বাঁশবেড়িয়ার ধুমো ও জ্যাঙড়া কার্তিক

Share your experience
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares

দীপঙ্কর পাড়ুইঃধুমোকার্তিক : ধুমো মানে এই কার্তিকের বিশালাকার শরীরকেই বোঝানো হয়েছে।অভিধানে ধুমো শব্দ না পেলেও ধুমসা শব্দটি রয়েছে।হয়তো ধুমসা>ধুমসো>ধুমো শব্দটি এভাবে এসেছে।’ধুমশো-ধ্রম্রকার;কৃষ্ণবর্ণ স্থূলদেহ বয়স্ক পুরুষ।’অন‍্যদিকে ধুম্ব>ধুমো কথাটি আসতে পারে বলে মনে হয়।কারন ‘ধুম্ব-ধূমের ন‍্যায় কৃষ্ণবর্ণ এবং তুম্বের ন‍্যায় স্থুলধর;কুৎসিত মোটা।’বাঙলা প্রবাদে আছে ‘ধুম্ব মিনসে।’আভিধানিকগত অর্থ দেখলে বোঝা যায় এই কার্তেকের দশাসই চেহারাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে,তাই নাম ধুমোকার্তিক।এক্ষেত্রে প্রতিমার সাথে আভিধানিক অর্থ মিলে যায়।কারন এখানে বৃহৎ বড় শরীরের,মোটা তবে কুৎসিত করে নয় বাড়ির বয়স্ক ছেলের রূপে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়।কোঁকড়ানো চুল,মোটা গোফ বুড়োদের মতো চাদর ও ধুতি পরিহিত।আশ্চর্যের যে এই কার্তিকের বাঁশবেড়িয়ার ঐতিহ‍্যবাহী কার্তিকের দুইপাশে প্রহরীর ন‍্যায় দুজন দাঁড়িয়ে থাকেন তাকে এলাকার লোকেরা বলেন-সিপাহী,যা এই কার্তিক ঠাকুরের দুইপাশে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন।পুলিশের মত পোষাক-পরিচ্ছদ এই দুইজনার।এই পুতুলদ্বয়ের মধ‍্যে উপনিবেশিক প্রভাব লক্ষ‍্য করা যায়।দেখে যেন যনে হয় বাড়ির বয়স্ক কোনো লোককে যেন পাহাড়া দিচ্ছে।এলাকার লোকেরা বলেন আদিবাবা।গায়ের রঙ হলুদ।উচ্চতায় প্রায় ১৮-২০ ফুট।প্রকৃত অর্থেই এটি আদিরূপ কারন কালিঘাটের পটের কার্তিকের ছবি যদি দেখি তাহলে এ কার্তিকের সাথে সাদৃশ‍্য রয়েছে।পটে দ্বিস্তরীয় মাধ‍্যমে,আর এখানে ত্রি-স্তরীয় মাধ‍্যমে গঠিত হয়েছে কার্তিক।একসময় হুগলীর পট শিল্পীরা এই কার্তিক দেখে পট আঁকতেন।তারই প্রভাব পটে রয়েছে তা ঘুরে দেখার প্রয়োজন আছে।ময়ূরের উপর বসে আছেন কার্তিক।সাহাগঞ্জের নন্দীবাড়ির লোকের এ পুজো করতেন,এখন পুজোকমেটি এ পুজো পরিচালনা করে থাকেন।নন্দীবাড়ির সম্পর্কে সুধীরকুমার মিত্র উল্লেখ করছেন-এই স্থানের নন্দীবংশ একসময় খুব  খ‍্যাতিলাভ করিয়াছিল।শিবমন্দির,চতুস্পাঠী,দাতব‍্যকিৎসালয়,রথপ্রতিষ্ঠা,পুস্করিনী খনন প্রভৃতি যাবতীয় সৎকার্যের দ্বারা বীরেশ্বর নন্দী এই অঞ্জলে এবং সমগ্ৰ তিলি সমাজে বিশেষ প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন।লোক তাঁহাকে বীরু নন্দী বলিত।’এনারা হুগলীর জামগ্ৰামের নন্দী পরিবারের বংশের লোক।বীরেশ্বর নন্দী পিতার সঙ্গে বিবাদের দরুন কেওটায় চলে আসেন।ধুমোকার্তিকের প্রতিষ্ঠাকাল  ১৬০০ সন উল্লেখ রয়েছে।সেইদিক থেকে দেখলে প্রায় ৪২০বছরের পুরনো ঐতিহ‍্যবাহী এই কার্তিক।

.জ‍্যাংড়াকার্তিক : জাঙ্গড়া>জ‍্যাংড়া কথাটি এসেছে।এটি প্রাদেশিক শব্দ।অভিধানে রয়েছে-‘জাঙ্গড়া- সওয়ার;অশ্বারোহী।’অন‍্যদিকে জাঙ,জাঙ্গ মানে জঙ্ঘা,জানু হতে গোড়ালী পর্যন্ত‍্য;ঠ‍্যাং।’ আর রা একটি ক্রিয়া অর্থে বলা হয়েছে।আমরা রা করা,রা তোলা ইত‍্যাদির ব্যবহার দেখি।দুটি দিক থেকেই মিল রয়ছে।জাঙ্গড়া মানে অশ্বারোহী।প্রতিমাটি দেখলে মনে হয় অশ্বারোহী ঘোড়ার মধ‍্যে রণক্ষেত্রে ছুটে চলার একটি দৃশ‍্যপট।ময়ূরের উপর বসা,কিন্তু পায়ের অবস্থান দেখলে মনে হয় যেন অশ্বের উপর বসে আছে কার্তিক।কিন্তু এখানে অশ্ব নয় বাহন ময়ূর।রাজকীয় পোষাক,বিশেষত যোদ্ধাদের পোষাক-পরিচ্ছদ।মাথায় রাজমুকুট,হাতে বিশালাকার তীর ও ধনুক,মোটা গোফ,বিস্ফোরিত চক্ষুদ্বয়।যেন ক্ষত্রিয় তেজ ঝরে পড়ছে,ঠিক সেনাপতির মুখ।গায়ের রঙ হলুদ।কার্তিকের ভঙ্গিটি যেন রণক্ষেত্রে তীর চালানোর কথা মনে করায়।এই মুখ দেখলে উত্তর ভারতের ‘যৌধেয়’ জনজাতির কথা মনে পড়ে,তারাও এ ধরনের কার্তিক পুজো করেন।যৌধেয় জনজাতির কথা বললাম কারন এই কার্তিকের দুই পাশে যে দুজন দাঁড়িয়ে থাকেন,খয়রি বর্ণের ,দেখে মনে হয় কোনো দেহাতী জনজাতিদের হয়ে এনারা দুইপাশে অধিষ্ঠান করছেন।উত্তর ভারতের যৌধেয় টোটেম ময়ূর।প্রতিমার উচ্চতা  প্রায় ১৩-১৫ ফুট।সাহাগঞ্জের ধর্মরাজতলায় জ‍্যাংড়াকার্তিকের পুজো প্রায় ২৯১ বছর ধরে চলে আসছে।এলাকার লোকেরা আবার বলে জিলিপি কার্তিক।বাহন ময়ূরের মুখে বড় আকৃতির জিলিপি ঝোলানো থাকে এখানে।পুজোয় প্রসাদের মধ‍্যে জিলিপিও দেওয়া হয়।

ষড়ানন : বাঁশবেড়িয়ার খামারপাড়ার কুণ্ডুগলিতে পুজিত হন ষড়ানন কার্তিক।পুরাণ অনুযায়ী এই প্রতিমার নির্মাণ হয়েছে।স্কন্দপুরাণে আমরা ছয়টি মাথাযুক্ত কার্তিকের বিবরণ পেয়েছি,যার নাম ষড়ানন।ছয় আনন মানে ছটি মুখ।আবার অন‍্যদিকে ছয়টি ঋতু এখানে ছটি আনন।ছয়টি আনন থেকে ষড়ানন নামটি এসেছে।বর্তমানে মূর্তিটির একটু বদল ঘটেছে।শরীরের গঠ একই আছে।শুধু গলার জায়গাটি পরিবর্তন ঘটেছে,অতীতে এই প্রতিমার গলাটি একজায়গা থেকে নির্গত হয়ে ছটি মাথা নির্মাণ করা হত।এখন ছটি আলাদা আলাদা গলা করা হচ্ছে।প্রতিমার উচ্চতা প্রায় ১০-১২ ফুট।প্রতিমার বিশালাকার চেহারা,বিশেষত বুকের জায়গাটি বিশাল চওড়া,ময়ূরের উপর কার্তিক অধিষ্ঠিত নয়  ।সিংহাসনে বসেন কার্তিক।পাশে ময়ূর দাঁড়িয়ে থাকেন।দেহের রঙ কিছুটা হলুদ-কমলা বর্ণের।এখানে তান্ত্রিক মতে পুজো হয়।পুজোতে একটি বড় ঘটের পাশে ছটি ছোট্ট ছোট্ট ঘট স্থাপন করা হয়।এই ঘটগুলি দেবসেনা ওরফে মাতা ষষ্ঠীর প্রতীক হিসাবে পুজিত হন।প্রায় ৫০ বছর যাবৎ এই পুজো হচ্ছে।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দীপঙ্কর পাড়ুই

দীপঙ্কর পাড়ুই
দীপঙ্কর পাড়ুই--বর্ধমান বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক।কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর।লোকশিল্প নিয়ে গ্ৰাম ঘোরাঘুরিও লিখতে ভালোবাসি।আচমন,রাঢ়কথা ইত‍্যাদি পত্রিকায় ও বঙ্গদর্শন ও দুনিয়াদারি পোর্টালে কতগুলি লোকশিল্পের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।