ঝামটপুরের কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ

Share your experience
  • 42
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    42
    Shares

 স্বপনকুমার ঠাকুর ও শুভঙ্কর সিনহা:বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কয়েকটি বই’র নামের তালিকায় যে বইটির নাম নিঃসন্দেহে উঠে আসবে তা হলো কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখা শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থ।বইটি পাঠকাব্য। কোন সন্দেহ নেই শ্রেষ্ঠ চৈতন্যচরিতকাব্য।গৌড়ীয় বৈষ্ণব-দর্শনের বাইবেল।এ বই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।তৈরি হয়েছে বইচুরি ও কবিরাজ গোস্বামীর অন্তিম জীবন নিয়ে নানা লোকশ্রুতি,মিথ।বাঙলাসাহিত্যের পাঠক মাত্রই সে কথা জানেন।আজ আমরা কবিরাজ গোস্বামীর জীবন ও ঝামটপুরের পাটবাড়ি নিয়ে দু চার কথা আপনাদের কাছে নিবেদন করবো।

ঝামটপুর কাটোয়া মহকুমার কেতুগ্রাম থানার  প্রাচীন জনপদ।হাওড়া কাটোয়া –আজিমগঞ্জ রেললাইনের ঝামটপুর-বহড়ান স্টেশন।বহড়ান থেকে খাড়া পুবদিকে দেড়কিমি দূরে ঝামটপুর গ্রাম।বহড়ান উত্তররাঢ়ীয় কায়স্থ প্রধান অতি প্রাচীন জনপদ। বহড়ানের লেখক সত্যকিঙ্কর রায়ের রচনা থেকে জানা যায় ঝামটপুরের চক্রপানবাটী মৌজায় কৃষ্ণদাস কবিরাজের বসত বাটী ছিল।পরে চক্রপানবাটী ঝামটপুর মৌজায় মিশে যায়।ঝামটপুর পূর্বে মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত ছিল।পরে বর্ধমান জেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ জাতিতে বৈদ্য ছিলেন।কবিরাজ উপাধি বা পদবী তাঁদের বৃত্তিগত পরিচয় সূচক, নাকি কবিখ্যাতির জন্য তা নিয়ে বিতর্ক আছে; যেমন বিতর্ক রয়েছে শ্রীখণ্ডের বৈদ্যকবি গোবিন্দদাস কবিরাজকে নিয়ে।গোস্বামী খ্যাতি পেয়েছেন মূলত চৈতন্যচরিতামৃত রচনার পর থেকে।কৃষ্ণদাস কবিরাজের বাবার নাম ভগীরথ,মায়ের নাম সুনন্দা। এক ভাই শ্যামদাস। চৈতন্যচরিতামৃতে শাখা বর্ণনা পরিচ্ছেদগুলিতে চৈতন্যশাখা নিত্যানন্দ অদ্বৈতশাখার ভুক্ত কত যে বৈষ্ণব সাধক কবির নাম  উল্লেখ যে মানুষটি করেছেন,   সেই তিনি  নিজের সম্পর্কে আশ্চর্য নীরব থেকেছেন।ফলত তাঁর জীবন কাহিনি নানা কল্পনা ও অনুমানে ভরে উঠেছে।তবে চৈতন্যচরিতামৃতে কয়েকটি মূল্যবান ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বয়ং কবি এবং ঝামটপুর থেকে বৃন্দাবন বাসী কেন হয়েছিলেন সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির কথা জানিয়েছেন চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে।

কৃষ্ণদাসের প্রদত্ত বিবরণ অনুসারে আচার্য হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন যে তিনি যখন ঝামটপুর ত্যাগ করেন তখন তাঁর বাবা মা সম্ভবত বেঁচে ছিলেন না। তখন কৃষ্ণদাস কৃতবিদ্য যুবক।আচার্য মুখোপাধ্যায় অনুমান করেছেন যে কৃষ্ণদাস মহাপ্রভুর অপ্রকটের অব্যবহিত পূর্বে বা  পরে আনুমানিক ১৪৫০ শকাব্দে তাঁর জন্ম হয়েছিল।বাইশ বছর বয়সে তিনি ঝামটপুর ত্যাগ করেন।বঙ্গে তখন নিত্যানন্দের অপ্রতিহত প্রভাব চলছে। নিত্যানন্দের এক অনুগামী মীনকেতন রামদাসের অতি প্রিয়পাত্র ছিলেন এই কৃষ্ণদাস। রামদাসের প্রভাবেই তিনি গৌর নিতাইর প্রতি আসক্ত হন। এই কারনে বাড়িতে সর্বাদা নামসংকীর্তন হতো।কবি লিখেছেন—

অবধূত গোসাঞির এক ভৃত্য প্রেমধাম।

মীনকেতন রামদাস হয় তাঁর নাম।।

আমার আলয়ে অহোরাত্র সংকীর্তন।

তাহাতে আইসে তেঁহো পাঞা নিমন্ত্রন।।

চৈতন্যের অপ্রকটের পর বৈষ্ণবসমাজে অনেকেই নিত্যানন্দের ঘোর বিরোধী ছিলেন।কৃষ্ণদাস নিত্যানন্দপন্থী হলেও তাঁর ভাই শ্যামদাস ছিলেন নিত্যানন্দের কট্টর বিরোধী।তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের বাড়ির পূজারী গুণার্ণব মিশ্র।কবিরাজ প্রদত্ত বর্ণনা থেকে জানা যায় যে একদিন নামসঙ্কীর্তনে নিমন্ত্রিত হয়ে  মীনকেতন রামদাস এসেছিলেন তাঁদের বাড়িতে,কিন্তু নিত্যানন্দপন্থী রামদাসকে প্রথমে পাত্তা দেইনি কৃষ্ণদাসদের গৃহের পুজারী গুণার্ণব মিশ্র। ভদ্রতা দেখাননি বলে রামদাস ক্রুদ্ধ হয়ে দুচার কথা শুনিয়ে দিলেও মিশ্রমশাই নিজের কাজ করে  চললেন।এই মিশ্রর স্মৃতি স্বরূপ ঝামটপুর ও কাগ্রামের মাঝামাঝি স্থানেও আজও মিজরিপুকুর বা মিজদিঘি রয়েছে।

উৎসবের শেষে কৃষ্ণদাস ও শ্যামদাসের এনিয়ে কথাকাটাকাটি শুরু হলো মীনকেতনের উপস্থিতিতে।ঘটনা এমন পর্যায়ে পৌছালো যে মীনকেতন রাগে নিজের হাতে থাকা বাঁশিটি ভেঙে দিয়ে ঝামটপুর ত্যাগ করলেন।কবিরাজ গোস্বামী লিখেছেন—

ক্রুদ্ধ হঞা বংশী ভাঙ্গি চলে রামদাস।

তৎকালে আমার ভ্রাতার হৈল সর্বনাশ।।

কিন্তু তাঁর ভাইয়ের কী হয়েছিল এ সম্পর্কে কবিরাজ কিছু লেখেন নি বা ইঙ্গিত দেন নি। জনশ্রুতিও শোনা যায় না।বা শ্যামদাস সম্পর্কে কিছু জানা যায় না।  যাইহোক কৃষ্ণদাস  গৃহত্যাগ করে বৃন্দাবনে গেলেন আনুমানিক ১৪৭২ শকাব্দে।তারপরের ইতিহাস সকলের জানা। অতি বৃদ্ধ বয়সে ষড়গোস্বা্মীদের অনুপ্রেরণায় যে মহাগ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন তা ১৫৩৭ শকাব্দের জ্যৈষ্ঠ মসে সমাপ্ত হয়েছিল।১৫৪০ শকাব্দে  বা ১৬১৮ সালে তিনি প্রয়াত হন।

গৃহত্যাগের পূর্বে কৃষ্ণদাস ঝামটপুরের এক অনুগামী মুকুন্দ দাসকে তাঁর গৃহের ঠাকুরসেবার ভার দিয়ে গিয়েছিলেন।তিনিও কিছু দিন ঝামটপুরে থেকে বৃন্দাবনে কৃষ্ণদাসের কাছে সঙ্গে বাস করতে থাকেন।পরে কবিরাজগোস্বামীর প্রয়াণের পর চৈতন্যচরিতামৃতের একটি পুঁথি ,কবিরাজ পূজিত গোপাল জিউ এবং তাঁর ব্যবহৃত খড়ম নিয়ে আসেন ঝামটপুরে। যেগুলি এখনও বর্তমানে দেখা যায় ঝামটপুর পাটবাড়িতে।ক্রমশ ঝামটপুরের পাটবাড়িতে বিপিন দাস মহান্তের সময় মহাপ্রভুর দারুবিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয় আর ১৩১৮ বঙ্গাব্দে আর রাধাবল্লভ মহান্তের আমলে নিত্যানন্দের দারু বিগ্রহটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ঝামটপুর সংলগ্ন অনন্তপুরে রয়েছে ছোটপাটবাড়ি। এটি রঘুনাথের পাটবাড়ি নামে খ্যাত।এখানে পূর্বে রামচন্দ্র সীতাদেবী লক্ষণ ও হনুমানের মূর্তি পূজিত হতো।আগে এই মূর্তিগুলি পূজিত হতো বহড়ানের আখড়ায়।এই মূর্তিগুলির অঙ্গরাগ ও সেবাপূজাদি না হওয়ার কারনে একসময় গঙ্গাগর্ভে নিক্ষেপ করা হয়। তৎকালীন  জমিদারের প্রচেষ্টায়  রঘুনাথ ও গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে নিত্যসেবার ব্যবস্থা করা হয়।দুটি পাটবাড়ির উৎসব শারদ একাদশী থেকে শুরু করে চার দিন চলে।মেলা বসে।আর শোনা যায় কীর্তনগান।

 


Share your experience
  • 42
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    42
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR.SWAPAN KUMAR THAKUR
ড.স্বপনকুমার ঠাকুর।গবেষক লেখক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।কৌলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।