দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব

Share your experience
  • 34
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    34
    Shares

শুভদীপ রায় চৌধুরীঃবঙ্গের প্রাচীন উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম এই রাস উৎসব। কলকাতার দুর্গাপুজো যেমন বিখ্যাত, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো যেমন বিখ্যাত ঠিক তেমনই শান্তিপুরের রাস উৎসব বিখ্যাত। শুধুমাত্র শান্তিপুরই নয় ;কলকাতা সহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাচীন মন্দিরে রাধাগোবিন্দের রাস উৎসব হয়।

শ্রীশ্রী রাধাশ্যামসুন্দর জীউ, খড়দহ

শ্রীশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সন্ন্যাস গ্রহণের পর গৌড়বঙ্গ পরিভ্রমণ করে বৃন্দাবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় খড়দহ এসেছিলেন(চৈতন্যভাগবত)।বেশকিছু দিন পর শ্রী নিত্যানন্দ মহাপ্রভু, মহাপ্রভুর ইচ্ছাপুরণের জন্য বসুধা-জাহ্নবাকে বিবাহ করেন ও খড়দহে বসবাস শুরু করেন। শ্রী নিত্যানন্দ মহাপ্রভু খড়দহকে বৈষ্ণবদের একটি তীর্থস্থানে উন্নীত করেন ও খড়দহকে একটি শ্রীপাটে পরিণত করেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভু খড়দহে এসে পুরন্দর পণ্ডিতের বাসগৃহে বসবাস শুরু করেন, সেই বাসগৃহে(বর্তমান নাম ‘কুঞ্জবাটি’) নিত্যানন্দের অষ্টমপুত্র বীরভদ্রজীর জন্ম হয়। বীরভদ্রজীই খড়দহে শ্যামসুন্দরের কষ্টিপাথরের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৭৫ খ্রীঃ রাজসাহী জেলার পদ্মানদীর তীরে মাতা জাহ্নবার নেতৃত্বে ধর্মমহাসন্মেলনে আরও কয়েকটি কৃষ্ণবিগ্রহ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। বৃন্দাবনের গোপীনাথ মন্দিরের রাধারানিকে দর্শনের সময় তাঁর(মাতা জাহ্নবা) মনে হয়েছিল রাধিকার উচ্চতা আরও একটু বেশী হলে ভালো হত। তাই তিনি গৌড়ে এসে নয়ন ভাস্করকে দিয়ে রাধিকা মূর্তি গড়িয়ে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দেন ওই সময় শ্যামসুন্দরের জন্যও একটি রাধিকামূর্তি তৈরি করানো হয় অষ্টধাতুর। এই মন্দিরের রাস উৎসব বিখ্যাত, বহু দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন শ্যামের মন্দিরে। রাসের ক’দিন শোভাযাত্রা করে বিগ্রহ নিয়ে যাওয়ার সময় সেবাইত ও ভক্তরা কীর্তন করতে করতে নাচতে থাকেন। চারদিন ধরে চলে এই উৎসব। বিগ্রহ তিনদিন তিন ভাবে সাজানো হয়। প্রথম দিন নটবর বেশ, দ্বিতীয়দিন রাজবেশ ও তৃতীয়দিন রাখালবেশ হয়। এইভাবে ঐতিহ্যের সাথে রাস উৎসব পালিত হয় শ্যামসুন্দর জীউ-এর মন্দিরে।

“ওই কালো পূর্ণশশী

চল্ না মোরা দেখে আসি।”

শ্রীশ্রীরাধাগোবিন্দ জীউ, পানিহাটি

পানিহাটি অঞ্চলের রাধাগোবিন্দ মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম এই রাসবাড়ির রাধাগোবিন্দ জীউ। সাবর্ণ গোত্রীয় গৌরীকান্ত রায় চৌধুরী এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। রাস উৎসব এই মন্দিরে তিনদিন অনুষ্ঠিত হয়। শুরু হয় কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতিথিতে শেষ হয় রাস পূর্ণিমাতিথিতে। রাধাগোবিন্দ জীউ রাসমঞ্চে আসেন সন্ধ্যাবেলায়। অতীতে মেলা অনুষ্ঠিত হত মন্দির প্রাঙ্গণে। রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে রাধাগোবিন্দ জীউয়ের তিনদিনের বিশেষ সাজসজ্জা হয়। সকাল থেকে পূজাপাঠ ভোগ নিবেদন ইত্যাদি নানান প্রাচীন নিয়মের মাধ্যমে পালিত হয় পানিহাটি রাসবাড়ির রাস উৎসব।

শ্রীরাধারমণ জীউ, বড়গোস্বামী বাড়ী(শান্তিপুর)

শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য্যের পুত্র বলরাম মিশ্রের পুত্র মথুরেশ গোস্বামীর প্রথম পুত্র রাঘবেন্দ্র গোস্বামী থেকে সৃষ্টি হয় বড়গোস্বামী বাড়ি। শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য্যের সেবিত নারায়ণ শিলা আজও বড়গোস্বামী বাড়িতে সেবা পান। মথুরেশ গোস্বামী বর্তমান বাংলাদেশের যশোহর থেকে শ্রীশ্রীরাধারমণ বিগ্রহ শান্তিপুরে এনে বড়গোস্বামী বাটীতে প্রতিষ্ঠা করেন। ভাঙারাসের পরের দিন বড়গোস্বামী বাড়ির সব যুগল বিগ্রহকে নানালঙ্করে সজ্জিত করে অনুষ্ঠিত হয় কুঞ্জভঙ্গ যা এক মনোরম অনুষ্ঠান। রাস উৎসবের এই তিনদিন বড়গোস্বামী বাড়ির শ্রীশ্রীরাধারমণ জীউ-এর দর্শনে বহু দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত আসেন।

শ্রীশ্রীগোকুলচাঁদ জীউ, হাটখোলা গোস্বামীবাটী(শান্তিপুর)

বর্তমানে এই ঠাকুরবাড়ির নাম মধ্যম গোস্বামীবাটী  মূল ফটকের সামনের উপরিভাগে লেখা আছে। শ্রীমন্দিরে সকল বিগ্রহ পূজিত হলেও মূলতঃ শ্রীশ্রীগোকুলচাঁদ জীউ ঠাকুর বাটী নামেই প্রসিদ্ধ। রাস উৎসবের সময় বিশেষ সাজসজ্জা হয় বিগ্রহের। রাস উৎসবের শেষদিন কুঞ্জভঙ্গ যা ঠাকুর নাচানো উৎসব বলে খ্যাত।

শ্রীশ্রী শ্যামসুন্দর জীউ, শান্তিপুর

এই আতাবুনিয়া গোস্বামী বাটীর প্রতিষ্ঠাতা শান্তিপুর পুরন্দর শ্রীমদ্বৈতাচার্য্যের পৌত্র দেবকীনন্দন গোস্বামী। কথিত আছে অদ্বৈত প্রভু শ্রীশ্রীরাধাশ্যামসুন্দর শ্রীবিগ্রহের প্রতিষ্ঠাকার্য স্বহস্তে করেছিলেন। অদ্বৈতাচার্যের নবম পুরুষ আনন্দ কিশোর গোস্বামী জন্মগ্রহণ করেন এই বংশে। নিত্যপূজিত শালগ্রামশিলা বক্ষে ধারণ করে দণ্ডি কাটতে কাটতে শ্রীক্ষেত্রধামে জগন্নাথ দর্শন করতে যান, যার ফলস্বরূপ বাংলা তথা ভারত বিখ্যাত মহাপুরুষ সদগুরু প্রভুপাদ শ্রীশ্রী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর জন্ম হয়। রাস উৎসব উপলক্ষে বহু ভক্ত ছুটে আসেন এই বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বাটীর শ্যামসুন্দর জীউকে দর্শন করতে।

শ্রীশ্রীশ্যামচাঁদ জীউ, শান্তিপুর

১৬৪৮ শকাব্দ(ইং ১৭২৪খ্রীঃ) খাঁ বংশীয় উত্তরপুরুষ রামগোপাল খাঁ শ্যামচাঁদ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। অখণ্ড বাংলার ইট গাঁথা মন্দিরের মধ্যে বৃহত্তম এই শ্যামচাঁদ মন্দির। বাংলার স্থাপত্য গৌরবে অদ্বিতীয় এই মন্দির। সামনের ভাগ সুচাল কারুকার্যময়। সুউচ্চ চূড়ায় ত্রিশূল ও ধাতুনির্মিত পতাকা শোভমান। রাধাশ্যামচাঁদ বিগ্রহের চরণতলে রামগোপাল, রামজীবন, রামভদ্র এবং রাইচরণ এই চার সহোদরের নাম খদিত আছে। শ্যামচাঁদ মন্দির আটচালা শ্রেণীর। উচ্চতা প্রায় ১১০ফুট, দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ৬৮ফুট। রাস উৎসব উপলক্ষে প্রচুর ভক্তের ভীড় দেখা যায় এই শ্যামচাঁদ মন্দিরে।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 34
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    34
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ রায় চৌধুরী

শুভদীপ রায় চৌধুরী
শুভদীপ রায় চৌধুরী, ১২বছর দক্ষিণ কলকাতার স্বনামখ্যাত বিদ্যালয় "বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়" থেকে পড়ার পর উত্তর কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে স্নাতক এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর, বিশেষ বিষয় ছিল-ভারতের আধুনিক ইতিহাস। তাছাড়া ২০১৬সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে স্বতন্ত্র গবেষণায় যুক্ত। বর্তমানে বহু পত্রিকায় যুক্ত স্বতন্ত্র লেখায়, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে নয় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখার কাজেও যুক্ত। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের ৩৬তম বংশধর