বেহালার রায় বাড়ির দুর্গাপুজো–ইতিহাস ঐতিহ্য ও বনেদিয়ানার দৃষ্টান্ত

Share your experience
  • 585
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    585
    Shares

বেহালার রায় বাড়ির দুর্গাপুজো–ইতিহাস ঐতিহ্য ও বনেদিয়ানার দৃষ্টান্ত।১৭৪২ সালে বাংলায় মারাঠা বর্গীদের আক্রমণ শুরু হলে, রায় পরিবারের দেবকীনন্দনের (১৭০০) পুত্র জগৎরাম ও রাজারাম গৃহদেবতাকে সঙ্গে নিয়ে, মারাঠা-খাল পার হয়ে বেহালায় নতুন বসতি স্থাপন করেন। ‘রাজার বাগান’ নামে ৫৬ বিঘা জমি ও কয়েকটি পুষ্করিণী কিনে ভদ্রাসন নির্মাণ করেন ও ঠাকুরদালান নির্মাণ করেন। এই ঠাকুরদালানেই ১৭৫৬ সাল থেকে দুর্গাপুজো শুরু হয়।লিখছেন–শুভদীপ রায় চৌধুরী

দুর্গা--বেহালার রায়পরিবারের
দুর্গা–বেহালার রায়পরিবারের

বেহালার রায় বাড়ির দুর্গাপুজো- ইতিহাস কিংবদন্তী

বেহালা রায় পরিবারের আদিপুরুষ গজেন্দ্র নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ভূমি-রাজস্ব বিভাগের প্রধান সচিব। তাঁকে, ‘রাজা’ এবং ‘রায়চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত করে আদি সপ্তগ্রামের খাজাঞ্চী হিসাবে নিযুক্ত করেন। গজেন্দ্র নারায়ণ তাঁর গৃহদেবতা হিসাবে শ্রীলক্ষ্মী জনার্দনকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং দুর্গাপুজো ও অন্নপূর্ণাপুজোর প্রচলন করেন। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার হালিশহর ও মধ্যমগ্রামে বসবাস শুরু করেন ও দুর্গাপুজো এবং অন্নপূর্ণাপুজো করতে থাকেন।
১৭৪২ সালে বাংলায় মারাঠা বর্গীদের আক্রমণ শুরু হলে, রায় পরিবারের দেবকীনন্দনের (১৭০০) পুত্র জগৎরাম ও রাজারাম গৃহদেবতাকে সঙ্গে নিয়ে, মারাঠা-খাল পার হয়ে বেহালায় নতুন বসতি স্থাপন করেন। ‘রাজার বাগান’ নামে ৫৬ বিঘা জমি ও কয়েকটি পুষ্করিণী কিনে ভদ্রাসন নির্মাণ করেন ও ঠাকুরদালান নির্মাণ করেন। এই ঠাকুরদালানেই ১৭৫৬ সাল থেকে দুর্গাপুজো শুরু হয়।

বেহালার রায় বাড়ির দুর্গাপুজো–রায়বাহাদুর অম্বিকাচরণ রায়

জগৎরাম রায়ের পুত্র দুর্গাপ্রসাদ রায় স্বল্পায়ু ছিলেন, তাঁর পাঁচপুত্র- ভগবতীচরণ যিনি জজ্ হন, অভয়াচরণ, অম্বিকাচরণ, গৌরীচরণ ও রামাচরণ। বলাবাহুল্য কনিষ্ঠপুত্র রামাচরণ রায়ের ভাগে পুরানো জমিদারি ও অন্নপূর্ণা পুজোর দায়িত্ব আসে।
এই পরিবারের কৃতি পুরুষ ছিলেন রায়বাহাদুর অম্বিকাচরণ রায়, বিভিন্ন ভাষাবিদ অম্বিকাচরণ তৎকালীন কলকাতার উচ্চ আদালতে ব্রিটিশ বিচারপতিকে, আরবী, ফার্সী ও অন্যান্য ভাষায় লিখিত আইনের তর্জমা করে সাহায্য করতেন। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতির নিজেস্ব রীতিনীতি ও আইন প্রনয়নের ক্ষেত্রেও সহায়তা করতেন, তৎকালীন চিফজাস্টিস তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করে রানী ভিক্টোরিয়াকে চিঠি লিখেছিলেন। এতটাই খ্যাতি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন রায় বংশের অম্বিকাচরণ। বিদ্যাসাগরের সাথে তাঁর বিশেষ হৃদ্যতা ছিল, স্ত্রী শিক্ষার ব্যাপারে তিনি অগ্রণী ছিলেন এবং বলাবাহুল্য তিনি বিধবাবিবাহ আইনের পক্ষে দ্বিতীয় সই করেছিলেন। প্রথম সই করিয়েছিলেন নিজের জামাইকে দিয়ে।

রায়বাহাদুর অম্বিকাচরণ নিজের যোগ্যতায় প্রভূত সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন এবং পুরানো ভদ্রাসনের কাছেই নতুন বাসভবন ‘অম্বিকা মন্দির’ নির্মাণ করেছিলেন। পারিবারিক দুর্গাপুজোর ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, সমস্ত ভ্রাতার উপস্থিতিতে দুর্গাপুজো হত জগৎরাম রায়ের ভদ্রাসনের ঠাকুরদালানে। রায়বাহাদুর ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন, তাই তাঁর বিপুল সম্পত্তির সিংহভাগই কুলদেবতা শ্রীলক্ষ্মী জনার্দন, শ্রীদুর্গা ও শ্রীজগদ্ধাত্রীদেবীর নামে অর্পণ করে যান।

বেহালার রায় বাড়ির দুর্গাপুজো-সুরেন্দ্রভবন

অম্বিকাচরণ রায়ের চারপুত্রই কৃতি পুরুষ ছিলেন রায় বাড়ির। জ্যেষ্ঠপুত্র শ্রী সুরেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের মেম্বার। শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের আইনজীবী, অমরেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল ও কনিষ্ঠপুত্র শ্রী সৌরেন্দনাথ রায় ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। বংশবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে, ১৯০৫সালে সুরেন্দ্রনাথ পৃথক বাসভবন নির্মাণ করেন। ঠাকুরদালান সহ বিরাট গৃহটির নাম হন সুরেন্দ্রভবন।

বেহালার রায় বাড়ির দুর্গাপুজো-অমরেন্দ্রভবন

১৯২৫সালের মধ্যে সত্যেন্দ্রভবন ও ১৯৩০সালে অমরেন্দ্রভবন নির্মিত হয়। এঁরা প্রতিবছর পালা করে দুর্গাপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজো করতেন। অমরেন্দ্রভবনে ১৯৩০থেকে চারবছর অন্তর পুজো হত, তাঁর পুত্র শৈলেন্দ্রনাথ রায়ের আমলে বিভিন্ন কারণে অন্যান্য গৃহে পালার পুজোয় বিঘ্ন ঘটায় আশঙ্কা করে ১৯৭৬সাল থেকে প্রতিবছর পুজো করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে শৈলেন্দ্রনাথ রায়ের দুইপুত্র শ্রী সুবীর রায় ও শ্রী গৌতম রায় নিষ্ঠার সাথে প্রতিবছর দুর্গাপুজো ও জগদ্ধাত্রীপুজো করে আসছেন।

 জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোপুজো   

    
বেহালা রায় বাড়ির দুর্গাপুজো শুরু হয় জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে, তারপরই নিষ্ঠার সাথে মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ শুরু হয়ে যায়। সাবেকী একচালার প্রতিমা তৈরি করেন কুমোরটুলির বিখ্যাত শিল্পী মীনাক্ষী পাল। দুর্গাপুজোর সপ্তমী থেকে মহানবমী পর্যন্ত সন্ধ্যারতির পর প্রতিদিন ৫০০০ চন্দ্রপুলি তৈরি করে দেবীকে নিবেদন করে ভক্তদের বিতরণ করা হয় তবে বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে সেই প্রথা হয়তো এবছর বন্ধ থাকতে পারে বলেই মনে করছেন পরিবারের সদস্য শ্রী গৌতম রায় মহাশয়।

বেহালার রায় বাড়ির দুর্গাপুজো-কালিকাপুরাণ

এই বাড়িতে পুজো শুরু হয় প্রতিপদতিথিতে বোধনের মাধ্যমে। এই বাড়ির পুজো হয় কালিকাপুরাণ মতে। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন নবপত্রিকার স্নানপর্ব হয় বিভিন্ন পবিত্র তীর্থের জল সংগ্রহ করে রাখা হয় সেই জল দিয়ে স্নান করানো হয় নবপত্রিকাকে। সপ্তমীর দিন ১টি কুমড়ো বলি হয়, মহাষ্টমীর দিন দুটি কুমড়ো বলিদান হয়। সন্ধিপূজাতে দেবীকে ১০৮টি পদ্ম ও ১০৮টি প্রদীপ নিবেদন করা হয় এবং ১টি কুমড়ো বলিদান হয়। মহানবমীর দিন ৯টি প্রতীকী বলিদান হয়।

 ভোগমালা

এই বাড়ির পুজোয় প্রতিপদ থেকে পঞ্চমী অবধি পোলাও, পায়েস ভোগ নিবেদন হয়। ষষ্ঠীর দিন ভোগে থাকে কচুরীভোগ, সপ্তমী থেকে মহানবমী পর্যন্ত দুই রকমের ভোগ নিবেদন করা হয়। দুপুরবেলা প্রথমে খিচুড়িভোগ, নানান রকমের ভাজা, তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। তারপর সাদাভাত, শুক্তনি, ডাল, ভাজা, তরকারি, চাটনি, পায়েস এবং সঙ্গে আলাদা করে দুই রকমের মাছভোগও দেওয়া হয় দেবীকে। দশমীর দিন পান্তাভোগ, ইলিশমাছ, এঁচড়ের ডালনা, পায়েস, চাটনি, ক্ষীর, সন্দেশ, রাবড়ি ইত্যাদি নানান পদে ভোগ দেওয়া হয় রায় বাড়ির দেবীকে।

বেহালার রায় বাড়ির দুর্গাপুজো-ঐতিহ্য ও সাবেকিয়ানা

পুজোর প্রতিটি দিন সন্ধ্যাবেলায় লুচিভোগ হয়, সাথে থাকে ভাজা, তরকারি, বিভিন্ন মিষ্টি ইত্যাদি। সেই সাবেকী রীতি মেনে আজও ভোগ দেওয়া হয় রায় পরিবারে। দশমীতে অঞ্জলির রীতি এই বাড়িতে একটু আলাদা, অর্থাৎ পুরোহিতমশাই মন্ত্রপাঠ করতে করতে দেবীকে প্রদক্ষিণ করেন সাথে সাথে পরিবারের সকলেই প্রদক্ষিণ করেন দেবীস্তব। তারপর সন্ধ্যায় বাড়ির প্রতিষ্ঠিত পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন হয় এবং একবছরের মতন শারদীয়া পুজোর সমাপ্তি ঘটে রায় পরিবারে, আবার পরের বছরের অপেক্ষা শুরু হয়। বিসর্জনের পর ঘটে জলের সাথে ডাবটিকে তুলে আনা হয়। তিন দিন ডাবটি বাড়িতেই থাকে।

আরও পড়ুন –অর্ধ কালীদুর্গা রূপের বিচিত্র পুজো হয় সুভাষগ্রামের ঘোষবাড়িতে

সন্ধ্যাবেলা নারায়ণ পুজো ও আরতির পর শান্তিরজল দেওয়া হয়। সেই সময় ওই ডাবটি বাড়ির যিনি বয়ঃজ্যেষ্ঠ তিনি কনিষ্ঠের হাতে তুলে দেন। শুরু হয় কোলাকুলি ও প্রণামের পালা। এই ভাবে ঐতিহ্যের সাথে আজও পুজো করে আসছেন রায় বাড়ির সদস্যরা।

বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো নিয়ে কৌলালের একগুচ্ছ তথ্যচিত্র দেখুন


Share your experience
  • 585
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    585
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ রায় চৌধুরী

শুভদীপ রায় চৌধুরী
শুভদীপ রায় চৌধুরী, ১২বছর দক্ষিণ কলকাতার স্বনামখ্যাত বিদ্যালয় "বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়" থেকে পড়ার পর উত্তর কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে স্নাতক এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর, বিশেষ বিষয় ছিল-ভারতের আধুনিক ইতিহাস। তাছাড়া ২০১৬সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে স্বতন্ত্র গবেষণায় যুক্ত। বর্তমানে বহু পত্রিকায় যুক্ত স্বতন্ত্র লেখায়, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে নয় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখার কাজেও যুক্ত। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের ৩৬তম বংশধর