লেখক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও গঙ্গাটিকুরির দুর্গাপূজা

Share your experience
  • 37
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    37
    Shares

সম্পর্ক মণ্ডল

 

গঙ্গাটিকুরির দুর্গাপূজার ইতিহাস খুব পুরানো নয়। কংসনারায়ণী প্রভাবে বা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের প্রভাবের সাথে এখানকার দুর্গাপূজার কোনও সম্পর্ক নেই। তবে মোটামুটিভাবে বলা যায়, তিনশ বছর আগে রায়বাড়ির তরফে দুর্গাপূজার প্রচলন হয়। রায় সম্প্রদায়ই ছিল গঙ্গাটিকুরির আদি স্থপতি। গ্রামের মানুষের পানীয় জলের জন্য রায়পুকুর খনন করেন, রায়পুকুর পাড় সংস্কার করেন। তাদের দুর্গাপূজা বেশ জাঁকজমক করেই হতো প্রতিবছর এবং প্রতিমাটিও ছিল কংসনারায়ণী মডেলের। কালের স্রোতে রায়বাড়ির পূজা বন্ধ হয়ে যায়। পূর্বপাড়াতে শুরু হয় সাজার বাড়ির দুর্গাপূজা। সাজার বাড়িতে অনেকগুলি পরিবারের সাহচর্যে শুরু হয় দুর্গাপূজাটি। লেখক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাদের পরিবারও যুক্ত ছিলেন এই সাজার বাড়ির পূজার সাথে।

সাজার বাড়িতে পূজিত দেবীদুর্গা চারহাতবিশিষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজাগুলির মধ্যে গঙ্গাটিকুরির সাজার বাড়ির পূজাও একটি। এরপরে একই সাথে শুরু মজুমদার বাড়ি পূজা ও  ঘোষাল বাড়ির দুর্গাপূজা।  হাল আমলে পশ্চিমপাড়াতে দাস বৈরাগ্য বাড়িতে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজা, তবে এখানেই শুরু হয়েছিল আশির দশকে শ্রীবৈরাগ্যচরণ স্মৃতি সংঘের উদ্যোগে দুর্গোৎসব।

লেখক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলতেন, ‘বাংলা সাহিত্যের হ্যালির ধূমকেতু ‘। বিহারের পূর্ণিয়া কোর্টে ওকালতি প্র‍্যাক্টিস করতে করতে আর মন টিকলো না তাঁর। তিনি চলে এলেন কলকাতায়। যোগ দিলেন ১৮৬২ সালের ভারতীয় হাইকোর্ট আইনে তৈরি হওয়া কলকাতাতে নতুন হাইকোর্টে। বলা যায়, তখনই তাঁর তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের মহারথীদের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে। বিশেষত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে যোগাযোগ। বাংলা রস সাহিত্যে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন কিন্তু সেখানেও তাঁর মন টিকলো না। তিনি যোগ দিলেন বর্ধমান কোর্টে। সেখানেই তাঁর ওকালতির পসার জমে ওঠে। বর্ধমান রাজ পরিবারের কিছু মামলা ও কয়েকজন  ধনাঢ্য ব্যক্তির হয়ে মামলা লড়ে তিনি প্রচুর ধনসম্পদ ও কয়েকটি কলিয়ারির মালিকানা লাভ করেন কিন্তু অল্পবয়সে তাঁর একটি পুত্র সন্তানের মৃত্যু হলে তিনি গঙ্গাটিকুরিতেই বসবাস শুরু করেন স্থায়ীভাবে। এইসময় তিনি গঙ্গাটিকুরির পাশাপাশি উদ্ধারণপুরের নিকটবর্তী নৈহাটিতে জমিদারির মহলা ক্রয় করেন।  গঙ্গার তীরে সুদৃশ্য একটি বাড়িও করেন, যা কুঠিবাড়ি নামে পরিচিত ছিল।

নৈহাটির মহল দেখাশোনার জন্য মাঝেমাঝেই ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সকাল সকাল গোরুর গাড়ির যোগে নৈহাটি যেতেন আর সারাদিন কাজকর্ম সেরে ফিরতেন সেই সন্ধ্যার আগে। একদিন মেঘলা বিকালে নৈহাটি থেকে ফিরছিলেন ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। মৃদুমন্দ বেগে গোরুর গাড়িটি যখন নৈহাটি আর গঙ্গাটিকুরি গ্রামের মাঝখানে এসে গ্যাছে, তখন তিনি গাড়ি থেকেই দেখলেম, ঘোমটাপরা একজন স্ত্রীলোক আর তার চার ছেলেমেয়ে বসে আছে গাছতলাতে। এটা দেখে তিনি বেশ অবাক হলেন, ভাবলেন সন্ধে  প্রায় হয় হয় এমন সময় একজন স্ত্রীলোক তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবে? তিনি গাড়ি থেকে নেমে জিজ্ঞাসা করলেন যে এমন সময় কোথায় যাবেন মা?  তাতে সেই স্ত্রীলোক উত্তর দিলেন যে তিনি জনাই গ্রামে যেতে চান কিন্তু যানবাহন না পাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন। লেখক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে সযত্নে গাড়িতে বসিয়ে নিয়ে এলেন বাড়ি এবং অনুরোধ করলেন তাকে যে আজ রাতটা যেন গঙ্গাটিকুরিতে কাটিয়ে যায়, তাহলে পরেরদিন সকালে উঠেই তাকে তার সন্তানসহ জনাই গ্রামে পাঠাবার ব্যবস্থা ইন্দ্রনাথ বাবু নিজে করে দেবেন। রাতে খাওয়াদাওয়া হল এবং বেশ যত্নের সাথে তার সমস্ত পরিবারকে শোওয়ার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করে দিলেন।  পরেরদিন ভোর বেলাতে ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ঘুম থেকে উঠে প্রথমে গেলেন স্ত্রীলোক সহ গোটা পরিবারের খোঁজ নিতে কারণ জনাই যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা পাকা করেছিলেন কিন্তু গোটা পরিবারকে সারাবাড়িতে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও পেলেন না। এই ঘটনায় ইন্দ্রনাথ বাবু প্রচণ্ড অবাক হলেন, ঠিক তার কিছুদিন পরই একদিন রাতে স্বপ্নাদেশ পেলেন যে তোর বাড়িতে মায়ের বেশে এসে আশ্রয় চেয়েছিলাম, এখন আমাকে তুই প্রতিষ্ঠা কর এই বাড়িতে। এখানে উল্লেখ্য, জনাইয়ের দেবীদুর্গাও খুবই প্রসিদ্ধ। তারপর তিনি গঙ্গাটিকুরির নিজের বাড়িতেই শুরু করলেন আলাদাভাবে পূজা, সাথে সাজারবাড়ির দুর্গাপূজার  সাথে থাকলেন মিলেমিশে। ইন্দ্রনাথের দুর্গাপুজোর নেপথ্যে এই গল্প আজও শোনা যায় গঙ্গাটিকুরীতে।

এই বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপটির বেশ খ্যাতি আছে কারুকার্যময় বহিঃরঙ্গের জন্য। নির্মাণগতভাবে এই বাড়ির সঙ্গে  মিল আছে গুসকরার  চোঙদার বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপ ও অট্টালিকার,কারণ ইন্দ্রনাথ বাবুর পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলে চোঙদার বাড়ির মেয়ের। কিন্তু গঙ্গাটিকুরির ‘ইন্দ্রালয়’ এর চণ্ডীমণ্ডপের কারুকলার সাথে চোঙদার বাড়ির মিল নেই। ইন্দ্রলয়ের চণ্ডীমণ্ডপ তৈরির সময় সেই কয়েক হাজার টাকা খরচা করে আগ্রার শিল্পীদের নিয়ে আসা হয় গোটা দেওয়ালকে সুন্দর রূপ দিতে। চুমকির সাথে পাথরের কাজ করা এই অংশটি এই এলাকার আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। সাবেকিয়ানার সাথে আধুনিকতা মিলেমিশে এই পূজাটি অনন্য মাত্রায় পৌঁছেছে। এখানে শাক্তমতেই পূজা হয়। তবে পূজাদিনগুলি জড়িয়ে থাকে সাহিত্যিক ও শিল্পীদের আনাগোনা। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে হালআমলের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সহ অনেকেই এই বাড়িতে এসেছিলেন দুর্গাপূজাতে। তবে বাড়ির সদস্যদের কথায় জানা যায়, দুর্গাপূজা ছাড়াও এখানে খুব জাঁকজমক করে জগদ্ধাত্রী পূজা হয়। জগদ্ধাত্রী পূজার সাথের জড়িয়ে আছে  নাট্যচর্চার ইতিহাস।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 37
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    37
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সম্পর্ক মণ্ডল

Samparka Mondal
সম্পর্ক মণ্ডল বর্ধমানজেলার গঙ্গাটিকুরি গ্রামের ভূমিপুত্র।এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত রসসাহিত্যিক পাঁচু ঠাকুর।সম্পর্ক কবি।প্রিয় বিষয় গ্রামবাংলার মানুষ আর গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি।সম্পাদনা করেন একটি সাহিত্য পত্রিকা।