অহল্যাভূমি দামনকেয়ারিঃমাটিরবাড়ি যেখানে শিল্প

Share your experience
  • 21
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    21
    Shares

ডা.তিলক পুরকায়স্থঃএক শীতার্ত রবিবারের সকালে, দুই পাগলের ফোনে আড্ডা চলেছে। সময় সকাল ছয়টা। বিষয়বস্তু- দিকশূন্যপুরের অহল্যাভূমি। একজন রয়েছে বাংলার এক প্রান্তে, আরেকজন ঝাড়খণ্ডে। উঠলো বাই তো কটক যাই। দুইজনে দুই দিক থেকে বেরিয়ে পড়ল। গন্তব্য অহল্যাভূমির যে কোন অসাধারণ গণ্ডগ্রামে। দিশেরগড় ব্রিজের ওপর দুজনের দেখা, সময় সকাল নয়টা। ঠিক হোল প্রথম গন্তব্য হবে কোন চোখে পড়ার মতন গ্রাম। রঘুনাথপুর হয়ে আদ্রার দিকে মোড় ঘুরে পঞ্চকোট রাজবংশের বর্তমান ঠিকানা, কাশীপুর পৌঁছানো গেল। মধ্যে অনেক সুন্দর জায়গা পেরিয়ে যাওয়া হয়েছে , অনেক সুন্দরীর সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছে। অনেককেই চোখে ধরেছে কিন্তু মনে ধরে নি। এতক্ষণ রাস্তা ছিল খুব সুন্দর, এবার ধরেছি কাশীপুর থেকে হুরা যাবার রাস্তা। রাস্তার অবস্থা কিছুটা খারাপ  তবুও মোটামুটিভাবে ঠিকই আছে। স্টিয়ারিং এ বসে, শাটল ককের মতন চোখ ঘুরছে ডাইনে, বাঁয়ে।

ঐতো সেই সুন্দরী , যাঁর খোঁজে বেড়িয়েছি। অসাধারণ, অপূর্ব, কত কত শব্দ অজান্তেই বেরিয়ে পড়ল। কেন অপূর্ব সেটা বুঝতে হলে একবার এই দিকশূন্যপুরের – দামনকেয়ারি গ্রামে আসতে হবে। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ি মাটির তৈরি, অসাধারণ শিল্পসুষমা মন্ডিত। প্রচুর মাটির বাড়ির ছাদ খড়ে ছাওয়া, এক অসাধারণ নস্টালজিক অনুভূতির প্রকাশ। একতলা এবং দোতলা বাড়িও আছে। খড় ছাড়া ছাদে  ব্যবহার করা হয়েছে মাটির টালি। এই গ্রামটি মূলত সাঁওতাল আদিবাসী অধ্যুষিত। এখানে জানিয়ে রাখি যে, সাঁওতালদের  কয়েকটি পদবি আছে যেমন বাস্কে, টুডু, হাঁসদা, সরেন, মুর্মু, হেমব্রম, বেশরা ইত্যাদি। এখানে  কারা কত ঘর রয়েছেন  তার কোন সদুত্তর উপস্থিত মেয়েরা দিতে পারলো না। মেয়েরাই কাঁচামিঠে রোদে বসে আমাদের কথায় হেঁসে কুটিপাটি হচ্ছে।

হাসির কারণ আমাদের টুটা ফুটা সাঁওতালি শব্দের প্রয়োগ।আমার তো মনে হলো, বাংলাই এঁদের মাতৃভাষা, যেরকম চমৎকার ঝরঝরে বাংলা বলছে সবাই। বাঙালিদের মতন এরাও বারো মাসে তে্রো পরব পালন করে । বাহা, বাদনা, সহরাই ছাড়াও আরেকটি উৎসবের নাম শুনলাম- পৌষনা। যদিও এঁদের ধর্ম সারি ধরম এবং সারনা ধরম, কিন্তু বাঙালি হিন্দুদের দোল দুর্গোৎসবের ভরপুর আনন্দ নেয় এরা। তাই জিজ্ঞেস করতে পারলাম না যে এখানে হুদূর দুর্গা বা দাসাই নাচ হয় কিনা ! মেয়েদের সবারই পরণে আধুনিক ছাপা শাড়ি কিম্বা স্কার্ট। ছোটবেলায় যেসব সাঁওতাল মহিলা দেখেছি, তাঁরা প্রায় সবাই দুটি আলাদা আলাদা কাপড়ের টুকরো পরিধান করতেন। সেই বিশেষ টুকরোগুলির নাম যদ্দুর মনে পড়ে- ফতা। এখানে কাউকে ফতা পড়তে দেখলাম না।

নির্মল বাংলা মিশনের অন্তর্ভুক্ত এই গ্রামটি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী এখানে প্রতিটি বাড়িতেই শৌচালয় আছে, অর্থাৎ মাঠে ঘাটে যাবার কোন ব্যাপার নেই। অবশ্য নির্মল গ্রাম তকমা পেতে হলে শুধু বাড়িতে শৌচাগার নির্মাণ করলেই হবেনা। প্রতিটি স্কুলে এমন কি অঙ্গনবাড়ি কেন্দ্রেও ছেলে ও মেয়েদের আলাদা শৌচালয় থাকতে হবে। হাটে বাজারে কিম্বা বাসস্ট্যান্ডের আসে পাশেও পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা আবশ্যিক। সে যাই হোক, এরকম আরো অনেক গ্রামই, নির্মল বাংলা গ্রামের তকমা পেয়েছে। তাহলে কেন এই গ্রাম আলাদাভাবে মনে ধরল ? না, তেমন কিছু বিশেষত্ব নেই এখানে ? আহামরি দোকানপাট, বাজারহাট, নদী পুকুর বেষ্টিত পিকনিকের স্থান এটি নয়। চাকরী বাকরির কোন সুযোগ নেই। পানীয় জল, উচ্চ শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার যথেষ্ট পরিমাণ অভাব আছে এখানে, যার দিকে নজর দেওয়া একান্তই কাম্য। এরকমই আরো ২০৯ টি গ্রাম আছে কাশীপুর ব্লকে।কাশীপুর থেকে প্রায় ১৩ কিমি এবং পুরুলিয়া সদর শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিমি দূরে অবস্থিত এই গ্রামটি।

সিমলা ধানারা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত তেরোটি গ্রামের একটি হচ্ছে এই দামনকিয়ারি গ্রাম। দামনকিয়ারি ছাড়া বাকি গ্রামগুলি হচ্ছে সিমলা, সুমাইডি, ভূল্যান্ডি, গোপালপুর ইত্যাদি।আগেই বলেছি এটি মুখ্যত সাঁওতাল আদিবাসীদের গ্রাম।২০১১ সালের সেনসাস রিপোর্ট অনুসারে তখন এই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ১৬৮০ জন। ২১৯ টি বাচ্চাকে নিয়ে তখন পুরুষ মানুষের সংখ্যা ৮২৫ জন এবং নারী ৮৫৫ জন। এই দিকশূন্যপুরের – দামনকেয়ারি গ্রামে কিন্তু শিক্ষার হার ভালোই, ২০১১ র রিপোর্ট অনুসারে সাক্ষরতার হার – পুরুষ: ৭০%, নারী ৪৭%।প্রায় ৫০% অধিবাসী চাষবাস সহ বিভিন্ন গ্রামীণ শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত। তবে চাষাবাদ হচ্ছে এদের মুখ্য জীবিকা।আরেকটি ভুল ধারণা আমার ছিল যে, সাঁওতাল রমণীরা যেহেতু অত্যন্ত কর্মঠ এবং ছেলেরা অনেকেই কুঁড়ের বাদশা, তাই উত্তর পূর্ব ভারতের মতনই হয়ত এঁদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। কিন্তু এঁদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম ভুল ধারণা ছিল। এঁরা যেমন মঙ্গলয়েড নয়, প্রোট অস্ট্রলয়েড; তেমনি এদের সমাজব্যবস্থা ও পিতৃতান্ত্রিক। অভাব আর অভাব, এতো বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার গ্রামের বারোমাস্যা ।

তবুও কি এমন বিশেষ ব্যাপার আছে দামনকিয়ারি গ্রামে এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে , যাতে আপনা আপনি আপনার চক্ষু বিস্ফারিত এবং দন্ত কৌমুদি উন্মুক্ত করে অন্তর থেকে বেরিয়ে আসবে- বাহ! কি দারুন। প্রথমেই চোখ টানবে এই গ্রামের প্রাণোচ্ছল মেয়েগুলি। যেমনি এরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, তেমনি এঁদের মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্য প্রীতি। সাঁওতালরা স্বভাবতই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু মুখ্যত এখানকার মেয়েরাই তাঁদের নিজের নিজের ঘর বাড়িগুলিকে- বাড়ির দেওয়াল, উঠোন এমন কি গোয়াল ঘরের দেওয়ালেও কি সুনিপুণ দক্ষতায়, অপরূপ শিল্প কর্ম ফুটিয়ে তুলেছে, না দেখলে বিশ্বাস হবেনা। এবং এসবই তাঁরা করেছেন স্রেফ মাটি, গোবর, তুষ এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক রঙের মিশেলে। শুধুমাত্র নির্মল গ্রামের তকমাতেই এঁরা সন্তুষ্ট নন। পুরো গ্রামটাই বড় রাস্তার উপর, অথচ কোন বাড়ির সামনে একফোঁটা নোংরা, বা কাঠ কুটো পড়ে থাকতে দেখবেন না। বাড়ির উঠোন অবধি চমৎকার করে গোবর লেপা এবং এমনি সুন্দর ভাবে চিত্রিত করা , এ আমার স্বচক্ষে দেখা। আরেকটা কথা, পর পর ওপেন এয়ার গ্যালারির যে ছবিগুলি দেখবেন, সেখানে কোন দুটি বাড়ির অলংকরণ এক ডিজাইনের দেখবেন না। প্রতিটি বাড়ির সামনে বসার জন্য একটি চমৎকার রক তৈরি করা হয়েছে।

জায়গা কম থাকলে নিদেনপক্ষে প্রবেশ দুয়ারের দুদিকে দুটি বসার চেয়ার তৈরি করা হয়েছে । সব মাটি দিয়ে তৈরি, ওপরে কালো রঙের প্রলেপ দেওয়া। হাত দিলে কালো সিমেন্টের মতন লাগে। এক বাড়ির সামনের চেয়ারে নাতি কোলে ঠাম্মার ছবি তুললাম। মাটির ঘর, খড়ের চাল, দেওয়ালে অসাধারণ চালচিত্র। অনেক বাড়িতে আবার হাঁড়ি কলসি উল্টো করে, বড় থেকে ছোট জ্যামিতিক সাযুজ্য রেখে, বিভিন্ন রকম রঙ দিয়ে, দারুন দারুন পিলার তৈরি করা হয়েছে।

ছেলেদের কাউকে প্রায় দেখতে পাচ্ছি না। একজন ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন টলতে টলতে, দিন দুপুরেই হাঁড়িয়া পান করেছেন বোঝা যাচ্ছে। হাঁড়িয়া পান কিন্তু সাঁওতাল সমাজের এক অত্যাবশ্যক বলা যায় সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে। সমস্ত রকম লোকাচার, দেশাচার এমন কি বিবাহ ঠিক হলেও হাঁড়িয়া পানের ব্যবস্থা থাকে। এই হাঁড়িয়া বা রাইস বিয়ার কিন্তু এঁরা নিজেরাই তৈরি করে ভাত এবং হরিতকী গেঁজিয়ে । শুনেছি যে এতে নাকি এলকোহলের মাত্রা কম থাকে। তাই হবে, সেজন্য দিন দুপুরে যাঁর পা টলছে, তিনি কিন্তু কোনরকম ভনিতা না করে কি সুন্দর করে হাঁড়িয়াকে শিল্পভাবনায় প্রকাশ করেছেন।দেখুন হাঁড়িয়া শিল্পের ক্রমবিকাশের রঙিন ছবি বাড়ির দেওয়ালে।

 

শেষ করছি শ্রী যুধিষ্ঠির বাস্কের গল্প বলে। একটি বিরাট মাটির বাড়ি, পুরো বাড়িটি চমৎকার রঙিন ডিজাইন করা। এই ডিজাইন কে করেছেন, যুধিষ্ঠির বাবু না তাঁর পরিবার জানি না। কিন্তু আমাদের সামনে যুধিষ্ঠিরবাবু মাটি ও গোবরের মিশ্রণ দিয়ে তকতক করে তাঁর বাড়ির বিশাল উঠোন নিকোচ্ছেন পরম মমতায়। বিশ্বাস করা মুস্কিল যে, কোন মাঝবয়সী পুরুষ মানুষের পক্ষে মাটি গোবর দিয়ে এমন মসৃণ করে উঠোন নিকোনো সম্ভব। এখানেই শেষ নয়, বিশাল উঠোন নিকোনোর পরে, শুরু করলেন ধান ঝাড়াই, ধান মাড়াই সব নিজহাতে। গন্ডগ্রামে থেকেও উনি আধুনিক বিজ্ঞানের সহায়তায় মেশিনের সাহায্য নিয়ে একা হাতে সব কাজ সুন্দর ভাবে সমাধান করছেন।

এই অসাধারণ পল্লীর অসাধারণ সুন্দর বাড়িগুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আছে এখানকার মাটির ঘরের সাব-পোস্টাফিস। আমি আজ অবধি মাটির ঘরের কোন পোস্টাফিস দেখিনি। রবিবার বলে পোস্টাফিস বন্ধ ছিল। পোস্টাফিসের ঝকঝকে বোর্ড এবং শূন্যে টাঙানো লেটার বক্স , এক ফিরে আসা অতীতকে মনে করিয়ে দিল।

 

ঋণ স্বীকার:

Damankiari Village in Kashipur(Puruliya) West Bengal.

 


Share your experience
  • 21
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    21
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।