গ্রামের নামটি জলসোতি

Share your experience
  • 278
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    278
    Shares

 স্বপনকুমার ঠাকুর

কাটোয়া-আজিমগঞ্জ রেললাইনে গঙ্গাটিকুরি স্টেশন।চারদিকে শুধু  রোদ-জলমলে শস্যশ্যামলা মাঠ আর গাছপালার ছায়াছবি।দূরে দূরে গ্রাম।বামদিকে সর্পিল গতিতে বয়ে আসা বড়কাঁদর।এখন সে বিগতা্যৌবনা।শুকিয়ে কাঠখোট্টা। অথচ পাল-সেন আমলে সে ছিল ভয়ংকরী। দুকুলপ্লাবী;যুবতী তটিনী সিঙ্গাটোয়া।ডানদিকে সিদে রাস্তাধরে এগিয়ে আসুন।হ্যাঁ-ঠিক ধরেছেন এ হলো সেই ই্তিহাসের আলোময় গ্রাম। রাজা বল্লাল সেনের মা বিলাসদেবী। গঙ্গাতীরে হেমাশ্বযজ্ঞ করার পৌরোহিত্য স্বরপ দান করেছিলেন তাঁর গুরুদেব ওবাসুদেব শর্মণকে-এই গ্রামটি ।

সিঙ্গাটোয়া নদীরতীরে বাল্লহিট্টা!

এখন যাকে বলে বালুটে। লালমোরামের গাঁ-পথ পেরিয়ে চলুন ।খড়-গোবর-গোরুবাছুর মানুজনের আবহমান গেরস্থালির কোলাজ।এবার মোচর দেওয়া রাস্তা এসে থমকে গেছে  ভিনগাঁয়ের এক শিবঘরে।সামনেই পড়ে রয়েছে  বিরিক্ষি গাছতলায় ভাঙাচোরা প্রত্নস্তূপ।বিষ্ণুমূর্তির ভাঙা কীর্তিমুখ।চালির একাংশ। ভিতর থেকে উঁকি মারছে ভাঙা অচেনা মুখাবয়ব।তাতে একপ্রস্থ সিঁদুরের প্রলেপ।এবার  শিবঘরে এক ঝলক দেখুন।কী! চমকে গেলেন! ঠিকই ধরেছেন!পাল-সেন আমলের  তিন-তিনটে বিষ্ণুমূর্তি!

গ্রামের নামটি জলসোতি।প্রাচীন নাম জলস্রবস্তী।মুর্শিদাবাদজেলার সালার থানার অতি প্রাচীন এক জনপদ।গাছ-গাছালি ঘেরা। নম্র খড়ো মেঠোবাড়ী।পাশেই দালানকোঠার উদ্ধত ইমারত।সুধাগড় ঠাকুরপুকুর ছামপুকুর দীঘি কাঁটাগড়ে আনদখানি, বুড়িপুকুর হেদোপুকুর হাসনাপুকুর এমন কত পুকুরমালায় ঘেড়াবেড়া আদ্দিকালের গণ্ডোগ্রাম।কিন্তু এই গ্রামের উল্লেখ আছে ১৯১১ সালে আবিষ্কৃত বল্লাল সেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে।বোঝাই যায় একদা ব্রাহ্মণ কায়স্থ তথা উচ্চবর্ণ অধ্যুষিত রাজ-আনুকুল্য প্রাপ্ত জনপদ।এখন সে রাম না থাকলেও অযোধ্যার স্মৃতিস্বরূপ রয়ে গেছে প্রাচীন এই তিনটি বিষ্ণুমূর্তি।

বিষ্ণু হিন্দুদের ত্রি-দেবতার অন্যতম।একসময় উচ্চবর্ণ পূজিত বিষ্ণুর পারিবারিক মূর্তি ভোগবিষ্ণু।যে মূর্তির মধ্যস্থলে সমপাদস্থানিক ভঙ্গিমায় দণ্ডায়মান বনমালী বিষ্ণু। দুচোখে তাঁর ধ্যানের স্বপ্ন।তিনি চতুর্ভুজ।শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী।সঙ্গে তাঁর দুই প্রিয়তমা পত্নী।ডাইনে বাণীপাণি সরস্বতী।বামে লক্ষ্মী।আরও আছে দুই স্ত্রীর সালাঙ্কারা দুই পরিচারিকা।বিষ্ণুর পরণে ধুতি।গায়ে উত্তরীয়।মাথায় কিরীট মুকুট।চালির মাথায় কীর্তিমুখ।বিষ্ণুকে মালা পরাবার জন্য অন্তরীক্ষে ধাবিত বিদ্যাধর-বিদ্যাধরী।পাদপীঠ ত্রিরথাকৃতি।একেবারে নীচে জোড়করে বিষ্ণুভক্ত বাহন গড়ুর।

জলসোতির তিনটি মূর্তির মধ্যে দুটি রূপমণ্ডন অনুসারে ত্রিবিক্রম।কারণ বিষ্ণুর উপরের ডানহাতে গদা, বামহাতে চক্র,নিচের ডানহাতে শঙ্খ, বামহাতে শোভিত লীলায়িত পদ্ম।মাঝের মূর্তিটি আমার সম্পূর্ণ দেখার সৌভাগ্য হয়নি।কারন তখন সিংহাসনের আড়াল ছিল।তবে যেটুকু দেখেছি তাতে নিঃসন্দেহে মূর্তিটি বামন রূপের।কারণ উপরের  দুটি হাতে যথাক্রমে চক্র ও গদা। আর নিচের দুটি হাতে পদ্ম ও শঙ্খ।এই মূর্তিটি পুর্ণাঙ্গ।চালির উপরের অংশে বিদ্যাধর বিদ্যাধরী ছাড়া দেখা মিলেছে তম্বুরা বাদিকা গণমূর্তির।

জলসোতির অধিশ্বরী জলেশ্বরী চণ্ডী।শারদ একাদশী তিথিতে দেবীর গ্রাম ষোল-আনা পুজো।আর চাষের জন্য বৃষ্টিকামনায় দেবীর স্পেশাল পুজো।এইকারনেই তিনি জলেশ্বরী।দেবীমূর্তি বলতে ভাঙা চোরা কয়েকটি পাথরের টুকরো।হয়তো দেবীমূতি ছিল কোনকালে।হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির সলিলে।গ্রামের শিবগাজন দেখার মতো।নারীপুরুষে বাবা ভোলামহেশ্বরের ভক্ত হন চৈতিগাজনে।মড়ার মাথা নিয়ে প্রাগৈতিহাসিক ধর্মাচারণে জলসোতি তখন পাল-সেনযুগ অতিক্রম করে আরও দূর  ধুসর অতীতের ক্যানভাসে।

জলসতির জলতরঙ্গে বেজে ওঠে এক বিস্মৃত বৈষ্ণব পদকর্তার সুললিত সুরলহরি। মহাজন দাসজগমোহন ঠাকুরের পদাবলী।কে এই জগমোহন ঠাকুর? ইতিহাস সে সম্পর্কে বড় নীরব। অনেকেই বলেন তিনি ছিলেন  শ্রীনিবাস আচার্যের বংশধর।পূর্ব নিবাস আমগোড়িয়া।গ্রামবাসীরা দাবী করেন তিনি এই গ্রামের ভূমিপুত্র। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গৌর-নাগরীরূপের গৌরাঙ্গের দারুবিগ্রহ।রচনা করেছিলেন একাধিক গৌরপদাবলী।কালান্তরে সে সব হারিয়ে গেছে।পদকল্পতরুতে সংগৃহীত তাঁর ভণিতাযুক্ত একটি নন্দোৎসবের পদ পাওয়া গেছে।

পুরব জনম দিবস দেখিয়া আবেশে গৌররায়।

দ্বিজগণ লইয়া হরষিত হইয়া নন্দ মহোৎসব গায়।।

খোল করতাল বাজয়ে রসাল কীর্তন জনম লীলা।

আবেশে আমার গৌরাঙ্গ সুন্দর গোপবেশ নিরমিলা।।

ঘৃত ঘোল দধি গোরস হলদি অবনী মাঝারে ঢালি।

কান্ধে করি তাহার উপরি নাচে গোরা বনমালী।।

করেতে লগুড় নিতাই সুন্দর আনন্দ আবেশে নাচে।

রামাই মহেশ রাম গৌরীদাস নাচে তার পাছে পাছে।।

হেরিয়া যতেক নীলাচল-লোক প্রেমের পাথারে ভাসে।

হেরিয়া বিভোর আনন্দসাগর এ জগমোহন দাসে।।

দাস জগমোহনের লেখা  এই গানটি নন্দোৎসবের সময় তাঁর আরাধ্য দেবতাকে শোনানো হয়।

জগমোহন নিঃসন্দেহে সপ্তদশ শতকের পদকর্তা ছিলেন।এমন অনুমান অসঙ্গত নয়,কারণ তাঁর প্রতিষ্ঠিত গৌরবিগ্রহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বর্গিহাঙ্গামার বেদনাদ্র স্মৃতি।কথিত আছে এই মূর্তি আগে প্রতিষ্ঠিত ছিল কেতুগ্রাম থানার আমগোড়িয়া গ্রামে।বর্গিহাঙ্গামার সময় এই মূর্তির নিরাপত্তার জন্য মালদহের চাঁচলের রাজবাড়িতে স্থানান্তরিত হয়েছিল।জগমোহনের শিষ্য ছিলেন চাঁচলের রাজারা।গৌর সেবার জন্য তাঁরা পঞ্চাশ-ষাট বিঘা ভূসম্পত্তি দান করেছিলেন।দেশভাগের পর সে সম্পত্তি পাকিস্থানে চলে যায়।বর্তমানে সেবাইতদের ব্যক্তিগত অর্থে  মহাপ্রভুর সেবা চলে।জগমোহনের বংশধর ঠাকুরপরিবার  ছাড়াও দৈহিত্র সূত্রে চট্টোপাধ্যায় বন্দ্যোপাধ্যায় গোষ্ঠীরাও সেবাচক্রে জড়িত।

গৌরবাড়িতে নাটমন্দিরসহ দালানমন্দির রয়েছে।গর্ভগৃহে মহাপ্রভুর দারুবিগ্রহ ব্যতিরেকে ডানদিকে  কষ্টিপাথরের গোবিন্দ আর অষ্টধাতুর রাধারানি।বামে রয়েছেন একইভাবে রাধা-গোপীনাথ।৪১টি শালগ্রামশীলা ছাড়াও আছে গোপালমূর্তি।নিত্যসেবা হয় তিনবার।সকালে বাল্যভোগ,দুপুরে অন্নভোগের সঙ্গে শাক পঞ্চব্যঞ্জন ভাজা টক আর পরমান্ন পদাবলী।সন্ধ্যে দুধ মিস্টিসহ দুপুরের পান্তাভো্গের ব্যতিক্রমী   ব্যঞ্জনমালা।উৎসবের বারোমাস্যায় বৈশাখমাসে ঝারাদান।জষ্টিমাসে স্নানযাত্রায় ১০৮ঘটি গঙ্গা আর দুধদিয়ে স্নানযাত্রা।আষাঢ় মাসে রথযাত্রা।শ্রাবনে ঝুলনযাত্রা।এই সময় বাৎসরিক উৎসব।তিন দিন ধরে নাম সংকীর্তন আর কীর্তন গানের সঙ্গীতবাসর।ভাদ্রমাসে জন্মাষ্টমী,আশ্বিনে রাধাষ্টমী,কার্তিকমাসে নিয়মসেবা,অগ্রানে নবান্ন গৌরভবনে,ভবনে। ফাল্গুনমাসে দোল,মহাপ্রভুর জন্মোৎসব ।এখানে হয় পঞ্চম দোলের বর্ণাঢ্য আয়োজন।

জলসোতি আপাদমস্তক বৈষ্ণবভূমি।শুধু দাস জগমোহনের স্মৃতি নয়;এই গ্রাম জড়িয়ে রেখেছে প্রাক-চৈতন্যযুগের পৌরাণিক বৈষ্ণবধর্মের স্মৃতিবিস্মৃতির নক্সিকাঁথাখানি।প্রাচীন তিনটি বিষ্ণুমূর্তি যার সাক্ষ্য দিচ্ছে আজও।কালান্তরে এই বঙ্গ থেকে বিলীন হয়ে গেছেন শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী পাথুরে বিষ্ণু।এসেছেন বংশীধারী ত্রিভঙ্গ মুরারি কৃষ্ণ।যাঁর বাঁশির সুরে  অভঙ্গ বঙ্গ হলো মধুর বৃন্দাবন।এই কৃতিত্বের পুরো অধিকারী এক দেবায়িত মানব-সন্তান।নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিত।দাস জগমোহনের আরাধ্য  করুণাময় মহাপ্রভু।

জলসোতির ইতিহাস-ভূমিতে আমার প্রণাম!

কৃতজ্ঞতাঃসুদীন বিথুন চট্টোপাধ্যায় ও বরুণ ঠাকুর


Share your experience
  • 278
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    278
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR.SWAPAN KUMAR THAKUR
ড.স্বপনকুমার ঠাকুর।গবেষক লেখক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।কৌলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।