মায়াপুর না নবদ্বীপ ? কোথায় শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থান ?

Share your experience
  • 30
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    30
    Shares

রিয়া দাস

আজকের নবদ্বীপ একসময় ‘ বাংলার অক্সফোর্ড ‘ নামে পরিচিত ছিল। তৎকালে বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃত চর্চার অন্যতম পীঠস্থান ছিল এই নবদ্বীপ। নবদ্বীপ শহরটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত এবং ১৮৬৯ খ্রিঃ প্রতিষ্ঠিত হয় অন্যতম প্রাচীন নবদ্বীপ পৌরসভা। ভাগীরথী ও জলঙ্গী নদীর মিলনস্থলের একপাশে রয়েছে যেমন নবদ্বীপ, তেমনি অপরপাশে মায়াপুর শহর। বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম পীঠস্থান নবদ্বীপের প্রতিটি আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে অগণিত মঠ-মন্দির। একইসঙ্গে সমগ্ৰ শহর জুড়ে রয়েছে শুধুই মহাপ্রভুর স্মৃতি বিজড়িত মধুর ইতিহাস।’ইতিহাস’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিভিন্ন রাজা-বাদশা, এবং যুদ্ধবিগ্ৰহের চিত্র। নবদ্বীপ শহরের ইতিহাসটা যেন একটু ভিন্ন ভাবেই রচিত করে গেছেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব। যে ইতিহাসে যুদ্ধবিগ্ৰহ নয়, আছে শুধু অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ভক্তির কথা।

এতক্ষণ ধরে নবদ্বীপ সম্পর্কে এত কিছু বলার মূল কারণ হল, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের প্রকৃত জন্মস্থান কোনটি– নবদ্বীপ না মায়াপুর ? তার যুক্তিপূর্ণ অনুসন্ধান। আলোচনার প্রারম্ভেই আমরা বলতে চাই………. নবদ্বীপের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা খুবই কঠিন এবং স্পর্শকাতর বিষয়ও……তাই নবদ্বীপ সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে আমরা অনেক তথ্য জেনে তবেই সেটিকে প্রকাশ করার প্রয়াস করছি……।

  শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী  এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার বলে মনে করেন। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে পরম সত্ত্বার পূজা প্রচার করেন এবং জাতি- বর্ণ নির্বিশেষে আচন্ডাল ব্রাহ্মণের কাছে ‘হরিনাম’ মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন ,” চন্ডালহোপি  দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ”। অর্থাৎ একজন সাধারণ চন্ডালও “দ্বিজ” অর্থাৎ ব্রাহ্মণের থেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারেন , যদি তিনি হরিভক্তি পরায়ণ হন।

চৈতন্যদেবের পিতা-মাতা জগন্নাথ মিশ্র ও অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন পূর্ব বাংলার শ্রীহট্টের ঢাকা দক্ষিণ শহরের ( অধুনা সিলেট, বাংলাদেশ) আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্ট থেকে দক্ষিণবঙ্গের নবদ্বীপের অধ্যয়ন ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য এসে বসতি স্থাপন করেন।

“ভজ নিতাই গৌর রাধে শ্যাম। জপ হরে কৃষ্ণ হরে রাম।।”

এবার আমরা প্রবেশ করছি আলোচনার মূল পর্বে অর্থাৎ বহু বিতর্কিত মহাপ্রভুর প্রকৃত জন্মস্থান প্রসঙ্গে। প্রচলিত মত অনুযায়ী ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি (২৩ শে ফাল্গুন, ১৪০৭ শকাব্দ) দোল পূর্ণিমার রাত্রিতে  চন্দ্রগ্রহণের সময় নদীয়া নবদ্বীপের অন্তর্গত প্রাচীন মায়াপুরে চৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হন।

কিন্তু কেউ কেউ এই প্রচলিত মত মানতে রাজি নন । তাঁদের দাবি চৈতন্যদেব নবদ্বীপ নয়,  গঙ্গার অপরপারে অবস্থিত মায়াপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর এখান থেকেই বিতর্কের মূল সূত্রপাত।কথামৃতে আছে,একবার শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর শিষ্য ও ভক্তদের নিয়ে নবদ্বীপ দর্শনে গিয়েছিলেন। তাঁর ও ইচ্ছা ছিল চৈতন্যদেবের জন্মস্থান দর্শন। কিন্তু নবদ্বীপে তিনি তা খুঁজে পাননি।নৌকা করে মায়াপুরের দিকে যেতে মাঝ ভাগীরথীতে  তিনি দিব্যজ্ঞানে দেখতে পান, চৈতন্য মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দ মহাপ্রভু রথে করে ওপর থেকে নেমে আসছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ আর এগোতে চান নি; ঘাটে নৌকা ভেড়াতে বলেন। কথামৃতে শুধু এই টুকুই উল্লেখ আছে। তাহলে কি চৈতন্যদেবের জন্মস্থান বাবিকে ভাগীরথীতে হারিয়ে গিয়েছে ? তবে বেশিরভাগ গ্রন্থতেই নবদ্বীপের কথাই উল্লেখ আছে। নবদ্বীপে প্রাচীন মায়াপুর মহাপ্রভুর জন্মস্থান যা বর্তমানে নদীগর্ভে চলে গেছে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত নরহরি চক্রবর্তীর”ভক্তিরত্নাকর”নামক গ্রন্থে প্রথম মায়াপুরের উল্লেখ পাওয়া যায়। শাস্ত্র মতে ভগবানের আবির্ভাব স্থানকে যোগপীঠ বলা হয়। সুতরাং নরহরি চক্রবর্তীর  মতে, মায়াপুরই(প্রাচীন) শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান।”ভক্তিরত্নাকর”গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনাবলীর ঐতিহাসিকতা বৈষ্ণব ও পন্ডিত সমাজের বিশেষ অনুমোদিত।প্রাচীন নবদ্বীপ এর অন্তর্গত মায়াপুর পল্লীই যে শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান সেই সম্বন্ধে আরও বহু প্রমাণ পাওয়া যায়।

অনেকের মতে,বর্তমান প্রাচীন মায়াপুর মহাপ্রভুর জন্ম গ্রহণ করেন এবং অনেকে এটাও বলেন মন্দির সংলগ্ন যে নিম বৃক্ষটি বর্তমানে আছে তার নীচেই চৈতন্যদেব জন্মগ্রহণ করেন……. কিন্তু ঐতিহাসিকদের মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। এর যুক্তি হল যে নিমবৃক্ষটির কথা এখন নিমাই এর জন্মস্থান হিসেবে চিহ্নিত….. সেটির বয়স ৫৩৩ বছর হওয়ায় স্বপক্ষে কোন বাস্তব যুক্তি নেই। (নবদ্বীপের ইতিবৃত্ত (মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল)।

তবে নবদ্বীপ ধাম ইযে চৈতন্যদেবের জন্মস্থান এ প্রসঙ্গে শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মভূমি নবদ্বীপ ধাম এসে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের সহ-সভাপতি স্বামী সুহিতানন্দজী মহারাজ বলেন শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থান এপার অর্থাৎ বর্তমান নবদ্বীপ ধাম, ওপার নিয়ে বিতর্ক করার কোন সরবত্তা নেই। শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান যে এই নবদ্বীপ ধাম তা পরম পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজেই নবদ্বীপ ধাম এসে আত্ম উপলব্ধি করে গেছেন। তাঁর এই আত্ম  উপলব্ধি কখনোই মিথ্যা হতে পারে না।

ভক্তিবিনোদ ঠাকুর প্রভুপাদ ভক্তিরত্নাকরের সূত্র অবলম্বনে সিমলিয়ার দক্ষিণে একটি স্থান মায়াপুর নামে চিহ্নিত করেন, তখন এই স্থানটিকে মিঞাপুর নামে একটি মুসলমান পল্লীর অবস্থান ছিল। পন্ডিতের মতে, মায়াপুর নামটি এসেছে মিঞাপুর থেকে, কেউ কেউ এই মায়াপুরকেই আবার চৈতন্যদেবের জন্মস্থান বলে দাবি করেছেন। তাঁদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই জানাই যে, সতর্কতার সঙ্গে চৈতন্য জীবনী গ্রন্থগুলি পাঠ করলেই জানা যায়, কাজি দলনের দিন চৈতন্যদেব নিজ গৃহ হতে গঙ্গা তীর বরাবর কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর গঙ্গাতীর ত্যাগ করে গঙ্গানগর গ্রামের উপর দিয়ে সিমলিয়া গিয়ে ছিলেন। কাজী দমনের পর দক্ষিণে অবস্থিত শূদ্র- পল্লী ভ্রমন করে তিনি সাদী গাছা-পার ডাঙ্গা হয়ে নগরে ফিরেছিলেন।

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে অঙ্কিত রেভিনিউ সার্ভের মানচিত্রে গঙ্গানগরের অবস্থান চিহ্নিত আছে। আসলে চৈতন্য আমলে গঙ্গা নবদ্বীপের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে প্রবাহিত ছিল। মায়াপুরের পাশে গঙ্গা প্রবাহিত ছিল না।এখন যে স্থানটিকে মায়াপুর বলা হচ্ছে সে যুগে এই স্থানটি ছিল কাজীর বাড়ির দক্ষিণে মূলত শূদ্র-পল্লি , ব্রাহ্মণ-পল্লি নয়। সুতরাং বর্তমান মায়াপুরে চৈতন্যদেবের জন্মস্থান ছিল এ কথা ভাবার পেছনে কোনও ঐতিহাসিক সত্যতা নেই।

তাহলে মহাপ্রভুর জন্মস্থান কোথায়? সেই বিষয়েই আজ আমাদের আলোচনা….১৭৬২ খ্রিঃ ২রা এপ্রিল প্রলয়ঙ্কর ভূমিকম্পে নবদ্বীপ নগরী ধ্বংস হয়ে যায়…. এর ফলে মহানগরের মানচিত্রে অনেক পরিবর্তন আসে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্লাবন হত। ১৮৬৯খ্রিঃ পৌরসভা স্থাপিত হওয়ার পর ভূকৈলাশের রানী তারা সুন্দরী দেবীর অর্থানুকূল্যে গাবতলার  কাছে এই কারণে কয়েকটি বাঁধও নির্মিত হয় ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে…..।শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আমলে গঙ্গা যে পথে প্রবাহিত ছিল পরবর্তীকালে নদীপথের পরিবর্তন ঘটে……শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থানে দেওয়ান গঙ্গা- গোবিন্দ সিংহের প্রাচীন পাথরের মন্দিরটি গঙ্গা গর্ভে তলিয়ে যায়। তাই ঐতিহাসিকদের মতে,শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপের  যেই স্থানে জন্মেছিলেন, সেই স্থানটি এখন গঙ্গা-বক্ষে মিলিয়ে গেছে।

তথ্যসূত্রঃ

১/বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খন্ড, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স।

২/নবদ্বীপের ইতিবৃত্ত, পাতা-১১২, ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থ, উইকিপিডিয়া।

৩/নবদ্বীপের ইতিবৃত্ত-মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল।

৪/Chaitanya Bhagavata Adi-khanda1..122

৫/Chaitanya Bhagavata.Madhya khanda 24.

বিশেষ সৌজন্য–নবদ্বীপ রয়েল সোসাইটি

ছবি-লেখক

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 30
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    30
    Shares

Facebook Comments

Post Author: রিয়া দাস

রিয়া দাস
রিয়া দাস।ইতিহাসে স্নাতকোত্তরে পাঠরত।ক্ষেত্রসমীক্ষক।