বাঁশবেড়িয়ার ঐতিহ‍্যবাহী কার্তিক তৃতীয় পর্ব

Share your experience
  • 791
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    791
    Shares

দীপঙ্কর পাড়ুইঃ‘বংশবাটী প্রভূতয়ো হগলীমাজ‍্য বর্ত্ততে।
খলাপি তটিনী নিতং বহতে বালুকাস্তরে।।’

কবিরামের ‘দিগ্বিজয় প্রকাশে’ বংশবাটীর উল্লেখ পাওয়া যায়।বংশবাটী বা বাঁশবেড়িয়া অতীতের একটি উল্লেখযোগ‍্য জায়গা ছিল।সপ্তগ্ৰামের একটি গ্ৰাম বা জনপদ।একদা বংশবাটী রাজবাড়ি,হংসেশ্বরী মন্দির,অনন্ত বাসদেব মন্দির,উদয় রায়,রাঘব রায়,রামেশ্বর,রাজা রঘুদেব রায়,কুমার মুনীন্দ্রদেব রায়,চতুস্পাঠীসহ নানা ঐতিহ‍্যের শিকড় আজও রয়েছে।এককালে সারস্বত সমাজ গড়ে ওঠে এখানে।সে ঐতিহ্যের ছাপ এখনও রয়েছে ‘টোলবাড়ি’ তার প্রমাণ।বাঁশবেড়িয়া রাজবাড়ির সভাপণ্ডিত ছিলেন মহেন্দ্রনাথ তর্কপঞ্চানন, কথকতার সম্রাট শ্রীধর কথকের বাড়ি বংশবাটিতেই ছিল।তাঁর লেখা ‘সংগীত রত্নাবলী’একটি উল্লেখযোগ‍্য গ্ৰন্থ।

সেরকম ভাবেই বাঁশবেড়িয়ায় কার্তিকপুজোও একটি ঐতিহ‍্যবাহী পুজো হিসাবে পরিচিত।কার্তিকপুজো বণিক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায়।কয়েকশো  বছরের ইতিহাস এই কার্তিকপুজোর।বাঁশবেড়িয়ার ঐতিহ‍্যবাহী কার্তিকগুলি হল-

৫. সেপাহী কার্তিক বা আদি কার্তিক: হংসেশ্বরী মোড়ে কার্তিক অবস্থিত।আঞ্চলিক নাম বাজার কার্তিক,পাশেই বাজার অবস্থিত।প্রায় ৩৫০ বছরের বেশী সময় ধরে এই কার্তিক পূজিত হন।বাঁশবেড়িয়া অঞ্চলের এটিই হল আদি কার্তিক।এ পুজোটি তেমন প্রচারিত হয়নি বলে অনেকে এর কাল নির্ণয় করতে পারেননি।কার্তিক কালীঘাটের পটের মত,আদিরূপের।মুখাবয়বে সরু গোঁফ কোঁকড়ানো লম্বা চুল ঘার পর্যন্ত।ময়ূরের উপর অধিষ্ঠিত,ময়ূরের পিছনে গোলাকার ভাবে পালক বিন‍্যস্ত।কার্তিককে কাঁধে উত্তরীয় ও ধুতি পড়ানো হয়।কার্তিকের পাশে খাকি রঙের দু’জন সেপাই দাঁড়িয়ে থাকে।এদের পোষাক এখন ফুল প‍্যান্ট,কিন্তু অতীতে হাফপ‍্যান্ট পোষাকে সাজানো হত,মাথায় টুপি পরিহিত।এই মূর্তিদ্বয়ের মধ‍্যেও উপনিবেশিক প্রভাব রয়েছে বলে মনে হয়।

৬.ধেড়ে কার্তিক :
বাঁশবেড়িয়ার ডানলপঘাটে এই কার্তিক পুজিত হন।অভিধানে রয়েছে- “[দীর্ঘ>ধাড়ী>(তুচ্ছার্থে) ধেড়ে]অশোভনভাবে বড়।গ্রাম্য ব্যবহারে অবজ্ঞার আধিক‍্য অর্থে’ধেড়েঙ্গা’ এই অর্থে দিগ্ধেড়েঙ্গা(তুল-দীঘল,-ড়), ধেড়েকেষ্ট।” অভিধানগত অর্থ দেখলে সত‍্যি এ কার্তিকের শরীরের অঙ্গ-প্রত‍্যঙ্গ অস্বাভাবিক  ভাবে বড়ো।বিশেষ করে পা শরীরের থেকে বৃহৎ।ময়ূরের উপর বসানো হয়, পা-গুলি দুদিকে ঝুলে থাকে।হাত দুটি উপরের দিকে তোলা,হাতে তীর-ধনুক।আমরা অবিবাহিত বয়স্ক পুরুষকে ‘ধেড়ে কার্তিক’বলে ডাকি।হয়তো এইভাবে এই প্রতিমার নির্মাণ হয়েছে বলে মনে হয়।মুখের ভাব-ভঙ্গি দেখলে মনে হয়,এক্ষুনি কেঁদে উঠবে।

৭.অর্জুন কার্তিক: বাঁশবেড়িয়ার ধোপাঘাট ও  সাহাগঞ্জের কেওটায় অর্জুন কার্তিকের পুজো হয়।আসলে অর্জুনের সঙ্গে কার্তিক এখানে সম্পৃক্ত হয়েছে।সিংহাসনে বসা  বাঁ হাতে ধনুক ডানহাতে তীর,ভঙ্গিটি বীর সদৃশ (যা অর্জুনের ভঙ্গিটিটিকে মনে করায়)।কখনও কখনও মনে হয় সিংহাসন নয় ,রথে আসীন হয়ে আছেন।এখানে বাহন হিসাবে দুটি ময়ূর থাকে।

৮.জামাই কার্তিক : বাঁশবেড়িয়া অঞ্চলে এ কার্তিক অনেকগুলি রয়েছে।এর মধ‍্যে নামকরা হল রথতলা ও জামাইগলির জামাইকার্তিক।রথতলার জামাইকার্তিক প্রায় ৫০ বছর ধরে পুজিত হচ্ছে।কার্তিক এখানে সিংহাসন বা ময়ূরে নয়,ফুলসজ্জার খাটে বসে থাকেন,হাতে গোলাপফুল।খাটটি ফুলসজ্জার মত রজনীগন্ধা ফুলে সাজানো থাকে।ময়ূর কখনও খাটে আবার নীচে থাকে।
৯.রাজা কার্তিক : বাঁশবেড়িয়ার বেলতলায় এই পুজো হয়।এলাকার লোকে রেনেশা বলে অভিহিত করেন,তা আসলে সংস্থাটির নাম।সিংহাসনের উপর বসা,রাজকীয় পোষাক,বীর সদৃশ ভঙ্গি,বাঁ পা উদ‍্যতভঙ্গিতে উঠানো থাকে।মাথার মুকুট নয় পাগড়ী থাকে।প্রায় ৪৭ বছর ধরে পুজিত হচ্ছেন এই কার্তিক।

ছবি–লেখক

 


Share your experience
  • 791
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    791
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দীপঙ্কর পাড়ুই

দীপঙ্কর পাড়ুই
দীপঙ্কর পাড়ুই--বর্ধমান বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক।কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর।লোকশিল্প নিয়ে গ্ৰাম ঘোরাঘুরিও লিখতে ভালোবাসি।আচমন,রাঢ়কথা ইত‍্যাদি পত্রিকায় ও বঙ্গদর্শন ও দুনিয়াদারি পোর্টালে কতগুলি লোকশিল্পের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।