ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বহুত্ববাদ হল ভারতের প্রজাতন্ত্রের শক্তি

Share your experience
  • 26
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    26
    Shares

 

সম্পর্ক মন্ডল

বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো গণতন্ত্র ভারতের মূল ভিত্তিই হল ধর্ম নিরপেক্ষতা ও প্রাদেশিক সংস্কৃতির বহুত্ববাদকে এক সুরে বেঁধে ফেলা। তবে তাতে যে বাধার সম্মুখীন হতে হয় না, তা কিন্তু নয়, প্রতি মুহূর্তে উগ্র ধর্মতাত্ত্বিক বাধা ও উত্তরের সাথে দক্ষিণের বা উত্তর-পূর্বের সাথে বাকি ভারতের সংস্কৃতির ভিন্নতার জন্য ভারতবর্ষ রোজই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে ভাষার হাতিয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, এই চ্যালেঞ্জের। শাসনতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হিন্দি বলয়ে হওয়ায় অঘোষিতভাবে তাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চালানো প্রয়াস স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই চলে আসছে। এই হিন্দি ভাষা বিরোধের মূল সংকল্পটি দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলিতে বিপুলভাবে দেখা যায়। গান্ধিজি এই সংঘাতের কথা অনেক আগেই বুঝেছিলেন তাই ১৯২০ দশকেই কংগ্রেসের প্রাদেশিক কমিটিগুলি ভাষার ভিত্তিতে গঠন করেন এবং কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে অঙ্গীকারবদ্ধ করেন যে ভারত স্বাধীন হলে  দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করা হবে।

কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথেই এই সুরের তাল কেটে যায়, পূর্বে প্রতিশ্রুত অঙ্গীকার কংগ্রেস ভুলে যায় স্বাধীনতা লাভের তাড়াহুড়োতে এবং ভারতবর্ষের অঙ্গ থেকে পাকিস্থানকে আলাদা করে দেওয়া হয়। তৎকালীন সময়ে অনেক নেতাও ভেবেছিল পাকিস্থান ভাগের সাথে সাথে এই ভারত বুঝি ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে!  কিন্তু ভারতের বহুত্ববাদে সচেতন কোটি কোটি মানুষ সেই ভাঙনকে বুক দিয়ে রুখেছে। দক্ষিণ ভারত চিরকালই উত্তরের ভারতের প্রাধান্য মেনে নেয় নি তাই ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের সূত্রপাত তাদের ধরেই ঘটে অন্ধ্রপ্রদেশে, অথচ গোটা ভারতবর্ষ সুদৃঢ় প্রশাসনিক ঐক্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক সুরে মিলিত হয়েছে।

তবে বিচ্ছিন্নতাবাদ যে মাথাচাড়া দেয় নি, তা কিন্তু নয়! স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েই নাগাল্যান্ডে যে বিচ্ছিন্নতাবাদ দেখা গিয়েছিল, পরে আশির দশকে পাঞ্জাবে ও নব্বইয়ে কাশ্মীরকে ভারত থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়া কোনভাবেই ভারতের জনগণ সফল হতে দেয় নি। ভারতের জনগণ হল বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের শরিক, যাদের ৬৯ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে গণতন্ত্রের আদর্শ তাদেরকে শ্রেষ্ঠ শাসন উপহার দিতে পারবে ( একটি সংস্থার দ্বারা সমীক্ষা করা হয়)। ধর্মীয় সংস্থার স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ ভারতের কাছে শেখা উচিত, এমনই অভিমত ব্যক্ত করেন বিশ্বের বহু রাষ্ট্রনায়ক, এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ তার বই ‘গাঁধী-উত্তর ভারতবর্ষ ‘ লিখেছেন -‘ ২০০৭ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন একজন মুসলমান, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একজন শিখ এবং শাসক পার্টির নেত্রী ইতালি-জাত একজন ক্যাথলিক।  দেশের সবচেয়ে বড়ো আইনজীবী ও চিকিৎসকদের অনেকেই এসেছেন খ্রিস্টান আর পার্শি সম্প্রদায় থেকে ‘।

বহুত্ববাদের এমন উদাহরণ বিশ্বে আর ক’টা আছে?  রাস্ট্র একটি তাহলে তার ভাষাও একটিই হওয়া উচিত, নাহলে সোভিয়েত রাশিয়ার মতো ভারতের ভাঙন ধরবে কিন্তু বাস্তবিকভাবে সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে গেলেও ভারতবর্ষ আজও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে সারা বিশ্বে টিকে আছে। ইতিহাসবিদরা সাবধান করেছেন আমাদের পাকিস্থানের উদাহরণ টেনে, যে পাকিস্থান ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হল, সেই পাকিস্থান আবার ভাষার ভিত্তিতে পাকিস্থান ও বাংলাদেশে ভাগ হয়ে গ্যালো। তাই ‘এক ভাষা, এক নেশন’ বানাতে গেলে ভারতে আজ ‘ এক ভাষা, উনত্রিশ নেশন’ তৈরি হতো। যাতে ভাষাকে ঘিরে প্রতিদিনই নিত্যনতুন মতানৈক্যের সাথে ভাষাগত সংঘর্ষ দেখা যেতো। যদিও জহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর পর ১৯৬৫ সালের ২৬ জানুয়ারি সারা ভারতের আন্তঃরাজ্য যোগাযোগের জন্য হিন্দিকে একমাত্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাতে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তীব্রতর প্রতিবাদ ও নিন্দার জন্য ১৫ দিনের মধ্যেই এই স্বীকৃতিদানকে তুলে নেওয়া হয়। ভারতের বিচারালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, সংসদ ও উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজিকে তুলে ধরা হয় এবং ইংরেজি সরকারের কাজের ভাষাতে পরিণত আঞ্চলিক ভাষার সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমে যায়। জহরলাল নেহেরু ও মহাত্মা গান্ধীর মতো কিছু মানুষ স্বাধীনতা লাভের পরেও ইংরেজিকে রেখে দেওয়ার জন্য আগেই সওয়াল করেছিলেন তখন বাকি নেতারা গেল গেল রব তুলেছিলেন অথচ আঞ্চলিকতা সংঘাত আটকাতে পরে এটাই সঠিক দূরদৃষ্টি বলে বিবেচিত হয়। গোপালকৃষ্ণ গোখলে একবার বলেছিলেন -‘ ইংরেজি ভাষা শিখলে সরকারি উচ্চ পদে কাজ পাওয়া, ধন সম্পত্তি লাভ করা এবং যারা বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে তাদের জন্য অবশ্য দরকার তাই স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব অনেক বেড়েছে ‘।

সত্তর বছর আগের স্বাধীন হওয়া ভারত, সার্বভৌম একটি দেশ, যার উত্তরে কাশ্মীরের জঙ্গি সমস্যা, উত্তর পূর্ব অঞ্চল কিছু অংশ বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং অরণ্য অঞ্চলগুলিতে মাওবাদ সমস্যা বাদ দিলে সারা ভারতের সব জায়গাতে যে কেউ বাস করতে পারে বা যে কোনও পেশাতে স্বাধীনভাবে কেউ জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কলকাতার দুর্গাপূজাতে একজন মারাঠি স্বচ্ছন্দে অংশ নিতে পারে অথবা পাঞ্জাবের ভাংড়া নাচের জন্য একজন মালয়ালম যুবক প্রয়োজনে পাঞ্জাবি যুবক সাজতে পারে। এত বৈচিত্র্য আর সৌন্দর্যের সংমিশ্রণকে দেখে বিদেশীরা বারবার আশংকা প্রকাশ করে এই ভারতের ভেঙে পড়ার কিন্তু ভারতবর্ষ তার আপন মহিমাতে মহিমাময়ী হয়ে আজও এগিয়ে চলেছে। এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত গীতিকার জাভেদ আখতারের কথা না বলে শেষ করতে পাড়লাম না,  তিনি বলেছেন -‘ সারা ভারতে একটাই সংস্কৃতি চলে, তার নাম বলিউডের হিন্দি সিনেমার সংস্কৃতি। এই সিনেমাগুলিতেই সারা ভারত সংমিশ্রিত হয়ে আমাদের সামনে উঠে আসে’।

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 26
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    26
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সম্পর্ক মণ্ডল

Samparka Mondal
সম্পর্ক মণ্ডল বর্ধমানজেলার গঙ্গাটিকুরি গ্রামের ভূমিপুত্র।এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত রসসাহিত্যিক পাঁচু ঠাকুর।সম্পর্ক কবি।প্রিয় বিষয় গ্রামবাংলার মানুষ আর গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি।সম্পাদনা করেন একটি সাহিত্য পত্রিকা।