বাংলার লোকরামায়ণঃরাবনকাটা লোকনৃত্য

Share your experience
  • 63
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    63
    Shares

 

সুমনকুমার গায়েন

 

বাঁকুড়া জেলার অন্তগর্ত বিষ্ণুপুর নামটি উচ্চারিত হলেই  যে দৃশ্যকল্প আমাদের মননে উদ্ভাসিতহয় তা হল মল্লরাজাদের কাহিনী ও কীর্তি। এই মল্লরাজাদের দৌলতেই যে বিষ্ণুপুরের আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে সেই বিষয়ে বলার অবকাশ থাকে না। মল্লরাজদের নিদর্শন স্বরূপ পোড়ামাটি ও মাকড়া পাথরের   সৃষ্ট মদনমোহন, রাধাগোবিন্দ,  জোড়ামন্দির ,বৃহৎদুর্গ, ইত্যাদি সহ লৌহনির্মিত সর্বাপেক্ষা বৃহৎ দলমাদন কামান, মল্লরাজাদের অবসর  যাপনের অঙ্গ হিসেবে দশাবতার তাস, বিষ্ণুপুরীয় ঘরানার উৎকৃষ্টমানের সংগীতের ন্যায় ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক বহুবিধ উপভোগ্য বিষয়াদি বিষ্ণুপুরকে প্রাচীরের ন্যায় বেষ্ঠন করে রেখেছে।
এই প্রসঙ্গে বলা  যেতে পারে জীবনানন্দ দাশের বহুলচর্চ্চিত এই উক্তি….

“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি,
তাই পৃথিবীর রূপ খুজিতে  যাই না আর….”

জীবনানন্দ দাশের এই উক্তিকে পাথেয় করে বলা যেতে পারে বাংলা লোকশিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান। সমগ্র বাংলার আনাচে কানাচে জাল বিন্যাসের ন্যায় ছড়িয়ে রয়েছে লোকশিল্প ও সংস্কৃতি।যা একে অপরের পরিপূরক, তথা বাংলার  রূপের অঙ্গ। এমনি মোহময় রূপের আলোকশিখায় দীপ্ত হয়েছে বাংলার প্রত্যেকটি জেলা, বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর যার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। বিষ্ণুপুর ঘরানার লোকজশিল্প ও সংস্কৃতির নিগূঢ় রূপ হিসাবে ‘রাবনকাটা’ যেকোন শিল্পবেত্তার কাছেই  যথেষ্ঠ মনোগ্রাহী বিষয়, এমন এক সুপ্রাচীন লোকনৃত্য বিষ্ণুপুরবাসীর নয়নের মনির মতনই আজও উজ্বল।

আশ্বিনে বাঙালির শ্রেষ্ট উৎসব  দুর্গাপুজোর শেষলগ্নে মুলত বিষ্ণুপুর অঞ্চলে এই রাবনকাটা উৎসব জাঁকজমক ও উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। দশমী থেকে দ্বাদশী পর্যন্ত সময়টিতে মল্লরাজভূমে কান পাতলেই শোনা যায় ফিকে হওয়া নাকাড়া,টিকারা,কাঁসি, ঝাঁঝরের শব্দ ক্রমশ পষ্ট হয়ে এগিয়ে আসছে, সঙ্গে আসছে একটি শোভাযাএা। যার প্রথম সারিতে রয়েছে  জাম্বুবান, বিভীষন, হনুমান, সুগ্রীবের ছামধারী(মুখোশ) দলের সাথেই বাদ্যযন্ত্র বাদকের একটি ছোট্ট দল।যে দলের সাথেই মালার মতন যুক্ত হচ্ছে গ্রামের আঞ্চলিক  অধিবাসীরা, আট থেকে আশি বছরের সকলেই এই শোভাযাএায় শামিল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছামধারির দল এসে দাঁড়ালো এক গৃহস্থের দোড়গোড়ায়।গৃহকর্ত্রী হেঁসেল থেকে তার বছরদুয়েকের সন্তানকে কোলে করে হাসিমুখে বেরিয়ে এসে তুলে দিল ছামধারী জাম্বুবানের কোলে, তারস্বরে শিশুটি কেঁদে উঠলে সেই সঙ্গে বেজে উঠলো নাকারা,টিকারা,কাঁসা,আওয়াজ, শুরু হল এক বিশেষ ভঙ্গিমায় জাম্বুবান, বিভীষন, সুগ্রীব ও হনুমানের  নৃত্যের সাথে গ্রামবাসীদের উল্লাস। কিছুক্ষণ এমন নৃত্য চলার পরে জাম্বুবান তার কোল থেকে সন্তানকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিল।হাসিমুখে গৃহকর্ত্রী কিছু অর্থ প্রনামী হিসেবে ছামধারির হাতে তুলে দিলে, আবার কখনও  কখনও ওই মুখোশধারির পোশাকের থেকে পশমের ন্যায় লোম ছিড়ে নিয়ে নিজেদের কাছে  রাখে।  আবার সেই শোভাযাএা এগিয়ে চললো অন্য কোন গেরস্থের উদ্দেশ্যে।বিশেষত যখন দশেরাকে কেন্দ্র করে রাবণদহন উৎসবে ভারতের বিভিন্ন অংশের জনজাতি মাতোয়ারা হয়ে ওঠে, তখন মুলত বাংলার এমনই প্রচলিত পরম্পরাকে সামনে রেখে  বিষ্ণুপুরবাসী পালন করে  আসছে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাবণকাটা পরব বা উৎসব।

মল্লরাজাদের সমসাময়িক প্রায় চারশো বছরের প্রাচীন এই মুখানাচ মুলত বিষ্ণুপুরের অন্তজ সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী লোকেরা বংশপরম্পরায় অংশগ্রহণ করে থাকেন।যাদের হাত ধরেই এই লোকনৃত্যশিল্প বেঁচে রয়েছে তারা হলেন সুকুমার অধিকারী, নারায়ণ বারিক, মিঠুন লোহার, রঞ্জিত গড়াই। এদেরকে বাদ্যযন্ত্র (টিকারা,নাকারা,কাঁসি,ঝাঝ)বাজিয়ে সঙ্গ দেন সনাতন ধাড়া, শ্যামাপদ পন্ডিত,মধু দাস, ও তারাপদ ধাড়া।তাদের সঙ্গে থাকেন দলের ম্যানেজার জয়দেব দও। সারাবছর  এই ধরনের শিল্পীরা বিভিন্ন পেশায় জড়িত থাকেন, যেমন কেউ আইসক্রিম বিক্রি,রাজমিস্ত্রি কাজ,সব্জি বিক্রি আবার কেউ চুন বিক্রি করে এনারা নিজেদের সংসার চালান।

কথিত রয়েছে একটা সময় ছিল যখন মল্লরাজ-রাজারা এই লোকনৃত্য ও লোকশিল্পের জন্য বরাদ্দ প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করতেন।বর্তমানে বিষ্ণুপুরের সাধারন জনগণ তাদের সাধ্য মতন অর্থ প্রদান করে থাকেন এধরনের লোকপ্রসিদ্ধ পরম্পরাকে  সচল ও বহমান রাখতে।

প্রচলিত এইধরনের লোকনৃত্যে ব্যবহৃত মুখোশগুলি হল জাম্বুবান(কালো রং ), বিভীষন (লাল রং),সুগ্রীব (সাদা রং), হনুমান (সাদা রং)।

জাম্বুবান- এটি মুলত কালো রং এর হয়ে থাকে।মুখোশের নাকের অংশের গড়ন অনেকটা লম্বাটে ধরনের।কালো রঙের ওপর হলুদ ও লাল রেখার মাধ্যমে ভ্রু, চোখ, ঠোটের অংশ চিএিত করা। হলুদ রং দিয়ে গালের দুই পাশে ফুলের মোটিভ এবং সমগ্র মুখমন্ডলে পোল্কা ডটের ন্যায় করা অলংকরণ দেখা যায়। দাঁতের অংশটি খোদাই করে বার করা থাকে। মুখোশের ওপরে অংশে  কপালের দুই পাশে ‘সীতারাম’ নামক একটি লেখার  অংশের উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়।মুখোশের সঙ্গে লাগানো থাকে পশমের ন্যায় কালো চুল

 

বিভীষণ– এই মুখোশটি  সাধারনতঃ লাল রঙের।ডিম্বাকৃতি আকারের এই মুখোশটির বিস্ফারিত চোখ,নাকের নীচের  অংশে  কালো রং দিয়ে করা মোটা গোঁফ, এবং ঠোঁটের নীচে সাদা রং দিয়ে আঁকা দাঁত। এই মুখোশের মাথার ওপরের অংশে কপালের দুই পাশে ‘সীতারাম’ লেখার উল্লেখ দেখা যায়। এছাড়া মাথার অংশে সাদা রং দিয়ে রেখার মাধ্যমে করা মুকুটের ন্যায় অলংকরণ দেখা যায়, যা এই মুখোশটিকে অন্য মুখোশগুলির থেকে পৃথকভাবে চিনতে সাহায্যে  করে।এই মুখোশের চুলের রং লাল।

সুগ্রীব ও হনুমান- এই মুখোশগুলির রং সাদা। ডিম্বাকৃতির ন্যায় এই মুখোশগুলিরও কালো  বিস্ফারিত চোখ, কালো গোঁফ এবং দাতের অংশটি খোদাই করা। চুলের অংশটির রং হলদেটে সাদা।

মুখোশগুলি গামার জাতীয় নরম কাঠের তৈরী। মুখোশের মাথায় লাগানো হয় পশমের ন্যায় রঙিন চুল।প্রতেকটি মুখোশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নৃত্যশিল্পীরা পরিধান করেন লোমশ পোশাক।মাথায় একখণ্ড কাপড়কে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে পরিধান করা হয় মুখোশগুলিকে।এরপর শুরু হয় জাম্বুবান,বিভীষন,সুগ্রীব,হনুমানের সমবেত নাচ।সঙ্গে বাজানো হয় টিকারা, ঝাঝ,কাঁসি ইত্যাদি। নৃত্যের সময়ে অনেকে প্রচলিত লোকাচার অনুযায়ী ছামধারির পোশাক হতে পশমের লোম ছিড়ে নিজের ঘরে রেখে দেন, এতে  অনেকের বিশ্বাস দূষিতজ্বর থেকে পরিবারের পরিজনেরা রক্ষা পাবে। প্রতি বছর দশেরার প্রাকালে নবরূপে মুখোশগুলিকে রং করা হয়।
রাবণকাটাকে কেন্দ্র করে এই সময়ে বানানো হয় মাটির এক বিশালাকার রাবণমূর্তি ও সাজানো হয় রঘুনাথজীর রথ।  দশমী থেকে দ্বাদশী অবধি তিনদিনব্যাপী এই ছামধারির দল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটি ঘরে ঘুরে নাচ দেখিয়ে সামান্য  অর্থ উপার্জন করেন,এবং অনুষ্ঠানের শেষ দিন অথাৎ দ্বাদশীর রাতে বিষ্ণুপুরবাসী সমবেত হয় কাটানদার রঘুনাথজীর মন্দিরচত্তরে। সাজানো হয় অষ্টধাতুর রঘুবীর মূর্তি এবং ওই মূর্তিকে সাজানো রথে বসিয়ে নিয়ে বিশালাকার শোভাযাত্রা সহযোগে  জাম্বুবান,বিভীষন,সুগ্রীব,হনুমানের সাথে নিয়ে  গ্রামবাসীরা উল্লাস করে এগিয়ে চলে রাবণের উদ্দেশ্যে।জাম্বুবানের হাতে থাকা তলোয়ার দ্বারা রাবণের মস্তকছেদ করবার মধ্যে দিয়ে রাবণকাটা উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী উৎসবের শেষে মাটির বিশালকার রাবণমূর্তিকে ভেঙে ফেলা হয়।তারপর প্রথা মেনে গ্রামবাসীরা  অনেকে এই মাটি  সঙ্গে করে ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখেন,সংসারের শুভকামনার্থে।

বিজয়া দশমীর মূহুর্তে  বির্সজনকে কেন্দ্র করে  যখন বাংলার অন্যএ শোনা যায় বিষাদ মেশানো ঢক্কানিনাদ, তখন সমগ্র বিষ্ণুপুরবাসী দৈত্যরূপী রাবণকে কাটার মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তি বিনাশের আহবানে জাম্বুবান, হনুমান,সুগ্রীব, বিভীষনকে সঙ্গে নিয়ে মেতে ওঠে ঝাঝ, টিকারার শব্দে ঐতিহ্যময় প্রাচীন সংস্কৃতিকে আজও চলমান রাখার গর্বে।

তথ্য সহায়তা – সুকুমার অধিকারী,স্রেয় সেনগুপ্ত
কৃতজ্ঞতা স্বীকার- গুরুপ্রসাদ দে, সৌম্য সেনগুপ্ত

ছবি-লেখক। (রাবণকাটার নাচের মূহুর্তের)

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 63
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    63
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সুমনকুমার গায়েন

সুমনকুমার গায়েন
,সুমন কুমার গায়েন, ২০১৫ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যকলা বিভাগ(ছাপাই চিএ) থেকে স্নাতক পাঠ শেষ করে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর কলাভবনের ছাপাই চিএ বিভাগ হতে ২০১৭ সালে স্নাতকোত্তর পাঠ সম্পূর্ণ করেছেন।ছাপাইচিত্র অনুশীলনের পাশাপাশি এবং বঙ্গদর্শন,কৌলাল এর মতনই লোকশিল্প বিষয়ক পএিকাগুলির পাঠক হওয়ার সুবাদে এবং বাংলার গ্রাম ঘোরার পাশাপাশি লোক শিল্পের প্রতি একপ্রকার ভালবাসা, থেকে এই লোকশিল্পর ওপর লেখার আগ্রহ।