গঙ্গাদিত্য পুজো-মুর্শিদাবাদের অমরকুণ্ড গ্রামে প্রাচীন সূর্যোপাসনা

Share your experience
  • 730
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    730
    Shares

গঙ্গাদিত্য পুজো-মুর্শিদাবাদের অমরকুণ্ড গ্রামে প্রাচীন সূর্যোপাসনার দৃষ্টান্ত। এক সহকর্মীর কাছে নবগ্রাম ব্লকের অন্তর্গত অমরকুন্ড বা অমৃতকুন্ড গ্রামে গঙ্গাদিত্য মন্দিরের কথা শুনেছিলাম। গঙ্গাদিত্য অর্থাৎ সূর্য মন্দির যেখানে পূজা হয় এরকম মন্দির বাঙলা তো বটেই ভারতেও বিরল। সেই মতই একদিন বেরিয়ে পড়া শীতের সকালে আমার সহকর্মী সন্তুকে নিয়ে। বহরমপুর রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ব্রীজ পার করে সোজা এগিয়ে চলে উপস্থিত হলাম রাধারঘাট মোড়ে। এখান থেকে বাঁদিকে একটি রাস্তা চলে গেছে কান্দীর দিকে। লিখছেন–শুভদীপ সিনহা।

 

গঙ্গাদিত্য সূর্যমূর্তি
গঙ্গাদিত্য সূর্যমূর্তি

গন্তব্য অমরকুন্ড

আমরা এগিয়ে চললাম সোজা। মেহেদীপুর মোড়ের আগে একটি রাস্তা বাঁদিকে চলে গেছে অমরকুন্ডের দিকে। ওই রাস্তায় গনির চায়ের দোকানে চা খেয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। বাসুদেবপুর বাস স্ট্যান্ড পার করে চয়ননগর পার করে অমরকুন্ড গ্রামের মাঝামাঝি একটা জায়গায় গঙ্গাদিত্যের মন্দিরে এসে উপস্থিত হলাম। দূরত্ব বহরমপুর থেকে মোটামুটি ২৪ কিমি, সময় রাস্তায় জ্যাম না থাকলে ৪৫ মিনিট লাগে।

গঙ্গাদিত্য মন্দিরে

মুর্শিদাবাদের নবগ্রামের অমরকুন্ডে গ্রাম্যদেবতা গঙ্গাদিত্যের মন্দির ব্যতীত একটি ভগ্নপ্রায় মন্দিরে বাসুদেব, কাত্যায়ণী ও নারায়ণের শিলামূর্তি আছে। খুব সম্ভবত পালবংশের রাজত্বকালের এই মূর্তি দুটি।  এই মন্দিরের উত্তরে আরেকটি ভগ্নপ্রায় মন্দিরে কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ আছে। আগে এই শিবলিঙ্গের নিত্যপূজা হত। এই মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে একটি বড় প্রস্তরখোদিত দ্বারের চারিদিক বেষ্টিত চৌকাঠ আছে। মন্দিরের বারান্দায় ওঠার ধাপে একটি বৃহৎ প্রস্তরখন্ড প্রোথিত আছে।

প্রতি বছর বৎসর সারা বৈশাখ মাসের সন্ধ্যায় মন্দির প্রাঙ্গন থেকে একটি হরিনাম সংকীর্তনের দল বাহির হয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। মন্দিরের আদিত্য বিগ্রহ সপ্তাশ্ববাহিত রথের উপর অরুণ সারথীর সাথে দন্ডায়মান সূর্যবিগ্রহ। পাশের বিগ্রহকে রঘুনাথ বিগ্রহ বলে পূজা করা হয়ে থাকলেও আদপে এটি অবলোকিতেশ্বর পদ্মপাণি বিগ্রহ বলেই মনে করা হয়। গ্রাম দেবতার নিত্যসসেবার জন্য দেবোত্তর সম্পত্তি আছে। শ্রাবণের শেষ রবিবার গঙ্গাদিত্যের অভিষেক হয়।

গঙ্গাদিত্য মন্দির
গঙ্গাদিত্য মন্দির

গঙ্গাদিত্য কেন?

অনেক আগে অমরকুন্ড গ্রামের কাছে দিয়ে ভাগীরথী প্রবাহিত হত।  সৌর ধর্মাবলম্বী এক শ্রেণীর ব্রাহ্মণ গঙ্গার পশ্চিমতীরের অদূরে অমরকুন্ড গ্রামটিকে পানিকুন্ড নাম দিয়ে বসতি স্থাপন করেন বলে অনুমান করা হয়। তাদের উপাস্য আদিত্যদেব(সূর্য) শিলামূর্তি গঙ্গার নৈকট্য কারণে গঙ্গাদিত্য নামে এই গ্রামের গ্রাম্যদেবতা হিসাবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হন। বঙ্গদেশে বর্গীর অত্যাচারের আগে অবধি এই গ্রাম বৈদিক ব্রাহ্মণদের আশ্রম বলেই বিবেচিত হত।

গঙ্গাদিত্য ও বর্গিহাঙ্গামা

মুর্শিদাবাদের নবাব আলীবর্দী খাঁ বর্তমান তেলকর বিলের পশ্চিমদিকে চৈনখাঁ নামে জনৈক সৈনাধ্যক্ষের অধীনে চৈনগড় বা চয়েননগরে একদল সৈন্য প্রেরণ করে বর্গীর অত্যাচারের নিবারণের জন্য একটি ঘাঁটি তৈরি করেন। কিন্তু এত চেষ্টা সত্ত্বেও বর্গীর অত্যাচারের হাত থেকে এই গ্রামের অধিবাসীরা রেহাই পায়নি। গ্রামের নিপীড়িত ব্রাহ্মণগণ বাধ্য হয়ে জন্মভূমি ত্যাগ করে পূর্ববঙ্গে গিয়ে বাস করতে আরম্ভ করেন। কিছুকাল পরে অবশ্য আবার কিছু কিছু ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা এসে এখানে বসতি স্থাপন করেন।

 গ্রামের নাম কেন অমরকুণ্ড

অমরকুন্ড গ্রামের নামকরণ সম্পর্কে একটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। পুরাকালে রাজা বিক্রমাদিত্য(দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছদ্মবেশে দেশ ভ্রমণকালে বেরিয়ে সন্ধ্যার সময় এই গ্রামে এসে উপস্থিত হন। সন্ধ্যাকালে আরতি এবং কাঁসর ঘন্টার শব্দে মুগ্ধ হয়ে গ্রামে রাত্রি যাপন করার অভিপ্রায়ে এক জনৈক পন্ডিতের গৃহে আশ্রয়প্রার্থী হন। রাত্রিকালে তিনি গ্রামের চোদ্দটি টোলের সংস্কৃত এবং ধর্মশিক্ষার পদ্ধতি শুনে এবং গ্রামদেবতার বিষয় অবগত হয়ে গ্রামের নাম পাণিকুন্ডের বদলে অমরকুন্ড করেন এবং গ্রামদেবতার নিত্যসেবার জন্য ভূমিদান করেন।

গঙ্গাদিত্যর অভিষেক উৎসব

প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার সাড়ম্বরে গঙ্গাদিত্যের অভিষেক উৎসব পালিত হয়। উৎসব উপলক্ষে গ্রামের প্রত্যেক গৃহস্থ প্রাতঃকালে অন্তত এক কলসী গঙ্গাজল, দুধ, পূজার জন্য আতপচাল, চিনি, ঘি ইত্যাদির নৈবেদ্য নিয়ে মন্দিরে আসেন। দ্বিপ্রহরে গঙ্গাদিত্যের শিলামূর্তি মন্দিরের বাইরের বারান্দায় একটি উচ্চ কাঠের আসনে রেখে ঘি, চন্দন, কুমকুম ইত্যাদি সুগন্ধ দ্রব্যের দ্বারা মার্জিত করা হয়। তারপর সেবায়েত যথাক্রমে ১০৮ কলসী দুধ, ১০৮ কলসী গঙ্গাজল এবং শেষে ৮ কলসী পুষ্করিণীর জল ঢেলে অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

গঙ্গাদিত্য মন্দিরের বহির্ভাগ
গঙ্গাদিত্য মন্দিরের বহির্ভাগ

আরও পড়ুন- হিলোড়ার শ্যামসুন্দর- রামায়েত সন্ন্যাসী ও আসর উন্নেসা বেগম

গঙ্গাদিত্যর পুজো

পরে সূর্য্যস্তব পাঠ এবং খিচুড়ি ও পায়সান্ন ভোগ দিয়ে ষোড়শোপাচারে পূজা হয়। অপরাহ্নে গৃহস্থরা দলে দলে খিচুড়ি ও পায়েস ভোগ সেবায়েতের কাছ থেকে নিয়ে যান। মানত দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা যে কোন রবিবারে দুধ, আতপ চাল এনে সেবায়েতের কাছে দিলে সেবায়েত সেটা দিয়ে পায়েস তৈরি করে গঙ্গাদিত্যের কাছে নিবেদন করেন। এটাই মানত পূরণের পদ্ধতি। বর্তমান সেবায়েত সুমনবাবু যথেষ্ট আমাকে সাহায্য করেছেন বিবিধ চিত্র ও তথ্য দিয়ে। তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

ছবি–লেখক

আরও দেখুন কৌলালের তথ্যচিত্র

 

 


Share your experience
  • 730
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    730
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ সিনহা

শুভদীপ সিনহা
শুভদীপ সিনহা।সরকারি আধিকারীক।ক্ষেত্রসমীক্ষক ও লোকসংস্কৃতি চার্চায় বিশেষ আগ্রহী।