আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে

গ্রামাঞ্চলে  আকাশপ্রদীপকে ফানুস বা ফনেস বলে।পন্ডিতদের মতে ফনেস শব্দটির আদি উৎস গ্রিক শব্দভান্ডার।এর অর্থ মোমবাতি।মিশর দেশে ফানুস নামক বাতি জ্বেলে অভিবাদন করার প্রথা ছিল।তারও আগে ফারাওরা সাইরিয়াস নামে নক্ষত্রের উদয়কালে যে উৎসব পালন করতেন সেই উৎসবে যে মশাল ব্যবহৃত হতো সেখান থেকেই নাকি ফানুস বা ফনেসের উদ্ভব হয়েছে।শুধু হিন্দু ধর্মে নয় ;বৌদ্ধধর্মে ফানুস ওড়ানো বা আকাশদীপ দেখানো এক জনপ্রিয় উৎসব…লিখছেন–স্বপনকুমার ঠাকুর

যমপুকুর যমপূজা ও যমদ্বিতীয়া 

কল্পিত এই দক্ষিণ দিকের ঘাট থেকেই যম মানুষকে বৈতরণী পার করেন। এই দক্ষিণ দিকেই যমের বামদিকে থাকে যমের স্ত্রী  এবং ডানদিকে থাকে যমের মাসি। উত্তর দিকে অবস্থান করেন জেলে-জেলেনী, যারা মৃত্যুপুকুর থেকে মানুষের আত্মাকে বের করেন জাল ফেলে। পূর্বদিকে থাকে ধোপা-ধোপানী,  স্বর্গের পুকুরে যারা রোজ কাপড় কাচে,  এই ধোপা-ধোপানী বর্ণনা আমরা পাই মনসামঙ্গলে মৃত স্বামীকে নিয়ে বেহুলা স্বর্গে গেলে এমন ধোপানীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। পশ্চিমদিকে আঁকা থাকে কাক,বক ও কচ্ছপের চিত্র।–লিখছেন–সম্পর্ক মণ্ডল

বিরহীর মদনগোপাল মন্দিরে সম্প্রীতির ভাইফোঁটা উৎসব

ভাইফোঁটা উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই মন্দির।এ সম্পর্কে একটি লোককথা প্রচলিত আছে।এক রাতে গ্রামের অনেককে  মদনগোপাল স্বপ্নাদেশ দেন —আমার বোন সুভদ্রা এখানে নেই। কে আমায় ফোঁটা দেবে ? সেই স্বপ্নাদেশের কথা প্রচারিত হতেই মদনগোপালকে ঘিরে বিরহী গ্রামে শুরু হয় ভাইফোঁটা। মন্দিরে নিত্য পূজা ছাড়াও ভাইফোঁটার দিন মদনগোপালের বিশেষ পূজা হয় এবং মন্দির প্রাঙ্গণে বিরাট মেলা বসে…লিখছেন–রিয়া দাস

ভাইফোঁটা, চৌকাঠ ও ভার্চুয়াল কপাল

নিজের পরিবারই শেষ কথা ছিলনা তখন। এর বাইরে ছিল এ পাড়া, ও পাড়া।  সম্পর্কে বোন বা দিদি ঠিক ডেকে বসিয়ে দিত পাতা আসনে। কপালে এঁকে দিত চন্দনের ফোঁটা। হাতে দিত খাবারের প্লেট। এইসব লতায় পাতায় জড়িয়ে থাকা সম্পর্কগুলোকে ভাইফোঁটা যেন ডেকে ডেকে চিনিয়ে দিত। একসঙ্গে একটা সুস্থ পরিবেশে বেঁচে থাকার, পবিত্র সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখার চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতো। একটা লোকাচার থেকেই যেন পাওয়া যেত একটা যৌথ জীবনচর্চার শিক্ষা। এটা ভাইফোঁটার কাছে মানবজীবনের ঋণ। লিখছেন–তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

ভাইফোঁটা শুধু বোনেরাই নয়,মা কালীও ফোঁটা দেয়!

‘দীপোৎসবকল্প গ্রন্থে সর্বানন্দসুরি নামক এক প্রাচীন আচার্য লিখেছেন যে জৈন ধর্মের প্রবর্তক ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীরের প্রয়াণ হলে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ শিষ্য নন্দীবর্ধন শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। বাঁচার ইচ্ছা একরকম ছেড়েই দিলেন। কিন্তু তাঁর বোন অনসূয়া দাদাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে আসনে বসিয়ে মুখে অন্ন তুলে দিলেন। দাদাকে অযাচিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হলেন। দাদার কপালে পরিয়ে দিলেন রাজ তিলক। নন্দীবর্ধন আবার রাজকার্যে মন দিলেন। কাকতালীয় ভাবে দিনটি ছিল কার্ত্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া। ঐতিহাসিকরা মনে করেন এর পর থেকেই ভাইয়ের আয়ু কামনায় বোনেদের এই ব্রত ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়েছে…লিখছেন–কৌশিক রায় চৌধুরী

বাঁদনা পরব–লেখায় ও ছবিতে

শালুক ফুল আর নৈবেদ্য হল চালের গুঁড়ি। জলছাড়া দুধে গুলে বাড়ীতে তৈ্রি বিশুদ্ধ ঘিয়ে ছেঁকে তৈরি করা পিঠা। বাঁদনার প্রথমদিনে ভাল করে স্নান করিয়ে শিংএ সরষের তেল মাখানো ও শিং ভর্তি সিঁদুরের তিলক লাগানো, সারা গায়ে নিজের টোটেমের চিহ্ন রং দিয়ে এঁকে দেওয়া, দুই শিং বরাবর ধানের শিসের মোড়(মুকুট) পরানো, গলায় বুনো ফুলের মালা পরানো হয় এবং তারপর সপরিবারে ভক্তিভরে গরু চুমানো ও পূজা করা হয়। সেইদিনের রাত্রিবেলা (অমাবস্যা) সারা রাত গাই গরুকে ঘুমাতে দেওয়া হয় না, জাগিয়ে রাখা হয়। গরু-জাগরনের রাতে ধাঙইড়ারা (গরু জাগানোর দল) বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে সহরই গীত গেয়ে প্রতিটি কৃষকের বাড়ীতে ঢুকে ।সঙ্গে থাকে ঢোল, ধামসা, মাদল্ করতাল, সাহনাই, পেঁপতি, টিনভাঙ্গা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র। লিখছেন–ভূপেন্দ্রনাথ মাহাত।

ডাকাত ঘোষাল সর্দারের সিদ্ধেশ্বরী কালী

ঘোষাল সর্দার নামে এক দস্যু সর্দার, কোড়লার বৃহৎ  পুষ্করিণী থেকে তুলে আনলেন সিদ্ধেশ্বরী মাকে। প্রতিষ্ঠা করলেন এই পুষ্করিণীর পাড়ে । আজ যেখানে সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মন্দির। ঘোষাল সর্দার স্বপ্ন পেয়েছিলেন যে, মা সিদ্ধেশ্বরী পুষ্করিণীতে আছেন সর্দার যেন তাকে মুক্ত করে প্রতিষ্ঠা করেন । বর্তমানে কোড়লার এই মন্দিরে রয়েছে বড় আকারের মাতৃমূর্তি, ঠিক তার বাম পাশে আজও প্রতিষ্ঠিত রয়েছে ঘোষাল সর্দারের প্রতিষ্ঠিত সেই মূর্তি। যা আজও পূজিত হন। লিখছেন–সুমন্ত বড়াল

পশ্চিম মেদিনীপুরের দীপাবলি পুতুল

পুতুলটি আর পাচটি সাধারণ মাটির পুতুলের মতন ঠিক দেখতে নয়।পুতুলের মধ্যে আলাদা একটা বিশেষত্ব আছে।পুতুলের নলাকার দুই হাতের অংশটি কাঁধ বরাবর ডান ও বামদিকে কিছুটা প্রসারিত হয়ে মাথার ওপর  উঠে গিয়েছে। অনেকটা ত্রিভুজের আকৃতি নিয়েছে। তার সঙ্গে লাগানো রয়েছে মাটির প্রদীপ। মাথার ঠিক ওপরে একটি এবং ডান ও বামহাতে মধ্যে দুটি করে চারটি। সংখ্যায় মোট পাচটি। জানা গেল এমনই পুতুলের নাম দীপাবলি পুতুল…লিখছেন–সুমনকুমার গাইন

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ও আগমেশ্বরী কালীমাতা

পরের দিন ভোরে গঙ্গাস্নানে বেরিয়ে কৃষ্ণানন্দ দেখলেন, এক দরিদ্র বধূ গাছের গুঁড়ির উপর নিবিষ্ট মনে ঘুঁটে দিচ্ছেন। বাঁ হাতে গোবরের মস্ত তাল, ডান হাত উঁচুতে তুলে ঘুঁটে দিচ্ছে। নিম্নবর্গীয় কন্যা, গাত্রবর্ণ কালো, বসন আলুথালু, পিঠে আলুলায়িত কুন্তল, কনুই দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে সিঁদুর লেপ্টে গেছে। এ হেন অবস্থায় পরপুরুষ কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটলেন সেই বধু।— এই ছবিটিই মানসপটে এঁকে গঙ্গামাটি নিয়ে মূর্তি গড়তে বসলেন কৃষ্ণানন্দ। কৃষ্ণানন্দের এই মূর্তিই পরবর্তীতে দুই বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠল।লিখছেন–তিরুপতি চক্রবর্তী।

ঠনঠনিয়া কালীমাতা

বলা হয় ডাকাতরা  এই কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর আর দেবীকে নড়ানো যায়নি। অগত্যা জঙ্গলে ভরা অঞ্চলেই তৈরি হয় মন্দির। এখানে মায়ের নিজের নামের বদলে ঘন্টার নামেই বিখ্যাত ।জনশ্রুতি বলে, এই মন্দিরের ঘন্টা বাজিয়ে একসময় দূর-দূরান্তে ডাকাতদের হামলার সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হতো। ঘন্টার ঠনঠন শব্দ থেকে মন্দিরের নাম ঠনঠনিয়া..লিখছেন–রিয়া দাস।