গাঁয়ের পুজো পরিক্রমা-গুড়ের মিস্টান্ন শিল্প আর চালভাজা মুড়ি

Share your experience
  • 266
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    266
    Shares

গাঁয়ের পুজো নাড়ু
 নাড়ু  গাঁয়ের পুজো

গাঁয়ের পুজো পরিক্রমা-গুড়ের মিস্টান্ন শিল্প আর চালভাজা মুড়ি।গ্রাম বাংলার দুর্গাপুজো মানেই বড় পুজো।মেয়েদের বাপের বাড়ি থেকে আসা থেকে শুরু করে তত্ত্বতালাস গুড়ের মিস্টি চালভাজা মুড়ির সাতকাহন লিখছেন–স্বপনকুমার ঠাকুর।

গাঁয়ের পুজো-সাতকাহন

এইতো সেদিনের কথা। অথচ দেখতে দেখতে দুটি দশক হাওয়া। দুগগাপুজোর ক দিন আগেকার কথা। বেশ একটা সাজো সাজো রব পড়ে গেছে। দূর গাঁয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে মেয়েরা বাপেরবাড়ি আসছে।বাড়ি ঘর এলামাটি দিয়ে নিকিয়ে চুকিয়ে ঝকঝকে তকতকে।পাড়ার অবিবাহিত মেয়েরা বিকেলে খড়ি গোলা আর ছাগলের ঘাড়ের লোম কেটে তুলি বানিয়ে বাড়ির বাইরের দেওয়ালে সব লতাপাতা আর নকশা আঁকছে মনের সুখে।ষষ্ঠীর দিন মেয়ের বাড়িতে তত্ত্ব যাবে।বাজার হাট চলছে। গাঁয়ের গরিব গুর্বো মানুষ।এইসময় দেকুড়ির দীনেশ ফেরিওয়ালার কাছে সবাই হামলে পড়ে।সস্তার রঙিন ফ্রক।ছাপা লুঙি।ডুরেল শাড়ি।নাতি নাতনির হাফশার্ট জামা। ইংলিস প্যান্ট।

গাঁয়ের পুজো মুড়ি ভাজা

ভোর থেকে মুড়িভাজার ধূম ।আগের দিন চাল নুনিয়ে বারান্দার হাওয়ায় মেলে দেওয়া হয়েছে।ভাতের চালের চালভাজা হবে।কুসুমফুলের বীজ,ডিঙিলির বীজ গোলাপ ছোলা বড় বুট কলাই পুরুত কলাই আর মোটা মোটা মটর নুন মাখিয়ে শুকিয়ে ঝনঝনে করে রাখা হয়েছে।পেল্লাদের মা মুড়ি ভাজে।এই সময় জোটে পাঁচপো মুড়ির সঙ্গে মুড়ি ভাজুনের কাপড়। ভোরে এসে হাজির।ঘুলি ঘুলি ভোর।দূর থেকে ছোটলাইনের ট্রেনের হুইসেল।একটা হিমেল হাওয়ায় মৃদু স্রোত।এই সময় মুড়ির চাল নাড়তে নাড়তে কেউ কেউ সুর করে মৃত বাবা মা বা নিকট আত্মীয়র জন্য কাঁদে।আমাদের বাংলার মাস্টার ছিলেন পাঁচুবাবু। কানে কালা হলেও বেশ রসিক মানুষ।বেশ মনে পড়ে অপিনিহিতি বোঝাতে মুড়ি ভাজুনির কান্নাকে তিনি উদারণ হিসাবে ব্যবহার করতেন আর আপন মনে হাসতেন।

গাঁয়ের পুজো কাপড়কাচা

সকাল সকাল পুকুরের ঘাটের উপচে পড়া ভিড়। বেড়া জালে মাছ ধরেছে ছিদাম বাগদির দল।বিহারি ফেরিওয়ালা এই সময় বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতে আসতো দুধ সাদা সোডার পাটালি।সেগুলি ভেঙে গরমজলে ডাঁই করে এক পেছে কাপড় নিয়ে ঘাটে ঘাটে হাজির মেয়েরা।সঙ্গে একটা কাঠের পাটা।তারপর সেই দুপুর অবধি ধূপ ধূপ করে আওয়াজ।কাপড় কাচা চলছে।বাড়িতে তখন পিঁড়ের ধারি দেওয়ালের কাঁথে আলকাতরা দেওয়ার তোড়জোড়।এইসময় ছেলেপুলেকে নিয়ে ভয়।দেওয়ালে অসতর্ক ভাবে পিঠ দিলে একেবারে আলকাতার স্ট্যাম্প।নতুন জামাপ্যাণ্টের দফারফা।

গাঁয়ের পুজো  সিঁড়ির নাড়ু
গাঁয়ের পুজো সিঁড়ির নাড়ু

গাঁয়ের পুজো গুড়ের মিস্টি

দুপুরে একটা মিস্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো।ভিয়েন শুরু হয়েছে। অনেক আগে থেকেই কড়াতাকের আখের গুড় টিন থেকে বের করে একটা বড় ঝাঁজুড়িতে ঝরাতে দেওয়া হতো।পুরুষরা এক ডজন নারকেল কাটারি দিয়ে দু আদখানা করে নিয়ে কুড়ুনিতে কুঁড়তে বসে গেছে। প্রায় দশ সের গুড়ের ভিয়েন ।চাট্টিখানি কথা নয়। পাড়ার গেবোর মা সুনুরে ভিয়েনদার।এই সময় তার কদর বেড়ে যায়।একটু গরজও ঠাওরায়।তা হোক।তিনি এই কাজে যাকে বলে মাস্টার।গুড় কড়াইএ চাপিয়ে তিনি বলে দিতে পারেন গুড় মরবে কি মরবে না! না মরলেও তিনি অন্য ব্যবস্থা করবেন।

গুড় মরলে এবার নারকোলের মিস্টি পাকানোর কাজ।বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও হাতে তেল মেখে এই কাজে হাত লাগায়। শুধু কী নারকোলের নাড়ু।ভালো কলমা চালের মুড়ির মোয়া,তিলের নাড়ু ছোলার নাড়ু চিঁড়ের নাড়ু বেসন ভাজার সিঁড়ির নাড়ু হরেক রকমের নাড়ু এই সময় তৈরি হতো।এর উপর আছে মুড়কি তৈরি করার ফৈজত। বাছাই ধান গরম কড়াই বালি দিয়ে ভেজে নেওয়া হতো।ঝাঁটার কাটির কুঁচি দিয়ে সেই সাদা ফুলের মতো খই নামিয়ে আবার বড় চালুনি সহযোগে ঝাড়াই বাছাই করে পাতলা গুড়ে মাখানো হতো।আহা ! সে কী স্বাদ গন্ধ! দেখতে এসব কোথায় হারিয়ে গেলো। গুড়ের পর হতো চিনির নাড়ু।তবে এটা এলিট কাস্টের লোকেদের বাড়িতেই বেশি হতো।মিস্টি হয়ে গেলে ঝকঝকে এক একটা কাঁচের বয়ামে সেই মিস্টিগুলো রাখা হতো ভাঁড়ার ঘরে সাজিয়ে।

গাঁয়ের পুজো  খণ্ড
গাঁয়ের পুজো খণ্ড

খণ্ড

আরেকটি গুড়ের মিস্টি ছিল। রাঢ়ের গিন্নিরা এটা তৈরিতে বড়ই সিদ্ধহস্ত। নাম ছিল খণ্ড। পুজোর সময়ে বেশি হতো।এবং বেশ অনেকটা পরিমানে।প্রায় সারা বছরের জন্য।ঠাকুর বাড়ির নৈবেদ্য দেওয়ার সময় এই গুড়ের খণ্ড মাথার উপরে থাকতো মণ্ডাটির মতো।কিম্বা কেউ বাড়িতে এলে বা মাঠ থেকে ফিরলে খণ্ড দিয়ে জল কাহোয়ার রেওয়াজ।মুনিশ রাখালেরাও বাদ যেত না।বিজয়া দশমীর পরের দিন থেকে বাড়িতে বাড়িতে প্রণামের ঘটা ।বিশেষ করে বামুনবাড়ি হলেতো কথাই নেই।এক্কেবারে বাগদি বাউড়িপাড়া থেকেও মাঠাকরুনদেরকে প্রণাম করতে আসতো।চাট্টি চালভাজা,দুটো খণ্ড দিয়ে জলখেতে দিত।আর থাকতো চা।কী নিবিড় সম্পর্কের বন্ধন ছিল একটা। খণ্ড হতো গুড় নেড়ে নেড়ে। এর সঙ্গে কিছু মেশানো হতো না।কিন্তু স্বাদ ছিল অসাধারণ।

গাঁয়ের পুজো  হলুদ চালভাজা
গাঁয়ের পুজো হলুদ চালভাজা

 চালভাজা

পুজোর সময় চালভাজা তৈরি করাটা ছিল একটা শিল্প। আলুনে চালভাজার জন্য ব্যবহার করা হতো ভাতের চালের মুড়ি।কিম্বা বাছাই করা খুদ।হালকা করে নেড়ে চুড়ে ভাজা হতো।তারপর নানা মশলা ও বিট নুন দিয়ে মাখিয়ে যাকে বলে ওমিত্তি। সাধারণ চালভাজা করা হতো হলুদ মাখিয়ে নুনিয়ে নিয়ে।এই মুড়ি ভাজার বিশেষ তাক বাগ ছিল।কতটা নাড়তে হবে খোলায়, কখন নামাতে হবে তা দক্ষ মুড়ি ভাজুনিদের কাছে ছিল শেখার বিষয়।মুড়ি ভাজা হলে ছোলা মটর নানা ধরনের বীজ বাদামভাজা এসব মেশানো হতো।মুড়িটা একটু শক্ত।এরপর গোটা লঙ্কা গোটা জিরে মৌরি তেল ছাড়া তাওয়ায় ভেজে মুড়িতে মেশানো হতো।আমাদের বাড়িতে আবার এগুলো গুড়িয়ে নিয়ে মুড়িতে সরাসরি তেল মাখিয়ে টিন বন্দি করে রাখা হতো।জামাই আপ্যায়নের প্রধান অঙ্গ ছিল চালভাজা সহযোগে ফালা ফালা নারকেল,পিঁইয়াজকুচি কাঁচালঙ্কা আর নানা ধরনের গুড়ের মিস্টি।

আরও পড়ুন- শরতের শালুক ফুল-জড়িয়ে আছে লোকবিশ্বাস লোকসংস্কৃতি

দেখতে দেখতে সেদিন কোথায় হারিয়ে গেলো।

ছবি–অপূর্ব ব্যানার্জী

 দেখুন কৌলালের পুজো পরিক্রমা


Share your experience
  • 266
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    266
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR. SWAPAN KUMAR THAKUR
লেখক-গবেষক ও অভিজ্ঞ ক্ষেত্রসমীক্ষক। কৌলাল অনলাইন ওয়েবসাইট ও প্রিন্ট কৌলাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। ড. ঠাকুর পেশায় শিক্ষক। প্রিয় বিষয় রাঢ়-বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি । বিবিধ পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।রচনা করেছেন ১৫টি বই ;বাঙ্গলার ইতিহাসে কাটোয়া,ইন্দ্রাণীর ইতিকথা, রাঢ় কথাঃমননে ও সমীক্ষণে,বঙ্গে বর্গিহাঙ্গামা ইতিহাস ও কিংবদন্তী,বাংলার মুখ,বাংলার লোক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি, রাঢ় বাংলার কবিগান,বাংলার কৃষিকাজ ও কৃষিদেবতা ইত্যাদি। পুরষ্কার ও সংবর্ধনা পেয়েছেন একাধিক সারস্বত প্রতিষ্ঠান থেকে যেমন কলকাতা প্রণয়-স্মারক পুরষ্কার, নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ,কলিকাতা লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে পেয়েছেন সারস্বত সন্মাননা।

2 thoughts on “গাঁয়ের পুজো পরিক্রমা-গুড়ের মিস্টান্ন শিল্প আর চালভাজা মুড়ি

Comments are closed.