গোপাল উড়ের টপ্পা গান ও বিদ্যাসুন্দর পালা

Share your experience
  • 135
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    135
    Shares

ডা.তিলক পুরকায়স্থঃ গোপাল উড়ের টপ্পাগান -বাংলাগানের এক বিস্মৃত অধ্যায়। বিদ্যাসুন্দর বলতে সবার মনে আসবে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের কথা। এই প্রণয় কাব্যের মূল রচয়িতা কিন্তু ভারতচন্দ্র নন, এগা্রো শতকের কাশ্মীরি কবি বিলহন সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন মূল কাব্য-” চৌরপঞ্চশিকা’ । কাব্যটি এত জনপ্রিয় ছিল যে, পরবর্তী কালে বিদ্যা ও সুন্দরের প্রেমকথা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বহু কবি কাব্যগীতি রচনা করেন। ষোড়শ শতকে কবি শাহবিরিদ খান , দ্বিজ শ্রীধর। তারপরে কৃষ্ণরাম দাস, রামপ্রসাদ সেন হয়ে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল। অন্নদামঙ্গল কাব্যের মধ্যকার পর্বটি হচ্ছে বিদ্যাসুন্দর বা কালিকামঙ্গল।ভারতচন্দ্র বাদে অন্যদের রচনাগুলি যেখানে ধর্মানুসারি সেখানে ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর পর্বটি কিন্তু বহুলাংশে আদি রসাত্মক , তাই কলকাতার বাবু সংস্কৃতির যুগে, পুরুষতান্ত্রিক বিকৃত রুচির যৌনাচার বিকাশের সময়- এই বইটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।আজকের আলোচ্য বিষয় গোপাল উড়ের টপ্পা গান।

বাংলানাটকের প্রথম যুগে বিদ্যাসুন্দর

তাই দেখতে পাচ্ছি, ১৭৯৫ সালের ২৭ শে নভেম্বর, ২৫ নম্বর ডোমতলা(আজকের এজরা স্ট্রিট) , সাহেবরা বলত ডুম টলি , প্রথম বাংলা নাটক অভিনীত হচ্ছে এক বিদেশি- হেরাসিম লেবেদফের নাট্যশালায়। ইতিহাস ঘেঁটে পাচ্ছি নাটক দুটির নাম- ছদ্মবেশ ও কাল্পনিক সংবদল। তখন কলকাতায় ভারতচন্দ্রের জনপ্রিয়তা দেখে, নাটক শেষে বিদ্যাসুন্দরের কিছু গানও পরিবেশিত হয়েছিল। এরপরে দেখছি, ১৮৩৫ সালে অক্টোবর মাসে, শ্যামবাজারের নবীন চন্দ্র বসুর বাড়িতে প্রথম বাঙালিদের দ্বারা যে বাংলা নাটক অভিনীত হয়- সেই নাটকটিও কিন্তু ভারতচন্দ্রের বিদ্যসুন্দর-ই। তবে একটা কথা, যৌনতার মোড়ক বাদ দিলে, বিদ্যাসুন্দর কাব্যের কাব্য মূল্য কিন্তু কিছুতেই অস্বীকার করা যায়না।তা নইলে কি আর ইংল্যান্ড থেকে সদ্য আগত ইংরেজ সিভিলিয়ানদের, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায়- বিদ্যাসুন্দর কাব্য। এবং এই কাব্য তাঁদের পড়াতেন কে জানেন ? খোদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়।

বিদ্যাসুন্দরের জনপ্রিয়তা

বিদ্যাসুন্দরের জনপ্রিয়তা দেখতে গেলে ,কোলকাতা ছাড়িয়ে বর্ধমানের তেজগঞ্জ চলে যান, সেখানেও পাবেন বিদ্যাসুন্দর কালী মন্দির। লোকবিশ্বাসে কাব্য ও কল্পনা মিলে গেছে। এখানেই নাকি কোথাও ছিল সুন্দরের কাটা সুড়ঙ্গ যা ধরে সুন্দর আসত বিদ্যার ঘরে। এই কালীর সামনেই নাকি তৎকালীন রাজা দুজনকে বলির আদেশ দিয়েছিলেন। এমনি লোকবিশ্বাসে রয়েছে ভক্তদের মধ্যে।

বাবু কলকাতার এক অন্যরকম বাবু বিশ্বনাথ বাবু, পুরো নাম বিশ্বনাথ মতিলাল। অন্যরকম বলতে বুঝিয়েছি, ইনি অন্য বাবুদের মতন দেশের সঙ্গে গদ্দারি করেননি। ছাপোষা জীবন শুরু করেন, কোম্পানির নুনের গোলায় ৮ টাকা মাইনের চাকরি দিয়ে। কাজে দক্ষতা দেখিয়ে হয়ে গেলেন নুন গোলার দেওয়ান, কারণ ইংরেজরা গুণীর মর্যাদা দিতে জানত। এবার টাকা আসতে লাগল বহু, বাড়ির কাছে একটা বাজার বসালেন এবং তার মালিক করে দিলেন নিজের ছেলের বৌকে। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বৌ বাজার নির্মাণের এটি হচ্ছে প্রাচীন ইতিহাস।

রাধামোহন সরকার

হাতে কাঁচা পয়সা আসার সঙ্গে সঙ্গে এতদিনের সব পুষে রাখা সাধ আহ্লাদ গুলি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। পাড়ায় ছিল সেযুগের এক ধনী গুণী মানুষ রাধামোহন সরকার। রাধামোহন ছিলেন বাবু কলকাতার প্রথম যাত্রা দলের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। আরো অনেক বাবুর মতন বিশ্বনাথ বাবু যোগ দিলেন রাধামোহনবাবুর সঙ্গে। ঠিক হল বিশ্বনাথ বাবুর বাড়িতে দুপুরে হবে অনুশীলন বা মহলা, রাতে হবে আখড়া। তখন শুরু হলো, খুঁজে খুঁজে ভালো অভিনেতা জোগাড় করা আর তাঁদের শিক্ষক রেখে নাচ-গান-অভিনয়ের তালিম দেওয়া।

এক ফেরিওয়ালা

এরকম একদিন দ্বিপ্রহরে, নতুন অভিনেতাদের নিয়ে মহলা চলেছে। হটাৎ কানে এলো কলা বিক্রেতা এক ফেরীওলার গলা। এক অদ্ভুত সুর করে ফেরিওলা হেঁকে যাচ্ছে, সেই গলায় এমন একটা কিছু আছে যে, দুজনেই মহলা থামিয়ে দিয়ে, দারোয়ানকে দিয়ে ডাকিয়ে আনলেন সেই কলা বিক্রেতা ছেলেটিকে।

গোপাল উড়ে

আরে এ কি ? এতো একটা ১৫/১৬ বছরের বাচ্চা ছেলে। এত সুন্দর করে সুর দিয়ে হাঁক দিচ্ছে, বাংলাও তো ঠিক করে বলতে পারেনা । এদিকে কলা বিক্রেতা ছেলেটি তো ভয়েই কাঁপছে ঠক ঠক করে, কি জানি কি গলতি করে ফেলেছে সে। যাইহোক ছেলেটির মন থেকে যখন ভয় দূর হয়ে গেল, তখন জানা গেল যে, ওদের পৈতৃক বাড়ি হচ্ছে, উড়িষ্যার যাজপুরে। নাম গোপাল, জাতিতে করন। গানের সুরের কথায় জানা গেল যে, ওর চৌদ্দ পুরুষে কেউ গান-বাজনার চর্চা করেনি। তবুও কিভাবে যেন, সুর ওর গলায় আপনি চলে আসে বলে দু কলি উড়িয়া গান গেয়েও শুনিয়ে দিল উপস্থিত সবাইকে।

রাধামোহনের জহুরীর চোখ ও কান- গোপালের মধ্যে ভবিষ্যত দেখতে ভুল করলেন না। রাধামোহনের  মনের ইচ্ছা একটা যাত্রা পালা দেখিয়ে, সেযুগের বাবুদের বাড়িতে প্রদর্শন করে, মানী গুনীদের চমকে দেওয়া। সেযুগের বাবুদের নাড়ির পছন্দ-অপছন্দের হাল হকিকত সব রাধামোহনের নখদর্পনে ছিল। তিনি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন, বাবু সংস্কৃতির কেষ্ট বিস্টুদের পছন্দের মতন পালা নামাতে গেলে নাচ, গান দিয়ে জমজমাট একটা রতি সুখবিলাস মার্কা পালা নামাতে হবে- আর এসব কিছুর সঙ্গে আরাম করে ফিট করে যাবে ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর।

গোপালের জীবন –তিল থেকে তাল- কলা বেচা গোপাল

গোপাল উড়ের টপ্পা গানের আগে তাঁর সম্পর্কে আরও দুচার কথা বলা প্রয়োজন।গোপালের একটু মেয়েলি কন্ঠস্বর আর দাঁড়ি গোঁফের অভাবে পরিষ্কার গাল দেখে , রাধামোহন বাবু গোপালকে কোন নারী চরিত্রের উপযোগী বলে ভেবে রাখলেন কারণ বিদ্যাসুন্দর পালা নামাতে হলে সবার আগে চাই, নাচ-গানে পারদর্শী একজন তুখোড় অভিনেতা। গোপালের জীবনটা যেন সত্যিকারের রূপকথার গল্প- তিল থেকে তাল হবার কাহিনী। কলা বেচা ফেরিওলা ভবিষ্যতে হবে, বাবু যুগের এক শ্রেষ্ঠ নট- বিদ্যাসুন্দরের হীরা মালিনী। বিদ্যার চরিত্রে ভোলানাথ বৈষ্ণব, সুন্দর- উমেশ মিত্র আর হীরা মালিনীর চরিত্রে গোপাল। সব শিক্ষার্থীদের মধ্যে গোপালের শেখার গতি প্রবল, তাই ঠিক হোল গোপালের শিক্ষাকালীন ভাতা হবে মাসে ১০ টাকা, থাকা খাওয়া ফ্রি। সেযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গায়ক হরিকিষেন মিশ্রকে নিয়োগ করা হল, গোপালকে গান শিক্ষার তালিম দেওয়ার জন্য। নাচ শেখাতে আসতেন পানিহাটির মোহন মুখুজ্জে। তাঁর তখন নাচ শেখানোর বহুত নাম- কলকাতার পতিতা মহলে বাইজিদের তিনি লাস্যময়ী খেমটা আর আড় খেমটা নাচের তালিম দিতেন। শোনা যায় গোপালকে নাচে-গানে তালিম দিতে, রাধামোহন বাবু দু বছরে প্রায় ১ লাখ টাকা গোপালের পিছনে খরচ করেছিলেন। সঙ্গে যাত্রা পালার উপযোগী করে নতুন করে লেখা হোল বিদ্যা সুন্দর পালা।

বাকিটা ইতিহাস

রাধামোহনবাবুর শখের যাত্রা পালার তখন চতুর্দিকে জয়জয়কার। আর লোকের মুখে মুখে ফিরছে মালিনীর নাচ-গান-এক্টিং এর গল্প। বিদ্যা নয় , সুন্দর নয়, মালিনীর কথা আগুনের মতন ছড়িয়ে গেছে কলকাতা থেকে গ্রামে গঞ্জে অবধি। শোভাবাজার রাজবাড়ী, ছাতুবাবু লাটুবাবুর বাড়ী, হাটখোলার দত্ত বাড়ী- যেখানেই রাধামোহনবাবুর তাঁর শখের যাত্রা দল নিয়ে যান, গোপালের গান আর শরীরী বিহঙ্গে বাবুকূল কুপোকাত। গোপালের মাইনে একলাফে বেড়ে হল ৫০ টাকা।
কিন্তু হঠাৎ করে কি যে হল , মাত্র ৪০ বছর বয়সে রাধামোহন বাবু, যাত্রার সাজ সরঞ্জাম, বিদ্যাসুন্দর যাত্রা পালার বই এবং পুরো দলটাকে গোপালের হাতে সঁপে দিয়ে পরলোক গমন করলেন। সারা কলকাতা বজ্রাহত, বাবুরা শোকস্তব্ধ , কি হবে রাধামোহনবাবুর শখের যাত্রা দলের ? কে আর চালাবে খরচা করে দলটাকে ? মালিনীর গান আর নাচ কি শোনা যাবেনা ?

গোপালের অভিনয়

সত্যি তো যাত্রাদলের বাকি শিল্পীরাও জানেন যে, বিদ্যাসুন্দরের আসল আকর্ষণ গোপালের অভিনয়, তাই সবাই গোপালের মুখের দিকে চেয়ে রইল, ভবিষ্যতের আশায়। গোপাল ছিলেন জাত শিল্পী, তাই মুষড়ে না পরে কিছুদিনের মধ্যেই দলের হাল ধরেন। তখন তিনিই যাত্রা দলের অধিকারী, সব দিক সামলাতে হবে একহাতে, তাই নিজে মালিনীর অভিনয় থেকে সরে এসে, নতুন করে দল গড়ায় মন দিলেন। নতুন একটি ছেলে কাশীনাথ কে নিয়ে উঠে পড়ে লাগলেন মালিনীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। পাবলিক এই নতুন মালিনীকে নিয়েও দিলখুশ। পাবলিকের মুখে কাশীনাথের নাম হয়ে গেল- “কেশে মালিনী”। বিদ্যা আর সুন্দরের রোলে রয়ে গেলেন পুরান জুটি ভোলানাথ আর উমেশ।তবে গোপালের মাস্টার স্ট্রোক হল- বিদ্যাসুন্দর পালার কাঠামোটি রেখে পুরো খোলনলচে বদলে দিয়ে নতুন করে লেখা। সঙ্গে নতুন করে শুরু হল গান লেখা ও সুর করা।শুরু হলো গোপাল উড়ের টপ্পা গান।

গোপাল উড়ের টপ্পা গান

যাত্রা পালা গোপালের হাতে এত জনপ্রিয়তা পায় কারণ তিনি শখের যাত্রা কে পেশাদারি স্তরে উত্তরণ করেন। সহজ ও প্রচলিত বাংলা ভাষায় লেখা বিদ্যা সুন্দর  চরম জনপ্রিয় হয়। তবে আমরা বর্তমানে যাকে গোপাল উড়ের টপ্পা বলে থাকি, সেটি নিয়ে সুধীর চক্রবর্তী তাঁর “বাংলা গানের সন্ধানে” বইতে মন্তব্য করেছেন-” সম্ভবত কৈলাস বারুই, শ্যমলাল মুখোপাধ্যায় ও ভৈরব হালদার সেই বিদ্যাসুন্দর  পালার বাঁধনদার। গোপালের কৃতিত্ব হলো কলকাতার তখনকার হালকা জনরুচি বুঝে তাতে সুরারোপ, নৃত্যাংশ নির্মাণ এবং সমগ্র ব্যাপারটিকে সার্থকভাবে রুপায়িত করার কৌশল।”
সেযুগের আপামর ছেলে-বুড়ো, কর্তা-গিন্নি, বাবু-বিবিরা গোপাল উড়ের বিদ্যাসুন্দরের ফিদা। কত কেচ্ছা, কত গল্প তখন বিদ্যাসুন্দর পালা নিয়ে। পাড়াতে পাড়াতে, দোল দুগ্গা পুজোয় বাবুদের মদের আসরের সঙ্গে বিদ্যাসুন্দর পালা- একেবারে মাখো মাখো যুগলবন্দী। এমনকি এই পালাগান ঘিরে খুন খারাপি থেকে রসালো কেচ্ছার অগুনতি ঘটনা ঘটে, যার কিছু লেখা আছে হুতুম পেঁচার নকশায়। সেখান থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃতির মধ্যে দিচ্ছি- ” একবার শহরের শ্যামবাজার অঞ্চলের এক বনিদী বড় মানুষের বাড়িতে বিদ্যাসুন্দর যাত্রা হচ্ছিলো, বাড়ির মেজবাবু পাচো ইয়ার নিয়ে যাত্রা শুনতে বসেচেন; সামনে মালিনী ও বিদ্যে ‘‘মদন আগুন জ্বলছে দ্বিগুণ কল্লে কি গুণ ঐ বিদেশী’’ গান করে মুটো মুটো প্যালা পাচ্চে—বছর ষোলো বয়সের দুটো (স্টড্‌ ব্রেড) ছোকরা সখী সেজে ঘুরে খেম‌টা নাচ্চে।

কত কাণ্ড!

মজলিসে রূপোর গ্লাসে ব্র্যান্ডি চলচে—বাড়ির টিকটিকি ও সালগ্রাম ঠাকুর পর্য্যন্ত নেশায় চুরচুর ও ভো ! ক্রমে মিলনের মন্ত্রণা, বিদ্যার গর্ভ, রাণীর তিরস্কার, চোর ধরা ও মালিনীর যন্ত্রণার পালা এসে পড়ল ; কোটাল মালিনীকে বেঁধে মাত্তে আরম্ভ কল্লে— মালিনী বাবুদের ‘দোহাই’ দিয়ে কেঁদে বাড়ী সরগরম করে তুল্লে— বাবুর চম্‌কা ভেঙ্গে গ্যালো ; দেখ্লেন কোটাল মালিনীকে মাচ্চে, মালিনী বাবুর দোহাই দিচ্চে অথচ পার পাচ্চে না। এতে বাবু বড় রাগত হলেন ‘‘কোন বেটার সাধ্যি আমার কাছ থেকে মালিনীকে নিয়ে যায়’’ এই বলে সামনের রূপোর গেলাসটি কোটালের রগ ত্যেগে ছুড়ে মাল্লেন—গেলাসটী কোটালের রগে লাগ্‌বামাত্র কোটাল ‘‘বাপ’’! বলে অমনি ঘুরে পড়লো , চারিদিক থেকে লোকেরা হাঁ হাঁ করে এসে কোটালকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গ্যালো—মুকে জলের ছিটে মারা হলো ও অন্য অন্য নানা তদ্বির হলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না— কোটালের পো এক ঘাতেই পঞ্চত্ব পেলেন।’


একটা মজার গল্প

এতো গেল খুন খারাপির কথা। এবার আরেকটা মজার গল্প দেখা যাক। হুতুমের নক্সায় লেখা আছে-” আর একবার ঠনঠনের ‘র’ ঘোষজাবাবুর বাড়িতে বিদ্যাসুন্দর যাত্রা হচ্ছিল, বাবু মদ খেয়ে পেকে মজলিসে আড় হয়ে শুয়ে নাক ডাকিয়ে যাত্রা শুনছিলেন। সমস্ত রাত বেঁহুসেই কেটে গেল, শেষে ভোর ভোর সময়ে দক্ষিণ-মশানে কোটালের হাঙ্গামাতে বাবুর নিদ্রাভঙ্গ হোল ; কিন্তু আসরে কেষ্টোকে না দেখে বাবু বিরক্ত হয়ে ‘ কেষ্ট লাও, কেষ্ট লাও’ বলে ক্ষেপে উঠলেন। অন্য অন্য লোকে অনেক বুঝালেন যে, “ধর্ম অবতার ! বিদ্যাসুন্দর যাত্রায় কেষ্ট নাই”, কিন্তু বাবু কিছুতেই বুঝলেন না ; কৃষ্ণ তাঁরে- নিতান্ত নির্দ্দয় হয়ে দেখা দিলেন না বিবেচনায় শেষে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগলেন।”

হিরে মালিনীর গান

শেষ করছি বিদ্যাসুন্দরে হিরে মালিনীর গান দিয়ে – “এস যাদু আমার বাড়ি।তোমায় দিব ভালোবাসা ।যে আশায় এসেছো যাদু।পূর্ণ হবে মন আশা ।আমার নাম হিরে মালিনী। ক’ড়ে রাঁড়ী নাইকো স্বামী ।’
তখন কিন্তু সাধারণ মানুষের মুখের বুলি এরকমই ছিল। বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাস থেকে যেমন বাবু কালচারকে বাদ দেয়া যায়না, তেমনি অস্বীকার করা যায়না,  একটা যুগের আবাল- বৃদ্ধ – বনিতাকে এক ভিন রাজ্যের বাসিন্দা গোপাল উড়ে এসে কিভাবে তাঁর গান, নাচ এবং পালাগানের মধ্য দিয়  মাতিয়ে রেখেছিলেন  কলকাতা সহ সারা বাংলাদেশকে।

গানের ডালি

কলকাতার ইতিহাসের এক বিশেষ পর্বে, লোকের মুখে মুখে ঘুরত গোপাল উড়ের টপ্পা গান- ” আমার প্রাণ এখন আর চায়না তোরে / শোন কালুয়া শোন / না বুঝে সপেছি তোরে / এ নব যৌবন। ” শোনা যায় গোপালের সবচেয়ে বিখ্যাত গানের কলি- ” মদন আগুন জ্বলছে দ্বিগুন কল্লে  কি গুন ওই বিদেশী / ইচ্ছা হয় যে উহার করে প্রাণ সঁপে হইগে দাসী।” নিয়েও অনেক গল্প। তখন হাওড়া স্টেশনের টিকিট কাউন্টার ছিল আর্মেনিয়ান ঘাট। এখান থেকেই নেটিভেরা থার্ড ক্লাসের টিকিট কেটে লঞ্চে চড়ে, গঙ্গা পেরিয়ে গিয়ে ট্রেন ধরত। খুব চাহিদা ছিল এই টিকিটের। বুকিং ক্লার্ক সুরসিক বাঙালি, ভালোই গাইতেন গোপালের মদন আগুন গানটি। টিকিটের পয়সা ফেরত দেবার সময় যদি খুচরো কম পড়তো, তবে উনি মদন আগুনের দুই লাইন নাকি গেয়ে শুনিয়ে দিতেন। পাবলিক নাকি পয়সার শোক ভুলে, খুশি খুশি লঞ্চে চেপে বসতেন, এভাবে ক্লার্ক বাবুর মন্দ আয় হতো না।

শেষকথা

তাঁর প্রচলিত সুর বা গোপাল উড়ের টপ্পা নিয়ে কালক্রমে বহু লোকে গান বেঁধেছিলেন। অথচ দুঃখের কথা ইন্টারনেট ঘেঁটেও কোথাও সেযুগের এত গুণী একজন মানুষের কোন একটাও ছবি খুঁজে পেলাম না।দুর্গাদাস লাহিড়ীর “বাঙ্গালী গান”, ১৯০৫ অনুসারে পাচ্ছি যে, গোপাল ছিলেন সুপুরুষ, বিনয়ী ও অতি ভদ্র ব্যক্তি, চমৎকার ঠুংরী গান গাইতে পারতেন। তাঁর জন্ম হয় সম্ভবত ১৮১৭ সালে। রাধামোহনের শিষ্য গোপাল, গুরুর মতনই মাত্র ৪০ বছর বয়সে পরলোকে যাত্রা করেন। লাহিড়ী মহাশয় তাঁর ” বাঙালী গান” বইটিতে তিনি গোপাল উড়ের ৩৩৯ টি গানের সংগ্রহ সংকলন করেছিলেন।

 

ছবি- নেট।

তথ্যসূত্র:– ১) কলকাতা বিচিত্রা, রাধারমণ রায়, দেব সাহিত্য কুটির, জানুয়ারি ২০১১।
২) ইতিহাসের কলকাতা, সংগ্রহ সম্পাদনা কমল চৌধুরী

৩)বাবু গৌরবের কলকাতা, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়।
৪) হুতুম পেঁচার নক্সা, কালীপ্রসন্ন সিংহ।


Share your experience
  • 135
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    135
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।