বাঁশবেড়িয়ার ঐতিহ‍্যবাহী কার্তিক প্রথম পর্ব

Share your experience
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares

 

 

দীপঙ্কর পাড়ুইঃ’কুন্ডু কাঁসারি উদ্গেরে/তিন নিয়ে বাঁশবেড়ে’

হুগলীর জেলার  বাঁশবেড়িয়ার উল্লেখযোগ‍্য একটি পুজো হল কার্তিক পুজো।অতীতে বংশবাটি সপ্তগ্ৰামের একটি গ্ৰাম ছিল,যা আজও বর্তমান।ভূ-ভারতের সাথে সপ্তগ্ৰাম একটি উল্লেখযোগ‍্য বাণিজ‍্যকেন্দ্রের সংযোগসূত্রে আবদ্ধ ছিল তার প্রামাণ আমরা চণ্ডীমঙ্গলকাব‍্যে পেয়েছি।চণ্ডীমঙ্গলে আমরা ষোড়শ বেনে বা বণিকের উল্লেখ পাই,যারা প্রকৃত অর্থেই সপ্তগ্ৰামের বণিক ছিলেন।এনারা হলেন-জয়পতি,সোম শ্রীধর,শূলপাণি, মেঘ, রাজারাম, শ্রীপতি,কমলাকান্ত,গুণাকর,গণেশ্বর,বাণেশ্বর,হরিহর,হিরণ‍্য,দিবাকর,পুরন্দর,মহানন্দ।এ থেকেই বোঝা যায় সপ্তগ্ৰামে এক অভিজাত সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল।আর বাঁশবেড়িয়ার কার্তিকপুজো এই সম্প্রদায়ের দ্বারা প্রতিষ্টিত ছিল। কয়েকশো বছরের ধরে কার্তিক পুজিত হচ্ছে বাঁশবেড়িয়ায়।এ প্রবন্ধে আমরা সাহাগঞ্জ-বাঁশবেড়িয়া অঞ্চলের কার্তিক নিয়ে বলব।

 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

হুগলীর বাঁশবেড়িয়ায় এই ছড়াটি প্রায় শুনতে পাওয়া যায়।আশ্চর্যের হলেও সত‍্যি এই যে বাঁশবেড়িয়ায় শঙ্খবণিক,কংসবণিক বা কাঁসারী,গন্ধবণিক তিলি নানা সম্প্রদায়ের লোকেরা এখানে বাস করেন।সে সময়ের ‘সুবর্ণবণিক সমাচার’পত্রিকা ঘাঁটলেই যার প্রমাণ পাওয়া যায়।ব‍্যবসায়ী ও মহাজনদের উদ‍্যোগে এখানে কার্তিক পুজোর প্রচলন হয়।এই ব‍্যবসায়ী ও মহাজনদের বা উত্তরসূরী বা সন্তান না হওয়ায় এই দেবতা পূজিত হন। বাঁশবেড়িয়া ছিল সপ্তগ্ৰামের মধ‍্যে একটি গ্ৰাম।সপ্তগ্ৰাম বন্দর কালের স্রোতে হারিয়ে গেলেও বাণিজ‍্যের লোকগুলি তো হারিয়ে যায়নি।এই সপ্তগ্ৰামেই বৈষ্ণব উদ্ধারণ দত্তের ‘শ্রীপাট’অবস্থিত।যা বাঁশবেড়িয়ার কাছেই।বাঁশবেড়িয়ার খামারপাড়ায় মতিনাথ শীল,বংশবাটির রামদাস মুন্সি ও শ‍্যাম দত্ত মুন্সি প্রমূখ ক্ষমতাবান ব‍্যক্তিরা ছিলেন কার্তিক পুজোর উপাসক বা প্রতিষ্ঠাতা।চুচুড়া ও সপ্তগ্ৰামে বিশেষত বাঁশবেড়িয়া সোনার ব‍্যবসা হত ও সোনার বাণিজ‍্যকেন্দ্র সুপ্রতিষ্টিত হওয়ার সুবাদে এখানে বিরাট বিরাট পুজোর আয়োজন হত,যা এখনও বর্তমান।

 

ধর্মীয় প্রক্ষাপট

হিন্দু পুরান অনুসারে কার্তিকের স্কন্দ, কার্তিকেয়, বিশাখ,শাখনৈগমেয়,মহাসেন নানা নামে পরিচিত।কার্তিক  ঊর্বরতা ও প্রজননের,শিশুর রক্ষাকারী দেবতা,যোদ্ধজাতিদের ও নৌজিবীদের পুজিত দেবতা, সূর্যরূপে, শস‍্যদেবতা,কামুক, জ্ঞানী ও যোগী হিসাবে। পরিচিত।পুরাণে যোদ্ধাদের বলা হত স্কন্দ।তিনি যোদ্ধা ছিলেন তাই এই নাম।তামিল সাহিত‍্যে প্রেমের ও পাহাড়ী কুমারী মেয়েদের প্রিয় দেবতা তাকে দেখান হয়েছে।দক্ষিণভারতে ইনি ‘মুরুগান’নামে পরিচিত।কার্তিক মূলত লৌকিক দেবতা হিসাবেই পরিগণিত।কার্তিকের স্ত্রী দেবসেনা।দেবসেনা হলেন ষষ্ঠীদেবীরই অপর নাম।ব্রহ্মার কন‍্যা।ষষ্ঠী প্রজনন ও শিশু রক্ষাকারী দেবতা;অন‍্যদিকে কার্তিক ষষ্ঠীর সাথে সংযুক্ত বলে সেদিক থেকে তিনিও প্রজননের দেবতা।কার্তিকের মা হলেন কৃত্তিকা। এই কৃত্তিকা ছিলেন ছয়জন। ছয় কৃত্তিকা তাকে পালন করেছিলেন বলে তার নাম কার্তিক।দেবসেনার অস্তিত্ব প্রমাণ মেলে মহাস্থান মিউজিয়ামে অবস্থিত,উত্তরবঙ্গ থেকে প্রাপ্ত ‘কার্তিক ও দেবসেনা’ খ্রিষ্টীয় ১০ম শতাব্দীর ভাস্কর্যে।জৈন‍্যকল্পসূত্রে ‘নেমিনাথে’র সঙ্গে কার্তিকের সংযোগ রয়েছে।’বৌধায়ন ধর্মসূত্র’,’তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ’,’নারায়ণোউপনিষৎ’ ও ঋষি পতঞ্জলীর ‘মাহাভাষ‍্য’এ কার্তিকের উপস্থিতি রয়েছে।’বিষ্ণুধর্মোত্তর’পুরাণে কার্তিক ছয়মুখবিশিষ্ট বা ষড়ানন পাঁচটি গুচ্ছযুক্ত শিখণ্ডক(চুল),লাল পোষাক পরিহিত ও ময়ূরের উপবিষ্ট হয়েছেন।মূদ্রা ও প্রত্নতত্ত্ব অনুসারে দেখলে কার্তিক খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় চর্তুথ-পঞ্চম শতাব্দী ব‍্যপক অর্থে কার্তিক পুজোর প্রচলন ছিল।বাংলায় কার্তিক পুজোর শুরু কবে থেকে!এর উত্তর মেলে কলহন রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’গ্ৰন্থে।এ গ্ৰন্থ থেকে জানা যায় পুণ্ডবর্ধনে,মানে উত্তরবঙ্গে খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের কার্তিকপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়।দক্ষিণবঙ্গে মূলত বণিক বা ব‍্যবসায়ী উদ‍্যোগে কার্তিকপুজোর প্রচলন ঘটে।যার প্রমাণ বাঁশবেড়িয়া,চুচুড়া ও কাটোয়ায় মত জায়গা।এই জায়গায় আজও এই কার্তিকপুজো বহমান।

কার্তিকের বাহনে টোটেম সংযোগ

কার্তিকের বাহন ময়ূর বা শিখী।কখনও কখনও কুক্কুট বা মোরগের উল্লেখও রয়েছে।এই ময়ূর ছিল প্রাচীনতম একটি পাখি।সিন্ধু সভ‍্যতার মৃতপাত্রে যার প্রচুর নির্দশন রয়েছে।হরপ্পা সভ‍্যতায় ময়ূর ছিল তেজোময় অন্তরীক্ষের ও মহাকাশের প্রতীক।পুরাণে আকাশের অগ্নি ও ক্ষত্রতেজের প্রতীক।কাজেই বোঝা যায় ময়ূর সিন্ধু সভ‍্যতার সময় থেকে টোটেম হিসাবে ছিল।উত্তর ভারতের রাজন‍্যবর্গের মূদ্রায় আমরা লাঞ্ছনা ও দেবসেনাপতি ষড়াননের বাহন রূপে প্রতীয়মান ছিল।এ প্রসঙ্গে দেবব্রত ঘোষ বলছেন-‘বঙ্গদেশে অন্ততঃ নিম্নগাঙ্গেয় উপত‍্যাকায় সুপ্রাচীনকালে ময়ূর যে অত‍্যন্ত জনপ্রিয় পাখি ছিল তার সবিশেষ পরিচয় পাই সুন্দরবনের উত্তর প্রান্তে ২৪-পরগণার চন্দ্রকেতুগড়ের ধ্বংসাবশেষের মধ‍্যে কলিকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়ামে ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রত্নতত্ত্ববিভাগের সংগ্ৰহশালায় রক্ষিত শুঙ্গযুগের কয়েকটি মাটির সীলমোহরে ও তাম্রমুদ্রার সাঁচীর তোরণের মত তোরনের উপর উপবিষ্ট ময়ূরের সুন্দর ছবিতে।জৈন মহাপুরাণে বনবেদিকা, সংশ্লিষ্ট তোরণ ও ময়ূরের কথা উল্লেখ আছে।’এ বর্ণনা থেকে পরিস্কার সিন্ধু সভ‍্যতায় ময়ূএর প্রাচীনতা লক্ষ‍্য করা গেলেও বাংলায় কিন্তু উলেখযোগ‍্য পাখি হিসাবে ময়ূরের স্থান ছিল।

বাঁশবেড়িয়ার ঐতিহ‍্যবাহী কার্তিক

১.রাজা কার্তিক:বাঁশবেড়িয়া-সাহাগঞ্জ এলাকায় এই কার্তিক পুজিত হন।আঞ্চলিক নাম রাজা কার্তিক।দুটি ময়ূরের উপর সিংহাসনে উপবেষ্টিত,পিছনে গোলাকার  Hollow র মতো ময়ূরের পাখনা,মাথায় স্বর্ণমুকুট দেহে জমিদারের মত পোষাক-পরিচ্ছদ,গলায় স্বর্ণ-অলঙ্কার,মুখাবয়বের মধ‍্যে গোফ রয়েছে বাংলার জমিদারদের মত,হাতে তীর ও ধনুকসহযোগে কার্তিক এখানে বসে থাকেন।কার্তিকের দুইপাশে দুই সখী জয়া আর বিজয়া চামর ও ব্যজন হাতে দাড়িয়ে থাকেন।প্রায় ৩৭৫ বছর যাবৎ পুজিত হচ্ছেন রাজা কার্তিক।এলাকার লোকেরা মহারাজ নন্দকুমার বা রাজা রামমোহন রায়ের সাথে এই কার্তিকের তুলনা করে থাকেন।এই পুজোর প্রতিষ্ঠাতা কে ঠিকভাবে জানা যায় না,তবে পুজো এলাকার ঐতিহ‍্যবাহী পুজোগুলির মধ‍্যে একটি।

(ক্রমশ)ছবি–লেখক


Share your experience
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দীপঙ্কর পাড়ুই

দীপঙ্কর পাড়ুই
দীপঙ্কর পাড়ুই--বর্ধমান বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক।কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর।লোকশিল্প নিয়ে গ্ৰাম ঘোরাঘুরিও লিখতে ভালোবাসি।আচমন,রাঢ়কথা ইত‍্যাদি পত্রিকায় ও বঙ্গদর্শন ও দুনিয়াদারি পোর্টালে কতগুলি লোকশিল্পের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।