গোকুলচাঁদ মদনগোপাল বাঁকুড়া নদীয়ার দুই বিগ্রহ ও মন্দির কথা

Share your experience
  • 947
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    947
    Shares

গোকুলচাঁদ মদনগোপাল--বিরহীর মদনগোপাল
বি্রহীর মদনগোপাল

গোকুলচাঁদ মদনগোপাল বাঁকুড়া নদীয়ার দুই বিগ্রহ ও মন্দির কথা।বাঁকুড়া জেলার পরিত্যক্ত পঞ্চরত্নমন্দির আর নদীয়া জেলার বিরহীর মদনগোপালের দালান মন্দির।দুই মন্দির নিয়ে জড়িয়ে আছে ইতিহাস কিংবদন্তী।লিখছেন–শুভদীপ সিনহা।

গোকুলচাঁদ মদনগোপাল- গোকুলচাঁদের পরিত্যক্ত পঞ্চরত্ন মন্দির

বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর-কোতুলপুর পিচের সড়কে জয়পুর অতিক্রম করে আরো তিন মাইল গিয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে সলদা গ্রামের ভেতর দিয়ে এক মাইল গেলে জয়পুর থানার অন্তর্গত গোকুলনগর গ্রামে পায়েচলা পথে আরো কিছুটা গেলেই পাথরের ভাঙা প্রাচীর ঘেরা অঙ্গনমধ্যে ল্যাটেরাইট নির্মিত, পূর্বমুখী, পঞ্চরত্ন গোকুলচাঁদের পরিত্যক্ত মন্দির অবস্থিত। এই মন্দির দৈর্ঘ্যপ্রস্থে প্রায় ১৩.৫ মিটার এবং উচ্চতায় প্রায় ১৪ মিটার । এই মন্দিরটি বাঁকুড়া জেলার পাথরের মন্দিরগুলির মধ্যে নানা দিক দিয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ হল, প্রথমত, এটি আয়তনে সবচেয়ে বড়। দ্বিতীয়ত, চারদিকে তিন-খিলানযুক্ত বারান্দা ছাড়াও গর্ভগৃহের চারিদিকে এক প্রদক্ষিণপথ সত্যই অভিনব। তৃতীয়ত, পূর্ব ও দক্ষিণের দেওয়ালে নিবদ্ধ দশাবতার ইত্যাদির বহু ভাস্কর্য সতেরো শতকের সমসাময়িক পাথরের মন্দিরে খুব একটা দেখা যায় না। উপরে ওঠার সিড়ি ছাড়াও লক্ষ্যনীয় বিশেষত্ব আছে চূড়াগুলির গড়নে। কেন্দ্রেরটি তুলনায় অনেক বড় ও আটকোনার।

গোকুলচাদের মন্দির

গোকুলচাঁদের মন্দির কথা

কোনেরগুলি চতুষ্কোণ, হাল্কা এবং লাবণ্যময়। দালান চারটি ও প্রদক্ষিণপথের ছাদ ভল্ট এর উপর এবং গর্ভগৃহ ও প্রধান চূড়াটির ছাদ কোণে লহরাযুক্ত গম্বুজের উপর অবস্থিত। দক্ষিণের দেওয়ালে, কার্নিসের নীচে, খোদাই পাথরের প্রতিষ্ঠালিপিটি থেকে জানা যায় যে, বাঁকুড়া জেলার এই বৃহত্তম ল্যাটেরাইট মন্দিরটি প্রথম রঘুনাথ সিংহের রাজত্বকালে ৯৪৯ মল্লাব্দ বা ১৬৪৩ খ্রীষ্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েচিল। এই বিশাল দেবালয় বীর হাম্বিরের আগের এক মল্ল রাজা চন্দ্রমল্লের প্রতিষ্ঠিত বলে এক জনশ্রুতি আছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তা অযৌক্তিক বলেছেন। এইকারণে যে, গোকুলচাঁদ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের উপাসনার জন্য এত ব্যয়সাধ্য মন্দির বীর হাম্বির(রাজত্বকাল ১৫৯১ থেকে ১৬১৬ সাল)বৈষ্ণবধর্ম গ্রহনের পরে প্রতিষ্টিত হওয়াই স্বাভাবিক।

গোকুলচাঁদ বিগ্রহের কথা

অঙ্গনের দক্ষিণপ্রান্তের ভোগের ঘর বা অতিথিনিবাস দেখার মত। ছাদ ভেঙে পড়লেও এর ৯ ফুট পুরু পাথরের দেওয়ালগুলি এখনো অক্ষত আছে। তিনটি ৭ ফুট চড়া ফুলকোটা খিলান সমন্বিত ও দৈর্ঘ্যে ১৮ মিটার ও প্রস্থে ১২ মিটার এই বিরাট নির্মাণের মত বিশাল ভিত্তিবেদীর পাথরের সৌধ বাঁকুড়া জেলার আর কোথাও নির্মিত হয়েছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু আমাদের উদাসীনতার ফলে অতিথিশালা সমেত সমস্ত মন্দিরটিই এখন ধ্বংসের মুখে। গোকুলচাঁদের বিগ্রহ বহুকাল আগেই চুরি গেছে। এই বিশাল মন্দির চত্বর আজ তাঁর পুরাতন স্মৃতির কথা মনে করে একাকী অপেক্ষা করছে তার পুরাতন গৌরব আবার কবে ফিরে আসবে তার অপেক্ষায়।

গোকুলচাঁদ মদনগোপাল-বিরহীর মদনগোপাল

হরিণঘাটা থানার অন্তর্গত এবং হরিণঘাটা থেকে ৩.২ কিমি উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। বিরহীবাজারে ৩৪ নং জাতীয় সড়ক থেকে যে পিচের শাখাপথ ৪.৮ কিমি উত্তর-পশ্চিমে শিয়ালদহ মেইন লাইনের মদনপুর স্টেশন অবধি গেছে, তাঁর বাঁদিকে বিরহীবাজার থেকে সিকি কিমি দূরে, মদনগোপালের এক দালান- মন্দির আছে। মন্দিরের সামনে মজা নদী যমুনার তীরে পাতলা ইটে তৈরি এক জীর্ণ ঘাট দেখা যায়।

গোকুলচাঁদ মদনগোপাল-ইতিহাস কিংবদন্তীতে মদনগোপাল

এরূপ কথিত আছে, অনেকদিন আগে এক বৈষ্ণব এখানে মদনগোপালের বিগ্রহের পূজা করতেন। পরে নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের উদ্যোগে মদনগোপালের বর্তমান দালান মন্দির নির্মিত হয়। এই মন্দিরটির বহু সংস্কার হয়েছে। মন্দিরটি প্রায় ২৫০ বছরের প্রাচীন। এই মন্দিরে কাঁঠাল কাঠে তৈরি প্রায় ৩ ফুট উচ্চতার বংশীধারী মদনগোপাল, নিম কাঠের তৈরি ২ ফুট উচ্চতার রাধিকা মূর্তি আছে। সাথে বল্রাম, রেবতী ও জগন্নাথের কাঠের তিনটি ছোট মূর্তি, একটি শিবলিঙ্গ এবং পাঁচটি শালগ্রামশিলা আছে। শোনা যায়, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র মদনগোপালের সেবার জন্য নাকি ১৫০ বিঘা দেবোত্তর সম্পত্তি দান করেছিলেন। মন্দিরের সামনে একটা পুরাতন বটগাছের নীচে একটি পুরনো পাথের খন্ড দেখতে পাওয়া যায়। এটা কি এবং কিভাবে এখানে এল কেউ সঠিকভাবে বলতে পারেননি।

 মদনগোপালের কথা

মদনগোপালের বৈশিষ্ট্য হল এই মন্দির চত্বরে কার্তিক ভ্রাতৃ দ্বিতীয়ার দিন ভাইফোঁটার মেলা। এরকম মেলা পশ্চিমবঙ্গ কেন, আর কোথাও হয় বলে জানা নেই। এই মেলায় পুরুষদের চেয়ে স্ত্রীলোকের সমাগম বেশী হয়। সমবেত মহিলাদের মধ্যে যাদের ভাই নেই, বা ভাইফোঁটার দিন অনুপস্থিত থাকে, তাঁরা মদনগোপালের কপালে ভাইফোঁটা দেন। এ এক অভিনব লৌকিক আচার। যারা ব্রাহ্মণ তাঁরা পুরোহিতের মাধ্যমে মদনগোপালের কপালে ফোঁটা দেন। অন্যেরা তেল-হলুদ-সিঁদুর মেশানো ফোঁটা দেন গর্ভগৃহের প্রবেশদ্বারের দুপাশের দেওয়ালে। মন্দিরের দুয়ারটি সুন্দর মূর্তি ও ফুলকারি নকশা দেওয়া।

আরও পড়ুন-বৈষ্ণবমেলা– বৃহত্তর কাটোয়া মহকুমায় কেন এতো বেশি হয়?

বিরহী নামকরণের নেপথ্যে

এই গ্রামের নাম বিরহী কেন হল সেই নিয়ে অনেক লোককাহিনী প্রচলিত আছে। মদনগোপাল নাকি প্রথমে একা এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। রাধাবিরহে কাতর মদনগোপালের স্বপ্নাদেশে সামনের যমুনাতীরে শ্রীরাধার কাঠের এক মূর্তি পাওয়া যায়, যা পরে মদনগোপালের পাশে প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাধিকার জন্য মদনগোপালের বিরহ এবং সেটা নিরসনের কাহিনীর উপর ভিত্তি করেই নাকি গ্রামের নাম হয় বিরহী। আরেকটি মতও আছে। ভগিনীর অভাবে মদনগোপালের যে বিরহ তা থেকেই এই গ্রামের নামের উৎপত্তি এবং সেই বিরহ প্রশমনের জন্য এই অঞ্চলের মহিলাসমাজের ভাইফোঁটার দিন তাঁকে ফোঁটা দেবার সুন্দর প্রথাটির প্রচলন করেছেন।

গোকুলচাঁদ মদনগোপাল-উপসংহার

এই মন্দিরের সামান্য উত্তরে ইটের তৈরি এক মঙ্গলচন্ডী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। দেবীর বর্তমানে কোন মূর্তি নেই, একটি পাথ্রই মঞগলচন্ডীর ধ্যানে পূজিত হন। কথিত আছে, আগে এখানে যে দেবীমূর্তি ছিল তিনি নাকি এক দস্যু দ্বারা পূজিত হতেন। দস্যু ধরা পড়লে, সেই মূর্তি যমুনাগর্ভে নিক্ষেপ করা হয়। আশ্বিনে শারদীয়া দুর্গাপুজোর সময়ে একদিন এই মন্দিরে দেবী চন্ডীর পুজো হয়। মন্দিরের কাঠের দুয়ার প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। মা চন্ডীর নাম অনুসারে বিরহীর পশ্চিমদিকের নাম চন্ডীপাড়া।

দেখুন কৌলালের ভিডিও

 


Share your experience
  • 947
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    947
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ সিনহা

শুভদীপ সিনহা
শুভদীপ সিনহা।সরকারি আধিকারীক।ক্ষেত্রসমীক্ষক ও লোকসংস্কৃতি চার্চায় বিশেষ আগ্রহী।