হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ আর অভিনব কাঁঠালের মেলা

Share your experience
  • 796
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    796
    Shares

হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ
হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ

সুমন্ত বড়াল–হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ।খুব একটা পরিচিত নাম নয়।তবে এখানকার রথের বৈচিত্র আর কাঁঠালের মেলা সত্যই বিস্ময়কর।টিনের আবরণে ঢাকা একটা রথ। মাহেশ বা গুপ্তিপাড়ার মতো বিশাল না হলেও খুব ছোট নয়। স্থানীয় মানুষের সাথে  কথা বলে জানতে পারা এই রথ স্থানীয় নিয়োগী পরিবারের । নিয়োগী পরিবার শুনতেই কেমন যেন ফেলুদার গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। গ্রামের অলিগলি ঘুরে কিছুটা গিয়েই খুঁজে পেলাম একটা রাসমঞ্চ আর তার পাশেই নিয়োগীদের বাড়ি।

হোয়েড়ার নিয়োগী পরিবার

সময় টা ২০১৯ এর মে মাস। বাঙলার জৈষ্ঠ্য মাস। এক বন্ধুর কাছে জানতে পারলাম আমাদের এই হুগলী জেলাতেই এক স্কুল আছে যা কিনা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় এর প্রতিষ্ঠা করা। গ্রামের নাম হোয়েড়া । পান্ডুয়া ব্লকের অন্তর্গত ছোট্ট একটা গ্রাম। আর জি টি রোডের ধারেই সেই স্কুল। জৈষ্ঠ্য এর রোদ মাথায় নিয়ে  যখন সেই স্কুলে পৌঁছলাম স্কুল বন্ধ । হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। এমন ঘটনা আকচার ঘটে আমার সাথে। তবে চোখ আটকালো স্কুলটার পাশে। তবে একটু হতাশ হলাম। আশা ছিল হয়ত কোন জমিদার বাড়ি হবে। কিন্তু না নিয়োগী বাড়ি একেবারেই হাল আমলের। গেট পেরিয়ে ঢুকতেই আলাপ হল অরূপ নিয়োগী ও তার স্ত্রীর সাথে ।পরিচয় সেরে রথের কথা জানতে চাইতেই উনি আপ্যায়ন করে ভিতরে নিয়ে গেলেন। একটা কথা বলতেই হয়। হোড়েয়ার নিয়োগী পরিবারের আপ্যায়ন সত্যি অতুলনীয়।

হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথের একাংশ
হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথের একাংশ

হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ

বাড়ির ভিতরে ঢুকেই চমক। রথের চূড়া, রথের দড়ি, কাঠের ঘোড়া, ঘরের তাক জুড়ে রথের পুতুল।কথায় কথায় গল্প জমে উঠলো। অরূপ বাবু জানালেন এই রথের ইতিহাস। প্রায় ২০০ বছরের পুরানো এই রথ। আর এই পুতুল, ঘোড়া সবই সেই সময়ের। তবে এই রথে প্রভু জগন্নাথ সওয়ার হন না। এই রথ নিয়োগী পরিবারের কূল দেবতা শ্রীধর জীঊ এর।রথের দিন নিয়োগী দের নিজ গৃহে পূজা অর্চনার পর জাঁকজমক করে শ্রীধর জীঊ এর প্রতিকৃতি শালগ্রাম শীলা রথে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর শুরু হয় রথের টান। রথের টান দুপুরের মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও শ্রীধর জীঊ সারাদিন রথে অবস্থান করেন। সন্ধ্যায় আরতির পর আবার তিনি নিয়োগী বাড়িতে ফিরে আসেন। উল্টো রথের দিন আবার একই রীতি। অরূপ বাবুর সাথে গল্প করতে করতে দুপুর গড়িয়ে গেল। রথের দিন আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। সম্মতি জানিয়ে সেদিন ফিরলাম।

হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ একাংশ
হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ একাংশ

হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথের মেলায়

আবার হোয়েড়া গেলাম রথের দিন। সকালটা গুপ্তিপাড়ার রথে কাটিয়ে দুপুরে যখন হোয়েড়া পৌঁছলাম তখন রথের টান  শুরু হয়ে গেছে। আর যে হোড়েয়ার রথ তলাকে দেখে গিয়েছিলাম ।এখন সে রথ তলার ছবি বদলে গেছে। রাস্তার দু ধারে সারি সারি দোকান নানা পসরা সাজিয়ে। আর জি টি রোড দিয়ে হোয়েড়া মোড়ে আসতেই চোখে পড়েছিল সারি সারি কাঁঠাল ।এই মেলা আর রথকে রেখে পৌঁছে গেলাম নিয়োগী বাড়িতে।

হোয়েড়ার নিয়োগীদের আপ্যায়ন

আগেই বলেছি নিয়োগী বাড়ির আপ্যায়ন এর কথা। সেই দুপুরের রথতলার মতো নিয়োগী বাড়ি ও যেন বদলে গেছে। বাড়ি জুড়ে প্যান্ডেল আর লোকে লোকারণ্য। এগিয়ে এলেন অরূপ বাবু ,অভ্যর্থনার উষ্ণতায় মুগ্ধ হলাম। আলাপ করিয়ে দিলেন পরিবারের সকলের সাথে। নিয়োগী বাড়িতে তখন দেদার আড্ডা। সামিল হলাম সেই আড্ডায় । মনে হচ্ছিল আমি যেন ওই পরিবারেরই কেউ। অনেক দিনের পরিচিত। দুপুরের খাওয়া সেদিন নিয়োগী পরিবারের সাথেই। সেও এলাহি আয়োজন। আর ওনাদের আপ্যায়ন এ আমি মুগ্ধ।

হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ-- কাঁঠাল মেলা
হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ- কাঁঠাল মেলা

 কাঁঠাল মেলায়

এদিকে আকাশ সাজছে কালো মেঘে। নিয়োগী পরিবারের সকলকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের সঙ্গ নিলেন দিলীপ কাকু। দিলীপ কুমার সোম। অসাধারণ মানুষ। রথ তলায় পৌঁছে প্রথমে রথ দেখা। ছবি তোলা। যে পুতুল গুলো সেদিন দেখেছিলাম আজ রথে সেগুলো অন্য রূপ পেয়েছে। দুপুর তখন বিকাল ।আর জিলিপি, বাদাম এর গন্ধে ভরপুর তখন ভরে গেছে মেলার মাঠ।আমার মাথায় তখন কাঁঠাল ঘুরছে। দিলীপ কাকুর কাছে জানতে চাইতেই , উনি নিয়ে গেলেন সেই কাঁঠাল বিক্রেতাদের কাছে। নানান ধরনের নানান সাইজের কাঁঠাল। এককথায় কাঁঠালের মেলা। কাঁঠাল নিয়ে এমন মেলা আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হয়না। আর কাঁঠাল যখন আছে তখন তার গন্ধ তো থাকবেই। কথায় কথায় জানা গেল , হোয়েড়া ও তার আশপাশে প্রচুর কাঁঠালের চাষ হয়। স্থানীয় মানুষ জন এই রথের মেলা উপলক্ষে সেই কাঁঠাল নিয়ে এসে বিক্রি করেন। বেচাকেনা ও হয় ভালো ।তবে এই মেলা একবেলার ।রথের দিন দুপুর থেকে সন্ধ্যে।

হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ মেলার জিলিপি
হোয়েড়ার নিয়োগীদের রথ মেলার জিলিপি

আরও পড়ুন  জগন্নাথ মদনমোহন-নীলাচলের ধর্মীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে

মেলার স্মৃতি

মেলা,রথ,নিয়োগী পরিবার,অভিনব কাঁঠাল মেলার স্মৃতি নিয়ে সেদিন ফিরেছিলাম। আজ ২০২০ । এক অদ্ভুত সময়ে মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা , অতিমারী পরিস্থিতিতে সব উত্সব স্থগিত। আজ তাই স্মৃতি রোমন্থন। এই আপদকালীন সময়ে মনকে ভালো রাখতে নষ্টালজিয়াতে ডুব দিয়েছি।

 


Share your experience
  • 796
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    796
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সুমন্ত বড়াল

সুমন্ত বড়াল
সুমন্ত বড়াল লেখক ক্ষেত্রসমীক্ষক ও সংস্কৃতিসংগঠক