গুসকরার ৪০০ বছরের  প্রাচীন চোঙ্গদার বাড়ির ব্যতিক্রমী দুর্গা পূজা

Share your experience
  • 37
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    37
    Shares

 ডা.তিলক পুরকায়স্থ

 

বৌদ্ধ থেকে ব্রাহ্মণ, যজমানি ছেড়ে সেনাপতি, দশমীতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান- এক ব্যতিক্রমী বাড়ির পূজা ও  ইতিহাস দর্শন।গুসকরার ৪০০ বছরের  প্রাচীন চোঙ্গদার বাড়ির ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজা।এই পুজো সম্পর্কে  কিছু বলার আগে আসুন জেনে নি- এই জমিদার বাড়ির প্রাচীন ইতিহাস।

চোঙ্গদার মানে সেনাপতি, সুতরাং আপনাদের মনে হতেই পারে যে এনারা বোধহয় ক্ষত্রিয়।কিন্তু তা নয়, আদতে পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রাম থেকে আগত চট্টোপাধ্যায় ব্রাহ্মণ।তবে এনাদের কোন পূর্বপুরুষ যজমানি ছেড়ে রাজার সেনাদলের সেনাপতি হয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই চোঙ্গদার উপাধির উদ্ভব। একটি বইয়ে দেখছি, গবেষক ডাঃ পঞ্চানন ঘোষালের মতে তাঁদের গুসকরায় আগমন ঘটে বহু আগে, কম করে হাজার বছর পূর্বে। গবেষক শিব শংকর ঘোষের মতে, এঁরা আগে বৌদ্ধ ছিলেন। পরে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে, হিন্দু ধর্মের প্রচার এবং প্রসারের জন্য বহু মন্দির বিশেষ করে শিব মন্দির নির্মাণ করেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দিরটি হচ্ছে নিকটবর্তী কুনুর নদীর ধারে অবস্থিত বিখ্যাত সোমেশ্বর শিব মন্দির এবং অসাধারণ সুন্দর রটন্তি কালী মন্দির।

 

এছাড়াও নিজেদের বাড়িতে এঁরা বিশাল দুর্গাদালান নির্মাণ করেন যেখানে দুর্গাপূজা ছাড়াও জাঁকজমকের সঙ্গে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে থাকে।  দুর্গাদালানের পাশেই আছে তিনটি শিবমন্দির এবং কালীমন্দির। কালীমন্দিরে মায়ের কাঠামো রাখা আছে। কালীপুজোর সময়, মূর্তি বানিয়ে কালীমন্দিরে ধূমধামের সঙ্গে কালীপূজা হয়।

জমিদার বাড়ি নাম হবার অনেক আগেই, চোঙ্গদার বাড়ির দুর্গা পূজার সূচনা হয় প্রায় চারশ বছর আগে জনৈক চতুর্ভূজ চোঙ্গদার এবং তস্য পত্নী বিদ্যাধরী চোঙ্গদারের হাতে। অদ্ভুত সমাপতন হচ্ছে, এক দুর্গাপূজার দশমী তিথিতে এই দম্পতির মৃত্যু হয়। তখন এঁদের দুজনের মরদেহ , দুর্গাদালানেরই এক কোনায় সমাহিত করা হয়।  এনাদের সমাধিস্থলই হচ্ছে বর্তমানে দুর্গাদালানের যজ্ঞের বেদী।

এই বাড়ির এক ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ গিরিশ চোঙ্গদারের সময়ই এই পরিবারে ধন ঐশ্বর্যের বান ডাকে। এই গিরিশবাবুই চোঙ্গদার জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা মানা হয়।

কিন্তু চিরকাল কাহারো সমান নাহি যায়। যখন জমিদারি ছিল তখন হয়ত বাঘে গরুতে একঘাটে জল খেত। এখন জমিদারিও নেই, রাজ ঐশ্বর্য ও নেই, বংশধরেরা বেশিরভাগ কে কোথায় ছিটকে গেছে। আজ এই প্রাচীন স্থ্যাপত্য শৈলীর জমিদার বাড়ি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। দেওয়াল ছাতা ধরা, পলস্তরা খসে পড়ে পুরান ইঁট তার বলিরেখা দেখাচ্ছে। তা সত্ত্বেও বাংলার প্রাচীন প্রথাকে ,জমিদারি আভিজাত্যকে এখনও প্রাণপনে আঁকড়ে রাখার চেষ্ঠা করছে এই প্রাচীন বাড়ি। বিশাল কাঠের ঢেঁকিটি তার অন্যতম প্রমান। তবুও পুজোর কয়টা দিন বিশাল দুর্গাদালান, জেগে ওঠে , মহামায়ার আগমনে ।

 

বিশাল চোখ জুড়ান আলপনা দুর্গদালানের মেঝে জুড়ে। কচি কাঁচাদের হৈ হুল্লোড়, উঠতি বয়সীদের জমাটি আড্ডা, আলতা পড়া সুন্দরীদের নুপূর পায়ে চলার শব্দে, বিগত যৌবনা প্রাচীনা জমিদার বাড়ির ধমনীতে যেন নতুন রক্ত সঞ্চালন হয়েছে।

দুর্গদালানের বেদীতে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল এই বংশের বর্তমান পুরুষ শ্রী গৌতম চোঙ্গদারের সঙ্গে। মায়ের আসনের সামনে ডানদিকের ঘটটি হচ্ছে ভৈরবনাথ ঘট।এই ঘটটি মন্দিরেই অধিষ্ঠিত থাকেন, কখনও বিসর্জন হয় না।বামদিকের ঘটটি শান্তি কলস। এছাড়াও বেদীতে রাখা আছে রুপোর নারায়ণের সিংহাসন।পুজোর চারদিন কাঁচের চিমনির মধ্যে রাখা একটি প্রদীপ সর্বক্ষণ জ্বলে দশমী অবধি, যাকে বলা হয় প্রাণপ্রদীপ।আর সর্বক্ষণ জ্বলে যজ্ঞ স্থলের হোমের আগুন।

গৌতমবাবুর কাছে জানা গেল, দশমীর পুজো সাঙ্গ করে ওনারা পুজোর প্রতিষ্ঠাতা চতুর্ভূজ ও বিদ্যাধরীর স্মরণে এক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেন। এরপর শান্তিকলস বিসর্জন দেওয়া হয় কিন্তু ভৈরবনাথ ঘট দুর্গাদালান মন্দিরের এক কোণায় রেখে দেওয়া হয়।একসময় একাদশীর দিনে অর্থাৎ চতুর্ভূজ ও বিদ্যাধরীর প্রতিকী শ্রাদ্ধ হবার পরদিন গ্রামবাসী এবং প্রজাদের ভুড়িভোজ করে খাওয়ানো হতো। তবে সেসব এখন অতীত। এখানকার মূর্তিতে একটি অদ্ভুত বিশেষত্ব চোখে পড়ল।

দুর্গা এবং তাঁর পরিবারের সবার মাথায় মুকুট থাকলেও, এখানের সরস্বতী ঠাকুরের মাথায় কোন মুকুট নেই ।কেন ,এই প্রশ্ন মাথায় এসেছিল কিন্ত জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছিলাম।

 

দুর্গাদালানেই রাখা আছে জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের কাঠামো। দেখলাম এবং শুনলাম যে এখানের জগদ্ধাত্রী পুজোয় দুটি সিংহ এবং জয়া ও বিজয়ার মূর্তি থাকে। এরকম জগদ্ধাত্রী মূর্তিও খুব কমই দেখা যায়। বার বার করে ওনারা জগদ্ধাত্রী পুজোয় আসতে বললেন। জগদ্ধাত্রী পুজোয় একবার এই ব্যতিক্রমী পুজো বাড়িতে আসাই যায়।

চোঙ্গদার বাড়ির দুর্গাপূজায় জাঁকজমক, ঠাট বাট হয়ত আগেকার দিনগুলি থেকে অনেক কমে গেছে, কিন্তু আন্তরিকতা, নিষ্ঠা এবং ঐতিহ্যের বিচারে এখনও এই বাড়ির পুজো এক অনন্য উদাহরণ।

 

এখানে আসা কোন ব্যাপারই না। বাসে, গাড়িতে বা ট্রেনে গুসকরা এসে গাড়ি ভাড়া করে এখানে চলে আসা যায়। সব ড্রাইভারই  এই বাড়ি চেনে।রিক্সা নিলে গুসকরা স্টেশন থেকে একদম কাছেই। কলকাতা থেকে নিজের গাড়ি নিয়ে এলে,  গুগুল ম্যাপে চোঙ্গদার জমিদার বাড়ি লিখলেই হবে। এখানে এলে খুব কাছেই আরো দুটি এরকম অতি প্রাচীন বাড়ি- মাজি বাড়ি এবং পাত্র বাড়ির ব্যতিক্রমী দুর্গা ঠাকুর ও দর্শন হয়ে যাবে। আর চন্দননগরের বাইরে গিয়ে এই ব্যতিক্রমী বাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোয় একবার আসুন না।

ছবি:- লেখক।

 

ঋণ স্বীকার:-১) শ্রী গৌতম চোঙ্গদার, চোঙ্গদার বাড়ির বর্তমান পুরুষ এবং এই পুজোর অন্যতম ব্যক্তিত্ব।

২)বঙ্গের শারদোৎসব ও ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজা- শিবশংকর ঘোষ।

৩)শ্রী নবারুণ মল্লিক, ক্ষেত্রসমীক্ষক।

 


Share your experience
  • 37
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    37
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।