হুঁকো-প্রাচীন কলকাতার বাবু ও সাহেবি কালচারে ধূমপান

Share your experience
  • 333
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    333
    Shares

হুঁকো
হুঁকো

ডা.তিলক পুরকায়স্থ- হুঁকো টানার গল্প একবারে সর্দি-জ্বর ভাইরাসের মতন। বহুকষ্টে যদি বা হুঁকো টানা ছাড়ানো গেল, আবার সে ফিরে আসবেই। একদা বাংলার তাম্বাকু ও গঞ্জিকা সেবার ছিলিম চেহারা পাল্টে হোল থেলো হুঁকো, আবার কলকেতার বাবুদের হাতে সেটা জাত বদলে হয়ে গেল গড়গড়া বা আলবোলা – এই নিয়ে বাবু কালচারের কলকেতা শহরে কত মুখরোচক গল্প, কত লেখালেখি।

কিছুদিনের জন্য হুঁকোর চলন কোথায় যেন হারিয়ে গেল। তখন গড়গড়া ছেড়ে সবার মুখে চুরুট, সিগার আর পাইপ। আর বর্তমান লেখকের মতন হা-ঘরেরা তখন কি আর করে! তাদের পূর্বপুরুষরা টানতো ছিলিম। আর বর্তমান পুরুষদের মুখে জ্বলন্ত বিড়ি। হা ঘরেদের কথা ছাড়ান দিচ্ছি। তুলসী চক্রবর্তীর হাতের থেলো হুঁকো আর মহানায়কের সিগার মুখের ছবি- দুটি আলাদা ক্লাসের চিত্রায়ন। এর পরে কিছুদিনের জন্য কয়েকটি বেরসিক ডাক্তারের পরামর্শে কিছুদিনের জন্য তামাকু সেবনে যেন ভাঁটার টান চলছিল, কিন্তু সে আর কদিন ? আবার সগৌরবে ফিরে এসেছে বাবু কালচারের আলবোলা বা গড়গড়া নতুন রূপে , তবে ঘরে ঘরে নয়- বার-এ, বার-এ ।

হুঁকো থেকে হুক্কাবার

জেন ওয়াই এর আধুনিক, অভিজাত ঘরের বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের এযুগের হট ফেভারিট নেশা হচ্ছে হুক্কা বার । তবে হুঁকো টানার সনাতন পরিবেশ ও প্রথা বদলে গেছে। পাশ বালিশে হেলান দিয়ে, অর্ধ নিমিলিত চোখে হুঁকো টানার বদলে- মায়াবী নীল আলোতে তুফানি গানের সঙ্গে হিপ-হপ, তারি মধ্যে আধিভৌতিক ধোঁয়াটে অচেনা জগতের হাতছানিতে জমিয়ে সুখটান দিচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ, ঠিক যেভাবে সুখটান দিতেন কলকাতার ডাকসাইটে বাবুরা এককালে। আমাদের সময় হলে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজত- ‘দম মারো দম’ , জেন ওয়াই এর ফেভারিট হচ্ছে- ” তেরা প্যায়ার, প্যায়ার, প্যায়ার- হুক্কা বার।”
এখন আর সিগারেটের ধোঁয়া নয়, আধুনিক জীবন পছন্দ করে দু ঠোঁটের ফাঁকে সুগন্ধী তামাকের ধোয়ার কুণ্ডলী দিয়ে মানচিত্র রচনা করা। এতো সেই বিকৃত রুচির বাবু কালচারের আধুনিক যুগের মোড়কে ফিরে আসা ! তবে রক্ষে যে কোভিড মারণ ব্যাধি কিছু ভালো কাজ করেছে, ধেই ধেই করে নাচ আর হুঁকোর পাইপে হাজার জনের সুখটান- সব আবার অতীত , জান হ্যায় তো জাহান হ্যায়।

ইতিহাসে হুঁকো

আমাদের দেশে থেলো হুঁকোর প্রচলন কিন্তু বহুদিনের।তারপরে মোগল ও ইংরেজদের হাত ধরে আগমন গড়গড়ার। হুঁকোর জলের মধ্যে দিয়ে তামাকের ধোঁয়া টানবার সময় যে গুড়গুড় আওয়াজ হয় তার থেকেই গুরগুড়ে বা গড়গড়া।গড়গড়ারই আরেকনাম আলবোলা- মিশরে বলে “সীসা”, ইরানে ” গলিয়া”, তুরস্কে ” নারগিলে”। বেশির ভাগ পন্ডিতদের মতে গড়গড়ার জন্ম মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও। এখানে একটা প্রশ্ন হচ্ছে, নারগিলের সঙ্গে নারকোলের মিল খুঁজে পাচ্ছেন কিনা। আর আমাদের দেশে থেলো হুঁকোর খোল তৈরি হয় নারকেলের খোল দিয়েই। সে যাই হোক, যে মহাপ্রভু তামাকের ধোঁয়াকে সুগন্ধিত জলের মধ্যে দিয়ে পরিশুদ্ধ করার ব্যাপারটি মাথা খাটিয়ে বের করেছিলেন, পৃথিবীর কোথাও তাঁর নামটি কিন্তু লেখা নেই।

থেলো হুঁকো

আমজনতা বিশেষ করে বয়স্ক লোকেদের হাতে হাতে একসময় ঘুরতো থেলো হুঁকো। গাঁয়ের চন্ডীমণ্ডপে সালিশি সভা বসেছে, আর মোড়লের হাতে হুঁকো নেই, এমন দৃশ্য কল্পনা করা যায়না। সেই হুঁকোর খোল তৈরি হতো পালিশ করা নারকেলের খোল দিয়ে। খোলের সঙ্গে যুক্ত থাকে একটা কারুকার্য করা ফাঁপা নল। নলের আগায় ছোট পাত্রে তামাক আর তার উপরে পোড়ামাটির ছোট মালসায় টিকের আগুন। নারকেলের মালার খোলে একটি ছোট নল জোড়া। টিকের আগুনে গরম হয়ে তামাকের ধোঁয়া নল দিয়ে নিচে নামে, ছোট নল দিয়ে টেনে সেই তামাকের ধোঁয়ার মৌজ নেওয়া হয়।
মোগল যুগে নাকি রাজদরবারে গড়গড়ায় তামাক খাওয়ার প্রচলন করেন বিজাপুরের সুলতান আদিল খানের প্রেরিত দূত কোকা মির্জা বা নবাব আজম খান। তিনিই নাকি বিজাপুরের সুলতানের তরফ থেকে উপঢৌকন হিসাবে বেশ কয়েকটি গড়গড়া আকবর বাদশা এবং তাঁর সভাসদদের উপহার দেন।

গড়গড়া
গড়গড়া

কলকাতায় হুঁকো কালচার

কলকাতা শহর ও তার হুঁকো কালচারের প্রতিষ্ঠা কিন্তু জোব চার্নকের হাত ধরেই।
ইংরেজদের অবস্থা তখন তাড়া খাওয়া কুকুরের মতন। জোব চার্নকের উপর আদেশ হয়েছে মাদ্রাজ থেকে চট্টগ্রাম গিয়ে ঘাঁটি গড়তে হবে। শোনা যায় সাহেব নাকি গড়গড়া খেতে খুব পছন্দ করতেন, সেই গড়গড়া টেনেই নাকি সাহেবের মতিগতি বদলে যায়। চার্নক ঠিক করেন চট্টগ্রাম নয়, কোম্পানির ভাগ্য তৈরি হবে কলকাতার মাটিতে- এবং ইতিহাস তাঁর সেই দুরদৃষ্টির সাক্ষী।
পরে দেখা গেল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত প্রায় প্রতিটি সাহেবই গড়গড়ার ভক্ত বনে গেছেন । অবশ্য তখন মশা-মাছি, সাপ-খোপ ভরা কলকাতা শহরে তাঁরা অবসর সময়ে করতেনই বা কি ! রিকরিয়েশন বলে তো সাহেবদের তখন আর কিছু ছিল না। তাই দেখা যাচ্ছে, রাইটার্স বিল্ডিংয়ের করণিক বা রাইটারদের হুঁকো সাজিয়ে দেবার জন্য নতুন এক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হোল তৎকালীন কলকাতায়- হুঁকো- বরদার।

সাহেবদের ধূমপান বিলাস

হুঁকো ধরাবার জন্য প্রথমে ব্যবহার হতো কাঠকয়লা, পরে আবিষ্কার হয় গুলের। ক্রমে ক্রমে সাহেবদের বাড়িতে হুঁকো- বরদার চাকরি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারো বাড়িতে বেড়াতে গেলেও সাহেব-মেম এবং হুঁকো- বরদার থাকবেই, আহা ! যেন আমি-সে ও সখা। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, স্বয়ং লাট সাহেবের বাড়ির নিমন্ত্রনেও কালা আদমি বলতে একমাত্র হুঁকো- বরদারদেরই প্রবেশ অবাধ ছিল। বিশ্বাস হচ্ছেনা- তাহলে ১৭৭৯ সালের একটা ঘটনা দেখা যাক। বাংলার গভর্নর তখন ওয়ারেন হেস্টিংস, উনার বাড়িতে হবে গানের কনসার্ট, বিশিষ্ট ইংরেজদের জন্য রয়েছে সাপারের নিমন্ত্রণ।নিমন্ত্রণ কার্ডে কি লেখা আছে দেখে নিচ্ছি-” দি কনসার্ট টু বিগিন এট এইট ও ক্লক। মি: টম ইজ রিকোয়েস্টেড টু ব্রিং নো সার্ভেন্টস এক্সসেপ্ট হিজ হুঁকো- বরদার।”হুঁকো ও তৎকালীন ইংরেজ সংস্কৃতি নিয়ে চমৎকার ভিসুআল ডকুনেন্টেশন করে গেছেন কোম্পানির হিসেব রক্ষক জন উম্বওএলদের সাহেব তাঁর আঁকা- “স্মোকিং আ হুক্কা” ছবিতে।

আলবোলা

বলার নিশ্চয়ই দরকার নেই যে, ইংরেজদের দেখাদেখি গড়গড়া বা আলবোলা ততদিনে বাবু কালচারের অঙ্গীভূত হয়ে গেছে। গড়গড়া টানা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাবু সংস্কৃতির আভিজাত্য প্রকাশের অন্যতম হাতিয়ার। সারা কলকাতা শহরে আলবোলার রমরমা শুরু হল।হুঁকো নিয়ে শুরু হল কালো নেটিভ এবং ধলো সাহেবদের সমবেত নৃত্য।
বাবু কালচারে কেউকেটা হবার জন্য দুহাতে টাকার শ্রাদ্ধ করার সঙ্গে আবশ্যিক ছিল ঢালাও ফরাস এর ব্যবস্থা , রাতকে দিন করার ঝাড়বাতি, মদ্যপান, গণিকা গৃহে গমন, সুগন্ধি আতর দিয়ে ঘর মোছা, অম্বুরী বা বালাখানা তামাক দিয়ে গড়গড়া সেবন ইত্যাদি। গরিবের থেকো হুঁকোর নারকেলের মালার বদলে এলো কাঁচ, পিতল, রূপোর জলদানি। খানদানী বাবুদের অনেকেই রৌপ নির্মিত পাত্রে সুগন্ধী তামাক, গড়গড়ার গোলাপ জলে শোধন করে, সোনার নলে টান দিয়ে মৌজ করতেন।

পরানের হুঁকা রে
পরানের হুঁকা রে

গড়গড়ার দাম

যে সময়ে মাসিক ৫ টাকায় হেসে খেলে সংসার চালান যেত, তখন বাবুদের গড়গড়ার দামগুলি একটু দেখে নেওয়া যাক।
সবচেয়ে সস্তার ছিল রুবি গ্লাস আর রূপো বাঁধানো হুঁকো, দাম ১৩৫ টাকা।
এই একই জিনিষ, ডিলাক্স- ৩৫০ টাকা।
পোর্সিলিন আর মরকত নির্মিত- ৫৫০ টাকা।
রূপো আর মরকত নির্মিত- ৩০০০ টাকা।
এমনকি ১৫৫০০ টাকার গড়গড়িও নির্মাণ করতেন সাহেবদের – ” চার্লস নেফিউ এন্ড কোম্পানি”, নেটিভ বাবুদের জন্য। কি ছিল সেই গড়গড়ার গোপন কথা দেখে নিন- ” A magnificent solid gold Hookah set with Diamonds, Rubies and large Emeralds inlaid with flowers in small Diamonds and Rubies. ”

হুঁকোর টান
হুঁকোর টান

অম্বুরি তামাক

রইস বাবুর জন্য আসত এক জাতের তিমি মাছের পেটে জন্মান প্রাকৃতিক সুগন্ধি দ্বারা নির্মিত অম্বুরী তামাক। কোথাও পেলাম না তখন অম্বুরী তামাকের কত দাম ছিল ? এখন তো তিমি নিধন ব্যান, খাঁটি অম্বুরী তামাক পাওয়া যায় না। তবে এখনও কলকাতা শহরের মল্লিকবাজার এবং জ্যাকারিয়া স্ট্রিটের গুটি কয়েক দোকানে কৃত্রিম সুগন্ধি দিয়ে তৈরি অম্বুরী তামাক বিক্রি হয়। তামাকের ৪ টি জনপ্রিয় সুগন্ধি হচ্ছে- হেনা, কস্তুরী, কেওড়া ও শামামা। দামু মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন- অম্বুরী তামাকের বর্তমান দাম প্রতি তোলায় ১ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। সেযুগে দ্বিতীয় রইস তামাক ছিল বালাখানা। কলকাতায় বর্তমানে সুপারফাইন বালাখানা তামাকের দাম ২ হাজার টাকা প্রতি তোলা।

আরও পড়ুন–স্বপনকুমার শ্রীভৃগু ডা.এস এন পাণ্ডে- এক বিস্মৃত প্রতিভার তিন নাম

হে হুঁক্কে!

এখানে জানিয়ে রাখি ১ তোলা = ১১.৬৬ গ্রাম।সেই রইস বাবু কালচারের বাবুদের বন্দনা করছি বঙ্কিম বাবুর হুঁকো প্রশস্তি দিয়ে-
” হে হুঁক্কে ! হে আলবোলে ! হে কুণ্ডলাকৃত ধূমরাশি সমুদ্গারিণি ! হে বিশ্বরমে ! তুমি বিশ্বজনের শ্রমহারিণী,অলসজন প্রতিপালিনী, মূঢ়ে তোমার মহিমা কি জানিবে ? হে বরদে ! তুমি যেন আমার ঘরে অক্ষয় হইয়া বিরাজ কর!
তোমার সুগন্ধ দিনে দিনে বাড়ুক ! তোমার গর্ভস্থ জলকল্লোল মেঘ- গর্জনবৎ ধ্বনিত হইতে থাকুক ! তোমার মুখনলের সহিত আমার অধরোষ্ঠের যেন তিলেক বিচ্ছেদ না হয় !”

দেখুন রাবণ কাটা নাচ

 

তথ্যসূত্র:
১) বাবু গৌরবের কলকাতা, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়।
২) হুক্কা বিলাস, দামু মুখোপাধ্যায়।

ছবি- লেখক ও নেট।


Share your experience
  • 333
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    333
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।