হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী- ইতিহাস ও বাৎসরিক পুজো

Share your experience
  • 732
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    732
    Shares

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী- নিছক এক কালীমূর্তি নয়।এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাবর্ণদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক বিচিত্র অধ্যায়।হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের সংস্কার করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন রানি রাসমণিও।লিখছেন–শুভদীপ রায় চৌধুরী

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী
হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী

সাবর্ণ রায় চৌধুরী–কাটোয়ার আমাথি বা আমূল

একাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বেদগর্ভের বংশধরগণ বর্ধমান জেলার কাটোয়া থানার প্রাচীন জনপদ আমাথি(আমাটিতে)তে বসবাস শুরু করেন। এই বংশের নবমপুরুষ শৌরী সম্ভবত ১০৮২খ্রীঃ প্রথম গঙ্গগ্রাম থেকে আমাটিতে আসেন। বঙ্গদেশে হিন্দুধর্মের সংস্কারের জন্য বল্লাল সেন উচ্চবর্ণের মধ্যে অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ সমাজে কুলীন প্রথার প্রবর্তন করেন। বল্লাল সেন কুলীন বিচারের নয়টি গুণ নির্ণয় করলেন অর্থাৎ আচরণে, বিনয়ে, বিদ্যায়, সামাজিক প্রতিষ্ঠায়, তীর্থদর্শনের অভিজ্ঞতায় জ্ঞানী, নিষ্ঠাবান, নিজবৃত্তিতে পারদর্শী, দানে সক্ষম এই নয়টি গুণ যে সমস্ত ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থ সমাজে রয়েছে তারাই কুলীন বলে পরিচিত।

আমাথির গঙ্গোপাধ্যায় বংশ

আমাটির সাবর্ণ গোত্রীয় গঙ্গোপাধ্যায়গণ বল্লাল সেনের এই সমীকরণে কয়েক পুরুষ পরপর উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে আমাটির গঙ্গোপাধ্যায় বংশের চতুষ্পাঠীর খ্যাতিও ছিল অম্লান। এই বংশের ১৪তম পুরুষ হলধর গঙ্গোপাধ্যায় মহাপণ্ডিত ছিলেন, তিনি ব্রাহ্মণ্য কৃষ্টি ধরে রাখার জন্য ‘ব্রাহ্মণসর্বস্ব’,’কবিরহস্য’ ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। মূলত আমাটির গঙ্গোপাধ্যায় বংশ বরাবরই মূখ্য কুলীন ছিলেন এবং ১৫ও ১৬তম পুরুষ আয়ূরাম ও বিনায়ক পূর্বপুরুষের সম্মান ও কৃষ্টিকব মূলধন করে আমাটিতেই জীবনযাপন করতে লাগলেন। বেদগর্ভের অধস্তন ১৭তম বংশপুরুষ শিব গঙ্গোপাধ্যায় সংস্কৃত সাহিত্যে পাণ্ডিত্যের জন্য ১৩৮২খ্রীঃ “ব্যাস” উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি একাধারে সুবক্তা, সুলেখক এবং মহাজ্ঞানী পুরুষ ছিলেন।

পরমেশ্বর গঙ্গোপাধ্যায়

সাবর্ণদের ১৮তম পুরুষ পরমেশ্বর গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন স্বনামখ্যাত পণ্ডিত। তিনি “পুরারি” নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। পরমেশ্বর বা পুরারি গঙ্গোপাধ্যায় সুলতান আলাউদ্দিন হুসেনের আমলে সর্বপ্রথম বাংলায় মহাভারত রচনা করেছিলেন। তিনি আমাটিতেই ছিলেন এবং তাঁর দুইভাই পূর্ববঙ্গে জীবিকার সন্ধানে গিয়েছিলেন। বর্ধমানের কাটোয়ার আমাথি(আমাটির) বসবাস ত্যাগ করে সাবর্ণ গোত্রীয় বংশধরগণ বর্তমান হুগলি জেলার ত্রিবেণীর নিকট ভাগীরথীর পশ্চিম উপকূলে গোহট্ট(বর্তমানে গোপালপুর) গ্রামে চলে আসেন।

পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায়

সাবর্ণ গোত্রীয় পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি সম্রাট হুমায়ুনের সেনাপতি ছিলেন, বলা যায় ব্রাহ্মণ সেনাপতি ছিলেন এবং সম্রাট হুমায়ুন তাঁকে ‘সখত্ খাঁ’ বা ‘শক্তি খাঁন’ উপাধি দিয়েছিলেন এবং মুঘল সম্রাট কর্তৃক ৪৫টি গ্রামের হাভেলি পরগণা জায়গির পান। এতদিন সাবর্ণ বংশধরগণ ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপন করেছিলেন কিন্তু সেনাবাহিনীর কাজ থেকে অবসরগ্রহণের পর পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় পূর্বতীরে হাভেলি শহর পরগণায় নতুন সমাজ গঠন করে হাভেলিশহর গড়ে তোলেন। সেকারণে তিনি হাভেলিশহরে নতুন করে ব্রাহ্মণ্য সমাজের পত্তন করেছিলেন।

হালিশহর বৈদ্যবাটী কুমারহট্ট

পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুর থেকে বৈদ্যদের নিয়ে আসলেন এবং হালিশহরে বসতি তৈরি করে দিলেন। বৈদ্যদের অপর একদল ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে পল্লী গঠন করলেন যার বর্তমান নাম “বৈদ্যবাটী”। ওড়িশা এবং দক্ষিণভারত থেকে যজুর্বেদীয় ব্রাহ্মণদের এনে চতুষ্পাঠী স্থাপন করে ভট্টপল্লীতে জমি দান করলেন, বর্তমানে যার নাম “ভাটপাড়া”। হাভেলিশহরে প্রচুর চতুষ্পাঠী গঠন হল, টোলে টোলে বহু কুমারবয়সি ছাত্রদের আগমন ঘটল, যেন হাভেলি শহরে কুমারদের হাট বসেছে এইভাবেই হাভেলিশহরের নাম হল কুমারহট্ট।

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী
হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী

কাঞ্চনপল্লি

তাই অঞ্চলের পরিচিত সেই থেকে কুমারহট্ট হাভেলিশহর বা কুমারহট্ট হালিশহর। পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় স্বর্ণশিল্পীদের এনে বসতি স্থাপন করেছিলেন, নাম হয়েছিল “কাঞ্চনপল্লী” বর্তমানে যা কাঁচড়াপাড়া নামে পরিচিত। শিল্পীদের বিভিন্ন শিল্পসামগ্রী বিক্রি করবার জন্য নতুন করে হাট বসানোরও ব্যবস্থা করেছিলেন, অতীতে এই হাটের নাম “নবহট্ট” বর্তমানে যা “নৈহাটী” নামে পরিচিত। সুতরাং সাবর্ণ বংশের পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় সৃজনশীল বংশধরগণের অন্যতম।

শ্রীচৈতন্যদেব

পঞ্চদশ শতাব্দীতে নিমাইও(মহাপ্রভু শ্রীশ্রীচৈতন্যদেব) হালিশহরে টোলে পাঠ গ্রহণ করতে আসতেন। তিনি সাবর্ণ গোত্রীয় মহাপণ্ডিত শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরীর থেকে দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। ‘আইন-ই-আকবরি’তে সারকার সাতগাঁর অন্তর্ভুক্ত পরগণাসমূহের মধ্যে হাভেলি শহরের নাম রয়েছে। এই বংশের ২১তম পুরুষ জীয়া গঙ্গোপাধ্যায় ১৫৩৫বা ৪৮খ্রীঃ মধ্যে গোহট্ট-গোপালপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে শিক্ষালাভের জন্য হালিশহরে এসেছিলেন। এই জীয়া গঙ্গোপাধ্যায়ই পরবর্তীকালে কামদেব ব্রহ্মচারী নামে প্রসিদ্ধ।

লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

পণ্ডিত জীয়া গঙ্গোপাধ্যায় “বিদ্যা বাচস্পতি” উপাধি দ্বারা ভূষিত ছিলেন। তাঁরই পুত্র হলেন লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি ১৬০৮সালে মানসিংহের থেকে ৮টি পরগণার বিশাল জায়গির পান এবং সাথে রায়, চৌধুরী উপাধিও। পরিচিত হয়েছিলেন রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরী হিসাবে, যিনি কলকাতার প্রথম সমাজসংস্কারক ছিলেন। রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরীর জ্যেষ্ঠপুত্র রামকান্ত রায় চৌধুরী কুমারহট্ট হালিশহরে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র জগদীশ রায় চৌধুরী(১৬২০-১৬৯০) ধার্মিক পুরুষ ছিলেন। জগদীশের জ্যেষ্ঠপুত্র তথা ২৫তম বংশপুরুষ বিদ্যাধর রায় চৌধুরী(১৬৪০-১৭২০) হালিশহরে বহু কর্মনিদর্শন রেখে গেছেন। তিনিই কুমারহট্ট হাভেলিশহরে শাক্ত-শৈব এবং বৈষ্ণব এই তিনধারার সুবন্ধন স্থাপন করে গিয়েছিলেন।

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী

কথিত রয়েছে রায় বিদ্যাধর মজুমদার চৌধুরী সকালে গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে একটি কষ্টিপাথর পেয়েছিলেন। স্বপ্নাদিষ্ট কষ্টিপাথর থেকে এক অন্ধ ভাস্করকে দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন শিব-শ্যামা এবং শ্যামরায়। সেই মূর্তিত্রয় হালিশহরেই প্রতিষ্ঠিত। বাজারপাড়ার গঙ্গাতীরে কালিকা, চৌধুরীপাড়ায় শ্যামরায় এবং শিবের গলিতে বুড়োশিব প্রতিষ্ঠা করেন। বাজারপাড়ার তিনশো বছরের পুরানো মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে যায়, যদিও তার চিহ্ন রয়েছে আজও। পরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে মন্দিরটি স্থানান্তরিত হয় বলদেঘাটায়।

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী মূর্তি

তবে কালিকাদেবীর নামানুসারে বাজারপারাে নামটি হয় কালিকাতলা এবং একটি দালানঘরে মূর্তি স্থাপন করা হয়(১৮৫০-৫৫খ্রীঃ)। পরবর্তীকালে ১৩২৩বঙ্গাব্দে সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশজ যোগেশচন্দ্র রায় চৌধুরীর স্ত্রী বসন্তকুমারী দেবী সিদ্ধেশ্বরী মন্দির ও তার সামনের নাটমন্দির সংস্কার করেন। বর্তমানে নবনির্মিত মন্দিরটির নির্মাণকাল ৮ই আগস্ট ১৯৯৮সালে। মন্দিরের সামনে রয়েছে দক্ষিণদিকে নাটমন্দির এই নাটমন্দিরে কড়িবরগার ছাদ রয়েছে এবং থাম রয়েছে বারোটি। সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের পাশেই রয়েছে আটচালার শিবমন্দির। বারেন্দ্রগলির রায়দের প্রতিষ্ঠিত চারটি শিব লিঙ্গের মধ্যে একটি রায় চৌধুরীদের কৃষ্ণচন্দ্র রায় দেবীর পাশে প্রতিষ্ঠা করেন।

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী ও বলদেঘাটার চট্টোপাধ্যায় পরিবার

উন্নতমানের অমূল্য কষ্টিপাথরের ছয়ফুট উচ্চতার চতুর্ভূজা সিদ্ধেশ্বরীমাতার অপূর্ব বিগ্রহ রয়েছে মন্দিরের গর্ভগৃহে। শ্বেতপাথরের শিবের ওপর মা দণ্ডায়মানা। হাতে খড়গ নৃমুণ্ডমালিনী বরাভয় আর অভয়দান করছেন দেবী এবং দক্ষিণপা শিবের বক্ষের ওপর এবং বামপদ হৃদি পরে অবস্থিত। পরবর্তীকালে বলদেঘাটার চট্টোপাধ্যায় পরিবারকে সাবর্ণরা দেবত্তর সম্পত্তি দানপত্র করেছিলেন দেবীর সেবার জন্য এবং সবকিছু ব্যয়ভার বহনের জন্য। দেখভাল করার জন্য বর্তমানে কমিটি তৈরি হয়েছে।

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির
হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী-বাৎসরিক পুজো

১৯৬৪ সালে মায়ের মূর্তিটি চুরি হয়ে যায় এবং পায়ের পাতাটি ভেঙে যায়। এরপর ঐ ভাঙা পা যুগের নিত্য সেবা হয় এখনও। এরপর ১৯৯৮সালে মায়ের বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। রাখিপূর্ণিমার দিন এই মন্দিরের বাৎসরিক উৎসব হয় এবং সেই দই বহু ভক্তসমাগম ঘটে মন্দিরে। তবে এবছর করোনা ভাইরাসের কারণে সেই ভক্তসমাগম দেখা যাবে না। বাৎসরিক উৎসবে সকালে থেকে মায়ের বিশেষ পূজা হয়, বেনারসি শাড়ি এবং বিভিন্ন গহনা দিয়েই মাকে সাজানো হয় সাথে ফুলের সাজ থাকেই(গোলাপের মালা, পদ্মের মালা ইত্যাদি)।

আরও পড়ুন- বিপত্তারিণী মা চণ্ডী দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার রাজপুরের ঐতিহ্য

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী ও রানি রাসমণি

রানী রাসমণি দেবী এই সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরকেই সংস্কার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেই সুযোগ পাননি বলেই দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দির তৈরি করেছিলেন রাসমণি। এই বংশের কুলতিলক যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী(স্বামী যোগানন্দ) যিনি শ্রীরামকৃষ্ণের পার্ষদ ছিলেন এবং ঠাকুর যোগীন মহারাজকে ঈশ্বরকোটি বলেই উল্লেখ করে গেছেন, তাঁর সাথেও হালিশহরের এক নিবিড় যোগাযোগ ছিল। এইভাবে আজও প্রাচীন মন্দিরে মা সিদ্ধেশ্বরীর নিত্যসেবা হয়, এবং হালিশহরের ঐতিহ্যপূর্ণ মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম এই সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির।

দেখুন কৌলালের তথচিত্র

 


Share your experience
  • 732
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    732
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ রায় চৌধুরী

শুভদীপ রায় চৌধুরী
শুভদীপ রায় চৌধুরী, ১২বছর দক্ষিণ কলকাতার স্বনামখ্যাত বিদ্যালয় "বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়" থেকে পড়ার পর উত্তর কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে স্নাতক এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর, বিশেষ বিষয় ছিল-ভারতের আধুনিক ইতিহাস। তাছাড়া ২০১৬সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে স্বতন্ত্র গবেষণায় যুক্ত। বর্তমানে বহু পত্রিকায় যুক্ত স্বতন্ত্র লেখায়, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে নয় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখার কাজেও যুক্ত। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের ৩৬তম বংশধর