বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো শুরু হয় পবিত্রতিথি রথযাত্রায়

Share your experience
  • 2.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.1K
    Shares

বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো
বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো

শুভদীপ রায় চৌধুরী–বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো হয় রথের দিনে। এই কারনে রথযাত্রার দিন থেকে শুরু হয় বাঙালীর সেরা পরব দুর্গোৎসবের কাউন্টডাউন।এই দিন বাংলার বনেদীবাড়িগুলিতে দুর্গার কাঠামোপুজো শুরু হয়।কাঠামোপুজোর উপকরণ বলতে এই দিন মায়ের মৃন্ময়ী বিগ্রহের যে মূল কাঠামো সেই কাঠামোকেই পূজা করা হয়। পরিবারের কুলপুরোহিতরা এই পুজো করে থাকেন। ফল, মিষ্টান্ন সহযোগে পূজাপাঠ হয়। দেবীর কাঠামোকে বিশেষ উপকরণ দিয়ে স্নান অভিষেক করানো হয়। তারপর পুজো হয়।

বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো

বঙ্গদেশে বহু উৎসব মহাসমারহে পালিত হলেও দুর্গাপুজো বাঙালির এক প্রাণের উৎসব, যে উৎসবে গোটা বাঙালি সমাজ মেতে ওঠেন দেবী আরাধনায়। আজ রথযাত্রা।পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সাথে সাথে বঙ্গের বিভিন্ন জগন্নাথ মন্দিরে পালিত হবে রথযাত্রা উৎসব। মাহেশ থেকে বড়িশা সকলেই মেতে উঠবেন জগন্নাথের রথযাত্রায়। এই দিনেই প্রতিবছর বনেদীবাড়ির ঠাকুরদালানে শুরু হয় দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিপর্ব কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। এই পবিত্রতিথিতে বিভিন্ন বনেদীবাড়ি দেবীর মূল কাঠামো পুজো করে শুরু করে তাদের এবছরের শারদীয়া। তারপর ধীরে ধীরে মৃন্ময়ীপ্রতিমা তৈরি হয় ঠাকুরদালানে।

বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো--সুরুলের সরকার বাড়ি
বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো–সুরুলের সরকার বাড়ি

বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো–সুরুলের সরকার বাড়ি

বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে সুরুল গ্রামে। সেই গ্রামের সরকার বাড়ি বা বলাবাহুল্য সুরুলের জমিদার বাড়িতে বহু প্রাচীন কাল থেকে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই ভরতচন্দ্র সরকার বর্ধমানের নীলপুর থেকে চলে এসেছিলেন সুরুলে। তাঁর আমল থেকেই দুর্গাপুজো শুরু এই পরিবারে। এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা হয় রথযাত্রার দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। আনুমানিক ২৮৫বছরের পুরানো এই বাড়ির পুজো, যা আজও অব্যহত রয়েছে নিষ্ঠার সাথে। পারিবারিক স্বর্ণালংকারে সাজানো হয় সুরুল বাড়ির দেবীকে। কথিত রয়েছে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের জমির বেশ অনেকটাই পেয়েছিলেন সুরুল জমিদার বাড়ির কাছ থেকেই।

বনেদীবাড়ির কাঠামো পুজো--শান্তিপুরের বড় গোস্বামীবাড়ি
বনেদীবাড়ির কাঠামো পুজো–শান্তিপুরের বড় গোস্বামীবাড়ি

বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো–শান্তিপুরের বড়গোস্বামী বাড়ি

শান্তিপুরের বড়গোস্বামী বাড়ির দুর্গাপুজোও বহুদিনের। প্রায় আনুমানিক ৩৫৪ বছরেরও প্রাচীন এই বাড়ির পুজো। উমা নয়, এই পরিবারের মা কাত্যায়নী রূপেই পূজা পান নিষ্ঠার সাথে। এই বাড়ির পুজোও শুরু হয় রথযাত্রার দিন থেকে কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। এই বাড়িতে দেবীর বাহন ঘোটকাকৃতি সিংহ, দেবীর গায়ের রঙ স্বর্ণবর্ণা। এই বাড়ির পুজোতে প্রায় ৩৬রকমের পদ রান্না হয়। রান্নায় থাকে ভাত, ডাল, নানান ধরনের শাক, বিভিন্ন রকমের তরকারি, পায়েস, মিষ্টি ইত্যাদি। প্রায় তিনশো বছরেরও প্রাচীন এই পুজো আজও মহাসমারহে পালিত হয়ে আসছে বড়গোস্বামীদের বাড়িতে।

বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো বলরাম দের বাড়ি
বনেদীবাড়ির কাঠামোপুজো বলরাম দে স্ট্রিটের দত্ত বাড়ি

বলরাম দে স্ট্রিটের দত্তবাড়ি

উত্তর কলকাতার বনেদীবাড়ির মধ্যে অন্যতম এই বলরাম দে স্ট্রিটের দত্তবাড়ির পুজো,। হাটখোলা দত্তদের একটি অংশ এই বাড়িতে পুজো শুরু করেছিল। এই বাড়ির কাঠামোপুজো হয় উল্টোরথের দিন। এই দিন থেকে শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণের কাজ, প্রস্তুতিপর্ব চলে ঠাকুরদালানে। শ্রী শ্যামলধন দত্ত ১৮৮২ সালে বলরাম দে স্ট্রিটের এই বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। এই বাড়িরও দেবীর বাহন ঘোটকাকৃতি সিংহ ও চালচিত্র মটচৌরির আদলে নির্মিত। এই বাড়িতে তিনদিনই(অর্থাৎ সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী) হয় কুমারিপুজো এবং সধবাপুজো। নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয় দেবীকে, ভোগে থাকে নিমকি, গজা, নারকেলনাড়ু, লুচি, রাধাবল্লভী, খাস্তা কচুরি ইত্যাদি। একসময় এই বাড়িতে বলিপ্রথা থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ। তবে ক্ষীরের পুতুল বলিদানের চল রয়েছে এই বাড়িতে।

বনেদীবাড়ির দুর্গাপুজো--শোভাবাজার রাজবাড়ি
বনেদীবাড়ির দুর্গাপুজো–শোভাবাজার রাজবাড়ি

শোভাবাজার রাজবাড়ি

কলকাতার বনেদীপুজো বলতেই যে রাজবাড়ির নাম মনে আসে, তা রাজা নবকৃষ্ণ দেবের প্রতিষ্ঠিত শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। এই রাজবাড়ির দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭ সালে, যা আজও অব্যহত রয়েছে। এই বাড়িতে উল্টোরথের দিন কাঠামোপুজো হয়, এবং শুরু হয় রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। অতীতে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত, কিন্তু আইনে বাঁধা দেওয়ায় কুমোরকে দিয়ে দশমীর দিন নীলকণ্ঠ পাখি তৈরি করে বিসর্জন দেওয়া হয়। আজও রাজবাড়ির মা কাঁধে করে বিসর্জন দেওয়া হয় সেই প্রাচীন রীতি মেনেই। এই পরিবারে অন্নভোগ প্রথা নেই ।তাই নানান রকমের মিষ্টান্ন তৈরি করে ভোগ দেওয়া হয়। যেমন- মিঠে গজা, দরবেশ, লেডিকেনি, জিলিপি,খাজা, সাদামিঠাই, লবঙ্গলতিকা, পেরাকী ইত্যাদি। ঐতিহ্য ও আভিজাত্যে আজও উজ্জ্বল এই বাড়ির পুজো।

আরও পড়ুন  গোলাবাড়ি-বাংলার ঘরবাড়ি ও স্থাপত্যের এক অনন্য ইতিহাস

উল্লিখিত চারটি বনেদীবাড়ির মৃন্ময়ী প্রতিমা বংশপরম্পরায় তৈরি করে আসছেন কুমোররা। শোভাবাজার রাজবাড়িতে যেমন প্রতিবছর নতুন কাঠামো বাঁধা হয় তারপর প্রতিমা তৈরি হয়। অন্যান্য জমিদারবাড়িতে কাঠামোপুজোর দিন থেকেই প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। দুর্গাপুজোর রীতিনীতি এই দিন থেকেই শুরু হয়।

ছবি–লেখক

 


Share your experience
  • 2.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.1K
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ রায় চৌধুরী

শুভদীপ রায় চৌধুরী
শুভদীপ রায় চৌধুরী, ১২বছর দক্ষিণ কলকাতার স্বনামখ্যাত বিদ্যালয় "বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়" থেকে পড়ার পর উত্তর কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে স্নাতক এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর, বিশেষ বিষয় ছিল-ভারতের আধুনিক ইতিহাস। তাছাড়া ২০১৬সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে স্বতন্ত্র গবেষণায় যুক্ত। বর্তমানে বহু পত্রিকায় যুক্ত স্বতন্ত্র লেখায়, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে নয় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখার কাজেও যুক্ত। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের ৩৬তম বংশধর