ইতিহাসে ও কিংবদন্তিতে ভরা গড়জঙ্গল, ইছাই ঘোষ ও গোপভূমি

Share your experience
  • 28
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    28
    Shares

অদ্ভুত উল্টানো নৌকার মতন অমরারগরের চণ্ডী মন্দির।সঙ্গে শিবমন্দির

ডা.তিলক পুরকায়স্থ

 

প্রথম দুটি পর্বে আমরা গড় জঙ্গল, শ্যামরূপা চণ্ডী এবং গোপভূমির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছি। এবারে আবার ফিরে যাচ্ছি ঢেকুরগড়। ষষ্ঠ শতকের রাজা গোপচন্দ্র। মাঝে মধ্যে আরো পরাক্রমশালী রাজাদের হাতে গোপভূমির শাসন ভার হস্তান্তর হয়েছে। যেমন পাল রাজাদের হাতে স্বাধীনতা হারিয়ে গোপভূমি , গৌড় রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতিহাসে পাচ্ছি, পাল রাজা মহীপালের রাজত্বকাল ৯৮৮ থেকে ১০৩৮ সাল অবধি।মহীপালের সময়ে ১০২১-১০২৩ সালে, চোল সম্রাট রাজেন্দ্র চোল বাংলা আক্রমণ করেন। মহীপালকে পরাজিত করে গঙ্গাইকোন্ড বা গঙ্গাবিজেতা উপাধি ধারণ করেন। রাজেন্দ্র চোল ফিরে গেলে, কলচুরীরাজ গাঙ্গেয় দেবের হাতে পুনরায় মহীপাল পরাস্ত হন। পাল শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিনয় ঘোষের মতামত অনুসারে, খুব সম্ভবত এই সময়েই মহা মান্ডলিক ইছাই ঘোষ, নিজেকে গোপভূমির স্বাধীন রাজা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিতারণ করেন, পাল রাজাদের তরফে সেই সময়ের গোপভূমির শাসন কর্তা- সামন্ত রাজা ‘কর্ণ সেন’কে।

তবে আরেকটি লেখায় পাচ্ছি যে ঈশ্বর ঘোষ সম্ভাব্যরূপে তৃতীয় বিগ্রহ পালের সমসাময়িক( আ: ১০৪০-১০৮০ খ্রিস্টাব্দ) ।পরবর্তী অংশটিকে দাঁড় করাতে, আমাকে ইতিহাসকে বহুল প্রচলিত মিথের মেলবন্ধনে জুড়তে হয়েছে। অবশ্য আমরা যাকে মিথ বলছি, সেটিকে এখানকার স্থানীয় নিম্নবর্ণের মানুষ ইতিহাস বলেই জানে এবং দৃঢ়ভাবে মানে।

ইছাই ঘোষের দেউল

কর্ণ সেন পালিয়ে গিয়ে জীবন বাঁচাতে পারলেও, শোনা যায়, এই যুদ্ধে তাঁর সাত পুত্রই নিহত হন। কর্ণ সেন পালিয়ে গিয়ে গৌড়েশ্বরের শরণ নেন। বিদ্ধস্ত কর্ণ সেনকে দেখে, গৌড়েশ্বর তাঁর ছোট বোন রঞ্জাবতীর সঙ্গে বৃদ্ধ কর্ণ সেনের বিবাহ দেন এবং মেদিনীপুর জেলার ময়নাগরের সামন্ত রাজার পদে অভিষিক্ত করেন।

কর্নসেন ও রঞ্জাবতীর পুত্রই হচ্ছেন, ধৰ্মরাজ ঠাকুরের আশীর্বাদধন্য লাউসেন।লাউসেন তাঁর পিতার রাজ্য উদ্ধার করতে, অজয় নদের তীরবর্তী স্থানীয় ডোম বীর – কালু ডোমের সাহায্য প্রার্থনা করেন।অবশ্য স্থানীয় নিম্ন বর্গের অধিবাসীদের মধ্যে আরেকটি প্রচলিত লৌকিক বিশ্বাস হচ্ছে, কালু বীরের নাকি আদতে নাম ছিল কালু সেন, লাউসেনের বৈমাত্রেয় সম্পর্কিত ভাই ছিলেন তিনি। পরে লক্ষ্যা নামক এক সাহসিনী, অস্ত্র চালনায় পটু ডোমের মেয়ের প্রেমে পরে, তাঁকে বিবাহ করে, পরিচিত হন কালু ডোম বলে। যুদ্ধক্ষেত্রে কালু বীরের সঙ্গে লক্ষ্যাও সমানে অংশগ্রহণ করতেন।

ইছাই ঘোষের পূজিত শ্যামরূপা চণ্ডী

রাঢ় বঙ্গের এই অঞ্চলে বাউড়ি, বাগদী, দুলে, ডোম, গোপ, সদগোপ অধিবাসীদের মধ্যে ধর্মরাজ ঠাকুর অত্যন্ত জনপ্রিয় দেবতা। এদিকে ইছাই ঘোষ ছিলেন হিন্দু তান্ত্রিক এবং চণ্ডী দেবীর একনিষ্ট ভক্ত।শুরু হয়, মা চন্ডীর ভক্ত ইছাই ঘোষ এবং তাঁর সেনাদের সঙ্গে , ধর্ম ঠাকুরের ভক্ত লাউসেন ও তাঁর সৈন্যদের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ। যুদ্ধে প্রথম লাউসেনের মুখ্য সেনাপতি কালু ডোম নিহত হন। তারিখটি ছিল নাকি সেবছরের ১৩ ই বৈশাখ। তাই এই দিনটির স্মরণে এখনও কালু বীরের পুজো ও মেলা বসে।

শেষ অবধি ইছাই ঘোষ যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। ঘনরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য অনুসারে মা শ্যামরুপা চণ্ডী নাকি দেবী পূজা সমাপ্ত না করে, যুদ্ধে যেতে ইছাইকে মানা করেছিলেন।

” সম্মুখে সপ্তমী শনিবার বারবেলা।

আজি রণে যেওনারে ইছাই গোয়ালা।”

 

লাউসেন নাকি দেবীর এই ইচ্ছার কথা জানতেন, তাই পুন: পুন: ইছাইকে কাপুরুষ সম্বোধন করে, যুদ্ধে যাবার জন্য উত্তেজিত করেন। কাপুরুষ সম্বোধনে ক্ষিপ্ত হয়ে, চন্ডিপুজো অসমাপ্ত রেখেই মহা মান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ যুদ্ধ যাত্রা করেন এবং নিহত হন।

এই স্থানটির নামই হয়ে যায় কাঁদুনি ডাঙ্গা, কারণ ইছাই এর মৃত্যুতে নাকি স্বয়ং মা ভবানী কেঁদে উঠেছিলেন।

” আর না শুনিব স্তুতি ও চাঁদ বদনে।

কান্দেন করুণাময়ী অঝোর নয়নে।”

রাঢ়ের এই বিখ্যাত ঘটনা বহুদিন ধরে লোকমুখে প্রচলিত ছিল। ক্রমে ক্রমে এই ঘটনাটি হয়ে দাঁড়ায় ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রধান বিষয় বস্তু । পাল যুগের বৌদ্ধ ধর্ম এবং হিন্দু ধর্মের শিব ঠাকুরের মধ্যে মিসিং লিঙ্ক হিসাবে উদ্ভব হয় নিরাকার ধর্ম ঠাকুরের। তাই ধর্মমঙ্গল কাব্যে, চণ্ডী ভক্ত ইছাই ঘোষের সঙ্গে আরেকজন ধর্ম ঠাকুরের ভক্ত গোপ রাজাকে দেখতে পাচ্ছি- রাজা হরিশ্চন্দ্র। জানিনা এই হরিশ্চন্দ্র কোন ঐতিহাসিক চরিত্র কিনা, তবে যদি তিনি ঐতিহাসিক চরিত্র হন, তবে গুসকরার কাছে অমরারগরের রাজা হলেও হতে পারেন। তবে একটা কথা, এই অমরারগরে গিয়ে আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। উনারা সবাই বলেছেন- অমরারগরের প্রাচীন গোপ রাজবংশের রাজারা ছিলেন শিব ও শক্তির উপাসক।

সে যাই হোক, ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুটি চরিত্র ইছাই ঘোষ এবং রাজা হরিশ্চন্দ্রের কথা, আদতে গোপভূমির রাজকাহিনী।তবে ইছাই ঘোষ কিন্তু কেবল ধর্মমঙ্গল কাব্যের অন্যতম নায়ক নন, তিনি ছিলেন একজন রক্ত মাংসের ঐতিহাসিক চরিত্র। আসছি সেই কথায়- পরের পর্বে।

 

অমরারগরের পঞ্চরত্ন বিষ্ণু মন্দির

তথ্যসূত্র:- 

১) গৌড় কাহিনী, শ্রী শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ। ডি এম লাইব্রেরি, ৪২ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, কলকাতা ৬ ।

২)পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, প্রথম খন্ড, বিনয় ঘোষ। প্রকাশ ভবন, কলিকাতা ৭০০০১২।

৩)মিথ পঞ্চদশ, মন্দিরের মিথ, মিথের মন্দির, কৌশিক দত্ত। পার্চমেন্ট।

৪) গড়ের মা, তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাম-ডানজোনা, পোষ্ট:- রামপুর, থানা – মহাম্মদ বাজার, জেলা- বীরভূম, ৭৩১১২৭  ।।

৫) বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম খন্ড, দ্বিতীয় সংস্করণ। শ্রীরাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়  প্রণীত। মনোমোহন প্রকাশনী, কলেজ স্ট্রিট।

৬) INSCRIPTIONS OF BENGAL, NANI GOPAL MAJUMDAR, SANSKRIT PUSTAK BHANDAR. Bidhan Sarani, Kolkata.

 

ছবি – লেখক।

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 28
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    28
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।