গাড়সি ব্রত- প্রাগার্যসংস্কৃতির লোক ইতিহাসের অমূল্য উপাদানে সমৃদ্ধ

Share your experience
  • 138
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    138
    Shares

গাড়সি ব্রত মঙ্গলদীপ
গাড়সি ব্রতে মঙ্গলদীপ

গাড়সি ব্রত- প্রাগার্যসংস্কৃতির লোক ইতিহাসের অমূল্য উপাদানে সমৃদ্ধ।বার মাসে তের পার্বনের বাংলায় প্রকৃত পক্ষে পার্বনের সংখ্যা বিচার করলে বলতে হয় বার মাসে বাহাত্তর পর্ব । যদিও এক দুই করে গুনলে সংখ্যাটা বাহাত্তরেও কুলোবে কিনা কে জানে ।এমনি একটি ব্রত হলো গাড়সি ব্রত বা গাড়ু সংক্রান্তি । এটা পূর্বতন পুব বাংলার একটি ব্রত । আশ্বিন সংক্রান্তির ভোর বেলায় অলক্ষ্মীকে বিদায় দিয়ে লক্ষ্মী ঠাকরুকে আহ্বান করেন গৃহস্থ রমণীরা- নানা প্রাচীন লৌকিক অনুষ্ঠান এর মধ্যে দিয়ে । লিখছেন–ময়ূখ ভৌমিক।

 আশ্বিন সংক্রান্তিতে গাড়সি ব্রত

আশ্বিন মাসের শেষ দিন ভোরের আলো ফুটতেই উঠানে একটি জল ভর্তি ঘটি বা গাড়ু বসিয়ে দেওয়া হয়। জলের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয় সর্ষের তেল। এবার একটি প্রদীপ জ্বেলে সামনে রাখা হয় । বাড়ির গিন্নি ছোট ছোট পাটকাঠির টুকরোতে আগুন ধরিয়ে ছেলে মেয়েদের হাতে দেন। তারপর সবাই সমবেত ভাবে বলেন অলক্ষ্মী দূ্রে যাও / লক্ষ্মী ঠাকরুন ঘরে আসো । তিন বার একই কথা বলে জলন্ত পাটকাঠি বাড়ির বাইরে ফেলে দেওয়া হয় । এটা অলক্ষ্মীকে বিসর্জন দেওয়র প্রতীকী অনুষ্ঠান। এই সময় ছোট ছেলে মেয়েরা কুলো বাজায়। অঞ্চল ভেদে জলন্ত পাটকাঠি দিয়ে মহিলা ও শিশুরা ধূমপানের অভিনয় করে ।

 গাড়সি ব্রত–নানা লোকাচার

এরপর বাড়িতে ফিরে চার দিকে গোবর বা গঙ্গা জল ছড়া দেওয়া হয় । একটি কাঁচা তেঁতুল প্রদীপের আগুনে পোড়ানো হয়, প্রদীপের শিখা থেকে কাজল পাতা হয় । একটি ছোট রেকাবিতে নিম পাতা /পাট পাতা, আখের গুড়, কাঁচা হলুদ টুকরো, কাঁচা তেঁতুল টুকরো, ভেজানো ছোলা, মটর ইত্যাদি (আগের দিন যোগাড় করে রাখা )নিয়ে ঘটি বা গাড়ু র সামনে বসে, প্রথমে নিম /পাট পাতা দাঁতে চিবিয়ে ফেলে দিতে হয় । এর পর ঘটির তেল জলে মুখ ধুয়ে চোখে কাজল ও ঠোঁটে তেঁতুল পোড়া দেওয়া হয় ।

 লোকসংস্কৃতি

বাড়ির গৃহিনী কাঁচা হলুদ মেখে, ঘটির তেল জল আর গরম ঠান্ডা জলের মিশ্রনে স্নান করে এসে (অনেক সময় স্নান না করে মাথায় জল ছিটিয়ে )এসে হাতে ছোলা মটর গুড়, হলুদ, ও তেঁতুলের টুকরো নিয়ে তিন বার উঠানে নির্দিষ্ট জায়গায় দেন ও বলেন আশ্বিন যায় /কার্তিক আসে /লক্ষী ঠাকরুন গর্ভে বসে । এর পর বাড়ির সবাই ওই ছোলা মটর গুড় হলুদ তেতুল খায় l এদিন বাড়িতে নিরামিষ রান্না হয় l বাড়ির সবাই কেই হলুদ মেখে, তেলে জলে স্নান করতে হয় । স্নান করার জলে একটু গরম জল মেশানোর প্রথা ও অনেকের দেখা যায় ।

 অঞ্চল ভেদে বিচিত্র লোকাচার

এই অনুষ্ঠান গুলোর আবার জেলা ভিত্তিক কিছু পরিবর্তন দেখা যায় । যেমন ঢাকা জেলার বিক্রম পুর অঞ্চলে বাড়ির গৃহিনী প্রশ্ন করেন, কে যায়? কে যায়? সন্তান স্থানীয় কেউ উত্তর দেয় গাড়সি যায় । গৃহিনী আবার বলেন যাইবার কালে কি দিয়া যায়? উত্তর হয় ডালে ডালে ফল দিয়া যায় । এই সময় বাড়ির কোনো বিশেষ গাছ যেটাতে আশানুরূপ ফল হচ্ছে না সেটার নাম করার চল আছে । বিশ্বাস– এতে পরের বছর ভালো ফল হবে । এছাড়া গরুর বাছুর, ক্ষেতের ধান ইত্যাদির কথা ও বলা হয় । প্রতিটি কামনা জানানোর সাথে সাথে গিন্নি একটি শুকনো পাট পাতা বা কোথাও কোথাও পাট এর আঁশ মাটিতে রাখেন ।

এর পর গৃহিনী জিগ্যেস করেন, কি নিয়া যান? ছেলে মেয়েরা সমস্বরে বলে, মশা মাছি, পুকা (পোকা ) মাকড়, ডাস পিঁপড়া নিয়া যায়।

 গাড়সি ব্রত -গাড়ুর ডাল

দুপুরে সমস্ত রকম সবজি দিয়ে মটর বা মুগ বা খেসারির ডাল রান্না করা হয় । তাতে ঘি ফোড়ন দিয়ে চিনার চাল এর ভাত সহযোগে খাওয়া হয় । এই ডাল আর ভাত ছাড়া অন্য কিছু এদিন খাওয়া বারণ, বিশেষ করে সর্ষের তেল এবং কোনো ধরনের মসলা, ফোড়ন ইত্যাদি । অবশ্য কোনো কোনো অঞ্চলে শুধু নিরামিষ খাবার এর প্রচলন আছে। সেক্ষেত্রে নিম বেগুন, তেঁতুলের টক, সমস্ত সবজি দিয়ে ডাল তৈরিতে এগুলো আবশ্যিক ।

গাড়সি ব্রতে অলক্ষ্মী পুজো

আবার কোনো কোনো অঞ্চলে গোবর মাটি দিয়ে অলক্ষ্মী মূর্তি তৈরী করে পুজো ও তারপর সেটি বিসর্জন করার প্রথা আছে । তবে যদি আশ্বিন সংক্রান্তির আগে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো সম্পন্ন হয়ে যায়, তবেই এই বিশেষ আচারটি পালন করা হয়। কারণ হিসেবে বলাহয় লক্ষ্মীরপুজো না হলে অলক্ষ্মী পুজো সম্ভব নয়, ( দ্রষ্টব্য-পরমেশ প্রসন্ন রায় এর মেয়েলি ব্রতের কথা ) ।

আট আনাজের ব্রত

সিলেট অঞ্চলে এই ব্রত টিকে আট আনাজের ব্রত বলে । সংক্রান্তির দিন আট রকমের আনাজ দিয়ে ডাল রান্না করে মাটির হাঁড়িতে রেখে দেওয়া হয় ও পর দিন ভোরে (পয়লা কার্তিক ) খাওয়া হয় । বলা হয়, আশ্বিনে রান্ধে /খার্তিক (কার্তিক )এ খায় /জেই বর মাঙ্গে /সেই বর ফায় (পায় )l

 গাড়সি ব্রত-কথা

ব্রত উপলক্ষে কোথাও কোথাও একটা ব্রত কথা বলা হয়, এক ব্রাহ্মণের পুত্রবধূ খুবই ধার্মিক ও আচার পরায়ণ ছিলেন। বধূর পুণ্যে ব্রাহ্মণের সংসারে কোনো অভাব নেই । এমন অবস্থায় ব্রাহ্মণী গত হলেন । ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণের চরিত্রে চাঞ্চল্য দেখা দিলো, সন্ধ্যা আহ্নিকে বসে শুধু দ্বিতীয় বিবাহের কথা চিন্তা করে । এই পাপের ছিদ্র দিয়ে অলক্ষ্মী ব্রাহ্মণকে আশ্রয় করলো কিন্তু ব্রাহ্মণের পুত্রবধূর পুণ্যের প্রভাবে বাড়িতে প্রবেশ করতে পারলো না । শেষে একদিন খুব সাজ গোজ করে সন্ধ্যা বেলা ব্রাহ্মণকে দেখা দিলো । বলল, আমি তোমার ঘরে আসতে চাই, কিন্তু তোমার বৌমার জন্য পারি ন। তোমার বৌমাকে বলো সকালে গোবর এর বদলে মাছধোয়া জল ছড়াতে, বাসি কাপড়ে রান্না করতে, সন্ধ্যা বেলা প্রদীপ না দিতে ।

তাহলেই আমি তোমার ঘরে আসবো । ব্রাহ্মণ সেই মতো হুকুম জারি করলো, কিন্তু বুদ্ধিমতী পুত্রবধূ তা শুনলো না । সে খুব ভোরে উঠে কেউ জাগার আগেই বাড়ি ঘর পরিষ্কার করে গোবর জল ছড়া দিলো, স্নান করলো আর সব নিরামিষ রান্না করলো । তারপর সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বেলে শঙ্খ বাজাতেই শোনে বাড়ির বাইরে কে যেন চিৎকার করে পালিয়ে যাচ্ছে । এদিকে ব্রাহ্মণ তো অপেক্ষায় অপেক্ষায় বসে আছে, কখন অলক্ষ্মী আসবে, চিৎকার শুনে ছুটে বেরিয়ে আসলো l এসে দেখে বিকট মূর্তি ধরে ও অলক্ষ্মী মরে পড়ে আছে । তখন ব্রাহ্মণ নিজের ভুল বুঝতে পারলো আর পুত্রবধূকে অনেক আশীর্বাদ করলো ।

এখনো এই দিন সন্ধ্যায় বাড়ির সদর দরজা, ঠাকুর ঘর, রান্না ঘর, গোয়াল, কলতলা, শৌচাগার, ইত্যাদি জায়গা য় প্রদীপ দেওয়া হয়।

 খেতি লক্ষ্মীর পুজো

উত্তর বঙ্গে রাজবংশী সমাজে এই দিনটি ডাক লক্ষী বা খেতি লক্ষী র পুজো বলে পালিত হয় । নিম, চালতা, জাম্বুরা (বাতাবি লেবু ) ইত্যাদি গাছের পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে ধানের ক্ষেতে ছড়ানো হয় । শেকড় শুদ্ধ ধান গাছ বাড়িতে এনে পুজো করে আবার খেতে পুনঃ রোপিত করা হয় l সন্ধ্যায় চালতার খোলায় প্রদীপ দিয়ে বাড়িতে ও ক্ষেতে দেওয়া হয় । উদ্দেশ্য পোকা মাকড় এর হাত থেকে কচি ধানের থোঁড়কে রক্ষা করা । একে বলে পাঁচকোল(চালতা ) বাতি l(আমাদের দেশের কৃষিজীবি মানুষদের এই ধরনের পরিবেশ বান্ধব কীট নাশক এর প্রয়োগ দেখলে অবাক হতে হয় )

 গাড়সি ব্রত -উৎস

এই বিচিত্র নামের ব্রতটি র উৎস সন্মন্ধে নিশ্চিত করে কিছু বলা না গেলেও, এর বৈশিষ্ট গুলো লক্ষ্য করলে একে প্রাক বৈদিক ঋতু উৎসব বলে অনুমান করা যায় ।সুদূর অতীতে যখন পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম বর্তমান রূপে বঙ্গ দেশে প্ৰতিষ্ঠা পায়নি, সেই সময় স্থানীয় কৃষি জীবি মানুষদের স্বাভাবিক উৎসব প্রবণতা ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ থেকে এই উৎসব এর জন্ম ।
আশ্বিন এর শেষে গ্ৰাম গঞ্জে এক রকমের পোকার খুব উপদ্রব হয় । বর্তমানে যেগুলো শ্যামাপোকা বলে পরিচিত । এগুলো ধানের খুব ক্ষতি করে । তাই এই পোকার হাত থেকে ধানকে রক্ষা করার জন্য এই মানুষেরা একটা উপায় বের করে, আগুন জ্বেলে ক্ষেতের ধারে, বাড়ির কোনায় কোনায় অন্ধকার এ রেখে দিলে পোকাগুলো আলোর সম্মোহনে ধংস হবে । এটাই কালক্রমে রীতি দাঁড়িয়ে যায় ।

পোকামাকড়

আদিতে পোকা মাকড় দমনে এই প্রদীপ বা আলো দেওয়া র প্রথা টি সম্ভবত সমগ্র কার্তিক মাস জুড়েই পালন করা হতো । এখনো আকাশ প্রদীপ হিসেবে যা অনেক জায়গায় টিকে আছে । প্রসঙ্গত, কার্তিক মাসের শেষে কার্তিক পূজার আগের দিন বা পূজার দিনে ও সন্ধ্যা বেলায় অনুরূপ ভাবে ছোট ছোট মশাল জ্বালিয়ে বাড়ির ছেলে দের দ্বারা ধান ক্ষেতের আলে পুঁতে দেওয়া র রীতি ও কোথাও কোথাও দেখা যায় l।

 আদি শস্যদেবী গাড়সি

এই গাড়সি সম্ভবত ছিলেন বঙ্গের পূর্ব তন শস্য দেবী । গাড়সি মানে নল যুক্ত গাড়ু।অতীতে বিশেষ ধরনের পুজোর ঘট বলেই মনে হয়। পরবর্তীতে পৌরাণিক লক্ষ্মী দেবীর প্রভাবে গুরুত্ব হারান l কিন্তু তবুও লোক জীবনে বিবর্তিত রূপে টিকে থাকেন অন্য নামে, অন্য রূপে । তাই বলা হয়, গাড়সি যায়, গাড়সি যায়, যাবার কালে কি দিয়া যায়? গাছে গাছে ফল দিয়া যায়, ইত্যাদি ।

আরও পড়ুন- বাবলাগাছ- অবহেলিত গ্রাম্য বৃক্ষটি জড়িয়ে আছে প্রাচীন ধর্মসংস্কৃতিতে

 ঋতু উৎসব

আবার এটা একটি ঋতু উৎসবও বটে । এই দিন থেকে হেমন্ত কাল শুরু, শীতের হওয়া বইতে থাকে বলে লোক বিশ্বাস । তাই আসন্ন শীতকে পরাস্ত করার কামনায় অনুষ্ঠিত হয় তেল জলে মুখ ধোয়া, গরম জলে স্নান, তেঁতুল পোড়া দেওয়া ইত্যাদি প্রাচীন জাদু বিশ্বাস মূলক অনুষ্ঠান । সমস্ত বছর যাতে খাবার জোগান ঠিক থাকে সেই কামনায় শীত ও গ্রীষ্ম দুই ঋতুর আনাজ (যেমন মুলো, ঝিঙে, কচু, ইত্যাদি ) দিয়ে ডাল রান্না করার প্রথা দেখা যায় ।

 দেখুন গাড়সি ব্রত আর ডাক সংক্রান্তির ভিডিও

 


Share your experience
  • 138
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    138
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ময়ুখ ভৌমিক

ময়ুখ ভৌমিক
ময়ূখ ভৌমিক।কোচবিহারে থাকেন।হোমিওপাথি চিকিৎসক।নেশা ক্ষেত্রগবেষণা।