রূপান্তরিত হল তা জানা যায় না।সাধারণত বাড়ির মেয়ে বউরা বলে থাকেন ইতু লক্ষ্মী। আবার অনেকে বলেন ইতু শস্যের দেবী। কারন শীত কাল রবিশস্য উৎপাদনের সময়।তাই এই সকল বীজের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ইতুপুজো যে কেবল সূর্যের ই পুজো তার নিশ্চিত প্রমাণদুটি এক এই পুজোয় কেবল দূর্বা ও অক্ষত (আতপ চাল) প্রয়োজন তুলসি, বেলপাতা নিষিদ্ধ, ঠিক যেমন টা সূর্যের অর্ঘের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ দুই রবিবারে এই পুজো হয় যা সূর্যদেবের বার।

পূর্ববঙ্গে এই পুজোর নাম “চুঙি পুজো”..সেখানে ঘটের বদলে বাঁশের চোঙ ব্যবহৃত হয়। প্রতি রবিবার আতপচাল কলা সন্দেশ বাতাসা ইত্যাদি সহকারে ইতুর নৈবেদ্য হয়। মাঝে অঘ্রানের শুক্লপক্ষে ভালো একটি রবিবার দেখে হয় ইতুর নবান্ন উৎসব। নতুন গুড়, চাল ফল দুধ একত্রে মেখে উৎসর্গ করা হয় ও সকলকে প্রসাদ দেওয়া হয় বাদ যায় না কাক পক্ষী ও। শেষ দিনে দেওয়া হয় ইতুর সাধ ।ব্রাহ্মণ বাড়িতে পায়েস রেঁধে দেওয়া হয় আর অব্রাহ্মণরা মুলো মুড়ি দেয় । ইতু ভাসানের দিন কাঁঠাল পাতায় আতপ চাল বেটে পিঠের আকারে করে ইতু ঘটের দুপাশে নতুন গুড় সহ দেওয়া হয় একে ইতুর পিঠে খাওয়া বলে।

কুমারী সধবা বিধবা সকলেই ইতু ব্রত করতে পারে। ব্রতীকে পুজোর দিনগুলিতে নিরামিষ আহার করতে হয় । যিনি এই ব্রত একবার শুরু করেন তাকে ততদিন এই ব্রত চালিয়ে যেতে হয় যত দিন না তিনি পরবর্তী প্রজন্মের কারুর হাতে এই ব্রত তুলে দিতে পারছেন। একবার যদি কোনো বাড়িতে ইতুপুজো উঠে যায় তবে আর তা শুরু করা যায়না। তাই বর্তমান বয়স্ক প্রজন্ম চলে গেলে ইতুপুজোর ভবিষ্যত কি হবে সে নিয়ে অনেক প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়।বর্তমানে বাড়িতে ইতুপুজোর ঝামেলা অনেকে রাখতে চায় না তাই সার্বজনীন মন্দিরে ইতু দিয়ে দেয়। অনেকে ইতু নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়ি যায়।পুজো শেষে ব্রাহ্মনী ব্রতকথা পড়ে তারপর ছড়া পড়ে ও অন্যরা শোনেন–

 

” অষ্ট চাল অষ্ট দূর্বা কলসপত্র থুয়ে

ইতুরকথা একমনে শুন প্রাণ ভরে ।।

ইতু দেন বর ।

ধন – ধান্যে , পুত্র- পৌত্রে বাডুক সবার ঘর ।।

কাঠি- কুটি কুড়াতে গেলাম ইতুর কথা শুনে এলাম ।

এ কথা শুনলে কি হয় ।

নির্ধনের ধন হয় ।।

অপুত্রের পুত্র হয়।

অশরণের শরণ হয় ।।

অন্ধের চক্ষু হয় আইবুড়োর বিয়ে হয় ।

অন্তিমকালে স্বর্গে যায় ।।

ব্রতকথা

অবন্তীনগরে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ দম্পতি বাস করতেন। তাঁদের দুই মেয়ে উমনো আর ঝুমনো। একদিন ব্রাহ্মণ ভিক্ষা করে পিঠের জোগাড় করে এনে ব্রাহ্মণীকে পিঠে তৈরি করতে বললে। মেয়ে দুটি যখন ঘুমিয়ে পড়ল তখন ব্রাহ্মণী পিঠে তৈরি করতে বসল।ব্রাহ্মন আড়ালে গিয়ে পিঠের শব্দ ধরে গুনতে লাগল ও এক একবার শব্দ শুনে দড়িতে এক একটি গিঁট দিতে লাগল। রাত্রে মেয়েদুটি উঠে মায়ের কাছে পিঠে খেতে চাইলে ব্রাহ্মণী তাদের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একটি পিঠে ভেঙে দু ভাগ করে দুই বোনকে দিলেন। তারা তাই খেয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর পিঠে গড়া শেষ হলে ব্রাহ্মণ খেতে এলো।ব্রাহ্মণী সব পিঠে ধরে দিলেন।ব্রাহ্মণ পিঠে গুনে দেখল একটি কম, ব্রাহ্মণী কে জিগেস করাতে তিনি সব খুলে বললেন। ব্রাহ্মণের খুব রাগ হল, কিন্তু কিছু বললেন না, মনে পুষে রাখলেন। কিছুদিন পর ব্রাহ্মণ মেয়েদুটিকে বললেন, তোদের পিসির বাড়ি রেখে আসি চল, সেখানে পেট ভরে খেতে পাবি। এই বলে মেয়ে দুটিকে নিয়ে ব্রাহ্মণ যেতে লাগল।

সন্ধ্যার সময় তারা এক বনের ধারে উপস্থিত হল। তখন মেয়ে দুটি বললে ,বাবা আমরা আর চলতে পারছি না।ব্রাহ্মণ বললে, তোরা আমায় কোলে মাথা রেখে ঘুমো, ঘুম ভাঙলে যাস।মেয়ে দুটি ঘুমিয়ে গেলে ব্রাহ্মণ মাটির ঢেলার ওপর তাদের মাথা রেখে চারদিকে আলতা গুলে শামুকের ঘুঁটি ছড়িয়ে চলে গেল। রাত হলে বাঘ ভাল্লুকের চিৎকারে তাদের ঘুম ভেঙে গেল।তাঁরা উঠে বাবাকে দেখতে পেল না। বড় মেয়েটি বললে বাবাকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। ছোটটি বললে না দিদি আমরা পিঠে খেয়েছি বলে বাবা আমাদের বনবাসে দিয়েছেন। বাবাকে যদি বাঘে খেত তবে আমরা কি বেঁচে থাকতাম , না মাটির ঢেলায় আমাদের মাথা থাকত।তখন তারা একটি বট গাছের কোটরে আশ্রয় নিয়ে রাতটুকু কাটালো। পরদিন সকালে তারা বেরিয়ে পড়ল। পথে যেতে যেতে দেখল দেবকন্যারা ইতুপুজো করছে। তারা দুই বোন দেবকন্যাদের কাছ থেকে ইতুপুজোর নিয়ম কানুন জেনে নিয়ে পুজো করলে। দেবকন্যা দের কথা মত তাঁরা বর চাইলে, “আমার বাপের সকল দুঃখ দূর হোক। ঘর বাড়ি হোক, একটি ভাই হোক, রাজার মত বড় হোক।” তারপর তারা প্রসাদ নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

ক্রমে ইতুর কৃপায় ঘরে এসে পৌছালো।। তাদের দেখে ব্রাহ্মণ তো রেগেই অস্থির, ব্রাহ্মণীর আনন্দের সীমা রইল না।তখন উমনো আর ঝুমনো ইতুপুজোর কথা সব খুলে বলল। কিছুদিন পর সেই দেশের রাজা ও তার মন্ত্রী সৈন্য সামন্ত নিয়ে মৃগয়ার উদ্দেশ্য বেরোলো ।তারা ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে সেই ব্রাহ্মণের বাড়ি এসে জল চাইল। উমনো ঝুমনো এসে তাদের জল দিলে। রাজা ও মন্ত্রী মেয়ে দুটি কে দেখে তাদেরকে বিয়ে করতে চাইলে । ব্রাহ্মণ আহ্লাদে উমনোর সঙ্গে রাজার আর ঝুমনোর সঙ্গে মন্ত্রীর বিয়ে দিলে।পরদিন তারা শ্বশুরবাড়ী গেল। যাবার সময় উমনো মাছ ভাত খেয়ে পান চিবোতে চিবোতে গেল। আর ঝুমনো ইতুর প্রসাদ খেয়ে নিরামিষ খেয়ে গেল। ক্রমে রাজার রাজ্যে ভয়ঙ্কর অমঙ্গল হতে লাগল। আর মন্ত্রীর সংসারে খুব উন্নতি হতে লাগল। রাজা উমনো কে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন। সে বোন ঝুমনোর বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নিল। ঝুমনো বললে দিদি ইতুর কোপে তোমার এই অবস্থা। তুমি শশুরবাড়ি যাবার সময় মাছ ভাত খেয়েছিলে, সেদিন অঘ্রান মাসের রবিবার ছিল। তারপর অঘ্রান মাস পড়তে ঝুমনো উমনো কে দিয়ে ইতুপুজো করালো আর বর চাইল। তখন আবার রাজার সুসময় ফিরে এলো। তখন রাজার উমনোর কথা মনে পড়ল ও তাকে রানী সাজিয়ে সসম্মানে ফিরিয়ে আনল । উমনো ঝুমনো ইতুপুজোর কথা সকলকে বলল ও ক্রমে ইতুপুজো জগতে প্রচার হল। তারপর উমনো ঝুমনো রাজা মন্ত্রী ব্রাহ্মন ব্রাহ্মণী সকলে পুষ্প রথ চড়ে স্বর্গে গেল।

ছবিঃলেখক


Share your experience
  • 739
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    739
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভজিত সাহা

শুভজিত সাহা
শুভজিত ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র।বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির গভীর অনুরাগী।সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্ষেত্রসমীক্ষা করে লিখতে ভালোবাসেন।