গোয়াল গোবর ঘুঁটে আর গোরুর পুরাণ-ফিরে দেখা ইতিহাস

Share your experience
  • 136
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    136
    Shares

গ্রামবাংলার পাঞ্চালিকা
গ্রামবাংলার পাঞ্চালিকা -গোয়াল গোবর ঘুঁটে

গোয়াল গোবর ঘুঁটে আর গোরুর পুরাণ-ফিরে দেখা ইতিহাস।গোরু কেন্দ্রিক লোকাচার লোকসংস্কৃতির মূল উৎস,আর্যসংস্কৃতিতে এর প্রভাব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে সাহিত্য ও প্রত্নতত্ত্বের আলোকে।লিখছেন–স্বপনকুমার ঠাকুর।

গোয়াল গোবর ঘুঁটে আর মা কালী

গভীর অমানিশা।মাতৃসাধক মহাসাধনায় মগ্ন। বার বার তাঁর ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠছে। মা মাগো। কোন রূপে তোর পুজো করবো মা। একটিবার বলে দে।আমি যে বিগ্রহ রূপে পুজো করতে চাই। দু চোখে তাঁর অশ্রুগঙ্গা। অবিরাম উৎসারিত মাতৃধ্বনির ওঙ্কার নাদ।একসময় মহাকাশ মথিত দৈববাণী–

বৎস কৃষ্ণানন্দ! আগামীকাল প্রথম যে নারীর মুখমণ্ডল তুই দর্শন করবি সেই রূপে করবি মাতৃ আরাধনা।

ভোর হয়ে আসছে। পূর্বাকাশে অরুণোদয়ের লালিমা।সাধক এগিয়ে চলেছেন লোকালয়ের দিকে।কিন্তু একী দেখলেন!এক কৃষ্ণকায় বধূ।মাথার চুল এলোমেলো। একহাতে গোবরের তাল। অন্যহাতে পাঁচিলে দিচ্ছেন ঘুঁটের থাপ্পড়।মুহূর্তে চোখাচোখি। বধূটি মহাসাধককে দেখে লজ্জায় জিভ কাটলেন। এভাবেই নাকি জন্ম হলো কালী রূপের।আপনি বলতেই পারেন গল্পো।তবে গপ্পো হলেও সত্যি।অন্তত গ্রামবাংলার মেয়েদের প্রাত্যহিক ঘুঁটে দেওয়ার ছবিটা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন–বড়ো বউ মেজো বউ মিলে ঘুঁটে দেয় ঘরের পাঁচিলে।

গোয়াল গোবর ঘুঁটে -চণ্ডীমণ্ডপের দারুভাস্কর্য
গোয়াল গোবর ঘুঁটে -চণ্ডীমণ্ডপের দারুভাস্কর্য

গোবর কাণ্ড

ভাবছেন আচ্ছা আগমবাইশে লোক মশাই ।সাতসকালে দেখিয়ে ছাড়লেন কিনা –কালী হলি মা ঘুঁটে দেয়ানি! কী আর করা যাবে।কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। এই ভাবেই নাকি কালীমূর্তির দর্শন পেয়েছিলেন।এমন গপ্পো অবশ্যি ঘুঁটে দেওয়ার কাঁথ ছেড়ে দুই বাংলার লোকবিশ্বাসে জীবন্ত। শুধু কী কালী! কাঁথ গোবর ঘুঁটে সেই সঙ্গে গোরু বাংলার লোকসংস্কৃতিতে একটা বড় স্থান জুড়ে আছে। প্রায়শ্চিত্ত থেকে পঞ্চগব্য। সেখানেও গোবর। টুসুতে গোবর।পৌষপার্বণে গোবরের নাড়ুপুজো। একাধিক গোবরগণেশও পূজিত হচ্ছেন ভারতে। আর গোবর দেওয়ার কাঁথ থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন স্বয়ং ভগবতী।কাঁথেশ্বরী নামে অষ্টধাতুর সাবেকি মাতৃমূর্তি। পূজিত হচ্ছেন বর্ধমান জেলার বৈষ্ণবতীর্থ শ্রীখণ্ড গ্রামে।

গোয়াল গোবর ঘুঁটে

গোবর ঘুঁটে গোরুর পুরাণ। এ নিয়ে উইকিপিডিয়া তৈরি করা আদৌ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমাদের লোকায়ত জীবনে, বিশ্বাসে, কিভাবে গো-কাণ্ড প্রকাণ্ড মহিমায় প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজও বহমান সেটা নিয়েই দু চার কথা। আজও গ্রামবাংলার বাসি কম্মো বলতে ঘর দুয়ারে গোবর দিয়ে পাটঝাঁট করাকেই বোঝায়।এবং এটি অত্যাবশকীয় গৃহকর্ম। ঘর দুয়োর নিকানো,উঠোনে লতা দেওয়া ,মাঝ ওঠোনে মেড়ুলি অর্থাৎ মণ্ডপ রচনা করা সবেতেই গোবর।তারপর সেখান থেকে নানা আকারের বাহু টানা ।একেই বলে লতাপাতা কাটা।উত্সব এলে গোবরজলের শিল্পটি আরও ছন্দোময় হয়ে ওঠে। এবং একেই শিল্পভূমি বানিয়ে মেয়েরা তখন উঠোন আলপনায় ভরিয়ে তোলে সারা অঙ্গনখানি। এতো গেলো একদিক।

গোয়াল গোবর ঘুঁটে ও গোরুর পুরাণ

অন্য দিকে,জষ্টি মাসে দশহরার সময় থেকে যে পাঁচটি বা ছয়টি পঞ্চমী হয় তখন সারা বাড়িখানিতে মোটা গোবর জলের দাগ দিয়ে নাগবন্ধনী রচনা করা হয়। গোবরজল গ্রামবাসীদের কাছে গঙ্গাজলের বিকল্প।সেই কারণে গঙ্গাস্নানের পরিবর্তে কেউ গোরুর গোয়ালে গিয়ে একঘটি জল মাথায় ঢাললে ফাউ মেলে এক গঙ্গা পুণ্যি।একেই বলে গোয়াল গঙ্গা।তো গোবর নিয়ে যদি এতো কিছু হয় তাহলে বুঝুন হিন্দুদের কাছে গোরু কী জিনিষ। গোয়ালপুজোতো আছেই।সেইসঙ্গে কোন গোরু যদি গলায় দড়ি নিয়ে টোঁটা আটকিয়ে অকস্মাৎ মারা যায় তাহলে মাথা নেড়া করে গো-ভাগারে গিয়ে শ্রাদ্ধ করা অনেকেই আশাকরি চাক্ষুস করেছেন।

ঘুঁটের কিস্যা

ঘুঁটে গ্রামবাংলার প্রধান জ্বালানি।ইদানিং গ্রামে গ্রামে গ্যাস এসে যাওয়ায় ঘুঁটে তার পূর্বেকার কৌলিন্য হারিয়েছে।একসময় গেরস্থ চাষিবাড়ি মানেই খামারবাড়ির পাশে গোবরের সারকুড়ে।আর গোয়ালবাড়ি মানেই মাচায় থাকে থাকে সজ্জিত ঘুঁটের স্তূপ। পূর্ববঙ্গীয়রা আবার পাটকাটির গায়ে গোবরের প্রলেপ দিয়ে শিককাবাবের মতো জ্বালানি বানাতে ভারি দড়।বেশ কয়েকবছর আগেও গেঁয়ো গিন্নিদের ফ্যাসান ছিল গোবর পাট সেরে চান করে এসে প্রতিবেশির বাড়ি থেকে তিনটে ঘুঁটে দিয়ে আগুন নিয়ে আসা। তখনকার দিনে রুগীর ভাত হতো বিশেষ রকমের তৈরি উনুনে। সরাসরি উনুনে না বসিয়ে ঘুঁটে চুড় করে তলায় আগুন দিয়ে ভাত বসানো হতো।একে বলা হতো পোড়ের ভাত।এই ভাত খেলে নাকি রুগি দ্রুত চাঙ্গা হয়ে উঠতো।

ঘুঁটে পুড়লে গোবর হাসে কিনা জানা নেই।তবে পোড়া ঘুঁটের ছাই দিয়ে সকালে উঠে দাঁত মাজা গ্রামবাসীদের মান্ধাতা আমলের অভ্যেস।এখন অবশ্য ছবিটা অনেকটা পালটেছে।কিন্তু পছন্দসই খাবার না পেলে ছেমুরাগীরা বলে ছাই খাবো?। এখনও মাঝে মাঝে দেখতে পাই পুকুরে চান করতে গিয়ে ব্রিটানিয়া থিন বিস্কুটের মতো ঘুঁটের ছাই অনেকেই মুর মুর করে খাচ্ছে।

গোয়াল গোবর ঘুঁটে গোরু খোঁজা

এবার গোরু খোঁজার পালা। মানে পণ্ডিতি গবেষণার দুচার কথা বলি। গোরু গোবর ঘুঁটের মহিমার কথা বলবো আর আর্যদের কথা আসবে না সে কেমন কথা! ভারি মজা লাগে যখন রাজনীতি প্রসঙ্গে গোবলয়ের কথা আসে।এইতো কদিন আগে করোনা থেকে করুণা পেতে গিয়ে গোরুর পেচ্ছাপ খাওয়ার হিড়িক পড়েছিল। কত জনা যে মোক্ষম গো-চাঁট খেয়েছে তাই নিয়ে কত হুলুস্থুলু কাণ্ড। সাধারণ লোকবিশ্বাস হলো গোভক্তি আর আর্যধর্ম যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।অবশ্য নাগরিক সমাজের দু একজন যখন গোবলয়ের আর্যামির বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রকাশ্য গোমাংস ভোক্ষণ করে বাহাদুরি দেখায় তখনও সেই পূর্বেকার আর্যামিই যে প্রকাশিত হয় সেকথা বলাই বাহুল্য।কেননা গোরু খুঁজতে গেলে মানে গবেষণায় দেখি তথাকথিত অন-আর্যরাই ছিলেন প্রকৃতপক্ষে গোমাতার সেবক।আর্যরা শুধু গোরুর মাংসই খেতো না, যাকে বলে গোরু চুরি করতেও ছিল ওস্তাদ।পরে তারা গোভক্তি হাইজ্যাক করে নেয় নিজেদের সংস্কৃতিতে।বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনায় আসছি।

সিন্ধুসভ্যতায় হিন্দুসভ্যতা

খ্যাতনামা নৃতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক অতুল সুর।তাঁর বিখ্যাত বই হিন্দু সভ্যতার নৃতাত্ত্বিক ভাষ্য। বইটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো হিন্দুসভ্যতার মূল উৎস হিসাবে সিন্ধুসভ্যতাকে দেখানো। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লেখক দেখিয়েছেন মাতৃকাতন্ত্রের উপাসনা,লোকদেবদেবী,শিবের উৎস ,লিঙ্গ যোনি পুজো, অবতারবাদ, নাগপুজো বৃক্ষপুজো, মূর্তিপুজো অর্থাৎ হিন্দু সংস্কৃতির বারোয়ানাই এসেছে অন-আর্য সংস্কৃতি থেকে। যার ধারক ও বাহক গ্রাম্য হিন্দুরাই।এবং আমরা বাঙালীর লোকসংস্কৃতি বলে যে বস্তুটাকে নিয়ে নাড়াচাড়া ও কাটা ছেঁড়া করি সেটি আসলে অনার্যদেরই সংস্কৃতি।

গোয়াল গোবর ঘুঁটের উৎস অনার্যসংস্কৃতি

ড.সুরের মতে অশ্বই ছিল আর্যদের সম্বল।তারা সিন্ধু সভ্যতার বাহকদের কাছ থেকে গাভী চুরি করে এনেছিল।তারপর তারা গুহার মধ্যে রক্ষিত গাভীসমূহ অপহরণ করেছিল(১/৬/৫) গাভী যে আর্যদের ছিল না তা তাদের প্রার্থনা থেকেই বোঝা যায়। প্রায় হাজার খানিক ঋকে শুধু শত্রুদের কাছ থেকে সম্পদ কেড়ে নেওয়ার প্রার্থনা।যার মধ্যে গোধন রয়েছে।ইন্দ্র নগর ধ্বংস করে পুরন্দর নামে খ্যাত হয়েছিল।তাছাড়া আর্যরা অশ্বমেধ এমনকি গোমেধ যজ্ঞ করতো।মোষের মাংস এমনকি কচি বাছুর পর্যন্ত খেতো।অতিথি এলে গোরুর মাংস রান্না করে খাওনোর প্রথা ছিল বলে অতিথির আরেক নাম ছিল গোঘ্না।সুতরাং বোঝাই যায় আর্য নয়, গোপালন প্রথা গোরু কেন্দ্রিক লোকাচার লোকসংস্কৃতির মূল উৎস হলো অনার্যসংস্কৃতি।

গোয়াল গোবর ঘুঁটে প্রত্নালোকে

এ কথার সত্যতা শুধু বৈদিক সাহিত্য থেকেই মেলেনি।মিলেছে খোদ প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে। সিন্ধুসভ্যতার শেষপর্বের সমকালীন সভ্যতা রাঢ় বাংলার পাণ্ডুরাজার ঢিবি।খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ অব্দ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ অব্দ পর্যন্ত ছিল প্রথম পর্বের কাল।এটি প্রাক ধাতুযুগ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।দ্বিতীয় পর্ব থেকে বাঙালীর সর্বপ্রথম তাম্রাশ্মীয় সভ্যতার অভ্যুদয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ অব্দ থেকে সূচনা।এই পর্বে যে গৃহস্থাপত্য দেখা গেছে সেখানে মিলেছে ঘরের মেঝেতে গোবরের আস্তরণ।একই ছবি আমরা মঙ্গলকোট উৎখননও দেখি।এখানেও কুঁড়ের ঘরের মেঝে নিকানো হতো গোরুর গোবর দিয়ে। (বিস্তারিত তথ্য মিলবে পুরাবৃত্ত ১ পৃষ্ঠা ৪২ এবং প্রত্নসমীক্ষা ইংরাজি প্রথম খণ্ড)সুতরাং সন্দেহ থাকে না যে গোরু কেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির জন্ম পুষ্টি সবই অনার্যদের হাত ধরে।পরে আর্যরা গোরুকে নিজেদের সংস্কৃতির মধ্যে আত্মসাৎ করে নেয়।

আরও পড়ুন –ঠিক্রে বা কল্কা–প্রতিমার চালির অলঙ্করণের এক বিস্মৃত ইতিহাস

ঘুঁটের দাম

শেষে আবার ঘুঁটের কথায় আসি।ঘুঁটের ছবি তুলছিলাম গ্রাম্যবাড়ির অন্দরমহলে।এক পৌঢ় মহিলা অবাক হয়ে বললেন ঘুঁটে কিনবে না কী গো!
মজা করে জিজ্ঞাসা করলাম — দর কত?
১৫ টাকা পোন।ভালো ঘঁসি।ফুল বাতেসার মতো। পাঁচ পোন লিলে দু গোণ্ডা ফাউ।
ফিরছিলাম যখন মনে পড়ে গেলো পান খড় ইত্যাদির মতো ঘুঁটে কেনা বেচাতেও সেই গোণ্ডা পোনের হিসাব। আজও টিকে আছে বহাল তবিয়তে।আর এ হিসাবের স্রষ্টা আমাদের পূর্বপুরুষ অস্ট্রিকভাষীরা।এদেরকেইতো আমাদের ইতিহাস অনার্য বলে দেগে দিয়েছে। হায় রে!

গ্রন্থঋণ–হিন্দু সভ্যতার নৃতাত্ত্বিক ভাষ্য–অতুল সুর,সাহিত্য লোক।

গোয়ালপুজোর ভিডিও


Share your experience
  • 136
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    136
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR. SWAPAN KUMAR THAKUR
লেখক-গবেষক ও অভিজ্ঞ ক্ষেত্রসমীক্ষক। কৌলাল অনলাইন ওয়েবসাইট ও প্রিন্ট কৌলাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। ড. ঠাকুর পেশায় শিক্ষক। প্রিয় বিষয় রাঢ়-বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি । বিবিধ পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।রচনা করেছেন ১৫টি বই ;বাঙ্গলার ইতিহাসে কাটোয়া,ইন্দ্রাণীর ইতিকথা, রাঢ় কথাঃমননে ও সমীক্ষণে,বঙ্গে বর্গিহাঙ্গামা ইতিহাস ও কিংবদন্তী,বাংলার মুখ,বাংলার লোক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি, রাঢ় বাংলার কবিগান,বাংলার কৃষিকাজ ও কৃষিদেবতা ইত্যাদি। পুরষ্কার ও সংবর্ধনা পেয়েছেন একাধিক সারস্বত প্রতিষ্ঠান থেকে যেমন কলকাতা প্রণয়-স্মারক পুরষ্কার, নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ,কলিকাতা লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে পেয়েছেন সারস্বত সন্মাননা।

1 thought on “গোয়াল গোবর ঘুঁটে আর গোরুর পুরাণ-ফিরে দেখা ইতিহাস

Comments are closed.