হুগলীজেলার কয়েকটি ঐতিয্যবাহী দুর্গাপুজো

Share your experience
  • 54
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    54
    Shares

বুড়িমা

বুড়িমা বরণের ভিডিও দেখুন…

শুভজিৎ দত্ত

সাবেকিয়ানার খোঁজে আজ আমার প্রথম গন্তব্য হুগলী জেলার মালিপাড়া গ্রাম।হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইনে তালান্ডু স্টেশন থেকে পশ্চিমদিকে ১.৪৫ কিমি দূরে সবুজে ঘেরা ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে পাকা রাস্তা ধরে সাইকেলে মিনিট পনেরো এগোলেই এই মালিপাড়া গ্রাম,যেখানে কয়েক শতাব্দী  ধরে হয়ে আসছে মুখার্জি বাড়ির পুজো।

মালিপাড়ার বুড়িমা

স্থানীয় মানুষের কাছে এই পুজো ‘বুড়িমা’ নামেই খ্যাত।মুখার্জি বাড়ির সদস্য শ্রী কৌশিক মুখার্জি থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা যায়, এই পুজো মূলত ছিল পাকড়াশি পরিবারের।সেই পরিবারের মেয়ের বিয়ে হয় এই মুখার্জি পরিবারের কোনও পূর্বপুরুষের সাথে।সেই থেকেই পাকড়াশি পরিবার থেকে মায়ের পুজো স্থানান্তরিত হয় মুখার্জি পরিবারে।তখন থেকেই প্রায়  কয়েকশো বছর ধরে নিয়ম-নিষ্ঠা মেনে চলে আসছে এই পুজো।

রথের দিন বাঁশ কেটে কাঠামো পুজো হয়।এরপর প্রতিমাশিল্পীরা মায়ের দুর্গাদালানেই মূর্তি গড়ার কাজে হাত লাগান।মহিষাসুরমর্দিনী মা এখানে শোলার সাজে সজ্জিতা একচালায় পুরো পরিবারসহ বিরাজমান।মায়ের পরনে থাকে লাল রঙের শাড়ি।ষষ্ঠীর দিন বিল্ববরণ,সপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নান করানোর পরই দেবীর প্রাণ  প্রতিষ্ঠা ।তবে প্রতিদিনই বাড়ির কূলদেবতা মধুসূদনের পুজোর পরই মায়ের পূজার্চনা হয়।সপ্তমী,অষ্টমী,নবমী পুজোর তিনদিনই পাঁঠা বলির রীতি আছে।তবে এই বাড়ির পুজোর একটি বৈশিষ্ট্য হল সপ্তমী, অষ্টমী,নবমী তিনদিনই মায়ের নৈবেদ্য হিসেবে থাকে মাছ।একসময় কুমারী পুজোর রীতি থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ।নবমী পুজোর পর দশমীর দিন পালন করা হয় অরন্ধন।দশমীতে তাই মায়ের নৈবেদ্য রূপে থাকে পান্তা ভাত।তবে এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ ‘সুখের বরণ’।যা নবমীর দিন অনুষ্ঠিত হয়।বাড়ির সদস্যরা ওইদিন সবাই মাকে বরণ করেন।দশমীতে আর এক বার সুখের বরণ করার পর মায়ের সামনে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়।এরপর সুতো কাটা হয়।

মুখার্জিবাড়ির দুর্গাদালান

তবে এই পুজো শুধু মুখার্জি বাড়ির পুজো নয়,পুরো গ্রামবাসীর পুজো।গ্রামবাসীরা ‘বুড়িমা’ কে খুব জাগ্রত মনে করেন,সেজন্য মায়ের কাছে অনেকেই মানত করেন।তাই সকাল থেকেই সবাই হাজির হয়ে যান ঠাকুরদালানে।এই পুজোয় মাইক বাজানো নিষিদ্ধ,শুদ্ধ ঢাকের আওয়াজে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজো কাটান বুড়িমা এবং গ্ৰামবাসীরা।অষ্টমীর দিন এই পুজোর এক বিশেষ আকর্ষণ ‘মানত পুজো’।ভক্তদের মনস্কামনা পূরণ হলে ওই দিন কেউ দণ্ডী খাটেন , কেউ ধুনো পোড়ান , কেউ বা বাতাসা ছড়ান বা হরিলুট দেন। বহু দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন ওইদিন।

দশমীর সন্ধেবেলায় গ্রামের মহিলারা সবাই মেতে ওঠেন সিঁদুরখেলায়।এরপর বুড়িমা কে গ্রামের ছেলেরা কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে দীঘিতে বিসর্জন দেয়।তাই বলাই যায় এই পুজো গোটা গ্রামের এক সামাজিক মেলবন্ধনের মাধ্যম।যেখানে আলোর রোশনাইয়ের আড়ম্বর না থাকলেও,আরাধনা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ।

দশমীতে অরন্ধন,তাই মায়ের নৈবেদ্য রূপে পান্তার ভোগ

 

পাণ্ডুয়ার মটুকপুরের পালবাড়ি

তালান্ডু র পর আমার পরবর্তী গন্তব্য পাণ্ডুয়ার মটুকপুরের পালবাড়ি।এই বাড়ির প্রবীণ সদস্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায় আনুমানিক দুশো বছর আগে এই বংশের স্বর্গীয় শ্রীরাজকৃষ্ণ পাল এবং স্বর্গীয় শ্রীহরিপদ পাল মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে মায়ের নির্দেশ মত এ বাড়িতে দুর্গাপুজো প্রচলন করেন।পান্ডুয়ার এই পাল পরিবারের মূলত কলকাতার পোস্তা অঞ্চলে তামাকের ব্যবসা ছিল।আরও জানা যায় যে স্বপ্নে দুর্গাপূজা করার নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে তিনি দেবীর নিকট তখনকার দিনে এই ব্যয়বহুল উৎসব আয়োজনের  সামর্থ্য না  থাকার বিষয়ে মনোভাব প্রকাশ করলে দেবী স্বেচ্ছায় এই পাল বাড়ীতে পুজো পাওয়ার জন্য আসেন। সেই থেকেই পান্ডুয়ার এই পাল বাড়িতে প্রতি বৎসর নিরবিচ্ছিন্নভাবে দুর্গোৎসব অনুষ্টিত হয়ে আসছে।

পান্ডুয়ার এই পাল বাড়ীর দুর্গাপুজার বিশেষত্ব এই বাড়ীর দুর্গাপ্রতিমা।সাবেকী একচালা শৈলীর দুর্গাপ্রতিমাটিতে দশভূজা দেবীর পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক ও গণেশের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।তার পরিবর্তে বাড়ীতে দেবীর সাথে থাকেন চামর ব্যজনরত মায়ের দুই সখী জয়া এবং বিজয়া।এছাড়াও উপস্থিত থাকে দেবীর বাহন সিংহ এবং মহিষাসুর।

পাল বাড়ির দুর্গাদালান

পাল বাড়ির সদস্যদের থেকে আরও জানা যায় পঞ্চমীর দিন মায়ের দুর্গাদালানের পাশে বোধনের মাধ্যমেই এ বাড়ির পুজো শুরু হয়।ষষ্ঠীর দিন বোধন ঘটেই মায়ের পুজো এবং সন্ধ্যারতির সমাপ্তির পর মা দুর্গার নয়টি শক্তির প্রতীক হিসেবে নবপত্রিকাকে আরতির মাধ্যমে আহ্বান করা হয়।সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নান করানোর পর বোধন ঘট ও দুর্গাদালানের মাঝে স্থাপন করেই শুরু এই বাড়ির পুজো।সপ্তমী,অষ্টমী,নবমী তে মায়ের পুজো ছাড়াও প্রতিদিনই নবগ্রহ,দশাবতার,পঞ্চদেবতা,জয়া-বিজয়ার পুজো অনুষ্ঠিত হয়।আর অষ্টমী ও সন্ধিপুজোয় হয় ৬৪ যোগিনীর পুজো।সন্ধিপুজোর সন্ধিক্ষণে তোপ ফাটানোর রীতি এখনও আছে।আরও জানা যায় একসময় এবাড়িতে পশুবলি হলেও বর্তমানে তা বন্ধ।প্রতিদিনই পালপাড়ার বাবা পঞ্চাননের পুজোর পরই মায়ের পুজো শুরু হয়।পুজোর প্রতিদিনই চলে চন্ডীপাঠ।পুজোয় মায়ের নৈবেদ্য রূপে চালের কিছু উৎসর্গ করা হয় না।তবে নবমীতে মাকে কাঁচামাছ নৈবেদ্য রূপে উৎসর্গ করা হয়।নবমী পুজোর প্রধান আকর্ষণ কুমারী পুজো।দশমীতে মায়ের পুজোর শেষে অপরাজিতা পুজো হয়।এইদিন সুতো কাটার পর সন্ধ্যাবেলায় মাকে পরিবারের সমস্ত মহিলারা বরণ করেন।এরপর বাড়ির ছেলেদের কাঁধে চেপে মা রওনা দেন কৈলাসের অভিমুখে।


এসব কথার মাঝেই কানে ভেসে আসলো আজানের সুর।বাড়ির দুর্গাদালানে বসে বসেই অনুমান করতে পারছিলাম বিবিধের মাঝে মিলন মহান।একদিকে আজানের সুর,আর একদিকে পুজোর সময় ঢাকের আওয়াজ দুইয়ে মিলে একটা অন্যরকম অনুভূতি।

কুমারী পুজো পালবাড়ি

 

নন্দীবাড়ির মা

জামগ্রামের নন্দীবাড়ির দুর্গা

পাল বাড়ি ছাড়াও পাণ্ডুয়ার জামগ্রামে আরও একটি জাঁকজমকপূর্ণ পুজো হয়,যা জামগ্রামের নন্দীবাড়ির পুজো বলেই খ্যাত।আপাতত আমার আজকের শেষ গন্তব্য এই নন্দীবাড়ী।বাড়িতে প্রবেশমাত্রই বাড়ির দুর্গাদালান আপনাকে বিস্মিত করবে।এত প্রাচীন অথচ সুপরিচর্যিত দুর্গাদালান খুব কম বাড়িতেই দেখেছি।প্রায় সাতমহলা বাড়ির দুর্গাদালানের একপাশে বাড়ির কুলদেবতা লক্ষ্মী-জনার্দনের মন্দির;অন্যপাশে সরকারবাড়ি,বৈঠকখানা,গোলাবাড়ি,নাচঘর। বাড়ির বাইরে অবস্থিত সুবিশাল রাসমঞ্চ।তবে পুজোর সময় এই দুর্গাদালান এক অন্যরূপে সুসজ্জিত হয়ে ওঠে।

এই নন্দী বংশের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা জানা যায় এই বাড়ির এক সদস্যের থেকে।জামগ্রামে নন্দী বংশের সূচনা করেন লক্ষ্মীকান্ত নন্দী।তবে এর আগে এই নন্দীদের আদি বাসস্থান ছিল উত্তর চব্বিশ পরগনার হালিশহরের নিকটস্থ কেওটা গ্রামে।১১৭২ বঙ্গাব্দে পর্তুগীজ বোম্বেটেদের আক্রমণের ভয়ে সেখান থেকে প্রথমে মন্ডলাই গ্রামে এরপর এই জামগ্রামে বসতি স্থাপন করেন।লক্ষ্মীকান্ত নন্দীর দুই ছেলে কুবেরচন্দ্র ও রামশঙ্কর নন্দী এলাকার পীরবাবা হাপুজি সাহেবের নির্দেশে সুপুরি ও শুকনো মশলার ব্যবসা শুরু করেন।এই ব্যবসা থেকেই নন্দী বংশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে এবং পরে ব্রিটিশদের থেকে পাণ্ডুয়ার জামগ্রাম ও কালনা,বদ্যিপুর দুটো জায়গার জমিদারত্ব পায়।

দুর্গাদালান

প্রায় ২৫০ বছর আগে এই দুই ভাইই (কুবেরচন্দ্র ও রামশঙ্কর নন্দী) এই নন্দী বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন।সেই থেকেই গুপ্ত প্রেসের পঞ্জিকানুযায়ী একদম নির্ঘন্ট মেনে এই বাড়িতে উমার আরাধনা হয়ে আসছে।তাই এখনও মহালয়ার দিন বাড়ির কোনো এক সদস্য কুবেরচন্দ্র ও রামশঙ্কর নন্দীর নামেই সংকল্প নেন।তবে এই বাড়িতে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় রথের দিন কাঠামোতে মাটি লাগানোর পর থেকেই।কাঠামো পুজোর পর থেকেই বংশপরম্পরায় মৃৎশিল্পীরা দুর্গাপ্রতিমা গড়ার কাজে হাত লাগান।ষষ্ঠীর সন্ধ্যাবেলায় বোধন ঘরে নবপত্রিকা ও বোধন ঘট স্থাপন করে মাকে আহ্বান হয়।এইদিন সকালে মা সেজে ওঠেন সমরাস্ত্রে।অষ্টমীর দিন নিত্যপুজো,পুষ্পাঞ্জলি সম্পন্ন হওয়ার পর ধুনো পোড়ানো হয়।এই সময় ভক্ত তার মানত অনুযায়ী তিনটে মালসা(একটা মাথায় ও দুটো হাতে নিয়ে)দুর্গাদালানের আঙিনায় বসে থাকেন যতক্ষন না কোনও একটা সরা নিভে যায়।বৈষ্ণব মতে পুজো হওয়ার দরুন সন্ধিপুজোতে কোনরকম বলির রীতি নেই।নবমীতে প্রধান আকর্ষণ কুমারীপুজো।দশমীতে আরশিতে মাকে বিসর্জন দেওয়ার পর হয় দশমীযাত্রা।যেখানে প্রত্যেক ভক্তদের হাতে তুলে দেওয়া হয় মায়ের পায়ে উৎসর্গীকৃত পদ্ম।তবে এই বাড়ি থেকে মা একা কৈলাসযাত্রা করেন না।নন্দীপাড়ার কিছুটা পরেই ঘোষপাড়ায় হয় প্রায় ৩০০ বছরের এক প্রাচীন সাবেকি দুর্গাপুজো।স্থানীয় মানুষদের কাছে ঘোষবাড়ির বাড়ির মা ‘দিদি’ আর নন্দী বাড়ির মা ‘বোন’।দশমীর দিন ঘোষ বাড়ির ‘দিদি’ প্রথমে বোনের বাড়িতে আসে।এরপর দুই বাড়ির সদস্যরা একে ওপরের ঠাকুরকে বরণ করার পর দিদি প্রথমে দিদি,তারপরে বোন একসাথে রওনা দেন কৈলাস অভিমুখে।তবে এই বাড়ির পুজোর নির্ঘন্ট দশমীতে নয়,কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পরেরদিন পীরসাহেবের কাছে নারায়ণপুজোর প্রসাদ পাঠানোর মাধ্যমেই শেষ হয় এই বাড়ির পুজোর নির্ঘন্ট।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 54
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    54
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভজিৎ দত্ত

শুভজিৎ দত্ত
প্রথাগত শিক্ষা বাণিজ্য শাখায় ও পেশাগত ভাবেও যুক্ত ট্যাক্স ও একাউন্টস সংক্রান্ত কাজে।ঘোরাঘুরির শখ থেকেই ফটোগ্রাফি,সেখান থেকেই স্হানীয় ইতিহাস,আঞ্চলিক ইতিহাস ও বাংলার লোকসংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহ জন্মায়।সেই সূত্রেই লোকসংষ্কৃতির টানে বাংলার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো, সাবেকি বাড়ির অন্দরমহলে ঢুঁ মারা গত কয়েক বছর ধরে।