বাঁশ যখন শিল্প–যাদবগঞ্জের বাঁশ শিল্পী মাহালিদের কথা

Share your experience
  • 142
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    142
    Shares

বাঁশ যখন শিল্প–যাদবগঞ্জের বাঁশ শিল্পী মাহালিদের কথা।সামান্য একটি বাঁশ। ঝোপে ঝাড়ে কতই না বাঁশের জঙ্গল দেখেছেন। অথচ শিল্পীর হাতে সেই বাঁশই হয়ে ওঠে এক অনন্য শিল্পকর্ম। আমার সঙ্গে চলুন পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের অন্তর্গত দিগনগর ২ পঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রান্তিক গ্রাম- যাদবগঞ্জে। এখানে এলে দেখবেন স্থানীয় মাহালি আদিবাসীদের বারোমাস্যার কাহিনীর সঙ্গে এক আদিবাসী দম্পতির হাত ধরে তাঁদের উত্তরণের প্রচেষ্টা। লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ।

বাঁশ যখন শিল্প
বাঁশ যখন শিল্প

মাহালিদের কথা- বাঁশ যখন শিল্প

মাহালি বা মহালিরা আদতে ছোটনাগপুর মালভূমির, সাঁওতাল খেরওয়াল গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত একটি অস্ট্রিক আদিবাসী সম্প্রদায়। ছোটনাগপুর থেকেই এঁরা ভারতের অনেক অংশে ছড়িয়ে পড়ে। একদা ১২ টি বিভিন্ন জাতি- কোল, ভীল, মুন্ডা, ওঁরাও, কুর্মি, সাঁওতাল, বিদিয়া, বিড়হড়, সাঁওতাল, কোড়া, গন্ড, দেশওয়ালী এবং মাহালি- এঁদের নিয়েই ছিল বৃহত্তর খেরওয়াল গোষ্ঠী। পরে এরা ভাগ হয়ে যায় ভিন্ন ভিন্ন জাতি হিসাবে।

আবার আরেক মতে মাহালিরা নাকি আদিম সাড়ধান আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত। এঁরা বলেন যে এঁদের মান্য ধর্ম হচ্ছে সিড়জম পুঁথি। কিন্তু বর্তমানে হিন্দু ধর্মে পালিত প্রায় সমস্ত পুজো-পালি ও উৎসব এঁদের ঘরে ঘরে পালন হয়।
মাহালি শব্দটির উৎপত্তি কিন্তু সাঁওতাল শব্দ মাদ (বাঁশ) থেকে। আরেকটি লেখায় পড়লাম মাহালি শব্দটি এসেছে ‘মাহট’ থেকে, মাহট মানেও কিন্তু বাঁশ। তাই মাহালিদের গানে আজও শোনা যায়-

বাঁশ যখন শিল্প-মহালি জনজাতির পরিচয়

” আমরা মাহালি জাতি
বাঁশো ছুলি তব দিনো রাতি,
পেটে লাগে ভূক
কেতে বুনো তব ডালি কুলো সুপ।”

স্নেহভরা মাহালি পিতা তাই তার মেয়েকে লেখাপড়া করতে বলেন- যাতে বিটি ভালো চাকরী পায়, সুখে থাকে, কষ্টকর বাঁশের কাজ আর না করতে হয়।

“আবু যত মাহালী জাতি
মাৎ কামিঃ বুন হসিত বিতি,
বিটি পাড়হ মিঃ
বাংখন মাৎ কামিঃ দিশায় মিঃ… 2
পাড়হো লেখন বিটি সান্মান নামাম
বগেঃ মাছো কামিঃ নামাম,
বিটি পাড়হ মিঃ বাংখন মাৎ কামিঃ দিশায় মিঃ.. 2
পাড়হো লেখন বিটি সুখতে জমাম
বাংখন পরে দুঃখ নামাম,
বিটি পাড়হ মিঃ বাংখন মাৎ কামিঃ দিশায় মিঃ.. 2 “

বাঁশ যখন শিল্প-যাদবগঞ্জ

গল্প হচ্ছে যাদবগঞ্জ মাহালি পাড়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি উৎপল বেসরা ও তাঁর স্ত্রী রিনা মাহালি বেসরার সঙ্গে। ইনারা দুজনে মিলে এখানকার আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।আগেই লিখেছি মাহালিরা জন্মগত ভাবে বাঁশ শিল্পী। এরা বাঁশ দিয়ে যেসব জিনিষ তৈরি করে তার মধ্যে আছে ঝুড়ি, চাঙাড়ি, কুলো বা চালুনী, ধামা, ধান রাখার টলা( ছোট গোল ধান রাখার বাঁশের পাত্র), মাছ ধরার জালের অংশ- বাঁকি, পাটা, ঘূর্ণি ইত্যাদি। মাহালির কুলোকে বলে হাটা, ঝুড়ি হচ্ছে ফেতয়ে , ঝাঁকার নাম ফেতিয়া , বিয়ের বরণ ডালা হচ্ছে দেউড়ি আর ছোট ডালি হচ্ছে খিচলা।

বাঁশ যখন শিল্প-মাহালিদের শ্রেণিবিভাগ

” ট্রাইবস এন্ড কাস্টস অফ বেঙ্গল” গ্রন্থে স্যার এইচ এস রিসলে সাহেবের করা মাহালিদের শ্রেণীবিভাগ নিম্নরূপ-
১) বাঁশফোড় মাহালি- যাঁরা মুখ্যত বাঁশের দ্রব্য নির্মাণ করেন।
২) পাটর মাহালি- বাঁশের ঝুড়ি নির্মাণের সঙ্গে কৃষিজীবী।
৩) তাঁতী মাহালি- এঁরা মুখ্যত পালকী বেহারার কাজ করত।
৪) সূলুনক্ষী মাহালি- কখনো চাষের কাজ, কখনও জনমজুর।
৫) এছাড়াও রিসলে সাহেব রাঁচির লোহারডাগা অঞ্চলে, মুন্ডা ও মাহালি দুই সম্প্রদায়ের এক ক্ষুদ্র-মিশ্র জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব দেখেছিলেন।

আমরা এসেছি বাঁশফোর মাহালি অধ্যুষিত, যাদবগঞ্জ গ্রামে। উৎপলবাবুর কথা অনুসারে এদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় গ্রাম সমাজ। আবার ৪০/৫০ টি গ্রাম সমাজ নিয়ে তৈরি হয় একটি দিগর সমাজ যার মুখ্য ব্যক্তি – মুখিয়া বা মোড়লকে এঁদের ভাষায় বলে ” মাঁঁঝি হারাম”। মুখিয়া ছাড়া আরো দুজন প্রধান ব্যক্তি হচ্ছেন পরামানিক ও গড়েৎ মাঁঁঝি।এঁদের সমাজের এক প্রাচীন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সাধারণত মাঁঁঝি হারাম এবং বয়স্কা কোন মহিলা বুড়ি হারাম হিসাবে মুখিয়ার কাজ করেন।

মাহালিদের পদবী প্রায় সাঁওতালদের মতই, তাই দেখতে পাবেন- হেমব্রম, হাঁসদা, সরেন, বাস্কি, কিস্কু, বেসরা, টুডু, মান্ডি, মুর্মু ইত্যাদি পদবী। এই পদবীগুলি হচ্ছে বিভিন্ন গোত্র বা পারিস। এঁদের মধ্যে স্বগোত্রে বিবাহ কিন্তু কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
মাহালিরা অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় জাতি। এঁদের জনসংখ্যা খুব কম, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কম, এঁরা খুব ভালো করে পারিপার্শ্বিক অন্য উপজাতি ও বর্ন হিন্দুদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে। তাই এঁদের ভাষা ও সংস্কৃতির সতত পরিবর্তন ঘটে চলেছে। বর্তমানে এঁদের ভাষায় সাঁওতাল, ওঁরাও , মুন্ডা ও ভূমিজ ভাষার শব্দ প্রচুর পাবেন। আর বাংলায় বসবাসের ফলে নতুন প্রজন্ম তো বাংলা ভাষাতেই সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দ।

এঁরা কিন্ত অত্যন্ত গরিব, আর বেশিরভাগই ভূমিহীন পরিবার হবার ফলে চাষবাসের ক্ষেত্রে এঁদের তেমন কোন উৎসাহ নেই। এঁদের পুরুষদের তুলনায় মেয়েরা অনেক বেশি কর্মঠ, এবং সামাজিক ও সাংসারিক দায়বদ্ধতা এঁদের কাঁধেই মুখ্যত ন্যস্ত।

বাঁশ যখন শিল্প

উৎপলবাবুর কাছে জানা যাক বাঁশ নিয়ে কিছু কথা। বাঁশ শিল্পের জন্য মুখ্যত লাগে তরল বা তরলা বাঁশ( অনেক জায়গায় তলতা বলে) এবং ভালকি বাঁশ। তবে বড়িয়া বাঁশ, কাঁটা বাঁশ এবং কালনেমি বাঁশ নামে আরো তিন রকমের বাঁশ পাওয়া যায়।
প্রাচীনেরা বাঁশজাত সামগ্রী নিয়ে গুসকরার বাজারে যেত বিক্রি করতে। কোন রকমে দিন গুজরানই হত, এসব বিক্রি করে।তাই উৎপল ও রিনার মাথায় আসে, বাঁশের ফ্যান্সি সামগ্রী তৈরি করার কথা। তাই এই গ্রামের প্রায় ৮০ টি ঘরের মেয়েদের জন্য আদিবাসী সমবায় সমিতি আয়োজন করেন বাঁশের শিল্পসামগ্রী নির্মাণের ট্রেনিং ক্যাম্প। এখান থেকেই একটু হলেও শুরু হয়ে যায় যাদবগঞ্জের আত্ম নির্ভরশীল হবার কাহিনী।

বাঁশ যখন শিল্প-নানা ধরনের বাঁশের কাজ

ট্রাডিশনাল জিনিষের পাশাপাশি শৌখিন জিনিষ যেমন ফুলের সাজি, ফুলদানি, বাঁশের ব্যাগ, টেবিল লাম্প, লাম্প শেড, টেবিল ম্যাট তৈরি শুরু হয়।অবশ্যই সস্তার প্লাষ্টিক জাত সামগ্রী এবং ভালো তরল বাঁশ পাবার সমস্যা- এঁদের বেশ অসুবিধার মধ্যে ফেলেছে। বেশির ভাগ সময়ই ঝাড়খন্ড থেকে বাঁশ কিনতে হয়। তাছাড়া দুটি গ্রামের প্রায় ৮০ টি শিল্পী পরিবারের কাজ করবার উপযোগী ওয়ার্কশপ তো দূরে থাক, মাথার উপরে কোন ছাউনি অবধি নেই, যেখানে বসে এরা কাজ করতে পারে। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমরা গেছি, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে মেয়েরা কাজ করছে। সত্যি এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। আরেকটি কথা, ৮০ টির মধ্যে মাত্র খান কুড়ি ঘরই পাকা, যেখানে শৌচালয়ের সুবিধা আছে।

মাত্র গুটি কয়েক মেয়ে এখানকার ছোট্ট আই সি ডি সি অফিসের বারান্দায় বসে শিল্পকর্ম করছে।চমকের একটু বাকি ছিল, ওঁদের গ্রামে এসেছি, যেন অনেক দিন পরে কোন কুটুম এসেছে ওঁদের ঘরে। বৃষ্টির মধ্যে ছাতা নিয়ে উৎপলের বৌদি ও একটি বাচ্চা মেয়ে আমাদের জন্য চা- বিস্কুট বানিয়ে নিয়ে এল। বৃষ্টি ধরে এলে ওঁদের সঙ্গে চললাম গ্রাম প্রদক্ষিন করতে। খোলা মাঠে, গাছের নিচে বসে , একমনে মেয়েরা বাঁশের কাজ করে চলেছে। প্রথমে গোটা একটা বাঁশকে কেটে কয়েকটি টুকরো করে প্রতিটি টুকরোকে কাটারি (কাতু) দিয়ে লম্বালম্বি ভাবে আবার কয়েকটি টুকরো করে ফেরে দেওয়া হচ্ছে।

এরপরে সেই কাটা টুকরোগুলিকে ঘুরো নামক একটি আরবাঁশের উপর রেখে একজনকে দেখছি সরু করে কাটা বাঁশের টুকরোগুলো থেকে পাতলা ছিলা(ওঁদের ভাষায় বিত্রি বা বিতি ) বের করছে কাতু নামক এক বিশেষ কাটারী দিয়ে। সেই বিত্রি চেঁচে মসৃন ও পাতলা টুকরো বেরোচ্ছে। মসৃণ বাঁশের বিতি বের করতে বাঁশের যে পাকানো চোঁচগুলো বেরোচ্ছে, সেগুলি উনুনের জ্বালানি রূপে ব্যবহার করা হয়।

বাঁশ যখন শিল্প-যন্ত্রপাতি

এরকম সবাই নানা রকম কাজ করছে কিছু বিশেষ যন্ত্রপাতি দিয়ে- কাতু ছাড়াও আছে সোঁদা( কাটারী), ছোট কাতু বা কাটিজ কাতু, ঘুরো এবং মুগুর । সবই ওঁদের নিজেদের হাতে তৈরি যন্ত্র । তবে এসবই লাগছে বাঁশের টুকরো বের করতে। আসল কাজটা তো পুরোটাই বিতি দিয়ে হাতের বুননের কাজ।

যাদবগঞ্জের আর্থিক উত্তরণের দ্বিতীয় পর্বে আসছি।আমরা বলি বাঙালি একাই একশ হতে পারে কিন্তু একশজন বাঙালি এক হয় না। এই কথাটি মিথ্যে প্রমান করে ছেড়েছেন শ্রী কমলাকান্ত জানা মহাশয়। কে উনাকে মাথার দিব্যি দিয়েছিল জানিনা, কিন্ত সেই ২০০৬ সাল থেকেই উনি সমাজের দুর্বল শ্রেণীর, বিশেষ করে তপশিলি জাতি ও উপজাতির মেয়েদের( বিশেষত করে যে সমস্ত মেয়েরা গ্রামীন শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত), অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন- EARDS বা এগড়া এগ্রিকালচার এন্ড রুরাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটি গঠন করে। এঁরা বীরভূম ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সহযোগিতায় ,উন্নত হাঁস-মুরগি-ছাগল পালন, বৈজ্ঞানিকভাবে মাছ চাষ করা, এসবের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।এঁদের পূর্বিতা নামে দুটি ক্রাফট সেন্টার আছে – সরপুকুরডাঙ্গা, শান্তিনিকেতনে এবং যাদবগঞ্জে। এই দুটি কেন্দ্র হচ্ছে, কেবলমাত্র স্থানীয় আদিবাসী মেয়েদের।

হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ ও গ্রামোন্নয়ন কেন্দ্র

যাদব গঞ্জের উৎপল বেসরা, দশরথ মুর্মু ইত্যাদি নতুন প্রজন্মের ছেলেরা সেই ২০০৬ থেকেই এসবের সঙ্গে যুক্ত।
উৎপলবাবুর সঙ্গে গেলাম ওঁদের হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে।সেন্টারের মূল বাড়িটি দোতলা, সামনে আরেকটি একতলা বাড়ি।এই একতলা বাড়িটিতে মাশ রুম চাষ হচ্ছে। দোতলা বাড়ির একতলায় আদিবাসী মেয়েদের সিবন শিক্ষা ও কাঁথা স্টিচের স্কুল চলছে। বীরভূম জেলার দেবানন্দপুর থেকে আসা টেলর মাস্টার সুজিত পাল, অতি যত্ন নিয়ে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এই ব্যাচের বেশির ভাগ মেয়েই সেলাই মেশিন চালান এবং কাঁথা স্টিচের ওস্তাদ হয়ে উঠেছেন।

ডাঁঁই করে রাখা আছে চুড়িদার, ব্লাউজ, কামিজ, পাঞ্জাবি, জহর কোট এবং রংবেরঙের শান্তিনিকেতনি কাঁধে ঝোলাবার ব্যাগ, মেয়েদের বটুয়া, হ্যান্ডবাগ ইত্যাদি। দোতলার দুটি ঘরেও প্রচুর তৈরি সামগ্রী , বিভিন্ন স্থানে পাঠাবার জন্য রাখা হয়েছে। সেন্টারের সমস্ত মেয়ে এবং কর্মচারীদের ব্যবহার অত্যন্ত আন্তরিক। আদিবাসী গরিব মেয়েদের স্বনির্ভর করে তোলার এই প্রয়াসকে অকুণ্ঠিত ভাবে অভিনন্দন জানাই।

সামাজিক রীতি নীতি

এঁদের সামাজিক ও লোকাচার সম্মন্ধে অনেক কিছু জানা গেল।এঁদের বিবাহাদি অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ নয়, মাহালি পুরোহিতই পৌরোহিত্য করেন। প্রতিটি বিয়েতে গ্রামপ্রধান বা মাঝি হারাম উপস্থিত থাকেন। তাঁকে দশটি পান পাতা ও দশটি সুপারি দিয়ে সন্মান জানান হয়। অনেকেই অবশ্য নতুন ধুতিও দেন।

মাহালিদের অনেক আগে চার প্রকার বিবাহ প্রথা ছিল। ১) ভালোবাসা জনিত আমাপর বিবাহ, যেখানে দুজনে পালিয়ে গিয়ে বিবাহ করত।
২) ভালোবেসে কোন মেয়ের সিঁথিতে সিঁদুর লেপে দেওয়া বিবাহ পর্ব।
৩)ঢুক বিবাহ, যেখানে কোন মেয়ে স্বেচ্ছায় তাঁর ভালোবাসার পুরুষটির ঘরে চলে আসে।
৪) ট্রাডিশনাল সন্মন্ধ করা বিয়ে।

বিয়ের মণ্ডপকে বলে মারয়া, পুব দিকে বসে বড়কর্তা- ছেলের বাপ। ছেলে বসে বাবার বলু( হাঁটু) তে। মেয়ের বাবা বসেন পশ্চিমদিকে, উনার হাঁটুতে বসেন বিয়ের কনে। একে মাহালিরা বলে ” বুলুরে দুরূপ কেতে বাপলা হুহুইয়া”। সিঁদুর দান হচ্ছে মুখ্য অনুষ্ঠান। উৎপলবাবুর কাছে জানলাম, বর্তমানে এসব প্রথার চল অনেক বদলে গেছে।মাহালি ছাড়া অন্য উপজাতিদের সঙ্গে বিবাহের চল নেই।

বাঁশ যখন শিল্প- মাহালিদের বিবাহরীতি

এঁদের বিবাহের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, আত্মীয় স্বজনেরা সবাই মিলে বিয়ের খরচাপাতি দিয়ে সাহায্য করেন। বিয়ের দিনের উপহার হচ্ছে একটি মোরগ ও এক হাঁড়ি হাঁড়িয়া নিয়ে আসা।একটি উঠোন বা খোলা জায়গাকে আম পাতা, নিম পাতা দিয়ে সাজান হয়। বর -কনে কে ফুল-পাতার মালা, চন্দন বাটা দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে, নতুন পোশাক পরান হয়, গলায় ও কোমরে জড়ান হয় ঘুনসী। মাঁঁঝি হারাম অনুমোদন দিলে বর- কনের সিঁথিতে সিঁদুর দান করে, চার হাত এক করে দেওয়া হয়। এইটি হচ্ছেএঁদের সাদাসিধে বিয়ের অনুষ্ঠান। এর পরে পাত্র ও পাত্রী পক্ষ নিজেদের মধ্যে কোলাকুলি করে আত্মীয়তা স্বীকার করে নেয়।

বিয়ের পরে হয় বিয়ের ভোজ। মুখ্য পদ হচ্ছে গরম ভাত( সড়ে দাকা) এবং মুরগীর মাংস, আর হাঁড়িয়া পান। বিয়ের পরেই নতুন বউ, বরের সঙ্গে শ্বশুর বাড়িতে চলে যায়, দ্বিরাগমনে ফেরে তিনদিন পরে। তখন চলে আরেকপ্রস্ত খাওয়া দাওয়া পর্ব।এঁদের মধ্যে শবদাহ প্রচলিত আছে। চিতার আগুনে মৃতের উদ্দেশ্যে মুগ ও ছোলা উৎসর্গ করা হয়।যিনি মুখাগ্নি করেন, তিনি মার্কিন কাপড়ের কাছা গলায় দেন, হাতে থাকে কুশের আসন। চতুর্থ দিন বা শ্রাদ্ধের দিনে মুন্ডিত মস্তক হয়ে তিনি নিজেই পৌরোহিত্য করেন। সেদিন নিমভাত বা তিতা ভাত খেয়ে অশৌচ শেষ হয়।

মাহালি পরিবারে কোন নতুন শিশু জন্মালে সারা গ্রামে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। জন্মের ২১ দিনের মাথায় হয় জন্ম একুশা। উঠোনের মধ্যে গোবর লেপে একটি জায়গা তৈরি করে, মাঁঁঝি হারাম ও বুড়ি হারামের উপস্থিতিতে বাচ্চাটিকে সেই গোবর নিকানো জায়গায় শুইয়ে রেখে বাচ্চাকে সবাই আশীর্বাদ করেন। এর পরে হয় ভোজ ও হাঁড়িয়া পান।

নানা পরব

সাঁওতালদের মতন মাহালিরাও অত্যন্ত হুল্লোড়ে জাতি। এঁদের প্রধান উৎসব হচ্ছে নবান্ন, হুলি(হোলি) বা ফেঙ্গুয়া পরব এবং দুর্গাপূজা। আশ্চর্য হবেন শুনে যে এঁদের ঘরে ঘরে দুর্গাপূজা হয়। তবে এই গরীব লোকগুলি কিভাবে আর চারদিনের পুজো করবে, তাই নবমীর দিনে প্রতি ঘরে সাধ্যমত পুজো করে, কেউ কেউ বাচ্চা মুরগি বলি দেয়।অর্থাৎ মহালিরা খেরওয়াল সম্প্রদায় থেকে উদ্ভূত হলেও বোঝা যাচ্ছে, বর্তমানে এঁরা হিন্দু সম্প্রদায় ভুক্ত বলেই নিজেদের মনে করেন।

সারা ভারতের অধিকাংশ আদিম জনজাতি কিন্তু মা দুর্গার পূজা করেনা , মা দুর্গা এঁদের প্রিয় রাজা ঘোরাসুর বা মহিষাসুরকে অন্যায় ভাবে বধ করেছেন বলে এঁদের বিশ্বাস। অবশ্য ওদের কথা ব্রাহ্মণ‍্য‍বাদী সংখ্যাগুরু সমাজ অর্থাৎ আমরা শুনতেই চাই না। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র যা হয়- সমাজের ক্ষমতাবান গোষ্ঠী তাদের আধিপত্য দেখিয়ে পরাজিত, দুর্বল গোষ্ঠীর কথা শুনতেই চায় না, বাধ্য করে পরাজিত গোষ্ঠীর ওপর নিজের বিশ্বাস, নিজের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেবার।

মহিষাসুর প্রসঙ্গ

আদিম আদিবাসী-মূলবাসী মানুষদের বিশ্বাস হল, মহিষাসুর ছিলেন তাদের রাজা, এ দেশের রাজা।তাকে অন্যায় ভাবে আশ্বিন মাসে হত্যা করা হয়। তাই আশ্বিন মাসকে খেরওয়াল রা বলে “দা৺শায় মাস” ।দুর্গাপূজার ষষ্ঠীর দিন থেকে দশমীর দিন পর্যন্ত দাসাই পরব পালিত হয়। দাসাই নাচের মাধ্যমে আসলে বীর রাজা মহিষাসুরকে স্মরণ করা হয়। তাই যুদ্ধ নৃত্য হলেও এই নাচের অন্তর নিহিত অর্থ দুঃখের। মহিষাসুর আদিবাসী সমাজে হুদুড় দুর্গা নামে পরিচিত।

হুদূর মানে অমিত বলশালী পুরুষ, আর দুর্গা কিন্তু পুংলিঙ্গ, যিনি দুর্গের রক্ষক।আর এই হুদূর কিন্তু আদিবাসীদের মতে গঙ্গা পুত্র ভীষ্মের মতন কোন নারীর বিরুদ্ধে কখনও অস্ত্র ধরতেন না।তবে মহাদেও বা শিব ঠাকুর কিন্তু এঁদের প্রিয় দেবতা। আদতে শিব ঠাকুর তো এঁদেরই পূজ্য দেব ছিলেন। অনেক পরে চালাক চতুর আর্যরা শিবকে বৈদিক দেবতায় উন্নিত করে।

 মা কালী

মা দুর্গাকে সহ্য না করতে পারলেও, মা কালী কিন্তু অধিকাংশ আদিবাসীদের কাছে পরম প্রিয় পূজ্য দেবী।আদিবাসীদের মধ্যে কালী পুজোর জনপ্রিয়তার কারণ কি। কারণ আদিতে কালী পুজো হচ্ছে অস্ট্রিক জাতি ও অস্ট্রিক সভ্যতার অবদান। তারাপীঠ, কামাখ্যা, কলকাতার কালীঘাট বা বেশির ভাগ শক্তিপীঠ গুলির দেবীর মূল রূপ যদি দর্শন করে থাকেন তবে অবশ্যই দেখেছেন যে বাইরের মুর্তিরূপ নয়, ভিতরে দেবীর আদি রূপ হচ্ছে শিলা। শিলা প্রতীক কিন্তু আর্য সভ্যতার দান নয়, অস্ট্রিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির অবদান।এই তিনটি পুজো বাদ দিলে, অনেক গ্রাম্য দেবতার পুজো হয়, যেমন দশালি পুজো ।

বাঁশ যখন শিল্প-শিল্পীদের কথা

যাদবগঞ্জের মাহালিদের আরেকটি অসাধারণ শিল্পীসত্তার উল্লেখ করছি। ঘুরে ঘুরে ওঁদের নিপুন হাতে তৈরি বাঁশের কাজ দেখছি। মেয়েরা আনমনে কাজ করে চলেছে আর কয়েকজন পুরুষমানুষ আনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজনের গলায় আবার ঝুলছে মাদল। তখন কথা বলে জানলাম যে, মাহালি গ্রামের মানুষগুলি কিন্তু অবসর সময়ে ঝুমুর( ওরা বলে ঝুমোর) গান-নাচ করেন। এঁদের পালা পার্বণে ঝুমুর গান হবেই হবে। শুধু তাই নয়, এঁদের দলের খ্যাতি এতদূর অবধি ছড়িয়ে গেছে যে, বিভিন্ন জায়গায় , এমন কি শান্তিনিকেতনেও এঁরা ঝুমুর গান পরিবেশন করে এসেছেন। ওঁদের ঝুমুর দলের নেতা ম্যানেজার মাহালির কাছে আবদার করা হল, ওঁদের নাচ-গান শুনতে চাই।

আরও পড়ুন- পাশা খেলা নিয়ে ইতিহাস সংস্কৃতি থাকলেও কৌলিন্য থেকে বঞ্চিত

এতক্ষন যে মেয়েগুলি একমনে বাঁশের কাজ করে চলেছিল, তারাও হৈ হৈ করে শাড়ীর আঁচল গুটিয়ে, মাথায় বনফুল ও পাতা গুঁজে নেমে এল ঝুমুরের আসরে। ম্যানেজার তো আছেনই, আছেন ওঁর স্ত্রী লক্ষ্মীমতি, ধামসা বাজাচ্ছে গোসাই, নাচছে ওঁর বউ রাসমণি,সোম মাহালি, আরো অন্তত ১৫/২০ জন মেয়ে। উৎপল বাজাতে শুরু করলেন মাদল, ওঁর বউ রিনা নাচের আসরে। সারাজীবনের মতন এক অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকলাম।

তথ্যসূত্র:- ১) ব্যক্তিগতকৃত সাক্ষাৎকারে শ্রী উৎপল বেসরা ও রীনা মাহালি বেসরা।
২) ব্যক্তিগতকৃত সাক্ষাৎকারে শ্রী কমলাকান্ত জানা।
৩) ব্যক্তিগতকৃত সাক্ষাৎকারে লেখক শ্রী প্রদীপ মুখোপাধ্যায়।
৪)উপকূলীয় দক্ষিণবঙ্গের লোকশিল্প, ১ ম খন্ড । সুদীপ্তা মাইতি।
৫)বাংলার জনজাতি( প্রথম খন্ড) , প্রদ্যোত ঘোষ। পুস্তকবিপনি। কলকাতা।
৬) মাহালী এবং তাঁদের জীবনযাত্রা- দশরথ মুর্মু, রিসার্চ স্কলার, ডিপার্টমেন্ট অফ ফিলোসফি এন্ড কম্পারেটিভ রিলিজিওন, বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন।
৭) বিপন্ন আদিবাসি মাহালি জনজাতি: ফিরে দেখা। চিন্ময় ঘোষ।স্বদেশচর্চা লোক, গোষ্ঠী, সমাজ, সম্প্রদায় ২ । ” লোক পত্রিকা” ।
৮)রাঢ় ভাবনা, সম্পাদক- সৌরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, জুলাই-২০১৯, মাহালি জনজাতি, তিলক পুরকায়স্থ।

 লোকশিল্প নিয়ে কৌলালের একগুচ্ছ ভিডিও তথ্যচিত্র দেখুন


Share your experience
  • 142
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    142
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।