জগন্নাথ মদনমোহন-নীলাচলের ধর্মীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে

Share your experience
  • 423
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    423
    Shares

জগন্নাথ মদনমোহন
জগন্নাথ মদনমোহন

শ্রীনিত্যানন্দ তীর্থনাথ (ঋত্বিক হাজরা)–জগন্নাথ মদনমোহন একই মুদ্রার যেন এপিঠ ওপিঠ। কেননা আমরা সকলেই জানি যে, মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথের দ্বাদশযাত্রাগুলির তিনটি ব্যতিরেকে বাকিগুলিতে তাঁর প্রতিনিধি্রা থাকেন। বিজয়বিগ্রহগণকে কেন্দ্র করে সেই সমস্ত  জগন্নাথের  যাত্রাগুলি সম্পাদিত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন তিথিকৃত্যগুলিতে এনাদের অংশগ্রহণ দেখা যায়। এঁদের মধ্যে নীলমাধব, নৃসিংহ, দোলগোবিন্দ, মদনমোহন, রামচন্দ্রের মত বেশ কয়েকজন রয়েছেন। তবে  এনাদের সকলের মধ্যে মদনমোহনের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশী। জগন্নাথই হলেন মদনমোহন। কি চন্দনযাত্রা কি রুক্মিনীহরণ একাদশীতে স্বর্ণময়ী মহালক্ষ্মী বিগ্রহে রুক্মিনীর সঙ্গে  বিবাহ নীতি অনুষ্ঠান পালন হোক জগন্নাথের প্রতিনিধিত্ব করেন মদনমোহন। আবার স্নানযাত্রা, রথযাত্রা বা পুনর্যাত্রায় মহাপ্রভুর মূল বিগ্রহের সঙ্গে  স্নানবেদী বা যজ্ঞবেদীতে অধিষ্ঠান করা হোক, মদনমোহন থাকেনই।

জগন্নাথ
জগন্নাথ

জগন্নাথ মদনমোহন

ইনি দ্বিভূজ বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণের ধাতুময় প্রতিমা, যাঁর উচ্চতা প্রায় ১হাত। উৎকলীয় রীতিতে নির্মিত রূপার চালচিত্র যুক্ত আসনে মদনমোহন অবস্থান করেন। চালচিত্রের শীর্ষে দধিনৌতি নামক পূর্ণকুম্ভোপরি নীলাচলচিহ্ন নীলচক্র থাকে। দধিনৌতির দুদিকে শুক-শারি দৃষ্ট হন। তার নিচে চালচিত্রের অর্ধগোলাকার অংশ রয়েছে। যার অন্তিম প্রান্তে দুটি মকরমুখ দেখা যায়। চালির অর্ধগোলাকার ভাগটি রয়েছে দুদিকের দুটি স্তম্ভের উপর। যাতে চক্র ও শঙ্খ ও তার নিচে হস্তীমর্দনকারী সিংহদ্বয় উৎকীর্ণ। চালির আসন অংশে করজোড়ে বীরাসনে উপবিষ্ট বিষ্ণু বাহন গরুড়দেবকে দেখা যায়। মহাপ্রভু জগন্নাথের মত মদনমোহনেরও অঙ্গরাগে বিশালনেত্র ও বিস্তৃত হাস্যযুক্ত অধর শোভিত হয়। ভালে থাকে রামাইত তিলক।

মদনমোহন জগন্নাথের প্রতিনিধি
মদনমোহন জগন্নাথের প্রতিনিধি

জগন্নাথ এর সঙ্গে মদনমোহন কেন?

বিশেষজ্ঞ গবেষকগণ বলেন, শ্রীচৈতন্যদেবের সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন মদনমোহন। এই সময় থেকে  শ্রীমন্দিরের সেবাপূজায় গোপালার্চনপদ্ধতি অনুসরণ করা শুরু হয়। তৎপূর্বে নাকি আদি শঙ্করাচার্যের সময় থেকে মহাপ্রভু সেবিত হতেন নৃসিংহ পরমাত্মা স্বরূপে। এখনও নবকলেবরের মত গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়াকর্মে নৃসিংহদেবই মুখ্যদেবতারূপে কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে থাকেন। পরবর্তীতে রামানুজাচার্যের সময়ে চতুর্ভূজ বিষ্ণুর অর্চনপদ্ধতির প্রভাব আসে।, যদিও কিম্বদন্তি যে জগন্নাথ মহাপ্রভু নাকি রামানুজের বিধি-ব্যবস্থাকে মান্যতা দেননি। শঙ্করাচার্যেরও পূর্বে শ্রীক্ষেত্রে যথেষ্ট ভাবে বৌদ্ধ, জৈন ও তান্ত্রিক প্রভাব ছিল। এবং এটা অনস্বীকার্য যে আদিতে জগন্নাথ ছিলেন মূলতঃ আদিবাসীদেরই দেবতা।

আরও পড়ুন– বিষ্ণু রূপী রামচন্দ্র হিসাবে পূজিত হন থাইল্যাণ্ডের রাজা জনগণের কাছে

মদনমোহন বিগ্রহের প্রকৃত তাৎপর্য

দার্শনিকগণ বলেন, মদনমোহন বিগ্রহে নৃসিংহ, রাম ও কৃষ্ণ স্বরূপের সম্মেলন ঘটে। শান্ত নৃসিংহমূর্তি দারুব্রহ্মের সমান মুখশৃঙ্গার রয়েছে। ললাটে রামাশ্রয়ী তিলক ও অবয়বে শ্রীকৃষ্ণ, এই তিনকে মিলিয়ে মদনমোহন। আবার একাধারে শঙ্খচক্রধারী নারায়ণের আয়ুধ আশ্রয় করে শ্রীকৃষ্ণবিগ্রহ।শ্রীকুলোক্ত বেণুগোপাল বা মদনগোপালের রূপকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঐতিহাসিক পণ্ডিতগণের মতে আদি শঙ্করাচার্য, রামানুজ বা শ্রীচৈতন্য, প্রত্যেকের সময়ই যে মহাপ্রভুর স্বরূপ বা পূজাপদ্ধতিতে বিবর্তন ঘটেছে, তার নিদর্শন এই অর্চাবিগ্রহসমূহ। লক্ষ্য করার বিষয়, বিগ্রহগুলি আলাদা হলেও পূর্ববিগ্রহের ভাবকে আশ্রয় করে।

সর্বশেষ বলা যায়, মদনমোহন নামক মহাপ্রভুর এই প্রতিনিধি বিজয়বিগ্রহ একাধারে ভক্তগণের চিত্তাকর্ষকচ। তেমনই জগন্নাথ দর্শন ও তাঁর ইতিহাসের একজন উত্তম কথাবাচক।

 

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 423
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    423
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ঋত্ত্বিক হাজরা

ঋত্ত্বিক হাজরা
শ্রীনিত্যানন্দ তীর্থনাথ(ঋত্বিক হাজরা)সহ সম্পাদক, কামেশ্বরাঙ্কনিলয়া(জ্যোতিষ্পীঠাধীশ্বর ও দ্বারকা শারদাপীঠাধীশ্বর জগদ্গুরু শঙ্করাচার্য স্বামী শ্রী স্বরূপানন্দ সরস্বতী মহারাজের আদেশানুসার জনগণের আধ্যাত্মিক উত্থানকল্পে প্রবর্তিত বাংলা মাসিক পত্রিকা ) এম. এ. (ইতিহাস), রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। মাতৃসাধক, লেখক ও হিন্দুধর্মশাস্ত্র গবেষক।