জগদ্রামী রামায়ণ

Share your experience
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

ডা.তিলক পুরকায়স্থ

” জগদ্রামী রামপ্রসাদী” বা চলিত কথায় জগদ্রামী রামায়ণ হচ্ছে বাংলা ভাষায় লিখিত সর্ব বৃহৎ রামায়ণ। সপ্তকাণ্ডের জায়গায় এই রামায়ণে অষ্ট কাণ্ডের বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলি যথাক্রমে – আদিকান্ড, অযোধ্যা কাণ্ড, অরণ্য কাণ্ড, কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড, সুন্দরা কাণ্ড, লঙ্কা কাণ্ড, পুষ্কর কাণ্ড,( রাম রাস কাণ্ড-এটিকে একটি অনুচ্ছেদ ধরা হয়েছে) এবং উত্তরা কাণ্ড।এই গ্রন্থ পিতা-পুত্র, জগৎরাম এবং রামপ্রসাদ, বাল্মীকি রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ, অদ্ভুত রামায়ণ এবং হনুমৎ সংহিতা অবলম্বনে রচনা করেন।

বাঙালি কি কৃত্তিবাস রামায়ণ ছাড়া, এই বৃহত্তম রামায়ণ গ্রন্থটির  সম্পর্কে  আদৌ অবহিত !

এই রামায়ণের খোঁজে এসেছি রানীগঞ্জ – মেজিয়া রোড ধরে দামোদর নদ পেরিয়েই, ডানদিকে রাস্তা ধরে অর্ধগ্রাম পেরিয়ে- ভুলুইয়ে । আমার গন্তব্য ভুলুই গ্রামে জগৎরাম রায়ের প্রতিষ্ঠিত অষ্ট নায়িকা দুর্গা মন্দিরে। এখানে অপেক্ষা করে আছেন- বৃহত্তম বাংলা ” জগদ্রামী রামপ্রসাদী রামায়ণ” এর মূল রচয়িতা জগৎরাম রায়ের নবম উত্তর পুরুষ জগবন্ধু রায় এবং রামপ্রসাদ মুখার্জি। জগৎরাম রায় তাঁর নিজের বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে-

” বিপ্রবংশে বন্দ্যঘটি : ভুলুই গ্রামেতে বাটি: পরিপাটি করি সমাদরে। / ভাবি রাম জগদ্রাম : কাব্য করে অনুপাম : জমধাম গমন নিবারে ।।”

সুকুমার সেনের বই ” বাঙালা সাহিত্যের ইতিহাস- দ্বিতীয় খন্ডে”, মন্তব্য করেছেন-” অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষপ্রান্তে বন্দ্যঘটি( অর্থাৎ বাড়ুজ্জে ) জগৎরাম রায় তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্র রামপ্রসাদের সহযোগিতায় বোধ করি বৃহত্তম রামকথা নিবন্ধ রচনা করিয়াছিলেন : নাম। অদ্ভুত রামায়ণ।”

” বাল্মীকি পুরাণ মত: অদ্ভুত আশ্চর্য্যজত : অমৃত অধিক রসময়।/ শ্রী রামের পদ অবশে : দ্বিজ জগত্রামে ভাসে : জমতাসে হইয়া সভয়।।”এই বৃহত্তম রামায়ণের রচনা সমাপ্ত হয় ১৭১২ শকাব্দ বা ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ শে ফাল্গুন।

” সপ্তদশ শতাব্দ দ্বাদশ যুক্ত তাথে।ফাল্গুনের শুক্লপক্ষ তিথি পঞ্চমীতে। / উনত্রিশ দিবস বারেতে বৃহস্পতি। জন্মভূমি ভুলুই গ্রামে করি স্থিতি ।”

জগৎরাম শুধু কবি ছিলেন না, ছিলেন দেবী দুর্গার একনিষ্ঠ সাধক। ভুলুই গ্রামে তাঁর প্রতিষ্ঠিত অষ্ট নায়িকা দুর্গা মন্দিরে এখনও মহাধুমধামের সঙ্গে প্রতিবছর দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।জগদ্রামী রামায়ণের পুষ্কর কাণ্ড থেকে সামান্য অংশ উদ্ধৃত করছি। বুঝতে পারবেন কেন এই রামায়ণ অন্য সমস্থ রামায়ণ থেকে পৃথক-

রাবণ বধের পরে ” রামচন্দ্র হল্য রাজা অজোধ্যা রাজ্যেতে।/ চতুর্দিগ বাসি ঋষি আস্যে আনন্দেতে।।”

সবাই রামচন্দ্রের বীরত্বের প্রশংসা করেছেন, সীতা দেবীর মুখে মুচকি মুচকি হাসি। সেই হাসি দেখে ” সভা সভার মুখ চায়‍্যা ভাবে নিজ চিত্তে।/ জানকির হাস্য হেন হল‍্য‍ কি নিমিত্তে।।”

তখন সভায় উপস্থিত সব মুনি ঋষিরা সীতার কাছে জানতে চাইলেন এই হাসির অর্থ। এর উত্তরে সীতা একটি ঘটনা জানান। সুমালী নামক এক বীর রাক্ষস , দেবতাদের কাছ থেকে পুষ্কর পর্বত ছিনিয়ে নিয়ে সেখানে তাঁর বাসস্থান বানান । তাঁর কন্যা নিকষার বিবাহ দেন বিশ্বশ্রবা মুনির সঙ্গে। এঁদের দুই পুত্র জন্মায়।

” ভয়ঙ্কর জ্যেষ্ঠ পুত্র সহস্র বদন।

কনিষ্ঠ হইল দশস্কন্ধ সে রাবণ।।

দেবেতে রাখিল্য নাম দুজন রাবণ।”

লঙ্কার দশস্কন্ধ রাবণ নিহত হয়েছেন। কিন্তু পুষ্করের রাজা ভয়ঙ্কর জ্যেষ্ঠ পুত্র সহস্র বদন রাবণ জীবিত – ” তার সম বলী নাই ই তিন ভূবন।।” নেহাৎ বিশ্বশ্রবা মুনির বারণ আছে, তাই সহস্র বদন রাবণ এখনও অবধি কোন উৎপাত করেনি। কিন্তু মুনিগণের জানা উচিৎ-

” লঙ্কার রাব্ণ বলবান বড় লয়।

তাহারে রাঘব রণে করিলেন ক্ষয়।।

ইহার বিনাশে সভে প্রভুর বাখান।

এ নিমিত্তে হাস্য চিত্তে শুন মুনিগণ।।

জদি দুষ্ট হয় লষ্ট সহস্র বদন।

শ্রীরামের পৌরষার্থ জানিব তখন।।”

এ কি সাঙ্ঘাতিক কথা জানকি শোনালেন। এরপরে কি আর চুপ করে থাকা যায়। আবার সসৈন্যে রঘুবীর বেরিয়ে পড়লেন সহস্র বদন রাবণ বধের উদ্দেশ্যে। এবার যুদ্ধে রামের পাশেই রয়েছেন সীতা দেবী। কেন ? কি উদ্দেশ্যে ? জানতে ঘটনা পরম্পরার দিকে নজর রাখুন।

এই রাবণের কাছে একটি অসাধারণ অস্ত্র ছিল- খুর্প বাণ। পাশুপাত অস্ত্র অবধি বিফল হল, এই বাণকে ঠেকাতে।

” রথে পড়ি রঘুবর : রক্তে ভিজে কলেবর : অজ্ঞানে আছেন নারায়ণ । / কিরিট কুণ্ডল মাথে : গড়ি পরে সেই রথে : খসে কেশ বসন ভূষণ ।।/ পুত্র তুল্য ভগবান : কোলে লয়‍্যা ধনুখান : সীতার দক্ষিণে রণ ঢলি। / শ্রী রামের এই গতি : রাবন আহ্লাদ অতি : নিজ দৃষ্টে দেখেন মৈথিলি।। / চিত্ত হল‍্য‍ সচঞ্চলা : মুহুর্মুহু মহীবালা : চকিতে চাহেন চারি পানে।/ বাক্য না নিস্বরে মুখে : হৃদি কাঁপে মন দুখে : জিহ্বা কাটে আপন শরমে ।।/ কোপ হল‍্য‍ পরকাশ : ঘনঘন বহে শ্বাস : ভ্রুকুটি কুটিল হল‍্য ক্ষণে।/ বিচ্ছেদ হইছে মর্ম : সর্বদেহে বহে ঘর্ম : অট্ট অট্টহাস ঘন ঘনে।।/ অতি কোপ হল‍্য‍ স্ফূর্তি : ত্যাগ কল্য নিজ মুর্ত্তি : দীর্ঘ জংঘা হল্যা মহাকালী।।/ হইলা বিকটাকর : ঘোর রূপা খরস্বরা : কোটরাক্ষি ভীমা মুন্ডমালী ।। / অস্থির কিংকিনী জুতা : চতুর্ভূজা হল্যা সীতা : লহ লহ করএ রসনা। / দলিত অঞ্জন আভা : সব শিশু কর্ণে শোভা : ক্ষুধাতুরা বিকৃত আননা।। / জটাজুট শোভে শিরে : সে খড়্গ খর্পর করে : ঘংটা পাশ ধরিলা দক্ষিণে। / অধিক প্রচণ্ড রোমা : ভীম বেগা পরাক্রমা : দিগম্বরা হল্যা ততক্ষণে।। / ঘূর্ণিত হইছে নেত্র : কোপে কাঁপে সর্ব্বোগাত্র : ঘর্ঘর শব্দ ঘোর ধ্বনি। / কোটি সূর্য্য জিনি ছটা : ব্রহ্মাণ্ড ভেদিল জটা : পদভরে কম্পিত ধরণী।।”

এরপরে যা হবার তাই হল- সহস্র বদন রাবণের

” রাবণের স্কন্ধে হত্যে মুন্ড সব পড়ে।

এক কালে পাকা তাল ভাদ্রে জেন পড়ে।।”

এখানেই শেষ নয়-

“রণমদে মত্ত কালী মনেতে উল্লাস।।

উদর বিদারি রাবণের অন্তে করি।

সহস্র মুন্ডের মালা গাঁথি মাহেশরী।।

আজানুলম্বিত মুন্ডে মালা দোলে গলে।”

সীতার এই করালী মহাকালী রূপ দেখে, দেব- মানব সবাই ভীতসন্ত্রস্ত । মহাকালীর উন্মত্ত নাচ বন্ধ করতে স্বয়ং মহাদেবকে আসরে নামতে হয়। ” শব ছলে সদাশিব পড়ি পদতলে।”

আস্তে আস্তে রামের জ্ঞান ফিরে এলে-

” প্রভু রামে দিব্যচক্ষু দিয়া নারায়ণী। পরম ঈশ্বর রূপ ধরেন আপনি।।” এতক্ষণ পরে সীতা দেবীর পরমাশক্তির রূপ অনুধাবন করে রামচন্দ্র কি করলেন দেখেনি- ” প্রণমিয়া রামচন্দ্র কন প্রিয় বাণী। ভয়ঙ্করী বেশ ত্যেজ জনক নন্দিনী।। পূর্বের শরীর ধর ধরণী তনয়া। মহাভয় হয় এই আকৃতি দেখিয়া।। পতিরে প্রসন্ন হৈয়া পরম প্রকৃতি। উগ্রবেশ ত্যাজি হৈলা পূর্বের আকৃতি।।”

তথ্যসূত্র : জগদ্রামী রামপ্রসাদী রামায়ণ। সম্পাদনা ডঃ পঙ্কজ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। কবিরচিঠি প্রকাশনী, নেহরুপার্ক, বাঁকুড়া।

ছবি – লেখক রাম সীতার মূর্তি দুর্গাপুর রাম মন্দিরের। বাকি সব ছবি ভুলুই গ্রামের। নিজেদের মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন জগবন্ধু রায় ও রামপ্রসাদ মুখার্জি। দুটি মন্দিরে ই দুর্গাপূজা হয়। একটি পুঁথি জগদ্রামী এবং রামপ্রসাদী রায়ের লেখা পুুঁঁথি।

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।