দুই বোনের দুর্গাপূজা

Share your experience
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    33
    Shares

কৌশিক রায় চৌধুরী

মেয়ে দুটির নাম শিবানী ও ভবানী। দুই বোন এবং বাল্য বিধবা। কৌলিন্য প্রথার শিকার। না কোন বিদ্যাসাগর মশাই নেই যে তাঁদের এই নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেন। কারণ তাঁর  আসতে তখন ঢের দেরি।  পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিধি-নিষেধের কাঁটার খোঁচায় মন প্রাণ রক্তাক্ত। অবশেষে  মুক্তির আশায় মাতৃ সাধনায় রত হলেন। পঞ্চবটীর নীচে পঞ্চমুণ্ডের আসনে বসে তন্ত্রসাধনায় ব্যাপৃতা হলেন দুই বোন। মন্ত্রের সাধন নইলে শরীর পাতন। কঠিন সে সাধনা। অবশেষে ধ্যান যোগে আদেশ পান দুর্গাপুজো করার। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ তাঁদের স্বপ্নের প্রতিমায় গণেশ কার্ত্তিকের স্থান হল না। ব্যতিক্রমী ভাবে সাত মূর্তির জায়গায় পঞ্চ মূর্তির পুজো শুরু হল। প্রতিষ্ঠাতা দুই বোন। দেবীর নামকরণ করলেন ভুবনেশ্বরী।

হ্যাঁ এটাই তালিবপুরের চৌধুরীবাড়ির দুর্গা পুজোর ইতিহাস। নবাবি আমলের অনেক আগে তালিবপুর গ্রামের ডাঙ্গাপাড়ায় চৌধুরীবাড়ির দুর্গাপুজো শুরু হয়। তালিবপুর মুর্শিদাবাদের একটি প্রাচীন জনপদ। কাগ্রামের (প্রাচীন কঙ্কভূক্তি) উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত  একটি বর্ধিষ্ণু মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম। প্রায় পঁচিশ শতাংশ হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, সদগোপ, বাগদি, নমঃশূদ্রের বাস।

চৌধুরীদের প্রকৃত পদবী চট্টোপাধ্যায়। এই বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান রূপচাঁদ চট্টোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দির (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রীঃ) সভাগায়ক ছিলেন। তিনি মূলত ধ্রুপদী সঙ্গীতের বিশারদ ছিলেন। বাঙলার বাইরেও এঁনার খ্যাতি ছিল। তাঁর পুত্র প্রাণকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ও সঙ্গীতের জগতে সুপন্ডিত ছিলেন।

মহালয়ার দিনেই ঠাকুর রঙ করার রীতি । মায়ের মূর্তিতে সাবেকি আনার ছাপ স্পষ্ট। টানা টানা ডাগর চোখে ডাকের সাজে সজ্জিত হয়ে মৃণ্ময়ী মা যেন চিন্ময়ী হয়ে ওঠেন। দুর্গার ধ্যান মন্ত্রে বলা আছে যে দুর্গার দেহের বর্ণ অতসী ফুলের রঙের মতো–
অতসীপুষ্প-বর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্ ,
নবযৌবন-সম্পন্নাং সর্ব্বাভরণ- ভূষিতাম্।।
তাই চৌধুরীবাড়ির দুর্গার গায়ের রঙ অতসী ফুলের রঙের মতোই করা হয়। ষষ্ঠীর দিন সকাল থেকেই পুজো আরম্ভ হয়ে যায়। ষষ্ঠী ও সপ্তমী দুদিন ধোপার পুকুর থেকে ঘট ভরে নিয়ে আসা হয়।   পুজোকর্তাদের মতে মহাষ্টমীর দিন সন্ধিপুজোর চূড়ান্ত মুহূর্তে বলিদানের স্থানের ঠিক মাথার উপরে শঙ্খচিলের আগমন ঘটে। যা উত্তর দিক থেকে এসে খানকয়েক পাক মেরে আবার উত্তর দিকেই প্রস্থান করে। কিন্তু সন্ধিপুজো রাতে হলে শঙ্খচিলের বদলে শেয়ালের দেখা মেলে। এমন কত গল্প শোনা যায়। আগে ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত চারদিন পাঁঠা বলি হতো। আর নবমীতে পাঁঠার সাথে মহিষ বলি দেওয়া হতো। আনুমানিক ১৯৫০ সাল নাগাদ পাঁচকড়ি চৌধুরী মহাশয় সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে ও সাহসে ধর্মের নামে পশুবলি বন্ধ করে দেন। সেইসঙ্গে পূর্ব বর্দ্ধমান জেলার গঙ্গাটিকুরী গ্রামের টোলের পরামর্শে তিনি চালকুমড়ো ও আখ বলির প্রচলন করেন। ষষ্ঠী, সপ্তমী, মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোয় চালকুমড়ো বলি হয়। আগে নবমীতে জোড়া পশু বলি হতো (পাঁঠা এবং মোষ) সেকথা আগেই বলেছি। বর্তমানে তার জায়গায় চালকুমড়ো ও জোড়া আখ বলি হয়।


পূর্বে তালিবপুরের চৌধুরীরা ধনী ছিলেন। পুজোর পাঁচ দিন ধরেই নরনারায়ণ সেবা চলত। পঞ্চ-গ্রামের লোক আসত প্রসাদ খেতে। সে এক এলাহি ব্যাপার। সঙ্গে চলত গান বাজনার আসর। শুনে গাল গল্প মনে হতে পারে। এখন চৌধুরীদের আর কেউই তালিবপুরে থাকে না। বর্তমানে পাঁচকড়ি চৌধুরীর মেজ ও ছোট ছেলে যথা দেবব্রত ও ধর্মব্রত চৌধুরী পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য চৌধুরী বাড়ি কঠোরভাবে শাক্ত। বসত বাড়িতে ও দুর্গা মন্দিরে কোন তুলসী মন্দির নাই। আগে বাড়িতে হরিনামও ঢুকতে পেত না। এই বংশের বিয়ে, পৈতে, অন্নপ্রাশন সমস্ত কিছু মন্দির চত্বরে সংঘটিত হয়।

আজ থেকে চারশো বছর আগে দুই বঙ্গ ললনা পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে অভিনব প্রতিবাদ দেখিয়েছিলেন তা ইতিহাসে স্থান পায় নি ঠিকই কিন্তু তারই উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে চলেছে তালিবপুরের চৌধুরী বাড়ির দুর্গাঠাকুর।

তথ্যসূত্র:– ধর্মব্রত চৌধুরী ও দেবব্রত চৌধুরী, তালিবপুর।

 


Share your experience
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    33
    Shares

Facebook Comments

Post Author: koushik roychoudhury

koushik roychoudhury
কৌশিক রায় চৌধুরী পেশায় শিক্ষক,নেশায় ক্ষেত্রগবেষণা।