গোলাবাড়ি-বাংলার ঘরবাড়ি ও স্থাপত্যের এক অনন্য ইতিহাস

Share your experience
  • 244
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    244
    Shares

 

গোলাবাড়ি--গোলাঘর
গোলাবাড়ি–গোলাঘর

দীপঙ্কর পাড়ুইঃ সাধারণত ধান যেখানে রাখা হয় তাকেই গোলা বা মরাই বলে।তবে গোলার রকমফের আছে।গোলার সঙ্গে সঙ্গে গোলাবাড়ি শব্দটি পাচ্ছি।গোলাবাড়ি মানে-একটি বড় উঠোনসদৃশ, যেখানে অনেকগুলি গোলা একসঙ্গে থাকলে তাকে গোলাবাড়ি বলে।এই জায়গাটি কোথাও কোথাও ঘেরাও থাকে।আঞ্চলিক ভাষায় বলে পাড়ন,খামার,গোলাঘর ইত‍্যাদি।হুগলী জেলার বলাগড়ে একসময় সবার বাড়িতেই খামার ছিল; সেখান থেকেই একটি জনপদের নাম হয়েছে ‘খামারগাছি’।এরকম অনেক জায়াগাতেই খামার সম্বন্ধীয় জায়গা আছে।যেমন-‘খামারপাড়া’,’খামারতলা’ ইত‍্যাদি।অন‍্যদিকে ধান‍্য বিক্রয়ের স্থানকেও গোলাবাড়ি বলে।এরকম স্থান বা আড়ৎ পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্রই দেখা যায়।পূর্ববঙ্গেও আমাদের উত্তরবঙ্গে এ ধরনের আড়ৎ দেখা যায়।যেখানে সকাল থেকে সারা দুপুর ধান বিক্রয় হয়।বাংলায় ধানের সঙ্গে গোলার সম্পর্ক বলেই বা ধান রাখা হয় বলে ধানের গোলা বলা হয়।আঞ্চলিকতা বা স্থানভেদে আলাদা নাম রয়েছে।হিন্দী শব্দেও গোলা,সংস্কৃত শব্দে গোল বলা হয়।ইংরাজি ভাষায় Grainary ; Store house।

গোলাবাড়ির প্রাক-ইতিহাস

গোলাবাড়ি বা শস‍্যগারের ধারনা নবোপলীয় যুগের।কারণ এ সময়েই কৃষিকাজের সঙ্গে সঙ্গে শস‍্য সংরক্ষণের প্রয়ৈজনীয়তা দেখা দিয়েছিল।সিন্ধুসভ‍্যতায় হরপ্পার রাভী নদীর ধারে শস‍্যগারের সন্ধান পাওয়া গেছে।এক-একটির আয়তন ১৫.২৪/৬.১০ মিটার।মহেঞ্জোদাড়ো কথাটির অর্থ হল-মৃতের স্তূপ।স্তূপ অর্থে বুঝি কোনো কিছু জড়ো করা ঢিবি বোঝায়।এই স্তূপ যেমন আদিমতম সভ‍্যতায় পাওয়া গেছে তেমনই বৌদ্ধধর্মেও স্তূপ রয়েছে।প্রথম দিকেে কাঠের হলেও পরে তা গুহা কেটে বা পাথরের তৈরি হয়েছিল।এগুলিকে চৈত বা বিহারও বলা হত।উত্তর-পূর্ব ভারতে বিভিন্ন সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীদের বাড়িঘর খড়ের তৈরি করা যা দেখতে স্তূপের মত।এরকম বাড়ি আন্দামন ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের মধ‍্যেও দেখা যায়।

উত্তর-পূব ভারতের বৌদ্ধদের মনাষ্ট্রির সামনে তৈরি সাদা রাঙের উঁচু ঢিবির মত স্তূপ দেখা যায় যা বাংলায় বা বিহারের ছটপুজোর সময় বানানো অস্থায়ী ঢিবির মত তৈরি করা হয়।এটি একটি আদিমতম রূপ।সেরকমই আদিম মানুষ কোনো খড় বা ঘাস জাতীয় জিনিস জড়ো করে রাখা জায়গা থেকেই বাংলায় ধানের গোলা বা স্তূপ বানানোর ভাবনা কাজ করেছিল বলে মনে হয়।গ্ৰামে খড় বা ঘাসকে এক জায়গায় জড়ো কে বলে-‘গাদা করা’।এ শব্দ মাটির উচু করে রাখাকেও বলা হয়।এই গাদা করে রাখা থেকেই ধানের গোলার প্রাথমিক রূপটি এসেছে।

গাদা শব্দটি -প্রতিষ্ঠা,গ্ৰন্থন,রাশ,রাশিকৃত বা রাশি রাশি অর্থে ব‍্যবহৃত হয়।স্তূপীকৃত খড় থেকে গোলার ফর্ম বা অববয়বটি গড়ে উঠেছে।সিন্ধু সভ‍্যতায় প্রাপ্ত নৃতাত্ত্বিক নির্দশনের মধ‍্যে পাথরের ‘লিঙ্গ’ গুলি পর পর দূখলে বোঝায় যায় ধানের গোলার একটি ফর্মে লিঙ্গের গঠনের সঙ্গে সাদশ‍্য রয়েছে।বাংলায় যারা গোলা বানান তারা -কাশ‍্যপ,সূত্রধর,কৈবর্ত,নমশূদ্র জনজাতির লোক।সমাজের নিন্ম শ্রেনীর লোক।আশ্চর্যের যে এদের মধ‍্যে অনেকই শৈবধর্মভুক্ত,কেউ নাথ ধর্মভুক্ত।কাজেই একটা যোগ সূত্র রয়েছে।এই যে জড়ো করে রাখার ফর্মটি চাষের জমি থেকেই শুরু হয়ে যায়।ধান কেটে গাদা করা এরপর ধান ঝেড়ে গাদা করা।আর সাজিয়ে রাখলে গোলার আকৃতির রূপ নূয়।এই সাজিয়ে রাখার লোকেরা ভূইমালী,রুইদাস,বাউলদাস সম্প্রদায়ভূক্ত।

 

গোলাবাড়ি -নানা ধরনের গোলা
গোলাবাড়ি -নানা ধরনের গোলা

গোলাবাড়ি–খড়ের গোলা

এ গেল খড়ের গোলা।প্রথমে বড় জায়গা জুড়ে গোলাকার বা চতুস্কোনাকার ভাবে খড় সাজানো হয়।প্রায় দশফুট উচ্চতা পর্যন্ত।এরপর মাথা বা ছাউনি বা ছাওয়া হয় ত্রিকোনাকৃতি ভাবে।ছাউনির মত করে।কারণ বর্ষায় যাতে জল নেমে যেতে পারে।আশ্চর্যের বিষয় ভেতরে গোলাকার ভাবে সজ্জিত’র কারণে কোনো জলীয়বাস্প ঢোকে ন।এভাবে ধান ২-৩ বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারে।এই যে জলীয়বাস্প রোধের বিষয়টি আবিস্কারের জ্ঞানই পরবর্তীতে গোলার মধ‍্যে দিয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।গ্ৰামীণ লোকেরা এই ধান সংরক্ষণের ব‍্যাপারটি যখন জানল তারা ভাবল যদি এই পদ্ধতিতে শস‍্য রাখা যায় তাহলে সেটাও অক্ষত থাকবে।

এতএব এই বিষয়টি জেনে তারা ধান রাখার একটি স্থায়ী গঠন বা ফর্মের বা অববয়বের দিকে এগোলেন।এবং খড় বা ধানের বা শস‍্যাদি জড়ো করে রাখা বা গাদা করে রাখার ফর্মের মতই তারা শস‍্যাগার বা গোলা বানালো।মোটামুটিভাবে নৃতাত্ত্বিক ভাবে দেখলে এই আবিস্কার তারা নব‍্যপ্রস্তর যুগেই করেছিল।যা এখনো বর্তমান। মানে ফর্ম বা অববয়বটির কথা বলছি। বাংলায় এই আদিমতম ফর্ম এখনও বজায় রয়েছে। যদিও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ‍্যায় তার ‘ভারত সংস্কৃতি’ গ্ৰন্থে বলেছেন- ‘ধানের চাষ,পান-সুপারীর ব‍্যবহার,–ভারতীয় সভ‍্যতায় এগুলি অস্ট্রিক জাতির দান বলে মনে হয়;’সিন্ধু সভ‍্যতায় ধান চাষ নিয়ে গবেষকদের মধ‍্যে সন্দেহ রয়েছে।যদিও কিছু কিছু জায়গায় ধান চাষ হত বলে অনেকের অনুমান।কিন্ত কৌতূহলের জায়গাটি হল শস‍্যাগার বা গোলার সন্ধান পাওয়া গেছে।

গোলাবাড়ি ইতিহাসে

ঐতিহাসিক দিলীপকুমার গঙ্গোপাধ‍্যায় তার ‘ভারত-ইতিহাসের সন্ধানে’ গ্ৰন্থে উল্লেখ করেছেন-‘শস‍্য বড় বড় গোলায় মজুত করে রাখা হত।মোহেনজোদড়ো,হরপ্পা এবং সম্ভবত কালিবঙ্গানে এ ধরনের বড় গোলা আবিস্কৃত হয়েছে।গোলার কাছেই ছিল শস‍্য ঝাড়াই-মাড়াই করার মঞ্চ বা পীঠিকা।মঞ্চের কাছেই ছিল শ্রমিকদের বাসস্থান।হরপ্পায় যে শস‍্যাগারটি পাওয়া গেছে তার পরিমাপ হল-লম্বায় ১৬৯ ফিট এবং চওড়ায় ১৩৫ ফিট(মতান্তরে ১৫০ × ২০০ ফিট)।’কচ্ছের সৌরাস্ট্রের উত্তর দিকে উপকূলীয় কুনতাসি অঞ্চলে সিন্ধু সভ‍্যতায় একটি ক্ষেত্র আবিস্কার হয়েছে।এখানে মাটির নীচে শস‍্যগোলা পাওয়া গেছে।

আশ্চর্যের বিষয় হল সৌরাষ্ট্রে এখনও বাংলার মত খড়ের গোলা প্রস্তুত করা হয়।সৌরাষ্ট্রে পশুখাদ‍্যের জন‍্য একধরনের ঘাসের গোলা তৈরি করা হয়।এ প্রসঙ্গে উমাপ্রসাদ মুখোপাধ‍্যায় তার ‘দুই দিগন্ত’গ্ৰন্থে বলেছেন-‘গোলাঘরই বটে।তবে মানুষের জন‍্য শস‍্যাগার নয়।গবাদি পশুর খাদ‍্য সঞ্চয়।জিনজোয়া ঘাসের গোলা।বর্ষার সময় এ ধরনের ঘাস জন্মায়,তখন কেটে এনে সংগ্ৰহ করে রাখা।এদেশের মানুষ –বিশেষতঃ এই বন্নী অঞ্চলের লোক,–গৃহপালিত পশুদের প্রাণ ধারণের প্রয়োজন মেটাতে অধিকতর সতর্ক ও যত্নবান।’

বই উল্লেখিত জিজোয়া ঘাসের ছবি দেখলে অবাক হতে হয়।এই ফর্ম তারা পেল কোথায়!অবশ‍্যই উত্তরাধিকার সূত্রে।তার মানে অতীতে ঘাস বা খড় জাতীয় বস্তুর গাদা বা গোলা এভাবে হত!তার একটি ধারণা এ ছবি থেকে পাওয়া যায়।সিন্ধুপ্রদেশের ঘাসের তৈরি গোলার প্রসঙ্গটি নিয়ে আসার কারণ হল;খড়ের গোলার অববয়বটি একটি আদিমতম রূপ যা এখনও আমাদের মধ‍্যে রয়ে গেছে।বিশ্বের অনান‍্য দেশেও ঠিক একই রকমের গোলা তৈরি হয়।যেমন-সুমের,আফ্রিকা ইত‍্যাদি দেশে।বাংলাতেও ঠিক একই পদ্ধতিতে ধানের গোলা তৈরি হয়।

গোলাঘর
গোলাঘর

মঙ্গলকাব‍্য ও পালাগানে ধানের গোলাবাড়ি

‘বাহির মহলে যার সাত মরাই টাকা’
ষোড়শ শতকে রচিত কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গলে’ মরাই’র উল্লেখ রয়েছে।মঙ্গলকাব‍্যগুলিতে বাংলার লোকায়ত বা গ্ৰামজীবনের নানা ছবি ধরা পড়ে।আদি অকৃত্রিম বাংলাঙীর সংস্কৃতি গুলি লুকিয়ে আছে মঙ্গলকাব‍্যগুলির ভেতর।চর্তুদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতকে রচিত মঙ্গল কাব‍্যে গ্ৰাম ও গ্ৰাম পরবর্তী সমাজের নানা পরিবর্তন,কৃষিভিত্তিক সমাজ,ব‍্যবসায়িক সমাজ ব‍্যবস্থা ভেঙে পড়ার ছবি যেমন লক্ষিত হয়।অন‍্যদিকে কৃষিজীবনের সফলতা অনক প্রকট ভাবে দেখা দেয়।সেখানে চাষ,চাষ সম্পর্কীত তথ‍্যাদি ও কৃষিজাত শস‍্যের সংরক্ষণ জনিত ছবিও ধরা পড়েছে।উঠে এসেছে মরাই বা গোলা ও গোলাবাড়ির নানা ছবি।

‘কোথাবা বাঁন্ধব মাচা মরাই কাকে বলে।
বাপের বয়সেতে চাস নাহি কোন কালে।।
মায়ে পোয়ে মাড়ে সেই ধান‍্য আড়াই হালা।
ভুবন মহন মাচা বাঁন্ধিল কমলা।।
বাসেবিনে মরাই বান্দিব কীসে বল।
গোরূ চরণা বাড়িগুলি বুড়ি আনি দিল।।
জেমন ঘরে তেমন দ্বার তেমন হৈল মাচা।
গোরূ চরান বাড়ি জেমন তেমনি হৈল চেচা।।
লক্ষির মরাই হৈল লক্ষ্ণীর ভান্ডার।
কার্ত্তিকের এয়োদশী তিথি গুরুবার।।
গাণিঞা বলিল গোধূলার কালে।
মায়ে পোয়ে ধান‍্য মাড়ি মরাইতে তুলে।।’

বিনন্দ রাখালের পালা

সপ্তদশ শতকে রচিত কবি দয়ারামের ‘বিনন্দ রাখালের পালা’ অংশবিশেষ। পালার নাম ‘বিনন্দ রাখালের পালা’,পুথি রচনার সময়কাল-১২ কবিতায় ধানের মরাই কিভাবে বানাতে হয় তার প্রছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে।লোকসংস্কৃতি গবেষক শ‍্যামল বেরা বলছেন-“একটা সময় ছিল গ্ৰাম বা‌ংলার মানুষ বাণিজ‍্যে যাওয়া,কিংবা চাকরি করার চেয়ে কৃষিকাজে বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন।সারা বছর স্বপ্নসাধের মূল নিয়ন্ত্রক ছিল-‘ধান’।” অন‍্যদিকে গুরুসদয় দত্তের ‘পটুয়া সংগীত’ গ্ৰন্থে গুণমনি চিত্রকর রচিত ‘চাষপালা’য়
উল্লেখ পাই-
‘তিন কোণ ধরিয়ে মহাদেব এক কোন ঝাড়িল।
মাণিক-মুক্তাতে কত বাখার বেধে দিল।।
দূর্গা বলে ভিক্ষার মায়া ছাড়ো চাষে দাও মন গো।’

শিব এখানে চাষি সে ধান চাষ করে।আলোচ‍্য অংশটিতে মরাই বাধার একটি প্রসঙ্গ রয়েছে। এখানে ‘বাখার’ মানে মরাই বা গোলা।
‘শাক দিতে ধন‍্যা প্রিয়া মুখ কর‍্যাছে বাঁকা।
মধ‍্যঘরে বাঁধা রাখ চৌদ্দ মরাই টাকা।।
ঘোড়াশালে ঘোড়া বাঁধ হাতীশালে হাতী।’

অষ্টাদশ শতকে রচিত কবি নিত‍্যানন্দ চক্রবর্তীর ‘লক্ষ্ণী জাগরণ পালা’য়  গোলাবাড়ির কথা আছে।দেখা যাচ্ছে মরাই মধ‍্যঘরে অর্থাৎ চারিদিক যুক্ত গোলাকার বসত বাড়ির মাঝে ছিল মরাই’র জায়গা।এবং এর পাশাপাশি অবস্থান করত ঘোড়াশালা,হাতিশালা ইত‍্যাদি।সপ্তদশ শতকে পালাগানে মরাই তৈরির প্রসঙ্গ এলেও মরাই’র অবস্থান সম্পর্কে উল্লেখ ছিল না।আবার অষ্টাদশ শতাব্দীর পালাগানে ধানের মরাই বা গোলার অবস্থান সূচিত হয়েছে।গোলাবাড়ি বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
‘বায়ন্ন বাখর বাঁধ‍্যা বিশ্বকর্ম্মা দেহ।
ধান‍্য হেতু হনুমান কুবের গৃহে যাহ।।
শুন‍্যা বিশ্বকর্ম্মা বস‍্যা বাঁধেন বাখার।
কুবের ভুবনে গেল পবনকুমার।।’

অন‍্যদিকে উক্ত এই পদটিতে পুরাণকেন্দ্রিক চরিত্রের উল্লেখ পাচ্ছি যেখানে বিশ্বকর্মা বাখার অর্থাৎ মরাই বাঁধছেন।মরাইয়ের ধান আনতে যাচ্ছে হনুমান কুবেরের ঘরে।আশ্চর্যের জায়গাটি হল-যেখানে ষোড়শ শতকে ‘বাহির মহলে যার সাত মরাই টাকা’র উল্লেখ পাচ্ছি।সেখানে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে দাম বাড়ছে।যেমন-‘মধ‍্যঘরে বাঁধা রাখ চৌদ্দ মরাই টাকা’।এখানে টাকাটি কিসের ধানের না মরাইর তা পরিস্কার নয়।কিন্তু মরাই’র দাম নিশ্চয় এত নয়।তাহলে এই হিসাব ধানের।টাকার পরিমান মরাইয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

  জ্যোতির্বিদ্যায় ধানের গোলা

আকাশে বিভিন্ন নক্ষত্রদের অবস্থান অনুসারে বা তাদের গঠন অনুসারে অনেক নক্ষত্রের নামকরণ হয়েছে।বা বলতে পারি তাদের আকারগুলি বাড়িঘরের বা স্থাপত‍্যের সঙ্গে যুক্ত।ভারতীয় জ‍্যোর্তিবিদ‍্যায় ২৭ নক্ষত্রের অস্থিস্ত লক্ষ‍্য করা যায়।বাংলা পঞ্জিকার প্রথমদিকে ‘জ‍্যোতিশ বচনার্থ’ পরিচ্ছদে বার,বারবেলা ও কালবেলা প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে ২৭টি নক্ষত্রের বিবরণ থাকে।সেগুলি হল-১.অশ্বিনী,২.ভরণী,৩. কৃত্তিকা,

৪.রোহিনী,৫.মৃগশিরা,৬.আর্দ্রা,৭.পুনর্ব্বসু,৮.পুষ‍্যা,৯.অশ্লেষা,১০.মঘা,১১.পূর্ব্বফল্গুনী,১২.উত্তরফল্গুনী,১৩.হস্তা,১৪.চিত্রা,১৫.স্বাতী,১৬.বিশাখা,১৭.অনুরাধা,১৮.জ‍্যেষ্ঠা,১৯.মূলা,২০.পূর্ব্বাষাঢ়া,২১.উত্তরাষাঢ়া,২২.শ্রবণা,২৩.ধনিষ্ঠা,২৪.শতভিষা,২৫.পূর্বভাদ্রপদ,২৬.উত্তরভাদ্রপদ ও ২৭.রেবতী।এর মধ‍্যে অশ্লেষা,কৃত্তিকা, ভরণী, মঘা,পুর্ব্বফল্গুনী, পূর্ব্বাষাঢ়া,পূর্বভাদ্রপদ ও শতভিষা নক্ষত্রগুলিকে ‘অধোমুখনক্ষত্র’ বলে,এই নক্ষত্রে বাস্তু,গৃহখননের জন‍্য শুভপ্রদ।এই ২৭ টি নক্ষত্রের মধ‍্যে মঘা একটি নক্ষত্র, দেখতে গোলাঘরের মত।বরাহ সংহিতায় এ সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে।যথা-
‘কোষ্ঠাগার গতে শুক্রে পুষ‍্যন্থে চ বৃহস্পতৌ।
বিন্দ‍্যাওদা সুখং লোকে শান্তশান্ত্রমনাময়ম্।।’

গোলাবাড়ি বহুপ্রাচীন এক স্থাপত্য

কোষ্ঠাগার মানে কোষ্ঠ (গোলা) আগার(গৃহ)।ধান‍্যাদি শস‍্য রাখার গৃহ; গোলাঘর বা গোলাবাড়ি।অর্থাৎ চিত্রকলা দিয়ে ছবিটি একটি গোলাঘর সদৃশ।ঘরের মত দৃশ‍্যকল্প তৈরি হয়।মঘা নক্ষত্রটি পাঁচটি নক্ষত্রের মধ‍্যে অবস্থান করে।এ সম্পর্কে আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বিদ‍্যানিধি উল্লেখ করছেন-‘৫ টি তারাতে মঘা নক্ষত্র শলাকার বা লাঙ্গলাকার(শালাকার=দীর্ঘগৃহ,চালা।মঘার একটি নাম কোষ্ঠাগার)অবস্থিত।চলিত ইংরেজীতে যাহাকে Tackle নক্ষত্র বলে,তাহাকেই নিম্নাদ্ধ,অর্থাৎ Shweta, Gama, Eta,alpha,Upsilon Clinic. তন্মধ‍্যে alpha Clinic বা Regulus মঘার যোগতারা।পুষ‍্যার ন‍্যায় উহা ক্রান্তিবৃত্তে অবস্থিত।’ প্রাচীনযুগে জ‍্যোর্তিবিদগণ এধরনের কল্পনা করেছিলেন মঘা নক্ষত্রের গঠন কল্পনা তারাদের অস্থানের উপর নির্ভর করে । আশ্চর্য হতে হয় এসব ভেবে,তখন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠে গোলাঘর বহুপ্রাচীন একটি স্থাপত‍্য।

গোলার শ্রেণী বিভাজন

বাংলায় ধানের গোলার অনেক রকমফের রয়েছে।সাধারনত ধানের গোলাকে ছয় ভাগে ভাগ করা যায়।যথা-ক.ধানের গোলা,খ. মরাই গ.খড়ের গাদা বা গোলা , ঘ.কড়ুই ,ঙ. ডোল ,চ.বাঁদি।যদিও এ প্রবন্ধে প্রথম তিনটি গোলা আলোচ‍্য বিষয়।

ক.ধানের গোলা

লোকপ্রযুক্তির একটি উল্লেখযোগ‍্য উদাহরণ হল ধানের গোলা।ধানের গোলা দরমা,বাঁশের চটা ও খড় এবং টিনের ছাউনি দিয়ে নির্মিত একটি সুসংবদ্ধ লোকায়ত রূপ।সাধারণত গোলার তিনটি অংশ ১.ভীটবা পিঁড়ি , ২.গোলা,৩.ছাউনি।

১.ভীট/পিঁড়ি : চতুস্কোনাকার চারদিকে ১ ফুট × ১ফুট উচ্চতা ১ ফুট থেকে ২ ফুট পর্যন্তও হয়।মাটি থেকে উচু করার কারণ জলের হাত থেকে বাঁচা বা ড‍্যাম থেকে বাঁচার জন‍্য।স‍্যাঁতসেঁতে (wet,moist) জমি হলে ছাতা(ছত্রাক)পড়ার সম্ভবনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন‍্য ভীটের দরকার।স্থানভেদে ভীটের আবার গোলাকার সিমেন্টেরও হয়ে থাকে।এই জায়গাটিকে পিঁড়িও বলে।

২. গোলা : গোলা বাঁশের চ‍্যাঁচাড়ী ও দরমা দিয়ে তৈরি হয়।বেড়ের মত। দরমা দু-ধরনের হয়।বাঁশের চ‍্যাঁচাড়ী ও দরমা বা বেতা দিয়ে ও শুধু বাঁশের চ‍্যাচাড়ী দিয়ে।দরমাকে বলে নীলের বেতা।বেতা বানানো হয় বাঁশ থেকে।সে বাঁশ আসামের পাহাড়ী জায়গায় হয়।হুগলী জেলার বলাগড়ের গোলা শিল্পীরা পূর্বস্থলী আর আসাম থেকে বেতা কেনেন। ১০ ফুট×১০ ফুট গভীরতা বা উচ্চতা ৬ ফুট পরিমাপের গোলাকার আয়তন। দু-দিক ফাঁকা।ভীটের উপর চারদিকে শক্তপোক্ত বাঁশ দিয়ে; মাঝে বাঁশের চ‍্যাঁচাড়ী দিয়ে নির্মিত মাঁচা দেওয়া হয়।এরপর পাঁচ ইঞ্চি পুরু খড়ের স্তর দেওয়া হয়।ভীট তৈরি হলে;ওর উপরে নির্মিত গোলাকে বসানো হয়।

ভীটের মাঁচার সঙ্গে মাটা তার বা নারকেল দড়ি দিয়ে ভেতর থেকে ও বাইরে দিয়ে বাঁধা হয়।গোলার উপরদিকে ছোট কুলুঙ্গির মত ঘুলঘুলি রাখা হয় হাওয়া চলাচলের জন‍্য।আবার কিছু গোলার নীচে বা উপর দিকে সাটারেয মত গেট থাকে।একে সাটার গেট বলে।সাটার গেট করা কারণ ওখান থেকে সহজে গোলায় ধান ঢোকানো বা বার করা যাবে।বেশি শ্রম করতে হবে না।এক্ষেত্রে দরজাটির চারিদিকে সাইকেলের পুরনো টায়ার কেটে চারিদিকে মুড়ে দেওয়া হয়; যাতে দরমার অংশ খুলে না যায়।এবং ইয়ার টাইট ভাবে দরজাটি বন্ধ হয়।কিছু কিছু সময় গোলায় মই পেতে ঝুড়ির সাহায‍্যে ধান ঢালা হয়।

৩.ছাউনি : ধানের গোলার ছাউনি দু-ধরনের হয়।,১.টিনের ছাউনি, ২.খড়ের ছাউনি

১.টিনের ছাউনি : ১০০ মনের গোলার ক্ষেত্রে ১২ ফুট ব‍্যাসার্ধের হয় ছাউনি।১৫০ মনের ক্ষেত্রে গোলা ১৪ ফুট ব‍্যাসার্ধ।ছাউনি শঙ্কু আকৃতির হয়।তার আগে বাঁশ ও বাঁশের চ‍্যাঁচাড়ী এবং টিনের ধাতব পাতের দরকার হয়। দিয়ে ছাউনির স্টাকচার তৈরি করতে হয়। ১০০ মনের ছাউনির স্টাকচার তৈরি করতে ৮ টি বাঁশ ও ৮ পিস টিন।১৫০ মন গোলার জন‍্য ১০ পিস টিনের দরকার হয়।সাটার গেট হলে ১০০ মনের জন‍্য ৯ পিস টিন লাগবে।প্রথমে ৬ ফুটের বাঁশ গুলি কেটে মাঝে একটি মোটা বাঁশের উপর রেখে শঙ্কু আকৃতির একটি অববয়ব করা হয়।তারপর বাঁশের নির্মিত চটা বা চ‍্যাঁচাড়ী দিয়ে গোলাকার বেড় লাগানো হয়।

একফুট বরাবর দুটি করে পাক উপরের দিকে।আর নীচের দিকে দু-ফুট বরাবর।এপর পর ধাতব টিন কেটে শঙ্কু আকৃতির ছাউনিটিতে মোড়ার কাজ চলে,পেরেকের সাহায‍্যে।এরপর একদম মাথার দিকে মুকুটের মতো করা হয়।মুকুটের উপরে নানা আকৃতির পশুও পাখি তৈরি করার রীতি আছে নানা গোষ্ঠীর মধ‍্যে।এই পশুপাখি তৈরি করার পিছনে টোটেম বা গোত্রপ্রবরের ভাবনা মিশে রয়েছে।কিছু কিছু গোলায় সাটার গেট বানানো হয়।সাটার গেট হলে টিন বেশি লাগে।সেক্ষেত্রে তার বানানোর পদ্ধতি সমূহ একটু অন‍্য রকম হয়ে থাকে।সাটার গেট গোলার মাঝ বরাবর উপরের দিকে বা নীচের দিকে থাকে।

সাইডে সরানো যায়।আবার তোলাও যায়।ধান ভরার জন‍্য এ ধরনের গেট তৈরি করা হয়।এখানে সাধারনত দুটি প্রচলিত মাপের গোলা তৈরির কথা বলা হল।সব থেকে ছোট পরিমাপের গোলা হল ৪০ মন ধানের।টিনের ছাউনি হলে কদিন জল খাওয়ানোর পর আলকাতরার প্রলেপ দেওয়া হয় টিন বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন‍্য।আলকাতরা দিলে ছাউনি প্রায় ১৫-২০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে।টিনের ছাউনি করতে খরচ হয় ১৮০০-২০০০ টাকা।মজুরী খরচ মিস্ত্রি ৫০০ টাকা,আর জোগার ৩০০ টাকা।স্থানভেদে এক-একরকম।রোজেও হয় আবার ফুরনেও কিজ হয়।

২.খড়ের ছাউনি : শঙ্কু আকৃতির বাঁশের ফ্রেম একই পদ্ধতিতে তৈরী করে খড় দিয়ে ছাওয়া হয়।যাদের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল নয় তারা খড়ের ছাউনি নির্মান করেন।খড়ের ছাউনি চার-পাঁচ বছর পর পর ছাইতে হবে।কারণ খড় বেশিদিন স্থায়ী নয়।আটি হিসাবে খড় কিনে ছাইতে হয়।যাদের খড় রয়েছে তাদের কেনার প্রয়োজন পরে না।

গোলাবাড়ি গোলাঘর
গোলাবাড়ি গোলাঘর

খ.গোলাবাড়ি–মরাই

‘মরাই একটি প্রাদেশিক শব্দ।ধানের গোলাকেই মরাই বলে।কিন্তু এর গঠন আকৃতি বা বিন‍্যাস অন‍্যরকম হয়।ষোড়শ শতকে এ কবিতায় মযাইর অস্থিত্ব রয়েছে।যা আজও গ্ৰাম বাংলায় দেখা যায়।মরাইকে অনেক জায়গায় বলে-‘বড় পাকানো মরাই’। ১-২ ইঞ্চি পুরু খড় বিনোই>বিনুনি পদ্ধতিতে দড়ির মতো তৈরি করা হয়। রাঢ় অঞ্চলে মরাইকে বলে–তলা।এখানে বর শব্দটি আবরণ শব্দ বোঝাতে ব‍্যবহৃত হয়।অভিধানে এরকম একটি ইঙ্গিত রয়েছে যে-বর-মহাদেব;সমস্ত জগৎ আবরণ করিয়া রহিয়াছেন বলিয়া তিনি শিব বর নামে খ‍্যাত।আর প্রথমেই কৌতূহলে পৌঁছিয়েছি যে গোলার এই রূপের মধ‍্যে শৈব প্রভাব রয়েছে।অন‍্যদিকে বড় শব্দটি হয়তো পাকানো অর্থেও ব‍্যবহৃত হয়েছে বলে মনে হয়।

বর পাকানো

রাস্তায় ধারে খড় হালকা ভিজিয়ে নিয়ে লম্বা দড়ি পাকানো হয়।এক জন জোগান দেবে আর একজন পাকাবে।এবাবে প্রথম দিকে প্রায় ১০০-১৫০ হাত পাকানো হবে।তার পর ভীটের উপর নিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে বাঁধা হবে বা বেড় ধরানো হয়;আর ভেতরে খড় দিয়ে বেড় ধরান হয়।এরম ভাবে একহাত হয়ে গেলে‌;এবার শুকিয়ে রাখা ধান ঝুড়ি করে ভেতরে ঢেলে দেওয়া হয়।এভাবে দুজন মিলে বর পাকাতে পাকাতে যাবে,আর ধান ঢালা হবে।সাধারনত উচ্চতা ৫-৮ ফুট।আর মাথায় খড়ের ছাউনি করা হয়।তবে ক্ষেপে ক্ষেপে খোলাও হয়,ধান বিক্রির সময়।খোলার সময় আবার সাবধানে গুটিয়ে রাখা হয় পরবর্তী সময়ে ব‍্যবহারের জন‍্য।ইঁদুরে কেটে না দিলে এ দড়ি দু-তিধ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে।রাঢ় অঞ্চলে বেশি পরিমানে মড়াই দেখা যায়।অন‍্যত্র উত্তবঙ্গে মরাই সাধারনত কম দেখা যায়।বর্তমানে ১০০ হাত বর পাকাতে বা বিনৈই করতে ১০০ টাকা মজুরী নেয় মিস্ত্রিরা।

গ.   গোলাবাড়ি- খড়ের গাদা বা গোলা

খড়ের গাদা হল গোলা বা গোলাবাড়ির আদিমতম একটি রূপ।গোলাকার আয়তনের জন‍্যই গোলা নামকরণ।মূলত গবাদি পশুর জন‍্য খড়ের গোলা তৈরি করা হয়।তবে অসময়ে খড় বিক্রির জন‍্যও গোলা তৈরি করা হয়ে থাকে।অনেকগুলি পরিমাপের গোলা হয়।সাধারনত দশ কাহনের খড় দিয়ে গোলা তৈরি হয়।স্থানভেদে ভিন্ন মাপের।যারা খড়ের গোলা তৈরি করেন তাদের মজুরী রোজ হিসাবে ৩০০শ টাকা।অনেক সময় খড় প্রতিমা তৈরির জন‍্যও অনেকে বিক্রি করবে বলে জমিয়ে রাখেন।খড়ের গোলা ধানের গোলার খামারেই পাশাপাশি তৈরি করা হয়।গোলাবাড়িতে খড়ের ও ধানের গোলা পাশাপাশি অবস্থান করে।বিক্রি হয় আটিতে,পন বা কাহন হিসাবে।যেমন-৮০ আটিতে এক পন।১৬ পনে এক কাহন।বন‍্যা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা দুর্যোগের সময় খড়ের দাম বাড়ে কাজেই খড়ের গোলা করে খড় জমিয়ে রাখলে চাষির আর্থিক স্বচ্চলতা বাড়ে।এই সঞ্চয়ের ধারনা এভাবেই এসেছিল।আর তা পশুর হোক বা মানুষের।যদি কোনো সময় ধান ঠিক না হয় তাহলে অসময়ের পুঁজি বা খাদ‍্য এই জমানো ধান গুলি হবে।বিক্রি করে সংসার চলবে।

গোলার রেখাচিত্র
গোলার রেখাচিত্র

 গোলাবাড়ি- ধানের গোলার পরিমাপ

সাধারনত ৪০-১৫০ মনের গোলা হয়। ১০০ মনের ও ১৫০ মনের ধান রাখার পরিমাপের উপর ভিত্তি করে।১০০ মনের গোলার পরিমাপের ক্ষেত্রে১০ ফুট ব‍্যাসার্ধের হয়।১৫০ মনের ক্ষেত্রে ১২ ফুট ব‍্যাসার্ধের গোলা তৈরি হয়।স্থানভেদে এক-একরকম পরিমাপের হয়ে থাকে।১০০ মনের ক্ষেত্রে উচ্চতা ৫ ফুট,তলা হবে ৮×৮ ইঞ্চি।১৫০ মনের ক্ষেত্রে উচ্চতা ৬ ফুট,তলা হবে ১০ ×১০ ফুট।গোলার উপর দিক একটু কম পরিমাপের ; আর নীচে দিক বেশি পরিমাপের হয়।মড়াইর ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক উলটো পদ্ধতিতে হয়।কিছু কিছু স্থানে দুদিকে একই মাপ,আর মাঝের বেড় কমিয়ে দেওয়া হয়।সেক্ষেত্রে গোলা দেখতে ডুগডুগীর মত হয়।

আবার কিছু জায়গায় দুদিকেই সমান রাখা হয়।আসলে ধান রাখার পরিমানের উপর নির্ভর করে গোলার আয়তন।১৫০ মনের (বড়)গোলা করতে সময় লাগে ৫ দিন।আর ১০০ মনে গোলা বানাতে ৩ দিন সময় লাগে।গোলার ছাউনি বানাতে খড়ের হলে ১ দিন।আর টিনের ছাউনি হলে ২ দিন সময় লাগে।অনেকসময় ধান বাড়ে কমেও।যেমন স্বর্ণমাসুরী ধান হলে ঠিক ঠিক পরিমাপূর গোলায় হয়ে যায়।কিন্ত ৩৮ বা ৯৮ ধান হলে একই পরিমাপের গোলায় ধান বেশি হয়।সেক্ষেত্রে বর্ধিত ধান কোনো বস্তায় পুড়ে রাখা হয়।

ধানের গোলা এক সম্প্রদায়ের লোকেরা বানান।আর ছাউনি অন‍্য সম্প্রদায়ের লোকেরা তৈরি করেন। বেশির ভাগ সুতোর,ভুইমালী,রুইদাস, জালিয়া-কৈবর্ত, মুন্ডারী,গোয়ালা,ডোম,নমশূদ্র, রাজবংশি,ভাগচাষি,হেলেচাষি ইত‍্যাদি জনজাতির লোকের গোলা ও ছাউনি তৈরি করেন।চাষি ও চাষের সঙ্গে সংযুক্ত লোকেরাই এ পেশাতে রয়েছেন।সারাবছরের জমির ধান মজুত রাখার জন‍্য তৈরি হয়েছিল গোলাঘর।আর দু-তিনটি বা চারটি গোলাঘর যুক্ত জায়গাকে বলা হয় গোলাবাড়ি।এ বাড়িতে গোলাঘরের পাশাপাশি থাকত ঢেঁকিঘর,গোয়াল প্রভৃতি।ব্রতপার্বনের দিনগুলোতে গোলাবাড়ি গম্গম্ করত।

গোলাবাড়ি অলঙ্করণ

গোলাবাড়ি দেওয়ালে সারি সারি গোলার আলপনা,গরুর সারি ও গরুরগাড়ি, লক্ষ্ণী ও লক্ষ্ণীপেঁচা,লতামণ্ডলসহ নানা বিষয় ভরে উঠত।গোলার গায়ে গোলাকার মাটি লেপে তাতে মালক্ষ্ণী ও জোড়া পেঁচা আঁকা হত ,তা এখনও হয়।এই গোলা বাড়িতেই অনুষ্ঠিত হত ‘পোষলা’ অনুষ্ঠান।বাড়ির ভেতর পোষলা রান্না করার চল এখনও রয়েছে।এছাড়া ব্রতকথায় বহু জায়গায় ধানের গোলার উল্লেখ পাওয়া যায়।কাজেই গোলবাড়ি বাঙালী গৃহস্থের তথা কৃষিজীবনের সাথে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন  কাঠের খেলনা আজও তৈরি করেন শুকদেবপুরের শ্রবণ দাস

তথ‍্যঋণ :     
১.চট্টোপাধ‍্যায়,সুনীতিকুমার-ভারত সংস্কৃতি,মিত্র ও ঘোষ,আশ্বিন ১৪২২।
২.গঙ্গোপাধ‍্যায়,দিলীপকুমার-ভারত-ইতিহাসের সন্ধানে,সাহিত‍্যলোক,আশ্বিন১৪২৪।
৩.মুখোপাধ‍্যায়,উমাপ্রসাদ-দুই দিগন্ত,মিত্র ও ঘোষ,বৈশাখ ১৩৯৩।
৪.ঘোষ,শৌরীন্দ্রকুমার-বাঙালি জাতি পরিচয়,সাহিত‍্যলোক,মাঘ ১৪১৭।
৫.Mohenjo Daro and Indus Civilization being an official account the archaeological excavation at Mohenjo Daro create out by the government of India between the years 1922 and 1927 John Marshall, Asian education service New Delhi ,Madras 1996
৬.দত্ত,গুরু সদয় -পটুয়া-সংগীত,ছোয়া,জানুয়ারি ২০১৬।
৭.শ‍্যামল বেরা সংগ্ৰহ ও সম্পাদিত-কবি দয়ারামের সারদামঙ্গল ও লক্ষ্ণীমঙ্গল(ধূলাকুটার পালা ও বিনন্দরাখালের পালা,সূচনা কালচারাল সেন্টার,জানুয়ারি ২০১২।
৮.সহজিয়া,ষষ্ঠ বার্ষিক সংখ‍্যাসম্পাদক-মধুসূদন মুখোপাধ‍্যায়,২০১০।
৯.রায় বিদ‍্যানিধি,যোগেশচন্দ্র -জ‍্যোতিষ-আমাদের জ‍্যোতিষ,শ্রী কেদারনাথ কত্তৃক প্রকাশিত,১৯০৩।
১০. ধানের গোলা সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে পড়ুন ‘পরম’পত্রিকার ৩৩ তম,’জনপ্রযুক্তি’ সংখ‍্যা।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা:গোলাশিল্পী সনাতন বাউল দাস-(৮৫),সোনা বাউল দাস (৬০ )

ছবি : লেখকের অঙ্কিত ও সংগৃহীত


Share your experience
  • 244
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    244
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দীপঙ্কর পাড়ুই

দীপঙ্কর পাড়ুই
দীপঙ্কর পাড়ুই--বর্ধমান বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক।কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর।লোকশিল্প নিয়ে গ্ৰাম ঘোরাঘুরিও লিখতে ভালোবাসি।আচমন,রাঢ়কথা ইত‍্যাদি পত্রিকায় ও বঙ্গদর্শন ও দুনিয়াদারি পোর্টালে কতগুলি লোকশিল্পের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।