জগদ্ধাত্রীপুজো তিন দিনের না একদিনের?

Share your experience
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

ঋত্বিক হাজরাঃবাঙালীর বারোমাসে তেরপার্বণ হলেও মূলতঃ ভাদ্রমাসের  সংক্রান্তি থেকে কার্তিকের সংক্রান্তি পর্যন্ত এই দুইমাস সময়পর্বকে  এককথায় বলা চলে উৎসবের মরসুম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দশভূজা সিংহবাহনা,করালবদনা শবাসনা এবংহেমন্তিকা কনকবরণা, এই তিনরূপে পূজিত হন বাংলায়। ইতিমধ্যে দুটি পূজা অতিক্রান্ত।এখন পূজিত হবেন তন্ত্রের পরিভাষায় দেবী মহাদুর্গা, যাঁকে ভক্তগণ জগদ্ধাত্রী অভিধায় ভূষিত করেন। কিন্তু সেই পূজা কবে আর কয়দিন ধরে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রথমে জগদ্ধাত্রীপুজোর উদ্ভবের কিংবদন্তীগুলি উল্লেখ করা প্রয়োজন।

এই প্রসঙ্গ আসে নবদ্বীপরাজ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের নাম। সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দীর পাঁচের দশক। বাংলার মসনদে তখন আসীন নবাব আলিবর্দি খাঁ। বর্গিহাঙ্গামায় ক্ষত-বিক্ষত দেশ। রাজকোষ শূন্য।যেমন করেই হোক অর্থের যোগান চাই।হঠাৎ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতি বারোলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা নজরানার হুকুম হয় নবাবের। প্রবল প্রতাপী কৃষ্ণচন্দ্র  এমন কথা শুনে বসলেন বেঁকে। নবাবের রোষে রাজাকে বন্দী করে নিক্ষেপ করা হল কারাগারে। বন্দী অবস্থাতেই রাজা মানস করেন যে, মুক্তি পেলে মহাষ্টমীতে দেবীকে অঞ্জলীপ্রদান করবেন। দেবীভক্ত  কৃষ্ণচন্দ্র দেবীর অশেষ কৃপায় দীর্ঘদিন পর বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে নদীপথে যখন নিজ নগরীতে প্রত্যাবর্তন করছেন, সেই সময় তিনি দুর্গাপ্রতিমার নিরঞ্জন দৃশ্য দেখে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন। বিজয়াদশমীর তিথি যে সেদিন! মানে শারদীয়া মহাপূজার অবসান হয়েছে সেবছরের মত।

মহারাজ প্রতিবছর নিজপ্রাসাদে মহাসমারোহে দেবী দশভূজার যে পূজায় ব্রতী হন, বর্ষে বর্ষে যে পূজার তিনি সংকল্পবদ্ধ, সেই সংকল্প যে পাত হল এইবছরে! ক্লান্ত মহারাজ ভোররাতে ঢলে পড়লেন ঘুমের অতলে। ভক্তের চোখের জলে থাকতে পারলেন না দেবী। স্বপ্নে দর্শন দিলেন রাজাকে চতুর্ভূজা সিংহপৃষ্ঠে আরূঢ় মূর্তিতে। আদেশ দিলেন পরবর্তী শুক্লা নবমীতে তিনদিনের পূজা একদিনে তিনবারে করার। কৃষ্ণনগরে ফিরে মহাপণ্ডিত শক্তিসাধক কালীশঙ্কর মৈত্রকে স্বপ্নবৃত্তান্ত প্রকাশ করলেন। তন্ত্রপারঙ্গদ কালীশঙ্কর তন্ত্রশাস্ত্র থেকে উদ্ধার করলেন দেবীর আদেশের সমর্থক বচন। নব উদ্যমে কৃষ্ণচন্দ্র সাড়ম্বরে পালন করলেন দেবীর আদেশ।

পরবর্তীকালে ভদ্রেশ্বরের গৌরহাটি অঞ্চলে কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান দাতারাম শূরের বিধবা কন্যার হাত ধরে তাঁর গৃহে শুরু হয় পূজা। পরবর্তীতে এই পূজা সার্বজনীনতা লাভ করে এবং বর্তমানে এই পূজা তেঁতুলতলার পূজা নামে বিখ্যাত। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বন্ধু ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী এই পূজা শুরু করেন ফরাসডাঙায়, যার বর্তমান নাম চন্দননগর। কিন্তু এ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।

এছাড়াও কলকাতায় বটকৃষ্ণ পাল, বেনিয়াটোলা দাঁ পরিবার, সিমলের কাঁসারীপাড়ার বুড়োমা বা বাগবাজারের শাঁখারীদের হাত ধরে কলকাতাতেও প্রবর্তিত হয় জগদ্ধাত্রীপূজা। তার মধ্যে বুড়োমার পূজা এতটাই প্রাচীন যে তার ইতিহাসের হদিশ পাওয়া যায়না। কথিত আছে, বটকৃষ্ণ তাঁর শিবপুরস্থ আদি ভিটা থেকে যখন উত্তর কলকাতার বেনিয়াটোলা অঞ্চলে ভদ্রাসন স্থাপন করেন, তখন তাঁর স্ত্রী ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে শিবপুরের বাড়ির শারদীয়া অভয়া দুর্গার পূজা এই বাড়িতে নিয়ে চলে আসবেন। কিন্তু মা স্বপ্নাদেশ দিকে বলেন, তিনি সেই ভিটা ছেড়ে যাবেন না, কারণ তিনি এই বাড়িতে ও পার্শ্ববর্তী ভরদ্বাজগোত্রীয় রায়চৌধুরীদের বাড়িতে তাঁর বোন নিত্য বিরাজিতা। তিনি বোনকে ছেড়ে যাবেন না। তার বদলে মা এই বাড়িতে জগদ্ধাত্রীপূজার আদেশ করেন, যা এখনও সাড়ম্বড়ে পালিত হচ্ছে।

সাক্ষাৎ জগজ্জননী শ্রীশ্রীমা সারদাও তাঁর পিত্রালয়ে গর্ভধারিণী শ্যামাসুন্দরী দেবীর পাওয়া স্বপ্নাদেশে প্রবর্তন করেন পূজা। পরিবারবর্গের সঙ্গে কলহের জেরে কালীপূজায় দেবীর নৈবেদ্যের চাল নিতে পরিবারের লোকেরা অস্বীকার করেন। দেবীর উদ্দেশ্যে প্রস্তুত চাল অস্বীকার করায় শ্যামাসুন্দরীদেবী মানসিকভাবে আহত হন এবং স্বপ্নে পায়ের উপর পা তুলে চৌকাঠে বসা চতুর্ভূজা রক্তবর্ণা মূর্তিতে মাকে দর্শন করেন। স্বপ্নে বলেন- “কালীর চাল আমি খাব…”। সেবছরই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পূজা হয় এবং বিসর্জন কালে শ্যামাসুন্দরী দেবী মা জগদ্ধাত্রীর কানে কানে বলে দেন- “জগাই মা, আবার এসো।” পরবর্তীতে চারবছর পরে একবার এবং নয়বছর পরে আবার পূজা বন্ধের কথা ওঠে। দুবারই শ্রীশ্রীমা স্বপ্নে জয়া-বিজয়াসহ মাকে প্রস্থানে  উদ্যত দেখলে পূজা না বন্ধ করার সংকল্প নেন।

কৃষ্ণনগরে পূজা হয় কেবল নবমীতেই। তেঁতুলতলার উৎসব পাঁচদিনব্যাপী হলেও পূজা হয় কেবল নবমীতে। কলকাতার প্রাচীন পূজাগুলি সবই প্রায় নবমীতে হলেও চন্দননগরে একদিনেরও পূজা যেমন দেখা যায়, তেমনই দেখা যায় তিনদিনের পূজা যা অধিবাসী ও দশমীকৃত্য নিয়ে পাঁচদিনে গিয়ে ঠেকে। জয়রামবাটীতে পূজা প্রবর্তনের বছরে পূজার পরের দিন বৃহস্পতিবার ও তারপর দিন একাদশী হওয়ায় বিসর্জন স্থগিত থাকে যা পরে রেওয়াজে পরিণত হয়।তাহলে কোনটা ঠিক? একদিনের পূজা নাকি তিনদিনের? চোখ বোলানো যাক শাস্ত্রের পাতায়।

শ্রীশ্রীমহাদুর্গা, যিনি জগদ্ধাত্রী নামে বিশ্ব বন্দিতা; তাঁর পূজার কল্পবিধান নিম্নরূপ।
তন্ত্রোদ্ধৃত বচনানুসার জগদ্ধাত্রী পূজার তিনটি কল্প। নিগমকল্পসার, জ্ঞানসারস্বত, মায়াতন্ত্র ও শক্তিসঙ্গমতন্ত্রে এর প্রমাণ আছে।

প্রথম কল্প হল কার্তিকের শুক্লপক্ষের সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত ত্রিদিনাত্মক পূজা হবে।প্রমাণ যথা-
সপ্তম্যাদি নবম্যন্তং পূজাকালমিতীরিতম্।
ত্রিদিনে ত্রিবিধাপূজা দশম্যাঞ্চ বিসর্জয়েৎ।।
—নিগমকল্পসার (জ্ঞানসারস্বতেও একই বচন উদ্ধৃত)

দ্বিতীয় কল্প হল কার্তিকের শুক্লা নবমীতে ত্রিকালীন পূজা।প্রমাণ যথা-
প্রপূজয়েজ্জগদ্ধাত্রীং কার্তিকে শুক্লপক্ষকে।
দিনোদয়ে চ মধ্যাহ্নে সায়াহ্নে নবমেঽনি।।
— মায়াতন্ত্রম্

দ্বিতীয় কল্পের ও তৃতীয় কল্পের প্রমাণ শক্তিসঙ্গমতন্ত্রে দৃষ্ট হয়। তাতে বলা হয়েছে কার্তিক শুক্লা নবমীতে ত্রিকালে বা সকৃতে অর্থাৎ একবার পূজা কর্তব্য।প্রমাণ যথা-
কার্তিকস্য সিতে পক্ষে নবম্যাং জগদীশ্বরীম্।
ত্রিকালমেককালং বা বর্ষে বর্ষে প্রপূজয়েৎ।।
— শক্তিসঙ্গমতন্ত্রম্

এর যে কোনো একটি বিধানে পূজা করলে পূজা সিদ্ধ।

এই বিধান মেনে বছরের পর বছর মা আসেন হেমন্তকালে এই ধরাধামে। কিন্তু এবছর ঘটেছে এক বিড়ম্বনা। বাংলায় প্রচলিত দুই পঞ্জিকা মতে এবছর পুজো পড়েছে দুদিন। কেউ বলে এদিন পুজো তো কেউ বলে ওদিন। এই নিয়ে জনগণ হয়রান। দৃকসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা, যা বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা নামে পরিচিত, সেই অনুসারে শ্রীশ্রীজগদ্ধাত্রীপূজা হবার কথা আগামী ৫ই নভেম্বর, মঙ্গলবার এবং সূর্যসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা, যার পোশাকী নাম গুপ্তপ্রেস ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা, সেইমতে ৬ই নভেম্বর, বুধবার। কেন এমনটা হল? স্মৃতি বলে, “শুক্লপক্ষে তিথির্গ্রাহ্যা যস্যামভ্যুদিতে রবিঃ”। অর্থ দাঁড়ায় শুক্লপক্ষে সেইদিন তিথি গ্রাহ্য, যেদিন সে সূর্যোদয়কে স্পর্শ করে থাকে। সেই অনুসারে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুসারে মঙ্গলবার উদয়াকে স্পর্শ নবমী সারাদিন থাকবে, কিন্তু গুপ্তপ্রেস তা না পেরে বুধবার উদয়া স্পর্শ করবে। তাই এই মতান্তর।

যদিও সাধারণ মানুষের তো পোয়া বাড়ো। উৎসব বৃদ্ধি পেয়েছে যে! এখন কে কোন পঞ্জিকা মেনে জগদ্ধাত্রীর পূজা করবেন সেটা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

ছবিপরিচিতি

কাঁসারীপাড়ার বুড়োমা, কলকাতা।চিত্র – পুষ্পেন্দু পাল ।বটকৃষ্ণ পালের বাড়ির মা জগদ্ধাত্রী, বেনিয়াটোলা, কলকাতা।চিত্র অজয় মুখোপাধ্যায়।বাগবাজার সার্বজনীন জগদ্ধাত্রী পূজা, কলকাতা এবং জয়রামবাটী রামকৃষ্ণ মঠ, মাতৃমন্দির।চিত্র সংগ্রাহক-লেখক।কৃষ্ণনগর বুড়ি মা, তেঁতুলতলার মা, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি, চন্দননগর আদি মা(চাউলপট্টী)।চিত্র –  আলিম্পন ঘোষ


Share your experience
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ঋত্ত্বিক হাজরা

ঋত্ত্বিক হাজরা
শ্রীনিত্যানন্দ তীর্থনাথ(ঋত্বিক হাজরা)সহ সম্পাদক, কামেশ্বরাঙ্কনিলয়া(জ্যোতিষ্পীঠাধীশ্বর ও দ্বারকা শারদাপীঠাধীশ্বর জগদ্গুরু শঙ্করাচার্য স্বামী শ্রী স্বরূপানন্দ সরস্বতী মহারাজের আদেশানুসার জনগণের আধ্যাত্মিক উত্থানকল্পে প্রবর্তিত বাংলা মাসিক পত্রিকা ) এম. এ. (ইতিহাস), রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। মাতৃসাধক, লেখক ও হিন্দুধর্মশাস্ত্র গবেষক।