পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থান ১ – বহুলা

Share your experience
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

দেবী বহুলা ও অষ্টভূজ গণেশ

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

ভূমিকা

পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থানগুলির আলোচনা শুরু করার আগে যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হল কি সিকোয়েন্সে পীঠস্থানগুলির আলোচনা করা উচিত। জনপ্রিয়তা কোনও মাপকাঠি হতে পারে না, কারন যে জায়গাগুলিতে সহজেই যাওয়া যায় বা যাদের অবস্থান বড় শহরের কাছে, সহজ বুদ্ধিতে বলে সেগুলিরই বেশি জনপ্রিয় হওয়ার কথা এবং হয়ও তাই। জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে কলকাতার কালীঘাট (কলকাতার কালীঘাট এই কারনে বলা হল যে আর একটি কালীঘাট বা কালীপীঠ আছে নদীয়া জেলার জুরানপুরে যার কথা স্থানীয় অধিবাসীরা ছাড়া বাইরের খুব বেশি লোক জানেন না) অবশ্যই শীর্ষস্থানে থাকবে, অথচ পীঠস্থানের কোনও সর্বগ্রাহ্য তালিকাতেই এটি পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থানগুলির মধ্যে প্রথম স্থানে নেই।

তাহলে কোন মাপকাঠিটি ব্যবহার করা উচিত?অ্যালফাবেটিকাল সিরিজ হতে পারে, কিন্তু এটা তো ঠিক স্কুলের স্টুডেন্ট রেজিস্ট্রার নয় যে পীঠস্থানগুলিকে অ্যালফাবেটিকাল সিরিজে সাজাতে হবে। তাহলে?

তাহলে হাতে রইল সেই ক্লাসিক তালিকাগুলি, প্রথমেই আমরা যার আলোচনা করেছি। ভালো কথা, কিন্তু ঐ তিনটি তালিকার মধ্যে আমরা কোনটা ধরে এগোবো? তিনটির মধ্যে তো মিল নেই। সহজ বুদ্ধিতে এবং Law of Heuristics অনুযায়ী প্রচলিত তালিকাটিকেই এখানে নেওয়া হল, যদিও এই সিলেকশনটি সম্পূর্ণভাবেই যাকে বলে এমপেরিকাল।

যাই হোক, আমরা প্রচলিত তালিকাটি ধরেই এগোব, এবং এই তালিকায়পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থানগুলির মধ্যে এক নম্বরে (সম্পূর্ণ তালিকায় ১২ নম্বরে) আছে বহুলা। অতএব, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থানের সন্ধান শুরু হচ্ছে বহুলা দিয়ে।

বহুলা নাটমন্দির কেতুগ্রাম

বহুলা : পীঠস্থানের তালিকায় অবস্থান

ক) প্রচলিত তালিকা (ক্রমিক সংখ্যা এই তালিকায় যেমন আছে) :-

ক্রমিকসংখ্যা – পীঠস্থান ——————— দেহাংশ ———————— দেবী ———————– ভৈরব

১২ —    বহুলা ———————-          বাম বাহু          ———————   বহুলা —————————–ভীরুক

খ) তন্ত্রচূড়ামণির তালিকা  (ক্রমিক সংখ্যা এই তালিকায় যেমন আছে) :-

১২ —    বহুলা ———————-          বাম বাহু          ———————   বহুলা —————————–ভীরুক

গ) শিবচরিত (ক্রমিক সংখ্যা এই তালিকায় যেমন আছে) :-

২৮ ———— বহুলা ———————– বাম বাহু —————– বহুলা ——————— ভীরুক

এখানে দেখা যাচ্ছে যে তিনটি প্রামান্য তালিকার দুটিতে (প্রচলিত ও তন্ত্রচূড়ামণি) বহুলার ক্রমিক সংখ্যা, পীঠস্থানের নাম, সতীর দেহাংশ, অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম ও ভৈরবের নাম একই, অর্থাৎ অন্য ভাষায় এই তালিকা দুটি এখানে ম্যাচ করছে। তৃতীয় তালিকা (শিবচরিত) ক্রমিক সংখ্যা আলাদা, বাকি প্যারামিটারগুলি ম্যাচ করছে।

এই তথ্যজ্ঞানকে হাতে নিয়ে এবার চলুন বহুলা যাওয়া যাক।

বহুলাক্ষীমন্দির

কোথায়?

বহুলা তীর্থপূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার কাছে কেতুগ্রামে অবস্থিত।কেতুগ্রাম একটি ছোট শহর এবং কেতুগ্রাম ব্লকের হেড কোয়ার্টার্স। কাটোয়া থেকে কেতুগ্রামের দূরত্ব কমবেশি ১৫ কিলোমিটার। প্রাচীনকালে এই কেতুগ্রামের নাম ছিল বহুলা বা বেহুলা। বহুলায় তিনটি প্রামান্য তালিকা মতেই দেবীর বাম বাহু পড়েছিল। তবে এখানকার পীঠস্থানটি নিয়ে বিতর্ক আছে।

বহুলা পীঠস্থানের বিতর্ক

বহুলা দেবীর যে মন্দিরটি এখন আমরা দেখি (যাতে দেবী বহুলার মূর্তি আছে), সেটি ছাড়াও কেতুগ্রামে আর একটি “পীঠস্থান” আছে। গ্রামের বাইরে শ্মশানের কাছে ঈশানী নদীর ধারে একটি মন্দিরে দেবীর ঘট পূজা করা হয়। এই মন্দিরটির নাম “মরাঘাট মহাপীঠ” এবং অনেকের মতে এটিই প্রকৃত বহুলা পীঠ। আবার অনেকে বলেন এই মন্দিরে অধিষ্ঠিতা দেবী বহুলা নন, বহুলাক্ষী এবং এটি স্বতন্ত্র একটি পীঠস্থান – এখানে দেবীর ডান কনুই পড়েছিল (শিবচরিত অনুসারে যেখানে দেবীর ডান কনুই পড়েছিল, সে জায়গাটির নাম রণখণ্ড, দেবী বহুলাক্ষী ও ভৈরব ভীরুক এবং পীঠস্থানের তালিকায় তার ক্রমিক সংখ্যা ২৭)। যাঁরা বলেন বহুলাক্ষী একটি আলাদা পীঠস্থান, তাঁরা ঈশানী নদীর তীরে এই জায়গাটির নাম প্রাচীনকালে রণখণ্ডই ছিল এমন দাবী করেন।

এই বিতর্ক মেটাতে আবার কেউ কেউ বলেন কেতুগ্রাম একটি যুগ্মপীঠ, এখানে দেবী বহুলা এবং বহুলাক্ষী দুজনেই আছেন। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, ভীরুক ভৈরব কিন্তু কেতুগ্রামে নেই, তিনি আছেন কিছুদূরে শ্রীখণ্ড গ্রামে ভূতনাথ শিবলিঙ্গ রূপে। ভূতনাথের প্রণামমন্ত্র হল :

“ওঁ ভীরুকায় ভূতনাথ নাম ধারিনে।

বহুলাক্ষী ভৈরবায় সদা শ্রীখণ্ড বাসিনে।”

এখানে লক্ষ্যণীয় দেবীর নাম “বহুলা” না বলে “বহুলাক্ষী” বলা হয়েছে।শিবচরিতের পীঠস্থানের তালিকায় ২৭ নম্বরে দেবী বহুলাক্ষী ও ভৈরব ভীরুক, আবার ২৮ নম্বরে দেবী বহুলা ও ভৈরব ভীরুক।অন্যদিকে, কেতুগ্রামের বহুলাক্ষী দেবীর ভৈরবের নাম “মহাকাল”, এবং তাঁর মন্দিরটি পাশেই। এর সমর্থন পাওয়া যায় জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে দেওয়া পীঠস্থানের তালিকায় যেখানে ২৮ নন্বরে স্থান দেওয়া হয়েছে বহুলাক্ষী দেবীকে, যাঁর ভৈরব হলেন মহাকাল।

অর্থাৎ, রহস্য আরও ঘনীভূত হল। আর স্থানীয় লোকের কথায় পরে আসছি।

তাহলে সাধারণ মানুষ অর্থাৎ আমরা কী করবো? আমার নিজের মত খুব সহজ – দুটিকেই দর্শন করবো।

বহুলামন্দির

দেবী দর্শন

ট্রেনে কাটোয়া পৌঁছে খোঁজ করে দেবীদর্শন ও বহুলা দেবীর ভৈরব ভিরুক, যিনি ভুতেশ্বর নামে শ্রীখণ্ডে আছেন তাঁকে দেখার জন্য একটি গাড়ি ভাড়া করা গেল। কাটোয়া শহর ছাড়িয়ে বর্ধমানের দিকে এগোতে কাটোয়া-বর্ধমান রেললাইনের লেভেল ক্রসিংয়ের ঠিক আগে বাঁদিকে যাজীগ্রামে শ্রীনিবাস আচার্যের শ্রীপাট। এলামই যখন একটু থেমে শ্রীপাটের রাধাকৃষ্ণ মন্দির দর্শন করে নিলাম। তারপর লেভেলক্রসিং পেরিয়ে কিছুটা যেতেই এল সিপাইদিঘি মোড়। এখানে রাস্তাটা দু’ভাগ হয়েছে। সোজা রাস্তা চলে গেছে বর্ধমান, আর ডাইনের রাস্তাটা গেছে কেতুগ্রাম নিরোল হয়ে বীরভূমের দিকে। আমরা ডানদিকের বীরভূম রোড (রাজ্যসড়ক ৬ বা SH 6) ধরলাম। কোশিগ্রাম, ফুলগ্রাম, যতীনগ্রাম হয়ে এল অজয়ের উপর কাশীরাম দাস সেতু। এবার বৃষ্টি কম, তাই অজয়ের জল কম।অজয় কাটোয়ার কাছে গঙ্গায় পড়েছে।অজয় পেরিয়ে বেরাণ্ডা, পুরুল্যে, ভুলকুড়ি হয়ে কেতুগ্রামে পৌঁছে গেলাম। কাটোয়া থেকে মোটামুটি ১৫ কিলোমিটার রাস্তা। কেতুগ্রামে পৌঁছে আমরা বাঁদিকে কেতুগ্রাম বাজারের দিকে ঢুকলাম। খুব ঘিঞ্জি রাস্তা, ভীষণ ভিড়ও আছে। সোজা রাস্তাটা মাঝে একবার ডানদিকে ঘুরলো। এই মোড়ের মাথায় একটি বেশ বড় মসজিদ চোখে পড়ল। জানা গেল এই অঞ্চলে বহু মুসলমানের বাস। আরও কিছুটা এগিয়ে রাস্তার উপরেই বাঁদিকে বহুলা দেবীর মন্দির। কিন্তু আমরা না থেমে এগিয়ে চললাম শ্মশান বা মরাঘাটের দিকে। ঐদিকেই গ্রামের বাইরে ঈশানী নদীর তীরে বহুলাক্ষী দেবীর মন্দির, যার আরেক নাম “মরাঘাট মহাপীঠ”। একটু এগোতেই বাঁধানো রাস্তা শেষ হয়ে খানাখন্দময় মাটির রাস্তা শুরু হল। একটু পড়ে গ্রামও শেষ হয়ে গেল। এবার দু’পাশে ধানক্ষেত।

আর একটু এগিয়ে ঈশানী নদী চোখে পড়ল। এখন বর্ষার জলে একদম টইটম্বুর। নদীর উপর একটি সরু কাঠের ব্রীজ। দেখেই বোঝা গেল এই ব্রীজটি গাড়ির জন্য নয়। আমরা গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। ড্রাইভার মিঠু দেখিয়ে দিল নদীর ওপারে একটি ছোট জঙ্গল মতো জায়গা। ঐটিই বহুলাক্ষী পীঠ।

আমরা ওদিকে এগোলাম। কাঠের ব্রীজটি দেখেই বোঝা গেল রিটায়ারমেন্টের পর এক্সটেনশনে আছে। কাঠের খুঁটি এবং পাটাতন জরাজীর্ণ, তার উপর পাটাতনের অনেক জায়গায় কাঠই নেই – দু-আড়াই ফুট চওড়া গ্যাপ দিয়ে দেখা যাচ্ছে নীচে ঈশানীর ঘোলা জল রাগী ভঙ্গিতে ছুটে চলেছে। কিছুই করার নেই। অল্টারনেটিভ রাস্তা হল সাঁতার কেটে নদী পার হওয়া! তাই ‘জয় মা’ বলে ব্রীজের পাটাতনের ফাঁকগুলো বকের মত লম্বা লম্বা পা ফেলে পেরোনো গেল।

নদীর ওপাড়ে পৌঁছতেই সামনের সেই জঙ্গলাকীর্ণ জায়গাটির মধ্যে একটা মন্দির চোখে পড়ল। দেখে বোঝা গেল আমরা মন্দিরটির পিছন দিকে আছি। এগোবার একটি কর্দমাক্ত পথ নজরে পড়ল। কাদার মধ্য দিয়ে সেদিকে এগোনো গেল। জায়গাটা একটু উঁচু। সেখানে উঠতেই চোখে পড়লো সামনে গাছগাছড়ার মধ্যে কয়েকটি টিনের চালের ঘর, আর ডানদিকে একটি ছোট পাকা অর্থাৎ সিমেন্টের তৈরী মন্দির, সামনে সিমেন্টেরই নাটমন্দির। এটিই বহুলাক্ষী দেবীর মন্দির।

বহুলাক্ষী দেবীর মন্দির

মন্দিরটি সঠিক ভাবে বলতে গেলে একটি পরিবর্তিত বা মডিফায়েড আটচালা মন্দির, যদিও হঠাৎ দেখলে দালানের উপর চারচালা চূড়া বলেই মনে হয়। তার কারন নীচের চারচালা অংশটির তুলনায় উপরের চারচালা অংশটি খুবই ছোট। মন্দিরটির সামনে একটা লম্বা বারান্দা। গর্ভগৃহের তিনটি অংশ বা কামরা। মাঝের বড় কামরাটি বহুলাক্ষী দেবীর, যদিও দেবীর কোনও মূর্তি নেই। এখানে ঘটেই বহুলাক্ষী দেবীর পূজা হয়। বাঁদিকের কামরাটিতে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপিত আছে। ইনিই বহুলাক্ষী দেবীর ভৈরব মহাকাল বা ভীরুক বলে পূজা পান। আর ডানদিকের কামরাটিতে আছে গণেশবিগ্রহ।

মূল মন্দিরের সামনে একটি পাকা নাটমন্দির। তারপরে পাশাপাশি দুটি ঘর। একদিকে একটি লম্বা মতন টিনের চাল দেওয়া ঘর, তার একটি কামরায় দেবীর ভোগ রান্না হয়, অন্যটায় একজন সাধু থাকেন যদিও উনি ছিলেন না বলে দেখা হল না। তাঁর বদলে পাওয়া গেল সাদা পোশাকের একজন ব্রহ্মচারীকে, নাম শ্রী বাপি দে। উনি আমাদের মন্দির চত্ত্বর ঘুরিয়ে দেখালেন।

ভোগ রান্না হওয়ার ঘরটির পাশের মাটির ঘরটির বয়স নাকি পাঁচশো বছরেরও বেশি। ঐ ঘরে নাকি অনেক মহাপুরুষ এসে থেকেছেন, তাঁদের মধ্যে বামাক্ষ্যাপাও আছেন।

ঐ ঘরটির সামনে একটি খুব মোটা বেলগাছ, গাছের গোড়াটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। বাপি দে জানালেন এই বেল গাছটির বয়সও নাকি পাঁচশো বছর। বেলগাছ পাঁচশো বছর বাঁচে জানা ছিল না, তাই সসম্ভ্রমে অতিবৃদ্ধ গাছটির দিকে তাকালাম। বয়সের জন্যই হোক বা অন্য কারনেই হোক গাছটির একটা দিক মরে গেছে, শুকনো ডালগুলি কংকালের হাতের মত আকাশের দিকে ছড়িয়ে আছে।

বাপি দে-কে বহুলাক্ষী বনাম বহুলার ব্যাপারে প্রশ্ন করতে তিনি জানালেন যে দুটি আলাদা পীঠস্থান নয়, কেতুগ্রামে একটিই পীঠস্থান (বহুলাক্ষী) এবং সেই পীঠস্থানটি হচ্ছে ঈশানী নদীর পাড়ে এই মন্দিরটিই। কিন্তু গ্রাম থেকে দূরে এবং ঈশানী নদী পার হয়ে আসতে হয় বলে ( আগে ব্রীজ ছিল না, সেজন্য বর্ষাকালে অগম্য হয়ে যেত জায়গাটি) গ্রামবাসীরাই গ্রামের মধ্যে নতুন পাকা মন্দির তৈরী করে মায়ের ও সাথে অষ্টভূজ গনেশের মূর্তি সেখানে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে। সেজন্য এই মন্দিরে এখন ঘট পূজা হয়।

ভালো কথা, কিন্তু বহুলাক্ষীর ভৈরব ভুতনাথের তো শ্রীখণ্ডে থাকার কথা, এখানে নয়। এ কথার কোনও সদুত্তর পাওয়া গেল না।

যাই হোক, আমরা প্রণাম জানিয়ে ফেরার রাস্তা ধরলাম। এবার দেবী বহুলার মন্দির।

দেবী বহুলার মন্দির

গ্রামের মধ্যে রাস্তা সরু, তবে রোড সারফেস ভালোই। রাস্তার পাশেই একটা পাঁচিল ঘেরা জায়গার মধ্যে বহুলা দেবীর মন্দির। চেহারা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে নতুন মন্দির, অন্ততঃ রংটি নতুন। মূল মন্দিরটি দালান টাইপের। সামনের দিকে গ্রিল দিয়ে ঘেরা বারান্দা, ভিতরে গর্ভগৃহে বহুলা দেবীর মন্দির। কালো পাথরের দেবী মূর্তি ফুট পাঁচেক উঁচু, কিন্তু কাপড়, মালা ইত্যাদিতে ঢাকা বলে শুধুমাত্র মুখমণ্ডল ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। জানা ছিল যে দেবী চতুর্ভূজা এবং তাঁর একটি হাত ভাঙা। আবার ধ্যানমন্ত্র অনুসারে দেবীর একহাতে কঙ্ক বা চিরুণি, দ্বিতীয় হাতে দর্পন এবং অন্য দুই হাতে বর ও অভয় মুদ্রা। এ কথাও পড়েছি যে দেবী মূর্তিটিতে বৌদ্ধ রীতির প্রভাব আছে, কিন্তু কিছুই বোঝা গেল না।দেবীমূর্তির ডানদিকে একটি ছোট অষ্টভূজ গণেশমূর্তি। পড়েছিলাম দেবীর বাঁ দিকে লক্ষ্মীদেবীর মূর্তি আছে, কিন্তু চোখে পড়ল না।

বহুলা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি হল :

“ধ্যায়চ্ছ্রীবহুলাং নগেন্দ্রতনয়াং পদ্মাসনস্থাং শুভাম

দোভিঃ কঙ্কতিকাং বরাভয় যূতাং বামে স্বপুত্রন্বিতাম

গৌরাঙ্গীং মণিহারকণ্ঠনমিতাং চিন্ত্যাং সুখাং কামদাম।”

স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস বহুলা দেবী বহু ঐশ্বর্যের অধীশ্বরী, এবং ভক্তদের যে কোন প্রার্থনাই বহুগুণে ফিরিয়ে দেন।

এখানে পুরোহিতমশাই জানালেন এই অষ্টভূজ গণেশ সমগ্র ভারতবর্ষেই বিরল এবং এই মূর্তিটিই পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র অষ্টভূজ গণেশ। কিন্তু বহুলা-বহুলাক্ষী বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন করতে তিনি সযত্নে বিতর্ক এড়িয়ে বললেন এটিই সতীপীঠ, এবং এনার ভৈরব শ্রীখণ্ডে।

প্রণাম জানিয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে এলাম। গর্ভগৃহে ঢোকার দরজার উপরে লেখা আছে “ওঁ”, তার নীচে “মা”, আর তার নীচে বাংলা অক্ষরে লেখা আছে পীঠনির্ণয়তন্ত্রের একটি মন্ত্র :

“বহুলায়াং বামবাহু বহুলাখ্যা চ দেবতা

ভীরুকঃ ভৈরবস্তত্রঃ সর্ব্বসিদ্ধি প্রদায়কঃ।”

মূল মন্দিরে ঢোকার গেটের উপরে একটি তোরণ মত স্ট্রাকচার, তাতে লেখা আছে “ওঁ”, তার নীচে“সতীপীঠ”, আর তার নীচে অন্নদামঙ্গল থেকে নেওয়া দুটি পংক্তি :

“বহুলায় বামবাহু ফেলিল কেশব

বহুলা চণ্ডিকা তাহে ভীরুক ভৈরব।”

মন্দিরের একপাশে কয়েকটি রুম চোখে পড়ল, সম্ভবতঃ অফিস ইত্যাদি। মন্দিরের সামনে দালান রীতির নাটমন্দির। দালানের উপর একটি শিখর বা রত্ন জাতীয় স্ট্রাকচার। নাটমন্দিরের সামনে একটি বলি দেওয়ার হাড়িকাঠ। শাক্ত মন্দিরে বলিদান নিয়মের মধ্যেই পড়ে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যে জিনিসটি অবাক করার মত তা হল মূল মন্দিরের একপাশে গায়ে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ লেখা একটি তুলসীমঞ্চ, তাতে একটি সতেজ তুলসীগাছ। শাক্ত মন্দিরই শুধু নয়, দেবী বহুলার মন্দির একটি রীতিমত শক্তিপীঠ। সেখানে তুলসীমঞ্চ দেখে একটু চমকে যেতে হয় বইকি। পরে চিন্তা করে দেখলাম কাটোয়া এবং সন্নিহীত অঞ্চলে বৈষ্ণব প্রভাব গভীর। হয়তো সেই কারনেই শক্তিপীঠে তুলসীমঞ্চের অবস্থান।

শক্তিদর্শন হল, এবার শিব দর্শন। তারজন্য যেতে হবে শ্রীখণ্ড। কিন্তু শ্রীখণ্ড যেতে হলে আমাদের আবার কাটোয়ার দিকে ব্যাক করে সিপাইদিঘি গিয়ে বর্ধমান রোড ধরে বর্ধমানের দিকে যেতে হবে। তাই আমরা সেই রাস্তাই ধরলাম।

ভূতনাথ
ভূতনাথ মন্দিরের ফলক

শ্রীখণ্ডে ভূতনাথ দর্শন

সিপাইদিঘি পৌঁছে ডানদিকে টার্ন নিয়ে বর্ধমান রোড (রাজ্য সড়ক ১৪ বা SH 14) ধরে মোটামুটি ছয় কিলোমিটার যেতেই পড়ল শ্রীখণ্ড মোড়। আমরা এবার বাঁ দিকে শ্রীখণ্ড গ্রামের মধ্যে ঢুকলাম। একটু যেতেই রাস্তার ডানদিকে দেখা গেল একটি উঁচু জায়গায় বেশ কয়েকটি মন্দিরের একটি গুচ্ছ। এটিই হচ্ছে ভূতনাথ মন্দির।

ভূতনাথ মন্দিরগুচ্ছ

মন্দিরগুচ্ছটি রাস্তা থেকে একটু উঁচুতে একটা অনুচ্চ টিলার উপরে। উপরে ওঠার সিঁড়ি আছে। ওঠার মুখেই একটি নবনির্মীত তোরণ। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলেই সামনে বেশ বড় একটি পঞ্চরত্ন মন্দির, তার সিঁড়ির দিকের দেওয়ালে স্টাকোর রিলিফের কাজে সতীর মৃতদেহ কাঁধে মহাদেবের বড় ছবি, উপরে বাঁ কোনায় সুদর্শন চক্র হাতে বিষ্ণুকে দেখা যাচ্ছে। এই মন্দিরটির ডানদিকে দু’টি চারচালা মন্দির ও একটি ছাদ দেওয়া স্ট্রাকচার। আয়তনেই বোঝা যাচ্ছে পঞ্চরত্ন মন্দিরটিই মূল মন্দির। মূল মন্দিরের সামনে একটি বড় দালান টাইপের নাটমন্দির, তারপর আরও দু’টি চারচালা মন্দির। সবকটি মন্দিরেই শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত। মন্দিরগুচ্ছের পিছনে একটি মাঝারি সাইজের পুকুর।

মন্দিরগুলি দেখেই বোঝা যাচ্ছে নবনির্মান বা সংস্কার করা হয়েছে, প্রাচীনত্বের একমাত্র চিহ্ন চোখে পড়ল মূল মন্দিরের গায়ে বসানো একটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠাফলক, কিন্তু ঠিকমত পড়া গেল না।

ভূতনাথ দর্শনের সঙ্গে আমাদের বহুলা-বহুলাক্ষী দর্শন সম্পূর্ণ হল।

কী ভাবে যাবেন

যদিও বর্ধমান থেকে কাটোয়ার বাস আছে, ফ্রিকোয়েন্সি কম বলে ট্রেনে বা বাসে কাটোয়া এসে কেতুগ্রামের বাস ধরাই ভালো। কাটোয়া থেকে কেতুগ্রাম ও শ্রীখণ্ড যাওয়ার বহু বাস আছে। আর গ্রামের মধ্যে টোটো বা হাঁটা।আবার কাটোয়া থেকে গাড়িতেও যাওয়া যায়। গাড়িতে গেলে সুবিধা বেশি। রাস্তার বিবরণ আগেই দিয়েছি।

উপসংহার

বহুলা দর্শন শেষ হল। আমাদের পীঠস্থান সন্ধানের প্রথম পীঠ। আমরা এর পরের পীঠস্থানের খোঁজে এগিয়ে যাব।

 

ঈশানীনদীর সেতু
বহুলাক্ষী মন্দির

বেলগাছ

 

ভোগঘর
তুলসীমঞ্চ

ছবি–লেখক

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।