ইছাই ঘোষের দেউলঃইতিহাস ও কিংবদন্তি

Share your experience
  • 455
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    455
    Shares

ইছাই ঘোষের দেউল

 

ডা.তিলক পুরকায়স্থ

প্রথম পর্বে আমরা ছিলাম মেধা মুনির আশ্রমে এবং ইছাই ঘোষের পূজিত শ্যামরূপা চণ্ডী মন্দিরে…

মন্দির দর্শন শেষ করে , সেখান থেকে চললাম গোপরাজ ইছাই ঘোষের দেউলে। ধর্মমঙ্গল কাব্যেও ইছাই ঘোষের উল্লেখ আছে। ইছাই ছিলেন গোয়ালা, ছিলেন স্বাধীনচেতা, বিদ্রোহী।নিজের সৈন্যদল তৈরি করেছিলেন- বাউরি, মুচি, হাঁড়ি, বাগদি, ডোম ইত্যাদি সমাজের দুর্বলতম মানুষদের নিয়ে।এদের মনে এখনো বীর ইছাই ঘোষের স্মৃতি জাগরুক।ইতিহাস বলে পাল রাজা মহিপালের সময় রাজ্যের ভাঙ্গনের সূচনা হয়।অনেক সামন্ত রাজারা বিদ্রোহ করেন, যার মধ্যে ইছাই ঘোষ অন্যতম।স্থানীয় রাজা কর্নসেনকে পরাজিত করে, বর্ধমান জেলার এক বিস্তীর্ণ অংশে গড়ে তোলেন গোপভূমি বা ঢেকুরগড়।

ইছাই ঘোষের মৃত্যুর পরে, সম্ভবত পরবর্তী কোন গোপ রাজা, তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে, এই অতি চমৎকার দেবালয় বা দেউলটি তৈরি করেন সম্ভবত মাতা ভগবতীর উদ্দেশ্যে।আবার অনেকের কাছে শুনেছি বর্ধমানের মহারানী বিষ্ণুকুমারী এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। আবার মন্দির নির্মাতা হিসাবে বর্ধমান রাজ চিত্র সেনের উল্লেখও পাওয়া যায়।

অনেক পরে  এই মন্দিরটির মধ্যে একটি সুবিশাল শিবলিঙ্গ , সম্ভবত কোন স্থানীয় জমিদার রেখে দেন, সেই থেকে  স্থানীয়রা একে শিব মন্দির বলেই গণ্য করে। অবশ্য জমিদার মহাশয় এটিকে শিব মন্দির ভেবে নেওয়ার পিছনে হয়ত কাজ করেছিল, এই দেউল এর মধ্যে কীর্তিমুখ মূর্তির উপস্থিতি।রাক্ষসের মতন দেখতে কীর্তিমুখ কিন্তু  শিব মন্দিরের বিশেষত্ব।স্কন্ধ পুরানে বলা হয়েছে, শিবের আদেশে জলন্ধর রাক্ষস নিজের শরীরকে নিজে গিলে ফেললে, শিব তার নাম নাম দেন- কীর্তিমুখ বা ফেস অফ গ্লোরি।

দেউলের কীর্তিমুখ

দুই

অনেক পুরাতাত্ত্বিকদের মতে এটি এগারোশ শতকে নির্মিত।তবে বিনয় ঘোষের মতে এটি ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকে নির্মিত ।দেখতে অনেকটা ওড়িশা শিখর মন্দিরের ধাঁচের।মন্দিরটিতে পাঁচটি ধাপ দেখা যায়।তাছাড়া, বিভিন্ন সময়ে সংযুক্তি বা রক্ষণাবেক্ষণ এর কাজ হয়েছে বোঝা যায়- আলাদাভাবে বিভিন্ন রকম ইঁটের নমুনা দেখে। অসম্ভব সুন্দর নৃত্যরতা নর্তকী এবং কীর্তিমুখ মূর্তি, এই দেউল এর অন্যতম সেরা কাজ।সেখান থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষনের জন্য দাঁড়ালাম অজয়ের তীরে।আহা! কি হেরিলাম! জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না।চতুর্দিকে আদিগন্ত বিস্তৃত কাশবনের মধ্যে দিয়ে একফালি নদী তিরতির করে বয়ে চলেছে।

শিবাখ্যাদেবী

এবারে আসি এতদ অঞ্চলের বিস্তৃত আলোচনায়।অজয় নদের দক্ষিণে বর্ধমানের কিনারায় অবস্থিত ইছাই ঘোষের দেউলের উল্লেখ আগেই করেছি।এই সমগ্র অঞ্চলটিকে স্থানীয়রা কাঁদুনেডাঙ্গা নামে অভিহিত করেন। এই খানের কোন এক স্থানে নাকি ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুই নায়ক- মা ভবানীর আশীর্বাদধন্য ঢেক্করীয় ঈশ্বর বা ইছাই ঘোষের সঙ্গে, ধর্মরাজের বরপুত্র লাউসেনের মরণপণ যুদ্ধ হয়েছিল।আর অজয় নদের বীরভূম বা উত্তর দিকে আছে লাউসেনতলা। বর্তমানে লাউসেনতলা বলতে আছে হাঁটুগাড়ি নামক স্থানে দুটি পুকুর এবং লাউসেন কুন্ড নামে একটি কূপ।

এই সমগ্র অঞ্চলটি পরিচিত ঢেকুর গড় বা ত্রিষষ্ঠী গড় নামে। অনেক প্রাচীনদের কাছে এই জায়গাটিকে সেন পাহাড়ি বা জঙ্গলমহল নামেও উল্লেখ করতে শুনেছি।বইখাতা ঘেঁটে মনে হল যে, ঢেকুরগড় নামটি সম্ভবত একদা এখানে বসবাসকারী ঢোকরা বা ঢেকারু নামক ধাতু শিল্পীদের থেকে এসেছে। অবশ্য অন্য মতও আছে, তান্ত্রিক ইছাই ঘোষের পুজোয় অসংখ্য বলি হত, এবং মন্দিরের পাশের রক্তনাল মুড়ী নালা দিয়ে রক্তের ঢেউ বয়ে যেত। সেই রক্তের ঢেউয়ের সঙ্গে কেউ কেউ ঢেকুরগড় নামের সাযুজ্য পেয়েছেন। আমার তো এসব কষ্ট কল্পনা বোধ হয়। তবে বৌদ্ধ তন্ত্রের ‘ ডাকার্নব’ পুঁথি অনুসারে এই স্থলের প্রাচীন নাম ছিল ঢেক্করী। এই ঢেক্করীর পরিবর্তিত রূপই সম্ভবত ঢেকুরগড় বা ত্রিষষ্ঠী গড়- মহা মান্ডলিক ঈশ্বরীয় ঘোষের রাজত্ব ও রাজধানী।

দেউলের এক অসাধারণ মূর্তি

অবিভক্ত বর্ধমানের দামোদর-অজয় উপত্যকার এক বিস্তৃত অংশ বহুপ্রাচীন কাল থেকে গোপ ভূমি নামে পরিচিত। শৌর্য্যে বীর্যে অনুপম গোয়ালা ঘোষ বা গোপজাতি এবং চাষী বা সদগোপ রাজার রাজত্ব করতেন এই অঞ্চলে। সেই কোনযুগে ষষ্ঠ শতকে এই গোপভূমির রাজার নাম পাচ্ছি- ” গোপ চন্দ্র”। আবার ভল্লুপাদ নামে আরেক রাজার উল্লেখ দেখছি। এনার কাহিনী বেশ ইন্টারেস্টিং।হাজার বছর আগে, এক সদগোপের ছেলে ছোটবেলা এখানকার জঙ্গলে হারিয়ে যায়। তখনকার জঙ্গলে নেকড়ে, হায়েনা থেকে ভালুক, কিছুই কম ছিল না। এর অনেক পরে গল্প কথার মতন এক সাধু বা ঋষির আবির্ভাব হয়, সারা গায়ে তার ভালুকের মতন লোম, মাথায় জটা। কথা বলতে জানতেন না, আকারে ইঙ্গিতে মনের ভাব ব্যক্ত করতেন। বহুদিন পরে মানুষের ভাষা শিখলে, জানা যায় যে, ইনিই সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলে, যাকে মানুষ করে এক জঙ্গলের ভালুকি। গাঁয়ের লোকে তাঁকে ডাকত ভল্লুপাদ ঋষি বলে। ভালুকের কাছে মানুষ হয়ে, তিনি হয়ে উঠেছিলেন অমিত বলশালী। অনুমান করা হয়, খ্রিস্টীয় দশম- একাদশ শতকে তিনি এই অঞ্চলে, অর্থাৎ গোপভূমে গড়ে তোলেন তাঁর সামন্ত রাজ্য ও রাজত্ব। তাঁরই নামে এই অঞ্চলের নাম হয় ভালকি। এনার বন্দনা করে শিবাখ্যা- কিঙ্কর কাব্যে লেখা আছে-

” ভল্লুপদ নাম জানে সর্বজন, ভল্লুকে তাহারে করিল পালন।

জাতীয় প্রকৃতি লুকাবার নয়, শৈশবে সে শিশু নির্ভয় হৃদয়,

মৃগয়া করিত, শ্বাপদ বধিত, বনের বরাহ করিয়া বিজয়।”

দেউলের শিবমূর্তি

ভল্লুপাদের পৌত্র বা মতান্তরে প্রপৌত্র ছিলেন ভালকির বিখ্যাত রাজা মহেন্দ্র রায়। তিনি তাঁর প্রিয়তমা পত্নী অমরাবতীর নামে রাজধানীর নাম দেন অমরার গড় বা অমরাগড়।রাজা মহেন্দ্র তাঁর রাজ্য সীমানা কাটোয়া থেকে পঞ্চকোট অবধি বিস্তার করেন। নিকটবর্তী খেজুডির উগ্র ক্ষত্রিয় রাজা জগৎসিংয়ের দশভূজা মূর্তি উঠিয়ে নিয়ে এসে নিজ বাটিতে শিবাখ্যা দেবী নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন। ‘শিবাখ্যা-কিঙ্কর কাব্য’ রচয়িতা দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় মাকে বন্দনা করে লিখছেন-

” এসো দেবী ! মহামায়া শিবাখ্যা জননী,

তোমার প্রাসাদে মাগো ধরিনু লেখনী।”

প্রথম পর্বটি পড়ুনমেধসাশ্রম গড়চণ্ডীধাম তথা শ্যামরূপার লোক- ইতিহাস

রাজা মহেন্দ্রের এক মেয়ের বংশোদ্ভূতরা হচ্ছেন সিওড়ের রাজবংশ, অন্য মেয়ের বংশধরেরা হচ্ছেন কাঁকসার রাজবংশ । কাঁকসার রাজবংশ ত্রয়োদশ/ চতুর্দশ শতকে সৈয়দ বোখারী নামক মুসলিম জমিদারের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অমরাগড়ে এখন রাজা নেই, রাজপ্রাসাদ নেই, কিন্তু শিবাখ্যা দেবী আছেন। অসংখ্য রাজ নির্মিত মন্দির আছে। অমরাগড়ের রাজারা খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতক অবধি এখানে রাজত্ব করেছেন। ১৭৭৪ সালে বর্ধমানের রাজা কীর্তি চাঁদের পুত্র চিত্রসেন, গোপ রাজাদের পরাস্ত করে রাঢ় ভূমির এই অংশকে বর্ধমানের রাজবংশের অন্তর্ভুক্ত করেন।

ঠিক সামনে, অজয় নদ

ছবি- লেখক

তথ্যসূত্র:-

১) গৌড় কাহিনী, শ্রী শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ। ডি এম লাইব্রেরি, ৪২ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, কলকাতা ৬ ।

২)পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, প্রথম খন্ড, বিনয় ঘোষ। প্রকাশ ভবন, কলিকাতা ৭০০০১২।

৩)মিথ পঞ্চদশ, মন্দিরের মিথ, মিথের মন্দির, কৌশিক দত্ত। পার্চমেন্ট।

৪) গড়ের মা, তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাম-ডানজোনা, পোষ্ট:- রামপুর, থানা – মহাম্মদ বাজার, জেলা- বীরভূম, ৭৩১১২৭  ।।

 


Share your experience
  • 455
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    455
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।