কোচবিহারের  মদনমোহন মন্দিরঃইতিহাস ও সংস্কৃতি

Share your experience
  • 477
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    477
    Shares

আশুতোষ মিস্ত্রীঃগত ১২ই জুন আমরা উত্তর পূর্ব ভারত ভ্রমণের সময় বাস যোগে কোচবিহার গিয়েছিলাম। ঠিক সন্ধ্যার সময় কোচবিহারে পৌঁছায়। কোতোয়ালী থানার পাশে এক অনুষ্ঠান বাড়ির লজে রাত্রিবাস করে পরের দিন সকালে টোটো ধরে  কোচবিহার রাজবাড়ী ও মদনমোহন মন্দির দর্শন করে ছিলাম। মন্দিরের সামনের চারিদিক পাকা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। সামনে বোতল তাল গাছের সারি। মূল প্রবেশ পথের রেলিং পেরিয়ে বাম দিকে ট্রাস্ট অফিস ও মাথার উপর ঝাড়বাতি টাঙানো। সামনে কিছু মদনমোহন ও বাকি বিগ্রহের মূর্তির ছবি রাখা আছে। একটু পেরিয়ে বাম দিকে জুতো রাখার তাক। মন্দির প্রাঙ্গণে  চারিদিকে অপরূপ সৌর্ন্দয্য , নানান গাছ ও নানান ফুলে বাগান পরিপূর্ণ।

মদনমোহন মন্দিরের   ‘মদনমোহন ‘ কোচবিহার রাজবংশের কূলদেবতা রূপে প্রতিষ্ঠিত। ইনি আবার কোচবিহারের জনগণের দেবতা রূপেও পূজিত হন । শৈব মহারাজ নরনারায়ণ  (১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ ) আসামের বৈষ্ণব ধর্মগুরু শঙ্করদেবের প্রভাবে রাধা বিহীন  একক বিগ্রহ মদনমোহন মূর্তি নির্মাণ  করান । অষ্টধাতুর সুবর্ণ মণ্ডিত বিগ্রহ  অতি মনোহর  ও উজ্জ্বল বর্ণের ।রুপোর বিশাল সিংহাসনে আসীন, সামনে অতি প্রাচীন চিরাচরিত তিন শালগ্রাম শিলা -অনন্তনারায়ণ, জনার্দন ও লক্ষ্মী নারায়ণ পূজিত হন।

বর্তমান মন্দিরটি বাংলা আটচালা শৈলীর, সামনে বারান্দা  ও প্রশস্ত  অঙ্গন বাগান, কুঞ্জ ।  ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে নতুন প্রাসাদ তৈরির পর মহারাজ নৃপেন্দ্রনারায়ণ তাঁর মহিষী ব্রাহ্ম কন্যা সুনীতি দেবীর আগ্রহে বর্তমান মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করেন ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ই জুলাই । রাজমাতা নিশাময়ী ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ২১ শে মার্চ উদ্বোধন করলেন মন্দির। এক আড়ম্বর্পূর্ণ ও বর্ণাঢ্য শোভা যাত্রার মাধ্যমে মদনমোহন বিগ্রহ রাজপ্রাসাদ থেকে  মন্দিরে আনা হয়। পাশেই তৈরি হয় “আনন্দময়ী ধর্মশালা”।

মদনমোহন মন্দির বাংলার চারচালা ও দালান মন্দিরের অনুকরণে দক্ষিণ মুখী চারকোনা ঘরের বাঁধানো কার্নিশের ওপর গম্বুজ বসিয়ে নির্মিত। দূর থেকে মন্দিরের চূড়া  শ্বেতপদ্মের মত লাগে। মন্দিরের পাশাপাশি চারটি কক্ষের মধ্যে মূল কেন্দ্রের কক্ষে ঠাকুর মদনমোহন অধিষ্ঠিত। রৌপ্য সিংহাসনে  অতি উজ্জ্বল স্বর্ণ বর্ণ  বংশিধারী  মনোহর ‘মদনমোহন’। মদনমোহন মন্দিরের মূল আকর্ষণ কিন্তু  মদনমোহনই। মন্দিরের কেন্দ্রীয় কক্ষে রুপোর সিংহাসনে দুটি বিগ্রহ থাকে। বড় মদনমোহন ও ছোট মদনমোহন। সর্ব সাধারণের জন্য বড় মদনমোহনকেই দেখানো হয়। ছোট মদনমোহন অন্তরালেই থাকেন। প্রতি একাদশীতে শায়িত এবং  উত্থিত হন। একাদশীতে উত্থিত হন তখন পর পর তিন দিন ভক্তদের দর্শন দেন। ছোট মদনমোহন মূর্তিটিই রাজা নর নারায়ণ কতৃক নির্মিত  আদি বিগ্রহ। রাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ দ্বিতীয় বড় মদনমোহন মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যা “সোনার মদনমোহন ” বিগ্রহ নামেই পরিচিত। এছাড়া অনন্ত নারায়ণ, লক্ষ্মী নারায়ণ নামক দুটি শাল গ্রাম শিলা মদনমোহন বিগ্রহের সামনে পূজিত হন।

মূল মন্দিরের পশ্চিম কক্ষে  শক্তির উপাসক মহারাজা হরেন্দ্র নারায়ণ কর্তৃক ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত করেন “আনন্দময়ী” কালী মূর্তি। বর্তমান মদনমোহন মন্দির উদ্বোধনের দিন এই মূর্তিটিকেও রাজবাড়ী থেকে এনে স্থাপন করা হয়। শ্বেতপাথরে শায়িত মহাকাল মূর্তির উপরে কষ্ঠি পাথরের তৈরি মায়ের মূর্তি। মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ৪ ফুট। প্রত্যহ আড়ম্বরের সহিত নিত্য পূজা ও অন্নভোগ এবং অমাবস্যা পূর্ণিমা তিথিসহ প্রতিমাসে পশু বলি সহ বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়াও মূল মন্দিরের পূর্ব কক্ষে মদনমোহন বিগ্রহের বামদিকে অপরূপ কারুকার্যময় রৌপ্য সিংহাসনে মা কাত্যায়নী, মা জয় তারা ও মা অন্নপূর্ণা বিগ্রহ অধিষ্ঠিত। সিংহাসনের সামনে আছেন পঞ্চমুখী গণেশ , মঙ্গল চণ্ডীর দুটি বিগ্রহ , মহিষমর্দিনী মূর্তি, মহাকালীর ছোট মূর্তি এবং বানেশ্বর মন্দির থেকে আনা পাথরের প্লেটের উপর মঙ্গলচণ্ডীর মূর্তি। এছাড়াও একটি ছোট মূর্তি সিংহাসনের পাশে অবস্থিত বাক্সের মধ্যে বদ্ধ অবস্থায় থাকে। ভক্তদের চোখের আড়ালে থেকে যান। এই মূর্তিটিকে শ্রী শ্রী যন্ত্র বলা হয়। এই মূর্তির পূজা বদ্ধ অবস্থায় অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা যায়।

মদনমোহন মন্দিরের পূর্ব দিকে দক্ষিণ মুখী মন্দিরটি “মা ভবানী ” মন্দির অবস্থিত। উক্ত মন্দিরে রুপোর সিংহাসনে প্রায়  ২ ফুট উচ্চতার পাথরের মা ভবানীর অসুরনাশিনী দশভূজা মূর্তি। মূর্তির রং টকটকে লাল বর্ণের। এই মূর্তিতে বাহন হিসেবে দেবীর বামদিকে বাঘ ,  আর ডানদিকে সিংহ অসুরকে আক্রমনরত অবস্থায় আছে। এই মূর্তি বিশেষত অন্য কোথাও সেরকম দেখা যায়না। আগে এই মূর্তিটি ভবানী গঞ্জ বাজারে স্থাপিত ছিল। পরবর্তীকালে মদনমোহন মন্দির স্থাপনের সাথে ভিন্ন মন্দির তৈরি করে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

রাজবাড়ীর ট্রাস্টের অধীনে সমগ্র মন্দিরের  পূজার্চনা করা হয়। রোজ সকাল  ৮ টাতে মঙ্গলারতী শুরু  থেকে রাত ৯ টা শয়ন দেওয়া হয় ।শুধু মদনমোহন মন্দিরে রাস  উৎসব ছাড়া ২৭ টি উৎসব হয় বছরে। যেহেতু কালী ও ভবানী  আছেন তাই বলিদানের যূপকাষ্ঠ ও আছে।

মদনটমোহন মন্দিরের উল্লেখযোগ্য উৎসবের মধ্যে রাস উৎসব অন্যতম। যদিও আমরা রাস উৎসবে যায়নি তাই এ বিষয়ে বিশদ তথ্য জানতে পারিনি। তবে কিছু তথ্য ঘেঁটে জানা যায় , মদন মোহনের দ্বাদশ যাত্রা( দোলযাত্রা, রথযাত্রা প্রভৃতি) মধ্যে সব থেকে আড়ম্বর পূর্ণ ভাবে পালিত হয় রাযাত্রা। রাস পূর্ণিমার দিন মন্দিরের সামনের বারান্দায় সু সজ্জিত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত মদনমোহনের বিশেষ পূজা সম্পন্ন করা হয়। ১৫ দিন ব্যাপী রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। রাস পূর্ণিমায় মদনমোহন মন্দির চত্বর আলোকসজ্জায় আলোকিত হয়ে ওঠে। মন্দির চত্বরে মাটির পুতুলে কৃষ্ণলীলা প্রদর্শন করা হয়। শ্রীকৃষ্ণের এই রাসলীলাকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেল বন্ধন গড়ে ওঠে।

১৮১২ খ্রিস্টাব্দে রাস পূর্ণিমার দিন মহারাজা হরেন্দ্র নারায়ণ স্বজন আত্মীয় নিয়ে নতুন প্রাসাদে প্রবেশ করেন। সম্ভবত সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই রাস মেলা চলে আসছে। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ বর্তমান মদন মোহন মন্দির স্থাপনের পর থেকে এই মেলা পূর্বে মন্দির সংলগ্ন বৈরাগী দীঘির চারপাশে এবং ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্যারেড গ্রাউন্ড বর্তমান রাসমেলা মাঠে স্থানান্তরিত করা হয়।

রাসমেলার মূল আকর্ষণ হলো রাসমঞ্চ বা রাসচক্র। প্রায় ৩০ ফুট দীর্ঘ কাঠের খুঁটির চারপাশে বাঁশের ফ্রেমের উপর কাগজের সূক্ষ্ম নকশা ও বিভিন্ন দেব দেবীর ছবি বংশ পরম্পরায় ফুটিয়ে তোলেন একটি মুসলিম পরিবার। বৌদ্ধ ও মুসলিম ধর্মের ঘরানা প্রত্যক্ষ ভাবে দেখা যায়, যা কোচবিহারের মহারাজাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল নির্দশন। প্রত্যেক বছর রাস পূর্ণিমার দিন মা কাত্যায়নী ও রাসমঞ্চের পূজা শেষে রাস চক্র ঘুরিয়ে বংশের রাজারা সর্ব প্রথম মেলার উদ্বোধন করতেন। বর্তমানে কোচবিহার জেলার জেলাশাসক পদাধিকার বলে নাম সর্বস্ব দেবত্র ট্রাস্টের সভাপতি হন। তাই জেলাশাসক রাস চক্রের চাকা ঘুরিয়ে  মেলার উদ্বোধন করেন। এই রাস উৎসবের সময় কোচবিহার  মদন মোহন মন্দিরে হাজার হাজার ভক্তদের সমাগম হয়।

তথ্য সূত্র : কোচবিহার দেবত্র ট্রাস্ট পত্রিকা ও উইকিপিডিয়া।

 


Share your experience
  • 477
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    477
    Shares

Facebook Comments

Post Author: Ashutosh Mistri

Ashutosh Mistri
আশুতোষ মিস্ত্রী ।বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার নবগ্রাম থানার অন্তর্গত জারুলিয়া গ্রামে । বর্তমানে বহরমপুর Ghosh AET Centre ফার্মের অ্যাকাউন্ট দেখা শুনো করেন । Murshidabad Heritage And Cultural Development এর সদস্য ও ইতিহাস বিষয়ক বই সংগ্রাহক।ক্ষেত্রসমীক্ষক।