ব্ল্যাক ডোকরাশিল্প আজও টিকে আছে উড়িষ্যার বারাখামায়

Share your experience
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

ডা.তিলক পুরকায়স্থঃশিল্পগ্রাম  উড়িষ্যার কন্ধমাল জেলার বারাখামা  ডোকরা/ঢোকরা গ্রাম। এখানে পৌঁছাতে গেলে প্রথমে আসতে হবে দারিংবাড়ি।দারিংবাড়ির অবস্থান কন্ধমাল জেলায়। এই সেদিন ১৯৯৪ সালে, ফুলবনি জেলা থেকে বিভক্ত করে এই জেলার সৃষ্টি। প্রায় পুরো জেলাটাই বর্ষাবন । তবে জেলাটি কিন্তু বিশাল, আট হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি এর আয়তন। সেই তুলনায় লোকসংখ্যা খুব কম।উড়িষ্যার এই জঙ্গলমহল আগে বিভিন্ন করদ রাজাদের জায়গা ছিল।আমার প্রিয় লেখক বুদ্ধদেব গুহর লেখায় অনেক বার এসেছে এখানকার বিখ্যাত জায়গাগুলি যেমন ফুলবনী, বালিগুদা, রাইকিয়া ইত্যাদি।

পুরো জেলাতেই আদিম জনজাতি কন্ধরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর আছে ১৭% খ্রিস্টান পানাস জনজাতি। কন্ধরা নিজস্ব ধর্মাচরণের অঙ্গ হিসাবে আদিবাসী দেবতার পুজো অর্চনা এবং বিভিন্ন উৎসব পালন করে। এঁদের দেবতার নামের সঙ্গে ‘পেনু’ শব্দ যুক্ত থাকে, যেমন দারনি(ধরণী) পেনু, সারু পেনু ইত্যাদি। আর উৎসবের নামের সঙ্গে যুক্ত ‘লাকা’ শব্দটি।যেমন ফসল কাটার উৎসব ‘সিসা লাকা’, মহুয়া ফুলের উৎসব ‘মারাঙ্গা লাকা”, আম খাবার উৎসব ‘কেঁদু লাকা’ ইত্যাদি।অর্থাৎ দেবতাকে উৎসর্গ না করে এরা আম খায় না, মহুয়া ফুল কুড়োয় না এমন কি ফসল ও কাটেনা। এঁদের মধ্যে যাঁরা একসঙ্গে দুইসারি মুখোমুখি কুটির বানিয়ে বসবাস করে, তাঁদের বলে কুটিয়া কন্ধ। সামনে একসারি টানা বারান্দা, টানা ছাদ, খালি পার্টিশন দেওয়াল, দুটি ঘরকে আলাদা করে।

কন্ধদের বিশ্বাস তাঁদের আদিমাতা হচ্ছেন ধরিত্রী দেবী বা ‘দারনি’/টানা’ পেনু এবং পিতা হচ্ছেন পর্বত দেবতা ‘সারু পেনু’।জানেন কিনা জানিনা , প্রায় দুশো বছর আগে এদের মধ্যে কিছুদিনের জন্য নরবলি প্রথা চালু ছিল, (যাকে বলত মেরিয়া) যা ব্রিটিশরা শক্ত হাতে বন্ধ করে। এটা নিয়ে কন্ধজাতির মধ্যে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। আদিতে কন্ধরা কুমড়ো, কলা ইত্যাদি ক্ষেতের ফসল বলি দিত তাঁদের পেনু দেবতাকে। দারনি বা ধরণী পেনুর পুজো হতো মেরিয়া খুঁটি বা দণ্ডের নিচে রাখা তিনটি প্রস্তর খন্ডকে। এই নিয়ে প্রচলিত রয়েছে লোককথা। একদা পুজোর সময় বাঁশের খোঁচা লেগে একটি বাচ্চা ছেলের আঙ্গুল কেটে কয়েক ফোঁটা রক্ত পরে দারনি পেনুর পাথরখন্ডে , এবং বাচ্চাটি কিছুক্ষণ পড়ে মারা যায়। পুরোহিত নিদান দেন, পেনু নররক্ত চান। বর্তমানে তরিতরকারি এবং কখনও কখনও মহিষ বা ভেড়া বলি দেওয়া হয়।

দারিংবাড়ি থেকে রাস্তা গেছে – সুদূর ওড়িশার উপজাতি অধ্যুষিত কন্ধমাল জেলার বারাখামা ঢোকরা গ্রামে।   এখানকার শিল্পীদের নির্মিত ব্ল্যাক ডোকরা শিল্পকলা দেখলে হতভম্ব হয়ে যেতে হয়। অথচ দুঃখের কথা, কজন বাঙালি এই চমকপ্রদ ব্ল্যাক ঢোকরা মূর্তি নিয়ে অবহিত, সন্দেহ আছে।

শিল্পগ্রামে ঢুকতেই একজন শিল্পীর সঙ্গে আলাপ হোল।  নাম শ্রীবুনু নায়েক, একজন ব্ল্যাক ডোকরা শিল্পী।ইনি এমন এক শিল্পী যার ঝোলাতে আছে অসংখ্য পুরস্কার , যেমন ২০০৪ সালে কলিঙ্গ পুরস্কার, ২০০৭ এ এক্সেলেন্ট হান্ডিক্রাফট এওয়ার্ড, ২০১৬ তে ওড়িশা কলা বিমর্শ পুরস্কার এবং আরো কত কত।এরকম একটা পুরস্কার পেলেই আমরা বুদ্ধিজীবী বনে গিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতাম! আর এই নিরহংকারী ,গরিব ,অসাধারণ শিল্পী কি বললেন জানেন ?

—-আমার ব্ল্যাক ডোকরা শিল্প ও শিল্পীদের নিয়ে আগ্রহ ওনার খুব ভালো লেগেছে।

 

বারাখামা ঢোকরা গ্রামের এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানকার শিল্পীদের দ্বারা নির্মিত ব্ল্যাক ডোকরা মূর্তি। ডোকরা শিল্প তৈরিতে যেমন শুধু পুরানো পিতল ব্যাবহার করা হয়, ব্ল্যাক ঢোকরা মূর্তি তৈরিতে কিন্তু পিতল ছাড়াও পুরানো কাঁসা ব্যবহৃত হয়। ব্ল্যাক ঢোকরা মূর্তি কখনও ফাঁপা  হয় না, সলিড ধাতুর তৈরি, তাই এর ওজন ও বেশি হয়।এগুলিকে হাতের ব্রাশ বা বাফিং মেশিন দ্বারা পালিশ করা হয়না। তাই এই মূর্তিগুলির রঙ কালো বা কালচে হয়ে।কন্ধমাল জেলার উপজাতিরা মুখ্যত কন্ধমাল হলেও এখানকার ঢোকরা শিল্পীরা কিন্তু ঘাসি উপজাতির। পুরুষানুক্রমে এরা ব্ল্যাক এবং সোনা রঙের সাইনিং ডোকরা মূর্তি বানিয়ে চলেছে।অত্যন্ত দরিদ্র, অনেকেই চাষ বাস, গবাদি পশুপালন করে জীবনধারণ করছেন। সুখের কথা, একটি এনজিও সংস্থা দরবার সাহিত্য সংসদ ও টাটা ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ৫০টি পরিবারের জন্য শিল্পগ্রাম।বুনু নায়েক, লক্ষ্মণ নায়েক ইত্যাদি পুরস্কৃত শিল্পীদের হাত ধরে ভারতবর্ষের একমাত্র ব্ল্যাক ডোকরা শিল্পগ্রাম লড়াই করছে বেঁচে থাকার জন্য, শিল্প ও শিল্পীর হৃতসন্মান ফিরিয়ে আনার জন্য।

ছবি- লেখক।তথ্যসূত্র:উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য

 


Share your experience
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।