মুর্শিদাবাদের গদাইপুর গ্রামের  পেটকাটি দুর্গা

Share your experience
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares

আশুতোষ মিস্ত্রীঃমুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘি থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত জঙ্গিপুর মহকুমার অন্তর্গত সমগ্র রাঢ় এলাকা জুড়ে মাতৃ মন্দিরের ছড়াছড়ি। প্রায় বেশির ভাগ গ্রামেই কালী মন্দিরে মা কালী পূজিত হন। এই দেখে অনুমান করা যায় রাঢ় অঞ্চলের এই এলাকা গুলিতে এক সময় শক্তি পূজার ব্যাপক প্রসার ছিল। যেমন হিলোড়া যাজিগ্রামের বিদ্যামাতা, রমাকান্ত পুরের রক্ষাকালী, সেকেন্দ্রার কৃষ্ণকালী, গাদি গ্রামের সিদ্বেশ্বরী কালী, হিলোড়ার মুক্তকেশী কালী, সিদ্ধিকালী গ্রামের সিদ্ধিকালী, বংসবাটি গ্রামের বৃদ্ধেশ্বরী ও রাজেশ্বরী কালী, খিদিরপুরের দুলাল কালী, বাড়ালার সিংহবাহিনী , নিস্তা গ্রামের কূপ কালী প্রভৃতি কালী মন্দির জঙ্গিপুর মহকুমাতে শক্তি পূজার প্রসারের কথা জানিয়ে দেয়। জঙ্গিপুর মহকুমার এই সব গ্রাম গুলিতে সেই সময় তন্ত্রচারী তান্ত্রিকদের ব্যাপক ভাবে আনাগোনা ছিল, তারই নমুনা গ্রামের এই কালী মন্দিরগুলি।

এই কালী প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে এবার দুর্গা প্রসঙ্গে আসা যাক। জঙ্গিপুর মহকুমায় দুর্গাপূজার কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই  গদাইপুর গ্রামের “পেটকাটি “দুর্গা মায়ের পূজার কথা বলতেই হবে। এই পূজা উপলক্ষে পাঁচ দিনের মেলা বিশেষ ভাবে পরিচিত হয়ে আসছে। গ্রামটি আখেরি নদীর ধারে অবস্থিত। গ্রামটি বেশ প্রাচীন গ্রামে বেশিরভাগ গোয়ালা , রাজবংশী ও ব্রাহ্মণদের বাস । প্রায় এক হাজার মানুষ বাস  এই গদাইপুর গ্রামে। সেখানেই এই ব্যানার্জী বাড়ির পারিবারিক পুজো , এখন পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে রূপ নিয়েছে সার্বজনীনের। রঘুনাথগঞ্জ শহর থেকে ভাগীরথী নদীর তিন কিলোমিটার জলপথ বেয়ে নৌকায় পৌছে যেতে হবে গদাইপুর গ্রাম। এছাড়া উমরপুর থেকে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে অজগর পাড়া মোড়  হয়ে গদাইপুর যাওয়া যায়।

প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন এই দুর্গা পূজা। গদাইপুরের মানুষ এই দুর্গা মা কে ” ভারতী” দেবী রূপে পূজা করে থাকেন। “পেটকাটি” চলতি নাম লোক মুখে প্রচারিত। ব্যানার্জী  বংশের প্রতিষ্ঠিত এই পেটকাটি দুর্গা মায়ের নামকরণ জানতে , এই বংশেরই পঞ্চম পুরুষ শ্রী প্রণয় কুমার ব্যানার্জী মহাশয় জানালেন –  এই বংশেরই ৯-১০ বছরের কিশোরী কন্যা অষ্টমী পূজার দিন নতুন শাড়ি পরে  মায়ের মন্দিরে সন্ধ্যা প্রদীপ দিতে আসার সময় দুর্গা মা তাকে খেয়ে ফেলেন। তারপর আর কোথাও মেয়েটির সন্ধান পাওয়া যায়না। রাত্রে দুর্গা মা মেয়েটির বাবাকে স্বপ্ন দেন , মা বলেন , ‘ ভয় নেই তোর মেয়ে আমার কাছেই আছে। মেয়েটির বাবা তখন বলে , কি করে বুঝবো মা যে আমার মেয়ে তোমার কাছে আছে। দুর্গা মা তখন বলেন, দেখবি আমার ঠোঁটের কোণে তোর মেয়ের কাপড় লেগে আছে। তারপর দিন সকালে দুর্গা মায়ের পেট কেটে জীবন্ত অবস্থায় মেয়েটিকে উদ্ধার করে হয়। সেই থেকেই দেবীদুর্গা এখানে পরিচিত হয় “পেটকাটি” দুর্গা হিসেবে।

এই পেটকাটি দুর্গা মায়ের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে জানতে ব্যানার্জী বংশের বংশধর শ্রী প্রণয় কুমার ব্যানার্জী বলেন-  তাঁর পাঁচ পুরুষ আগে শ্যাঁমচাদ ব্যানার্জী ও তার ও অনেক আগে থেকে বংশ পরম্পরায় পূজা হয়ে আসছে। তিনি জানান বর্তমান দালান মণ্ডপের আগে এই স্থানে চুন সুরকি গাঁথা ও টিনের ছাউনির মণ্ডপ ছিল। প্রায় ৫০ বছর আগে রঘুনাথগঞ্জের ছয়কড়ি সাহা নামে এক কন্ট্রাকটর বর্তমান দালান মন্দিরটি বানিয়ে দিয়েছিলেন। মন্দিরের পেছনে একটি পুকুর আছে , গ্রামের মানুষ সেই পুকুরকে পাগল পুকুর বলে থাকে। ভক্তদের মধ্যে আগত মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীরা এই পুকুরে স্নান করে ভালো হয়ে যান বলে জানা যায়। ব্যানার্জী পরিবারের বর্তমান সদস্যরা সারাবছর এই পাগলা রোগীদের সুস্থ্য করার জন্য গাছ গাছালি আয়ুর্বেদ ঔষধ দেন।  ঔষধ খেয়ে অনেক ভারসাম্যহীন রোগী সুস্থ্য হয়েছেন বা হচ্ছেন বলে জানা যায়।

পেট কাটি মায়ের নামে কোনো দেবোত্তর সম্পত্তি নেই । সবই ভক্তদের দান ধ্যানে পূজা চলে। সারাবছর নিত্য পূজা হয় মন্দিরে। শনি ও মঙ্গলবার ছাড়াও অন্য দিন অনেক ভক্ত আসেন। ভক্তরা সুস্থ্য হন দান ধ্যান করেন এবং অনেকে মায়ের কাছে মানত করে থাকেন। বর্তমানে ব্যানার্জী পরিবারে চারটি শরিক। তারা হলেন – আশীষ ব্যানার্জী, প্রণয় কুমার ব্যানার্জী, ভিক্টর ব্যানার্জি সদ্য পিতৃহীন কুশল ব্যানার্জী। প্রতি বছর এই চার পরিবারের একবার করে পালি পড়ে। এ বছর প্রণয় কুমার ব্যানার্জী মহাশয় পূজার দায়িত্বে আছেন। সারাবছর পরিবারের সদস্যরা নিত্য মায়ের পূজা পাঠ করে থাকেন , আর দুর্গা পূজার সময় বাইরের পুরোহিত এনে মায়ের পূজা পাঠ করান। দুর্গা পূজার সময় এই গদাইপুর গ্রামে বিরাট মেলা বসে। পাঁচ দিন ধরে চলে মেলা। হাজার হাজার ভক্তদের সমাগম হয় তখন।

রথের দিন  আখেরি নদী থেকে মাটি এনে গণকর গ্রামের প্রতিমা শিল্পী শ্রী জয়ন্ত চিত্রকর সম্পূর্ণ নতুন কাঠামোতে মাটি লেপন করে দুর্গা পূজার সূত্র পাত করেন। এ ছাড়া এই মন্দিরে নিত্য মায়ের পূজা হয়। এখানে  প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হলো প্রত্যেকের  মুখমণ্ডলের গড়ন এবং গোলাকৃতি টানা টানা চোখ। আর প্রতিমা গড়ার সময় পেট কাটার দাগ ও মায়ের ঠোঁটে রক্তের দাগ করে দেওয়া হয়।

এবার আসা যাক পূজা প্রসঙ্গে বোধনের দিন ঘট স্থাপন করা করা হয়।  শাস্ত্রীয় বিধান মেনে  পেটকাটি দুর্গা মায়ের পুজো শুরু হয় জীতাষ্টমী থেকে। দু-বেলা ঢাক, ঢোল, সানাই, বাজিয়ে ষষ্ঠী থেকে  চলে বিশেষ পুজো।  এই পূজা হয় শাক্ত মতে কালিকাপুরাণ অনুসারে সময় ধরে। ষষ্ঠীর দিন ফল মুলের ভোগের সাথে অন্ন ভোগ ও  বংশের কৌলিক মানত ছাগ বলিদানের মাংস ও মাছের রান্নার ভোগ নিবেদন করে পূজা করা হয়।

সপ্তমীর দিন সকালে আখেরি নদীর জলে নবপত্রিকা স্নান ও ঘট ভরে এনে সপ্তমী বিহিত পূজা আরম্ভ হয়। সপ্তমীতেও ফলমূলের ভোগের সাথে অন্নের ভোগ এবং মানতের ছাগ বলির মাংস ও মাছের রান্নার ভোগ নিবেদন করে পূজা করা হয়। পূজা কদিন বাদ্য যন্ত্র সহকারে রোজ সন্ধ্যায় মায়ের বিশেষ সন্ধ্যা আরতি করা হয়।

অষ্টমীতে মায়ের পূজায় ফুলমুলের ভোগের সাথে সম্পূর্ণ নিরামিষ অন্নভোগ খিচুড়ি ও পোলাও রান্নার ভোগ নিবেদন করে অষ্টমী বিহিত পূজা শেষ হয়।  সন্ধি পূজায় বাড়ির মানতের একটি ছাগ বলি দেওয়া হয়। ১০৮ টি পদ্ম ফুল ও প্রদীপ জ্বালিয়ে  মায়ের পূজা সম্পূর্ণ হয়।

নবমীতে ও ফুলমূলের ভোগের সাথে বলিদানের ছাগ বলির মাংস ও মাছের রান্নার ভোগ নিবেদন করে মায়ের নবমী বিহিত পূজা হয়। বাইরের ভক্তদের  মানতের ছাগ বলি শুধু মাত্র সপ্তমী ও নবমীতে দেওয়া হয়। প্রায় শতাধিক ছাগ বলি হয় নবমীতে। বাইরের কোনো বিশেষ ভক্ত যদি মায়ের কাছে মহিষ বলির মানত করে থাকেন তবেই সেই মহিষ বলি নবমীর দিন দেওয়া হয়। নবমীর দিন চাল কুমড়ো বলি দেওয়ার পর বলিদান পর্ব শেষ হয়। দশমীতে আখেরি নদীতে ঘট বিসর্জন করে মায়ের অপরাজিতা পূজা করা হয়। দশমীর দিন ঠিক রাত ১০ টায় মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নামিয়ে কাঠামো বাঁশ দিয়ে বেঁধে অনেক জন মিলে মাকে ঘাড়ের উপর নিয়ে আখেরি নদীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। বিসর্জনের জন্য আগে থেকে নৌকা এনে রাখা হয়। সেই নৌকায় মাকে চাপিয়ে আখেরি নদী দিয়ে মূল ভাগীরথী নদী নিয়ে যাওয়া হয়। সেই রাত্রি নৌকা চলতে চলতে রঘুনাথগঞ্জ সদর ঘাটে এসে উপস্থিত হয়। বাকি রাত মা নৌকার উপরেই থাকে।তারপরের দিন সকালে মাকে নিয়ে নৌকা বাইচ শুরু হয়। ততক্ষণে ভাগীরথী নদীর দুই কুলে হাজার হাজার ভক্তদের সমাগম হয় মায়ের নৌকা বাইচ দেখার জন্য। বেলা দশটার দিকে নৌকা বাইচ শেষ হলে নৌকার উপর মায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। বাঁধন আলগা হতেই গঙ্গার জলে পড়ে যাবার উপক্রম হলে নৌকার ভক্তরা হাত লাগিয়ে মায়ের বিসর্জন করে দেন।

তথ্যসূত্র : মুরশিদাবাদ থেকে বলছি – কমল বন্দোপাধ্যায়,

মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী মেলা – সুশান্ত বিশ্বাস।

সাক্ষাৎকার : শ্রীপ্রণয় কুমার ব্যানার্জী ও গ্রামবাসী।

 

 

 

 

 

 

 


Share your experience
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares

Facebook Comments

Post Author: Ashutosh Mistri

Ashutosh Mistri
আশুতোষ মিস্ত্রী ।বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার নবগ্রাম থানার অন্তর্গত জারুলিয়া গ্রামে । বর্তমানে বহরমপুর Ghosh AET Centre ফার্মের অ্যাকাউন্ট দেখা শুনো করেন । Murshidabad Heritage And Cultural Development এর সদস্য ও ইতিহাস বিষয়ক বই সংগ্রাহক।ক্ষেত্রসমীক্ষক।