জনাই অঞ্চলের সাবেকি দুর্গাপুজো

Share your experience
  • 55
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    55
    Shares

সিংহবাড়ি

শুভজিৎ দত্ত

বর্ষার বিদায় বেলা থেকেই প্রকৃতির বুকে কান পাতলেই শোনা যায় এক সাজো সাজো রবের গুঞ্জন,আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘেদের আনাগোনা ,শিউলি গাছে নতুন কুঁড়ির আগমন আর কাশের বনের ধীরে ধীরে মাথা দোলানো ;এ সবই যেন জানান দেয় মায়ের আগমনের ,ফিসফিসিয়ে যেন বলে যায় তোমরা তৈরি হও ,মা যে এবার স্বপরিবারে এলেন বলে।তবে আজকাল পুজো মানেই ঝাঁ চকচকে রঙীন ব্যাপার ,একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার খেলা,সেখানে আন্তরিকতা ও একাত্ম বোধের থেকে অনেক বেশি হয়ে ওঠে বাহ্যিক পরিবেশের সৌখিনতা।কিন্তু শহর ও শহরতলির রোশনাইকে পিছনে ফেলে কয়েক পা সবুজ গাঁয়ের দিকে বাড়ালেই পাওয়া যায় সাবেকিয়ানার মোড়কে এক অন্য পুজোর গন্ধ ,যেখানে হয়তো সৌখিনতার অভাব আছে কিন্তু অভাব নেই পুজোর রীতি নীতি ও আন্তরিকতার।সেখানে ভিন্ন ভিন্ন বাড়ির পুজোর ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস ,নিয়ম ও আচার ;এরকমই কিছু সাবেকিয়ানার রঙে রঙীন পুজোর সন্ধান পাওয়া যায় হুগলী জেলার জনাই রোড স্টেশনের কাছে বাকসা ও জনাই গ্রামে ,যাদের মধ্যে অন্যতম হলো বাকসা সিংহ বাড়ি ও চৌধুরী বাড়ির পুজো।

‘বাকসা’ এক বহু প্রাচীন বর্ধিষ্ণু গ্রাম

এই গ্রামের নামকরণের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় দক্ষিণ দিকে সরস্বতী(বতর্মানে ক্ষীণস্রোতা) নদীর তীরে পর্তুগীজরা এক বন্দর স্থাপন করেছিলেন।অনেকের মতে তাই পর্তুগীজ ‘baixel’ বা বজরার অপভ্রংশ থেকেই বাকসা নামটি এসেছে। চারশো বছর পূর্বের কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের চন্ডীকাব্যেও এই গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়।এই গ্রামেই কোম্পানির দেওয়ান শান্তিরাম সিংহ করহীন জমি পেয়ে নিজের জমিদারি শুরু করেন।এই শান্তিরাম সিংহ ছিলেন কোম্পানীর আমলে কালেক্‌টার মিঃ মিডলটন ও সার টমাস রমবোল্ড সাহেবের দেওয়ান।এমনকি তিনি পাটনা ও মুর্শিদাবাদ জেলা সম্বন্ধীয় কার্য্যের অধ্যক্ষও ছিলেন।তাই স্থানীয় মানুষদের কাছে এ বাড়ি ‘সিংহ বাড়ি বা সিংহী বাড়ি’ নামে পরিচিত।তবে এ বাড়ির পুজোর ইতিহাস বলার আগে এই বাড়ির এক পূর্বপুরুষের কথা না জানালে পুরো ইতিহাসটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়,এই পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন আমাদের সবার প্রিয় ‘হুতোম প্যাঁচা'(মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ)।

একসময় ‘টিকি কাটা জমিদার’ হিসেবেই ‘কালীপ্রসন্ন সিংহ’ পরিচিত ছিলেন।গুজব রটেছিল তিনি টাকা দিয়ে ব্রাহ্মণের টিকি কেটে আলমারিতে সাজিয়ে রাখেন।যদিও এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়,তবে তিনি স্বহস্তে এক ব্রাহ্মণকে তার দান করা গরু বিক্রির শাস্তি স্বরূপ টিকি কেটেছিলেন।সেই থেকেই ওনার নাম ছড়িয়ে যায় টিকি-কাটা জমিদার হিসেবে।

এই বাড়ির বর্তমান সদস্য শ্রী শৌভিক সিংহের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় এই বাড়ির পুজোর ইতিহাস। ওনার মতে এই পুজোর আনুমানিক বয়স প্রায় 500 বছর ।জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামো পুজোর সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় মায়ের পুজোর প্রস্তুতি।এরপর ধীরে ধীরে প্রকাশ ঘটে মায়ের ভুবনভোলানো মৃন্ময়ী রূপের । বাড়ির প্রতিমার প্রধান বৈশিষ্ট্য -মহিষমর্দিনী দশভূজা মূর্তি,দুপাশে জয়া-বিজয়া বিরাজমান।এই বাড়ির পুজো হয় মূলত কালিকাপুরাণ মতে। মহালয়ের দিন সকাল থেকেই চলে চন্ডীপাঠ,মায়ের চক্ষুদান।ষষ্ঠীর দিন রাতে বিল্ববরণের পর মায়ের আরতির সাথে সাথেই দুর্গাদালানে বসে গনেশঘট,দেবীঘট, কুন্ডহাঁড়ি (বাঁ দিক থেকে ডান দিকে)।এই বাড়ির দুর্গাদালানের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল-দালান টি সম্পূর্ণ মাটির।

সিংহবাড়ির দুর্গা

বাড়ির সদস্যদের থেকে যেটা জানা যায় এই খানে দেবী চন্ডী পঞ্চমুন্ডি আসনে অধিষ্ঠিত।সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নান করানোর পর বাড়ির কোনো প্রবীণ সদস্যের নামে নেওয়া হয় সংকল্প।তবে এই বাড়ির প্রধান আকর্ষণ ছিল মোষ বলি।এই মোষ বলির জন্য বাড়ির সামনের জলাশয়ের নামও-“মোষ পুকুর”।বর্তমানে এই বলিপ্রথা বন্ধ হয়ে গেলেও এখনও প্রতীকী হিসেবে সপ্তমী,অষ্টমী,নবমীতে চালকুমড়া বলি ও সন্ধিপুজোতে পাঁঠাবলি হয়।নবমীতে বাড়ির সবচেয়ে প্রবীণ মহিলা সদস্য কুমারী পুজোর সংকল্প করেন এবং তিনিই কুমারী পুজো করেন।দশমীতে প্রথমে বাড়ির শীতলা মন্দিরে পুজোর পর,বাড়ির কুলদেবতা শুভচন্ডীর পুজো হয় এবং এরপর মাকে দর্পণে নিরঞ্জন করা হয়।এরপর তিথি ধরে মাকে দালানবেদী থেকে নীচে নামিয়ে নিয়ে আসা হয়।যেখানে গ্রামের সমস্ত মানুষেরা একত্রে মিলিত হয়ে মাকে বরণ করার পর পরিবারের সদস্যরা কাঁধে করে দুলকিচালে বাকসা শিবমন্দিরের কাছে সরস্বতী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।

 

চৌধুরী বাড়ির চতুর্ভূজা অভয়া মূর্তি

বাকসা চৌধুরী বাড়ির পুজো

বাকসা সিংহ বাড়ির ছাড়াও এই এলাকার আরও এক সাবেকি বাড়ির পুজোর নিদর্শন ‘বাকসা চৌধুরী বাড়ি’।বর্ধমানের দেওয়ান রাজারাম চৌধুরী করহীন ৭৫ বিঘা জমি পেয়ে এখানেই নিজের জমিদারী শুরু করেছিলেন।বাংলায় যখন শাক্ত (শক্তি) ও বৈষ্ণব দের দ্বন্দ্ব চরমে,তখন এই দ্বন্দ্ব দূরীভূত করতেই তিনি শাক্তদেবীর দুর্গার সাথে বৈষ্ণবদের হৃদয়কমল রাধাগোবিন্দের প্রায় 250 বছর আগে একসাথে পুজো আরম্ভ করেন।তাই আজও মায়ের চালচিত্রের একপাশে রাধা ও অন্যপাশে গোবিন্দ বিরাজমান।এই বাড়ির ঠাকুরদালানের পিছনেই আছে বাড়ির কুলদেবতা রাধাগোবিন্দ জিউয়ের অপূর্ব এক মন্দির।

বাড়ির সদস্য শ্রী অনির্বান চৌধুরীর থেকে জানা গেল এই বাড়ির পুজোর কিছু রীতি-নীতি।জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমেই শুরু হয় দেবীর আগমনীর প্রস্তুতি।ষষ্ঠীর রাতে বেলতলায় বিল্ববরণ ও সপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নানের পর মায়ের প্রাণ প্রতিষ্টা করা হয়।অভয়ারূপী মা এখানে চতুর্ভূজা।পুজোর চারদিন লক্ষ্মীর হাঁড়ি মায়ের ঠাকুর দালানে রেখে পুজো করা হয়।তবে প্রতিদিনই বাড়ির কুলদেবতা রাধাগোবিন্দের পুজোর পরেই মায়ের পুজো হয়।সাবেকি বাড়ির পুজো হলেও এখানে পকান্ন ছাড়াই দেবীর আরাধনা হয়।চাল,ফল,ও মিষ্টি দিয়ে তৈরি হয় মায়ের নৈবেদ্য।পূর্বে সন্ধিপূজো,নবমী ও দশমীতে পাঠাবলির রীতি থাকলেও বর্তমানে প্রতীকী বলি হয়।

দশমীতে বাড়ির কুলদেবতা রাধাগোবিন্দ জিউয়ের আগে প্রথমে বাড়ির অপর কুলদেবতা ‘বিশালাক্ষী’ দেবী ও গ্রামের জাগ্রত দেবী বদ্যিমাতার আরাধনা করা হয়।এরপর রাধাগোবিন্দের পুজোর পর বিসর্জন হয় দেবীর ঘট।ঘট বিসর্জনের পর বিকেলে মহাসমারোহে দ্বাদশ শিবমন্দিরের পার্শ্ববর্তী সরস্বতী নদীতে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়।তবে এখানেই শেষ নয় একাদশীতে বর্ধমান রাজার নির্দেশে চালু হওয়া প্রথা অনুযায়ী সিয়াখালায় দেবী উত্তরবাহিনীকে নৈবেদ্য পাঠানোর মাধ্যমেই শুরু হয় আবার মায়ের আগমনের প্রতীক্ষার দিন গোনা।তবে দুর্গাপুজো ছাড়াও এই বাড়ির অন্যতম উৎসব দোলযাত্রা এবং জন্মাষ্টমী।

 সিংহবাড়ির পুজো

জনাই বাজারের কাছেই মুখার্জি বাড়ির পুজো

আগেই উল্লেখ করেছি বাকসা গ্রাম ছাড়াও জনাইতে এই ধরণের একাধিক সাবেকি পুজোর প্রচলন রয়েছে আজও ,তাদের মধ্যে অন্যতম হলো জনাই বাজারের কাছেই মুখার্জি বাড়ির পুজো।এই পুজো অনুষ্ঠিত হয় ‘উমা ভিলা’তে স্থানীয় মানুষের কাছে যা ‘বাজার বাড়ি’ নামেই পরিচিত।বাড়ির প্রবীণ মুখুজ্যে দম্পতির থেকে প্রাপ্ত হল এই বাড়ির ইতিহাস।প্রায় 270 বছর আগে শুধুমাত্র ভক্তি ও বিশ্বাসের টানে মা এসেছিলেন জনাই গ্রামের বাজারবাড়ির মুখুজ্যে বংশের ভিটেতে পুজো নেওয়ার জন্য,সেই থেকে আজও সেই ধারা অব্যাহত।অন্য সময় পরিবারের সবাই বাইরে থাকলেও মহালয়ের আগে থেকেই একে একে সবাই আসতে শুরু করে।তখন একসাথে অঞ্জলি দেওয়া থেকে শুরু করে গল্পগুজব সবই চলে পুজোর চারদিন ধরে।পুরো বাড়িটাই তখন এক অন্য রূপ নেয়।

     দেখুন জনাইএর বাজারবাড়ির দুর্গাপুজোর এক ঝলক

জন্মাষ্টমীর দিন কুলদেবতা নারায়ণ ও বানেশ্বর এর পুজোর পরই কাঠামো পুজো হয়।এরপর শিল্পীরা ধীরে ধীরে হাত লাগায় মূর্তি গড়ার কাজে। কাঠামো পুজোর পর শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় মা ধীরে ধীরে কাঠামো থেকে মৃন্ময়ী রূপে আবির্ভূত হন।ষষ্ঠীতে বিল্ববরণ ও সপ্তমীতে ঠাকুরদালানে নবপত্রিকা প্রবেশের পর মায়ের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়।পুজোয় চারবার বলির রীতি এখনও আছে এই বাড়িতে।তবে এ বাড়ির মূল আকর্ষণ আলোকসজ্জা।ঠাকুরদালানে কেরোসিনের ঝাড়বাতি আর হ্যাজাকের আলো,আর সাথে নহবতখানার নহবতের সুর পুরো পরিবেশটায় একটা অন্য মাত্রা জুড়ে দেয়।শুধুমাত্র ওই আলোয় মায়ের সালংকরা রূপ দর্শন সকল দর্শনার্থীকে এক অন্য ভাবজগতে নিয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। নবমী নিশিতে আগত সকল দর্শনার্থীই হয়তো তখন একই সুরে মনে মনে প্রার্থনা করেন –
” নবমী নিশি গো পোহায়ো না ধরি পায় ,
তুই চলে গেলে মাগো উমা মোরে ছেড়ে যায় !!”
ওখানকার সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের এই মোহময়ী পরিবেশ সকলকে এতটাই আবেগাচ্ছন্ন করে তোলে ,সকলেই হয়তো আপন মনে গেয়ে ওঠে দীনবন্ধু মিত্রের সেই কবিতা–
“ওই দেখো রাজবাড়ি রম্য অট্টালিকা
সরোজিনী সম্পদ নায়িকা
জ্বলিতেছে ঝাড়বৃন্দে বাতি পারিকর
দুলিতেছে চন্দ্রাতপ শোভা মনোহর
চৌদিকে দেওয়ালগিরি সারি সারি থামে থামে
বিরাজ দালানে দুর্গা যেন গিরিধামে।”

এই দুটি বাড়ি ছাড়াও আরও বেশ কিছু বনেদী বাড়ি স্বমহিমায় ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে জনাই ও পার্শ্ববর্তী বাকসা গ্রামের সাবেকিয়ানার ইতিহাসে।পুজোর বাকি মাত্র আর হাতে গোনা কয়েকটা দিন।তাই শহরের মতো এই দূর গাঁয়ের পুজোবাড়িগুলোও ধীরে ধীরে প্রস্তুত করছে নিজেদের পুজোর রঙে রাঙিয়ে নেওয়ার জন্য।আর দশমী তিথিতে জনাইয়ের ধনী গরীব নির্বিশেষে সকল ঘরে ঘরে বিজয়ার শুভেচ্ছা বার্তার সাথে যা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তা হলো এখানকার বিখ্যাত মন হরণকারী মিষ্টি ‘মনোহরা’।মিষ্টিমুখ ছাড়া যেমন কোনো শুভকাজের পরিসমাপ্তি ঘটে না ঠিক তেমন জনাইয়ের গল্প বলা অসম্পূর্ণ থেকে যায় এই মনোহরা ব্যতীত।

চৌধুরীবাড়ি
বাজারবাড়ির দুর্গা
বাজারবাড়ির দুর্গা
সিংহবাড়ির শীতলামন্দির

পথনির্দেশ:হাওড়া-বর্ধমান লোকালে (কর্ড) জনাই রোড স্টেশন।এখান থেকে টোটো বা অটো (ঘন্টা হিসেবে) করে নিতে পারেন এই গ্রামীণ এলাকার পূজাগুলো দেখার জন্য।

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 55
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    55
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভজিৎ দত্ত

শুভজিৎ দত্ত
প্রথাগত শিক্ষা বাণিজ্য শাখায় ও পেশাগত ভাবেও যুক্ত ট্যাক্স ও একাউন্টস সংক্রান্ত কাজে।ঘোরাঘুরির শখ থেকেই ফটোগ্রাফি,সেখান থেকেই স্হানীয় ইতিহাস,আঞ্চলিক ইতিহাস ও বাংলার লোকসংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহ জন্মায়।সেই সূত্রেই লোকসংষ্কৃতির টানে বাংলার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো, সাবেকি বাড়ির অন্দরমহলে ঢুঁ মারা গত কয়েক বছর ধরে।

1 thought on “জনাই অঞ্চলের সাবেকি দুর্গাপুজো

Comments are closed.