বাস্তু পূজা- পূর্ববাংলায় পৌষসংক্রান্তির অন্যতম লোক উৎসব

Share your experience
  • 587
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    587
    Shares

বাস্তু পূজা- পূর্ববাংলায় পৌষসংক্রান্তির অন্যতম লোক উৎসব। এই পুজোর সঙ্গের জড়িয়ে রয়েছে কুমীর ও কচ্ছপ পুজো। কূর্মসংস্কৃতি শুধু ধর্মরাজপুজোয় নেই রয়েছে বাস্তুপুজোতেও।লিখছেন–ময়ূখ ভৌমিক।

বাস্তু পূজা

বাস্তুপূজা

মকর সংক্রান্তির পুণ্য লগ্নে আপামর ভারতবাসী সমবেত হন পশ্চিবঙ্গের শেষ প্রান্তে অবস্থিত গঙ্গাসাগর সঙ্গমে, আর পূর্ব বঙ্গের হিন্দুরা তখন পালন করেন “বাস্তু পূজা “। বস্তুত কৃষি প্রধান পূর্ববঙ্গের প্রতিটি গৃহস্থ পরিবারে এটি একটি বৃহৎ পর্ব ত। এদিন সমগ্র বঙ্গে পৌষপার্বণ, ঘরে ঘরে পিঠা পুলি পায়েসের সমারোহ, আর তার সাথে সাথে ঘর বাড়ি জমি জায়গার অধিপতি বাস্তুরাজের পূজা।

 বাস্তুরাজ

বাস্তু দেবতার পূজা পৌরাণিক হলেও, পূর্ববঙ্গে প্রচলিত বাস্তুপূজার রীতিতে বহু লৌকিক উপাদানের সন্ধান পাওয়া যায় । বাস্তু দেবতার স্বতন্ত্র পূজা পূর্ববঙ্গ ছাড়া অন্যত্র দেখা যায় না। এটিও একটি লক্ষনীয় বিষয় ।প্রধানত পৌষ সংক্রান্তির দুপুরে পুরোহিত দিয়ে ঘরের বাইরে এই পূজা হয় । তবে কোনো কোনো পরিবারে অতি প্রত্যুষে বাড়ির গৃহিনীরা স্নান সেরে বিনা মন্ত্র এ এই পূজা করেন।

 বাস্তু পূজা পিঠে খাওয়ানো

সেক্ষেত্রে নতুন মাটির কল্কের সাহায্যে বাড়ির উঠানে, বারান্দায়, ঘরের দরজায় চালগুড়ো দিয়ে বেজোর সংখ্যক গোল গোল চিহ্ন দেওয়া হয়। এই গোল বৃত্ত গুলোর ভেতরে সিঁদুর ফোঁটা, ধান দূর্বা ও নতুন পাটালি গুড়, তিলের খাজা, তিলা কদমা, শাঁকালু ইত্যাদি দেওয়া হয় । শেষে উলু ও শঙ্খ ধ্বনি দিয়ে গৃহিনী বাস্তুঠাকুরকে প্রণাম জানান । একে বলে বাস্তু কে পিঠা খাওয়ানো । অনেক পরিবারে গৃহপালিত গরু বাছুর এর গায়েও এই কল্কের ছাপ দেওয়া হয় । অনেক জায়গায় এদিন গরু ছেড়ে দেবার প্রথা আছে ।( অর্থাৎ এদিন গরুকে বেঁধে রাখা নিষেধ )

 কাইঠো কুমীর

যে পরিবারে পুরোহিত দিয়ে পূজা হয়, তাঁদের নিয়ম কিছুটা আলাদা। এক্ষেত্রে বাড়ির উঠানে নির্দিষ্ট জায়গায় একটি মাটির ছোট বেদি করে তার ওপর পাঁচটি বা তিনটি ছোট মাটির গোল্লা করে তার ওপর একটি করে পাটকাঠি গুঁজে দেওয়া হয় । পাটকাঠি গুলো গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানো হয়। এগুলো বাস্তু ও তার সহচরদের প্রতীক lঅনেক পরিবারে এই বেদির দুপাশে মাটির কুমির ও কচ্ছপ গড়ে দেওয়ার রীতি ও দেখা যায়। এগুলো কে” কাইঠো কুমির “বলে । অনেক পরিবারে আবার পাটকাঠির বদলে “জিগা গাছের ডাল ” পুঁতে ও পুজো করা হয় ।

 বাস্তু পূজা চরুপাক

এই পুজোর একটা প্রধান অঙ্গ” চরু পাক “করা, এবং এটা সম্পূর্ণ ভাবে ব্রাহ্মণ পুরোহিত দিয়ে করা কর্তব্য । পূজার জায়গায় একটা মাটির উনুন তৈরী করে তাতে পাটকাঠির জ্বাল এ মিষ্টি ছাড়া পায়েস রান্না করা হয়। একেই চরু বলে । সাধারণত নতুন মাটির হাঁড়ি বা পেতলের মালসায় সোয়া সের দুধ দিয়ে চরু করা হয়। পুরোহিত প্রথমে অগ্নি পুজো করে চরু পাক করেন । একটা কলার মাজ পাতায় সিঁদুর ফোঁটা ও ধান দূর্বা সহ কিছুটা চরু বেড়ে দেওয়া হয় । এর পর যথাবিহিত পৌরাণিক পূজা পদ্ধতি মেনে পূজা সম্পন্ন হয়।বাস্তুদেবের পূজার পর বেদির চার কোনে শঙ্খপাল, বঙ্ক পাল, ক্ষেত্র পাল ও নাগ পাল এর পুজো হয়।এরপর চরু নিবেদন এর শেষে কলা পাতাটি মুড়ে ঘরের পাশে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয় ।

কচ্ছপপুজো বাস্তু পূজা

 বিচিত্র সংস্কৃতি

এই পূজার বিভিন্ন রীতি লক্ষ্য করলে আর্য ও প্রাগার্য্য সংস্কৃতির মিশ্রণ স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায় । খুব সম্ভব দ্রাবিড় জাতি গোষ্ঠীর বিভিন্ন লোকাচার,যেমন চরু পাক করা (আর দক্ষিণ ভারতের পোঙ্গল মোটের ওপর এক,), আর কুমির পুজো(পশ্চিম বঙ্গের নীল পূজা ), কুর্ম বা কচ্ছপ পূজা(ভারতের একমাত্র কুর্ম রূপী বিষ্ণু মন্দিরটি অন্ধ্র প্রদেশে অবস্থিত ), ইত্যাদির সাথে আর্য্য ব্রাহ্মন্য সংস্কৃতির মেল বন্ধনের ফলে এই বিচিত্র পুজোর জন্ম l

 আরও পড়ুন- পৌষপার্বণ– পৌষ আগলানো রাঢ় বাংলার প্রধান শস্য উৎসব

বর্তমানে কচ্ছপ পুজো আলাদা করে কিছু হয় না। কোনো কোনো পরিবারে বাস্তু ঠাকুরের বেদির পাশে একটা মাটির কচ্ছপ এবং বেদির অন্য দিকে একটা মাটির কুমির রাখা থাকে । তবে বেশির ভাগ পরিবারে কচ্ছপ থাকে না, শুধু কুমির থাকে।


Share your experience
  • 587
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    587
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ময়ুখ ভৌমিক

ময়ুখ ভৌমিক
ময়ূখ ভৌমিক।কোচবিহারে থাকেন।হোমিওপাথি চিকিৎসক।নেশা ক্ষেত্রগবেষণা।